বিশ্বকাপের বাণিজ্যিক সত্ত্বের একটা অংশ যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ব্যক্তিমালিকানাধীন বিনিয়োগকারীদের একটি গ্রুপের কাছে বিক্রি করে দেওয়ার পরিকল্পনা ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর। গত দু-তিন দিনে এ নিয়ে সমালোচনা হয়েছে অনেক। এই পরিকল্পনার কথা সামনে আসার পরই একবার এর সমালোচনা করেছিল ইউরোপের ফুটবলের নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থা উয়েফা।
আজ ইউরোপের দেশগুলো ঘোষণা দিয়েছে, ইনফান্তিনোর এই পরিকল্পনা টিকে গেলে তারা সবাই একযোগে বিশ্বকাপসহ ফিফার সব টুর্নামেন্ট বয়কট করবে। উয়েফার সদস্য ৫৫টি দেশই এ ব্যাপারে একমত হয়েছে।
ইনফান্তিনোর পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনার জন্য আজ উয়েফার সদস্যগুলোর এক জরুরি সভা ডাকেন সংস্থাটির সভাপতি আলেক্সান্দর সেফেরিন। বৈঠক দুই ঘণ্টাও গড়ায়নি, তার আগেই সভায় সব দেশ ঐক্যমত্যে পৌঁছে যায়। এর আগে যদিও শঙ্কা ছিল যে, ফুটবলে ইউরোপের পিছিয়ে থাকা দেশগুলো হয়তো ইনফান্তিনোর পরিকল্পনায় থাকা অর্থের প্রলোভনে সাড়া দিয়ে পরিকল্পনাটা মেনে নেবে। তবে আজ সভায় দেখা গেল, কেউই ইনফান্তিনোর পক্ষে নয়। সভা শেষে এক বিবৃতিতে উয়েফার সদস্য ৫৫ দেশ বলেছে, তারা ইনফান্তিনোর এই পরিকল্পনা ‘পরিষ্কারভাবে ও সর্বসম্মতভাবে বর্জন’ করছে।
‘আজকের আলোচনার প্রেক্ষিতে নেওয়া সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, এই প্রস্তাব যতক্ষণ পর্যন্ত বলবৎ থাকবে– যদি এই পরিকল্পনা পুরোপুরিই ছুঁড়ে ফেলে দেওয়া না হয়, কিংবা ফিফা যদি এর প্রশাসন বা টুর্নামেন্টগুলোর স্বত্ত্ব কখনোই ব্যক্তিমালিকানায় না ছাড়ার চূড়ান্ত প্রতিশ্রুতি দেয়, ততক্ষণ পর্যন্ত– উয়েফার কোনো জাতীয় দল ফিফার কোনো টুর্নামেন্টে অংশ নেবে না’– বিবৃতিতে জানিয়ে দিয়েছে উয়েফা।
ইউরোপের দেশগুলোর এই পদক্ষেপের কারণে ইনফান্তিনোর জন্য তার পরিকল্পনা নিয়ে সামনে এগিয়ে যাওয়া কঠিনই মনে হচ্ছে। এই পরিকল্পনা নিয়ে নিজেদের রায় জানানোর জন্য ফিফা তার সদস্য দেশগুলোকে ১৯ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সময় বেঁধে দিয়েছে বটে, তবে ইউরোপিয়ান দেশগুলোর এই সিদ্ধান্ত ও হুমকির পর ইনফান্তিনোর ওপর এই পরিকল্পনা বদলানোর কিংবা একেবারেই তুলে নেওয়ার চাপ বাড়বে।
আগামী বছর হতে যাওয়া ফিফা সভাপতি নির্বাচনের দিকে চোখ রাখলে ইউরোপের দেশগুলোর আজকের সিদ্ধান্ত আরও প্রভাবশালী হয়ে দেখা দেয়। আগামী মার্চের নির্বাচন সামনে রেখে ইউরোপের বড় বড় অনেক দেশ এর আগে ইনফান্তিনোর সমর্থনে চিঠি দিলেও, আজকের এই সিদ্ধান্ত ইনফান্তিনোর পায়ের নিচের মাটি অনেক নড়বড়ে করে দিয়েছে বলে মনে হতে পারে।
