জেন জি যেভাবে বদলে দিচ্ছে চাকরির সংস্কৃতি

চরচা ডেস্ক
চরচা ডেস্ক
জেন জি যেভাবে বদলে দিচ্ছে চাকরির সংস্কৃতি
কর্মস্থলের মানচিত্র বদলে দিচ্ছে জেন জি প্রজন্ম। ছবি: ফ্রিপিক

কয়েক বছর হলো কর্মজগতে প্রবেশ করেছে জেন জি প্রজন্ম। চাকরিতে ঢুকে এক নতুন অধ্যায় লিখছে তারা। বিশ্লেষকেরা বলছেন, প্রচলিত কর্মসংস্কৃতির বিশাল পরিবর্তন আসছে জেন জি’দের হাত ধরে। 

ফোর্বস এক প্রতিবেদনে বলছে, ১৯৯৭ থেকে ২০১২ সালের মধ্যে জন্ম নেওয়া এই জেন জি প্রজন্ম প্রযুক্তিতে অভ্যস্ত, উদ্যমী ও মূল্যবোধনির্ভর। তারা শুধু চাকরি করতে আসে না, তারা চায় তাদের কাজের যেন উদ্দেশ্য, ভারসাম্য থাকে। কাজ করে মানসিক তৃপ্তি পাওয়াটাও তাদের উদ্দেশ্য হিসেবে থাকে। ফলে প্রথাগত কর্মসংস্কৃতি এখন পরিবর্তনের পথে।

জেন জি প্রজন্মের সবচেয়ে বড় শক্তি তাদের উদ্দেশ্যনির্ভর চিন্তা। জেন জি প্রজন্মের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো তারা অর্থবহ বা উদ্দেশ্যনির্ভর কাজ করতে চায়। প্রায় ৮৬ শতাংশ জেন জি কর্মী মনে করে, কাজের উদ্দেশ্য তাদের মানসিক স্বাস্থ্য ও চাকরির প্রতি সন্তুষ্টির মূল উৎস। ৭৫ শতাংশ জেন জি প্রজন্মের চাকরিপ্রার্থীরা কোনো প্রতিষ্ঠানে আবেদন করার আগে দেখে নেয়, সেই প্রতিষ্ঠান সমাজের জন্য কী করছে আসলে। 

জেন জি কর্মী মনে করে, কাজের উদ্দেশ্য তাদের মানসিক স্বাস্থ্য ও চাকরির প্রতি সন্তুষ্টির মূল উৎস। ছবি: ফ্রিপিক
জেন জি কর্মী মনে করে, কাজের উদ্দেশ্য তাদের মানসিক স্বাস্থ্য ও চাকরির প্রতি সন্তুষ্টির মূল উৎস। ছবি: ফ্রিপিক

ফার্স্ট প্লেস ফর ইয়ুথ সংস্থার প্রধান নির্বাহী থমাস লি ফোর্বসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, ‘আমাদের প্রতিষ্ঠানে জেন জি কর্মীদের কাছে আমাদের সামাজিক লক্ষ্যটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। তারা চায় তাদের কাজ যেন মানুষের জীবনে বাস্তব পরিবর্তন আনে।’ এই প্রজন্মের চাহিদা মেটাতে এখন অনেক প্রতিষ্ঠান সামাজিক দায়বদ্ধতা ও টেকসই লক্ষ্যকে তাদের ব্যবসার কেন্দ্রে রাখছে। এটি প্রতিভাবান কর্মীদের জন্য আকর্ষণীয়ই শুধু নয়, এর ফলে কর্মীদের মধ্যে তৈরি হচ্ছে গভীর সম্পৃক্ততা ও অনুপ্রেরণা।

