প্রিমিয়ার লিগের আর্থিক সঙ্গতি বা ফিন্যান্সিয়াল ফেয়ার প্লে-র নীতি ভাঙার ১১৫টি অভিযোগ উঠেছিল ম্যানচেস্টার সিটির বিরুদ্ধে। এর মধ্যে একটি বাদে সবগুলো, অর্থাৎ ১১৪টি অভিযোগেই দোষী প্রমাণিত হয়েছে সর্বশেষ ৯ মৌসুমে ৬ বারই প্রিমিয়ার লিগ জেতা ক্লাবটিকে।
অভিযোগগুলো নিয়ে তদন্ত ও শুনানি প্রক্রিয়া চালানো প্রিমিয়ার লিগ কর্তৃপক্ষ এখনো অবশ্য রায়টির আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেয়নি। ইংলিশ সব মিডিয়া তার আগেই এই খবর প্রচার করছে।
দোষী প্রমাণিত হলেও এই দায়ের কারণে ঠিক কী শাস্তি পেতে পারে ম্যান সিটি, সেটাও এখনো ঠিক হয়নি। অভিযোগগুলো যে বছরগুলোর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য, সে বছরগুলোতে সিটির প্রিমিয়ার লিগের শিরোপা কেড়ে নেওয়া; পয়েন্ট জরিমানা; আর্থিক জরিমানা এমনকি প্রিমিয়ার লিগ থেকেই নিচের স্তর চ্যাম্পিয়নশিপে নামিয়ে দেওয়া–এখনো সব ধরনের শাস্তির রাস্তাই খোলা।
তবে সিটি এখনো তাদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলো নিয়ে রায় আসেনি জানিয়ে বলেছে, এমনই রায় এলে তারা এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ ক্রীড়া আদালত ‘কোর্ট অব আরবিট্রেশন ফর স্পোর্ট’-এ (সিএএস) আপিল করবে।
এই প্রক্রিয়ার ব্যাপারে জানে–এমন কয়েকটি সূত্র তাদের বলেছে জানিয়ে ক্রীড়াবিষয়ক জনপ্রিয় সংবাদমাধ্যম দ্য অ্যাথলেটিক তাদের প্রতিবেদনে লিখেছে, ১১৫টি অভিযোগের মধ্যে একটি ছাড়া বাকি সব কটিতেই সিটিকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছে। প্রিমিয়ার লিগের ২০টি ক্লাবের এক সভায় সিটির বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ার কথা জানানো হয়েছে। তবে এ ব্যাপারে প্রকাশ্যে কথা বলার অনুমতি না থাকায় সূত্রগুলো নাম প্রকাশ না করার শর্তে তাদের তথ্যটি জানিয়েছে বলে লিখেছে দ্য অ্যাথলেটিক।
সিটির বিরুদ্ধে প্রথম অভিযোগ আনা হয়েছিল ২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে। চার বছর ধরে তদন্তের পর এখন সিদ্ধান্ত এল।
কীভাবে এত দূর গড়াল বিষয়টি?
সিটির বিরুদ্ধে অভিযোগ মূলত ২০০৯ থেকে ২০১৮ সালের মধ্যে আর্থিক নীতিমালা ভাঙার। ২০১৮ সালের নভেম্বরে জার্মান সংবাদপত্র ডার স্পিগেল সিটির ফাঁস হওয়া আর্থিক নথি প্রকাশ করার পর অভিযোগগুলো আসতে শুরু করে। তদন্ত শুরু করে প্রিমিয়ার লিগ কর্তৃপক্ষ। তদন্তের পর অভিযোগ আনা হয়। পরে বিষয়টি একটি স্বাধীন কমিশনের কাছে পাঠানো হয়।
প্রিমিয়ার লিগের অভিযোগ ছিল, সিটি তাদের আর্থিক তথ্য এবং খেলোয়াড় ও কোচদের দেওয়া বেতন-বোনাসের বিস্তারিত তথ্য সঠিকভাবে দেয়নি। পাশাপাশি ইউরোপীয় ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা উয়েফার আর্থিক সঙ্গতি বা ফিন্যান্সিয়াল ফেয়ার প্লে (এফএফপি) বিধি এবং প্রিমিয়ার লিগের নিজস্ব ‘লাভ ও আর্থিক স্থিতিশীলতার নীতি’ও ভেঙেছে ক্লাবটি। সিটি অবশ্য শুরু থেকেই এসব অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে।
২০০৮ সালে শেখ মনসুরের মালিকানাধীন আবুধাবি ইউনাইটেড গ্রুপ কিনে নেয় ম্যান সিটি ক্লাবটিকে। এরপর থেকে এ পর্যন্ত সিটি প্রিমিয়ার লিগ জিতেছে ৮ বার, চ্যাম্পিয়নস লিগ ১ বার। এর বাইরে ৪ বার এফএ কাপ, ৭ বার লিগ কাপও জিতেছে। এসব শিরোপার মধ্যে ৬টিই এসেছে অভিযোগ আনার পরের সময়ে।
ডার স্পিগেলের ফাঁস করা নথির ভিত্তিতেই ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারিতে উয়েফা তাদের সব টুর্নামেন্ট, অর্থাৎ, চ্যাম্পিয়নস লিগ, ইউরোপা লিগ, সুপারকাপ থেকে সিটিকে দুই বছরের জন্য নিষিদ্ধ করে। পাশাপাশি ৩ কোটি ইউরো জরিমানাও করে। তবে পাঁচ মাস পর কোর্ট অব আরবিট্রেশন ফর স্পোর্ট এই শাস্তি বাতিল করে। সিএএস শাস্তি বাতিলের কারণ হিসেবে বলেছিল, এফএফপি লঙ্ঘনের অভিযোগের কিছু নির্দিষ্টভাবে প্রমাণিত হয়নি, কিছু অভিযোগের ক্ষেত্রে ঘটনাগুলো এত আগের যে, উয়েফার নীতিমালা অনুযায়ী সেগুলোর জন্য আর শাস্তি দেওয়া সম্ভব ছিল না।
এদিকে, অ্যাসোসিয়েটেড পার্টি ট্রানজ্যাকশন বা এপিটি-সংক্রান্ত নিয়ম নিয়েও কয়েক বছর ধরে প্রিমিয়ার লিগের সঙ্গে সিটির বিরোধ চলছিল। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে অবশ্য লিগের সঙ্গে এ বিষয়ে সমঝোতায় পৌঁছায় ক্লাবটি।
সিটির কী শাস্তি হতে পারে?
প্রিমিয়ার লিগের বিধিমালার ডাব্লিউ.৫১ ধারায় আর্থিক নীতিমালা ভাঙার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য শাস্তির কথা বলা আছে। সেখানে শাস্তির তালিকায় তিরস্কার ও জরিমানা থেকে শুরু করে, পয়েন্ট কেটে নেওয়া, শিরোপা কেড়ে নেওয়া, এমনকি প্রিমিয়ার লিগ থেকে বহিষ্কারও রয়েছে।
ডাব্লিউ ৫১ ধারার ৭ উপধারায় লেখা আছে, কমিশন চাইলে বিধিতে লেখা শাস্তিগুলোর মধ্যে একাধিক শাস্তিও একসঙ্গে দিতে পারে। এমনকি তারা উপযুক্ত মনে করলে অন্য ধরনের শাস্তিও দিতে পারে।
সিটির সামনে এখন সিএএস-ই সম্ভবত একমাত্র বাঁচার পথ।