উয়েফার বৈঠকে আজ ২০টিরও বেশি সদস্য ফেডারেশনের প্রধানরা বক্তব্য দিয়েছেন। সভায় উপস্থিত একজনকে সূত্র জানিয়ে ইংলিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ান লিখেছে, ইংলিশ ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের (এফএ) ডেবি হিউয়িটও বক্তব্য রেখেছেন এবং তিনি বয়কটের পক্ষে ‘বেশ কড়া’ কথা বলেছেন। এরপর এক বিবৃতিও দিয়েছে ইংলিশ এফএ, যেখানে ইউরোপিয়ান দেশগুলোর সঙ্গে সংহতি প্রকাশ করে তারা লিখেছে, ‘ফিফার পরিকল্পনার বিরুদ্ধে আমরা– ফিফা বিশ্বকাপের মালিকানা ফুটবলেরই, সবসময়ই তা থাকবে।’
উয়েফা যেভাবে ভাবছে, তাতে ইনফান্তিনোর পরিকল্পনা না বদলালে সিনিয়র জাতীয় দলের ক্ষেত্রে বয়কটের শুরুটা হবে আগামী বছর হতে যাওয়া মেয়েদের বিশ্বকাপকে দিয়ে। আর বয়সভিত্তিক পর্যায়ে বয়কট শুরু হতে পারে আগামী সেপ্টেম্বরে পোল্যান্ডে হতে যাওয়া অনূর্ধ্ব-২০ মেয়েদের বিশ্বকাপ দিয়ে।
ফিফার ছয় কনফেডারেশনের মধ্যে বাকি পাঁচটিকেও (কনমেবল, এএফসি, কনক্যাকাফ, ওশেনিয়া, সিএএফ) তাদের সঙ্গে একজোট হতে আহ্বান জানিয়েছে উয়েফা। এর মধ্যে এশিয়ার কয়েকটি দেশও তাদের মতো করেই ফিফার পরিকল্পনার বিরোধিতা করবে বলে আত্মবিশ্বাসী উয়েফার কর্তাব্যক্তিরা। আগামী বছর চতুর্থ মেয়াদে ফিফা সভাপতির পদে নির্বাচনের জন্য দাঁড়াতে যাওয়া ইনফান্তিনোর পক্ষে সবচেয়ে বড় সমর্থন সাধারণত ইউরোপের বাইরে থেকে– আফ্রিকা ও এশিয়ার দেশগুলো থেকেই– এসেছে। সেই দেশগুলোর বেশিরভাগ ইনফান্তিনোর পরিকল্পনায় সায় না দিলে সেটা নির্বাচনে অনেক বড় প্রভাব ফেলবে। উয়েফা এরই মধ্যে উত্তর ও মধ্য আমেরিকার ফুটবল নিয়ন্ত্রক সংস্থা কনক্যাকাফের সঙ্গে কথা বলেছে বলে জানাচ্ছে গার্ডিয়ান। কনক্যাকাফ ফিফার পরিকল্পনার বিরোধিতায় উয়েফাকে সমর্থন জানালেও এখন পর্যন্ত আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো অবস্থান নেয়নি। আজ বাংলাদেশ সময় রাত ১০টা ৩০ মিনিটে কনক্যাকাফের ৪১ সদস্য দেশ জরুরি সভা ডেকেছে।
দ্য গার্ডিয়ান লিখেছে, ইউরোপিয়ান ফুটবলের ভেতরের অনেক সূত্র বিশ্বাস করে, উয়েফার এই সিদ্ধান্ত আগামী বছরের ফিফা সভাপতি নির্বাচনে ইউরোপ-সমর্থিত কোনো প্রার্থীর জয়ের সম্ভাবনা বাড়িয়ে দিতে পারে। প্রসঙ্গত, আগামী বছরের নির্বাচনে ফ্রেঞ্চ ক্লাব পিএসজির মালিক এবং উয়েফায় ইউরোপিয়ান ক্লাবগুলোর সংগঠন (ইএফসি) সভাপতি নাসের আল-খেলাইফি প্রার্থী হিসেবে দাঁড়ানোর জোর সম্ভাবনা আছে।