শরৎ এলেই বদলে যায় প্রকৃতির চেহারা। নীল আকাশে সাদা মেঘের ভেলা, মৃদু বাতাস আর মাঠজুড়ে দোল খাওয়া কাশফুল জানান দেয় শরতের আগমনী বার্তা। কবি জীবনানন্দ দাশের শহর বরিশালও যেন শরতের সেই শুভ্র সৌন্দর্যে সেজে উঠেছে।
বরিশাল শহরের বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশনের (বিসিক) ৩৫ একর জমিজুড়ে এখন চোখে পড়ছে বিশাল এক কাশবন। শিল্পপ্রতিষ্ঠানের জন্য নির্ধারিত উন্নয়ন প্লটের বালুময় জমিতে প্রাকৃতিকভাবে জন্ম নেওয়া কাশফুলই এখন নগরবাসীর অন্যতম আকর্ষণ। প্রতিদিনই নানা বয়সী মানুষ ছুটে আসছেন এই কাশবনের সৌন্দর্য দেখতে।
বিকেল হলেই সাদা কাশফুলের সমারোহে মুখর হয়ে ওঠে পুরো এলাকা। কেউ মুঠোফোনে ধরে রাখছেন প্রিয় মুহূর্ত, কেউ পরিবার নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছেন কাশবনের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে। শিশুদের হাতেও দেখা যাচ্ছে কাশফুল। সব মিলিয়ে শরতের এই কাশবন হয়ে উঠেছে আনন্দমুখর এক মিলনস্থল।
গতকাল শুক্রবার বিকেলে সরেজমিনে দেখা যায়, বালুময় জমিতে প্রাকৃতিকভাবে বেড়ে ওঠা কাশফুলের মাঝ দিয়ে চলে গেছে পিচের সড়ক। সেই সড়কজুড়ে মানুষের ভিড়। কেউ ছবি তুলছেন, কেউ শিশুদের হাতে তুলে দিচ্ছেন কাশফুল। আবার কেউ কাশবনের ভেতর দিয়ে হেঁটে উপভোগ করছেন প্রকৃতির সৌন্দর্য। প্রিয়জনদের সঙ্গে গল্প আর অবসর সময় কাটাতেও অনেকে বেছে নিয়েছেন এই জায়গাটি।
কাশবনে ঘুরতে আসা দর্শনার্থীরা জানান, শরতের কাশফুলের সৌন্দর্য উপভোগ করতেই তারা এখানে এসেছেন। শহরের ব্যস্ততা থেকে কিছুটা দূরে প্রকৃতির কাছাকাছি সময় কাটানোর সুযোগ তাদের ভালো লাগছে। বিশেষ করে বিকেলের মৃদু বাতাসে দুলতে থাকা সাদা কাশফুলের দৃশ্য তাদের মুগ্ধ করছে।
বরিশাল নগরীর সি অ্যান্ড বি পোল সংলগ্ন এলাকার বাসিন্দা মো. আনিসও এসেছেন পরিবার নিয়ে। কাশফুল ছিঁড়তে ছিঁড়তে তিনি বলেন, “প্রথমবার পরিবার নিয়ে বিসিকের কাশফুল দেখতে এসেছি। ছোট মেয়ে কাশফুল নেওয়ার জন্য কান্না করছিল। এজন্য কয়েকটি কাশফুল ছিঁড়ে তার হাতে দিয়েছি।”
ঝালকাঠি থেকে আসা উম্মে জাহান সুখী পেশায় একজন কনটেন্ট ক্রিয়েটর। তিনি বলেন, “ভিডিও শুট করতেই এখানে এসেছি। এর আগে অনেক জায়গায় কাশফুল দেখতে গিয়েছি। তবে এত বড় জায়গাজুড়ে কাশফুল আগে দেখিনি। অনেক ভালো লাগছে।”
শুধু দর্শনার্থী নন, শরতের এই কাশবন ঘিরে ব্যস্ততা বেড়েছে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদেরও। কাশফুলের মাঝে ছোট্ট টেবিল পেতে ঝালমুড়ি বিক্রি করছেন রহিমা বেগম। তিনি বলেন, “শুধু কাশফুলের সময় এখানে ঝালমুড়ি বিক্রি করি। শুক্রবারে একটু বেশি বেচাকেনা হয়। দেড় হাজার থেকে দুই হাজার টাকার মতো বিক্রি হয়। অন্য দিন হাজার টাকার মতো বিক্রি করি।”
বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামার আগে বদলে যায় কাশবনের রূপ। পশ্চিম আকাশের ম্লান আলো সাদা কাশফুলের ওপর ছড়িয়ে দেয় সোনালি আভা। মৃদু বাতাসে দুলতে থাকা কাশফুলের সারি তখন তৈরি করে অন্যরকম এক দৃশ্য। দিনের ব্যস্ততা ভুলে সেই সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকেন দর্শনার্থীরা।
শরতের এই সৌন্দর্য উপভোগ করতে এসে যাতে কেউ কোনো অপ্রীতিকর পরিস্থিতির মুখে না পড়েন, সে বিষয়েও নজর রাখছে পুলিশ।
বরিশাল কাউনিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সনজিত চন্দ্র নাথ চরচাকে বলেন, “কাশবন দেখতে আসা দর্শনার্থীদের নিরাপত্তার বিষয়টি আমরা গুরুত্বের সঙ্গে দেখছি। দর্শনার্থীদের যাতে কোনো ধরনের অপ্রীতিকর পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে না হয়, সে বিষয়ে পুলিশের নজরদারি রয়েছে। পাশাপাশি সবাইকে শৃঙ্খলা বজায় রেখে কাশবনের সৌন্দর্য উপভোগ করার আহ্বান জানাচ্ছি।”
শরতের সাদা কাশফুল, নীল আকাশ আর মৃদু বাতাস–সব মিলিয়ে বরিশালের বিসিকের এই বিস্তীর্ণ কাশবন এখন নগরবাসীর ব্যস্ত জীবনে এক টুকরো স্বস্তির ঠিকানা। প্রকৃতির তৈরি এই সৌন্দর্য দেখতে প্রতিদিনই এখানে বাড়ছে মানুষের আনাগোনা।