কেন চুরি হয়নি ল্যুভ জাদুঘরের সবচেয়ে দামি রত্ন?

চরচা ডেস্ক
চরচা ডেস্ক
কেন চুরি হয়নি ল্যুভ জাদুঘরের সবচেয়ে দামি রত্ন?
ল্যুভ জাদুঘরে চুরি হওয়া অলংকারগুলোর মোট মূল্য প্রায় ৮৮ মিলিয়ন ইউরো।

প্যারিসের ল্যুভ জাদুঘরে ঘটেছে এক দুঃসাহসিক চুরির ঘটনা। চারজন চোরের একটি দল স্কুটার চেপে পালিয়ে যায় ফ্রান্সের রাজপরিবারের আটটি অমূল্য রত্ন নিয়ে। কিন্তু অবাক করার মতো বিষয় হলো তারা জাদুঘরের সবচেয়ে বিখ্যাত রত্নগুলোর একটি, ভারতের সঙ্গে গভীর ঐতিহাসিক সম্পর্কযুক্ত এবং ‘অভিশপ্ত’ হিসেবে পরিচিত রিজেন্ট ডায়মন্ড ছুঁয়েও দেখেনি।

প্যারিসের প্রসিকিউটর লর বেকো জানান, চুরি হওয়া অলংকারগুলোর মধ্যে ছিল রাজপরিবারের ব্যবহৃত মুকুট, হার ও ব্রোচ, যেগুলোর মোট মূল্য প্রায় ৮৮ মিলিয়ন ইউরো, অর্থাৎ প্রায় ১০২ মিলিয়ন মার্কিন ডলার।

চুরিটি ঘটে মাত্র আট মিনিটে, গত ১৯ অক্টোবর, যা সাম্প্রতিক দশকগুলোর মধ্যে সবচেয়ে দুঃসাহসিক জাদুঘর ডাকাতির ঘটনা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

চোরেরা নিয়ে যায় ফরাসি রাজপরিবারের অমূল্য কিছু রত্ন, যার মধ্যে ছিল সম্রাজ্ঞী ইউজেনি-নেপোলিয়ন তৃতীয়ের স্ত্রীর মুক্তোর মুকুট ও হীরের বোডিস বো, নেপোলিয়নের উপহার দেওয়া পান্নার নেকলেস ও কানের দুল, যা তিনি তাঁর স্ত্রী মেরি-লুইকে দিয়েছিলেন। এছাড়াও চুরি হয়েছে রানি মেরি-আমেলি দ্য বোরবন এবং রানি হরটেন্স অব হল্যান্ড-এর ব্যবহৃত নীলার অলংকার সেট।

সবচেয়ে দৃষ্টিনন্দন ছিল সম্রাজ্ঞী ইউজেনির ঝাড়বাতির মতো হীরের অলংকার যার নাম রিলিক্যুয়ারি ব্রোচ। এই ব্রোচ ফ্রান্স সাম্রাজ্যের ঐতিহ্যের এক প্রতীকী নিদর্শন।

কিন্তু চুরি হওয়া জিনিস থেকেও চুরি না হওয়া একটা জিনিসই তদন্তকারীদেরকে বেশি অবাক করেছে। চোর ছুঁয়েও দেখেনি ফ্রান্সের সবচেয়ে দামি রত্ন রিজেন্ট ডায়মন্ড।

রিজেন্ট ডায়মন্ডের ইতিহাস

‘রিজেন্ট ডায়মন্ড’-এর ইতিহাস ভারত থেকেই শুরু। অন্ধ্রপ্রদেশের বিখ্যাত গোলকোন্ডা অঞ্চলের কোল্লুর খনি থেকে ১৭শ শতকের শেষ দিকে এক শ্রমিক এটি আবিষ্কার করেছিলেন বলে কথিত রয়েছে। বলা হয় ওই শ্রমিক ৪১০ ক্যারেটের হীরেটি নিজের পায়ের ক্ষতের ভেতর লুকিয়ে খনি থেকে পাচার করেন। পরে মাদ্রাজে (বর্তমান চেন্নাই) যাওয়ার পথে তিনি এক ইংরেজ জাহাজের ক্যাপ্টেনের সাহায্যে হীরাটি বিক্রি করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু সেই ক্যাপ্টেন বিশ্বাসঘাতকতা করে। ওই শ্রমিককে হত্যা করে হীরেটি নিজের দখলে নেন।

Sapphire
Sapphire

পরবর্তীতে হীরাটি ঘষামাজা করে বিক্রি করা হয়। শেষমেশ এটি কিনে নেন ফিলিপ দ্বিতীয়, ডিউক অব অরলিয়াঁ, যিনি তরুণ রাজা লুই পঞ্চদশের অভিভাবক বা ‘রিজেন্ট’ ছিলেন। সেখান থেকেই হীরেটির নাম হয় ‘রিজেন্ট ডায়মন্ড’।

১৮ ও ১৯ শতক জুড়ে এটি শোভা পেয়েছে লুই পঞ্চদশ ও লুই ষোড়শের রাজমুকুটে, এমনকি মারি আঁতোয়ানেতের টুপিতেও বসানো হয়েছিল। ফরাসি বিপ্লবের পর এটি যায় নেপোলিয়ন বোনাপার্টের হাতে, যিনি নিজের তলোয়ারের হাতলে এই হীরাটি বসিয়ে ব্যবহার করেছিলেন সাম্রাজ্যিক ক্ষমতার প্রতীক হিসেবে।

রিজেন্ট ডায়মন্ড কি সত্যিই অভিশপ্ত?

চোখ ধাঁধানো সৌন্দর্য থাকা সত্ত্বেও রিজেন্ট ডায়মন্ড বহুদিন ধরেই অভিশাপ ও দুর্ভাগ্যের প্রতীক হিসেবে পরিচিত। যে খনি শ্রমিক এটি প্রথম খুঁজে পেয়েছিলেন, তাকে হত্যা করা হয়েছিল। পরে রাজা লুই ষোড়শ ও রানি মারি আঁতোয়ানেত দুজনকেই ফরাসি বিপ্লবের সময় মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। আর নেপোলিয়ন বোনাপার্ট নিজেও জীবনের শেষদিকে দুইবার নির্বাসিত হন এবং সেন্ট হেলেনা দ্বীপে মৃত্যুবরণ করেন।

এই সব রক্তাক্ত ইতিহাস থেকেই জন্ম নিয়েছে রিজেন্ট ডায়মন্ডের এই কুখ্যাতি। ফরাসি শিল্পজগতের অনেকে ধারণা করছেন, ল্যুভ জাদুঘরের চোরেরা হয়তো সেই অভিশাপের কথা জান আর সেই কারণেই তারা সব কিছু নিয়ে গেলেও রিজেন্ট ডায়মন্ডে হাত দেয়নি।

সম্পর্কিত