তবে শুধু উদ্দেশ্য নয়, জেন জি’দের কাছে কাজ ও জীবনের ভারসাম্য রক্ষাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ ব্যাপারে তারা কোন আপোষ করছে না। এমনকি অনেকে বেশি বেতনের চাকরি ছেড়ে দিচ্ছে শুধু কাজ ও জীবনের ভারসাম্য ঠিক রাখার জন্য। তারা পরিবার বা বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটানো এবং নিজের শারীরিক বা মানসিক সুস্থতার কথা চিন্তা করে অফিসের সময়ের বাইরে বাড়তি কাজ না করার বিষয়টিকে বেশ গুরুত্ব দিচ্ছে। 

মহামারির পর থেকে হাইব্রিড কাজের ধারা জনপ্রিয় হয়েছে। এটি জেন জি’রা দারুণভাবে গ্রহণ করেছে। তারা সময় নয়, ফলাফলের ওপর গুরুত্ব দেয়। কাজটি কোথায় বা কখন হচ্ছে, সেটি নয়; বরং কতটা কার্যকরভাবে সম্পন্ন হচ্ছে, সেটিই তাদের কাছে মুখ্য।

বিশ্লেষকেরা বলছেন, প্রযুক্তির ব্যবহারেও এই জেন জি প্রজন্ম এগিয়ে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, অটোমেশন ও ডিজিটাল টুলস তাদের কাছে কাজের অবিচ্ছেদ্য অংশ। তাই তারা এমন কর্মপরিবেশ আশা করে, যেখানে প্রযুক্তি শুধু কাজ সহজ করে না, বরং দক্ষতা ও সৃজনশীলতাও বাড়ায়। 

কাজ যতই গুরুত্বপূর্ণ হোক, মানসিক সুস্থতা তার চেয়ে বেশি জরুরি। ছবি: ফ্রিপিক
কাজ যতই গুরুত্বপূর্ণ হোক, মানসিক সুস্থতা তার চেয়ে বেশি জরুরি। ছবি: ফ্রিপিক

জেন জি কর্মীরা মানসিক স্বাস্থ্যের প্রতিও সংবেদনশীল। মহামারির সময়ে বেড়ে ওঠার অভিজ্ঞতা তাদের এটি শিখিয়েছে যে, কাজ যতই গুরুত্বপূর্ণ হোক, মানসিক সুস্থতা তার চেয়ে বেশি জরুরি। ফলে এখন অনেক প্রতিষ্ঠান কর্মীদের জন্য মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা বা পরামর্শমূলক সেবা চালু করছে।

ফোর্বস বলছে, জেন জি প্রজন্মের কারণে অফিসের নেতৃত্বেও আসছে বড় পরিবর্তন। জেন জি’রা পছন্দ করে সহানুভূতিশীল ও অংশগ্রহণমূলক নেতৃত্ব। তারা চায় তাদের মতামত শুনে সিদ্ধান্ত নেওয়া হোক। ফলে অনেক প্রতিষ্ঠানে এখন প্রচলিত ‘বস-কর্মচারী’ সম্পর্কের বদলে গড়ে উঠছে পারস্পরিক সহযোগিতা ও স্বচ্ছতার চর্চা।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো বৈচিত্র্য ও অন্তর্ভুক্তি। জেন জি হলো সবচেয়ে বৈচিত্র্যময় প্রজন্ম। জাতি, লিঙ্গ, সংস্কৃতি কিংবা মতাদর্শে তারা বৈচিত্র্যকে মূল্য দেয়। তাই তারা এমন কর্মস্থল বেছে নেয়, যেখানে প্রত্যেকের জন্য সমান সুযোগ ও সম্মান নিশ্চিত করা হয়।

সব মিলিয়ে বলা যায়, জেন জি প্রজন্ম কর্মক্ষেত্রে প্রবেশের সঙ্গে সঙ্গে কর্মজগতের সংজ্ঞাই পাল্টে দিচ্ছে। তাদের চাহিদা ও মূল্যবোধের প্রতিফলনে প্রতিষ্ঠানগুলো আরও মানবিক, উদ্দেশ্যনির্ভর ও প্রযুক্তিসমৃদ্ধ হয়ে উঠতে পারে।

সম্পর্কিত