জঙ্গল সলিমপুর। নানা কারণে কয়েক দশক ধরেই আলোচনায় এই নাম। চট্টগ্রামের প্রবেশমুখেই সীতাকুণ্ডের এই জঙ্গল সলিমপুর নিয়ে অনেকের মধ্যে, এমনকি প্রশাসনের মধ্যে কাজ করে নানা রহস্য ও ভীতি। চলতি বছরের শুরুতে, জানুয়ারির ১৯ তারিখে এখানেই সশস্ত্র হামলায় র্যাবের উপ-সহকারী পরিচালক মতালেব হোসেন নিহত হন। এরপর থেকে আরও আলোচনায় এই জঙ্গল সলিমপুর।
আলোচনায় থাকা এই জঙ্গল সলিমপুরে নতুন করে র্যাবের ক্যাম্পে হামলা করেছে ইয়াসিন বাহিনীর সদস্যরা। র্যাব-৭ এর অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল হাফিজুর রহমান সাংবাদিকদের জানান, ২৪ মে দিবাগত রাত আনুমানিক আড়াইটার দিকে ইয়াসিন বাহিনীর সশস্ত্র সদস্যরা র্যাব ক্যাম্প ঘিরে ফেলে এবং গুলি ছোড়ে। আত্মরক্ষার্থে র্যাব সদস্যরাও পাল্টা গুলি চালায়। স্থানীয়রা বলছেন, একই সময়ে জঙ্গল সলিমপুরের আলীনগর এলাকায় পুলিশ ক্যাম্পেও হামলা চালায় দুর্বৃত্তরা।
এই দুই ঘটনার পর জঙ্গল সলিমপুরে বিপুল আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে এবং অভিযান চলছে যৌথবাহিনীর।
চট্টগ্রাম শহরের বায়েজিদ বোস্তামী এলাকা থেকে মাত্র দুই কিলোমিটার পশ্চিমে অবস্থিত ৩ হাজার ১০০ একর বিস্তৃত এক দুর্গম পাহাড়ি এলাকা এই জঙ্গল সলিমপুর। অন্তত ২৫ হাজার ঘরবাড়ি রয়েছে এখানে, যেখানে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা ছিন্নমূল ও নিম্নআয়ের মানুষের বাসই বেশি।
সন্ত্রাসীদের নিরাপদ আশ্রয়স্থল হিসেবে পরিচিত এই জঙ্গল সলিমপুরে দীর্ঘদিন ধরে প্রশাসনের কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। এলাকার দুই পাশে পাহাড় এবং মাঝখানে সরু রাস্তার কারণে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা চাইলেও অভিযান চালাতে পারেন না।
গত ১৯ জানুয়ারি র্যাব কর্মকর্তা নিহতের পর গত ৯ মার্চ ভোর থেকে সেনাবাহিনী, পুলিশ, র্যাব ও বিজিবি একসাথে বিশাল অভিযান শুরু করে। প্রায় চার হাজার সদস্যের এই অভিযানে ড্রোন এবং হেলিকপ্টার ব্যবহার করা হয়। এরপর আলোচনা হয় এই জঙ্গল সলিমপুরে র্যাব ও পুলিশের স্থায়ী ক্যাম্প করা নিয়ে।
এই জঙ্গল সলিমপুরে বিভিন্ন সন্ত্রাসী গ্রুপের মধ্যে প্রায়ই গোলাগুলি ও খুনোখুনির মতো ঘটনার কথা জানা যায়। যৌথ অভিযানের আগ পর্যন্ত জঙ্গল সলিমপুরে একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ ছিল ‘ইয়াসিন গ্রুপের’ হাতে। এ ছাড়া এলাকায় সক্রিয় রোকন গ্রুপ ও রিদোয়ান গ্রুপ। অভিযোগ আছে, পাহাড় কেটে প্লট বাণিজ্য, অবৈধ বিদ্যুৎ ও পানির সংযোগ দেওয়া এবং মাদক ব্যবসার মতো অপরাধের সাথে জড়িত এই সন্ত্রাসী গ্রুপগুলো।
আওয়ামী লীগ আমলে ২০২২ সালে একবার র্যাবের সাথে সন্ত্রাসীদের গোলাগুলি হয় এবং ওই বছরই সলিমপুরে অবৈধ ঘরবাড়ি উচ্ছেদ অভিযান শেষে জেলা প্রশাসনের লোকদের বাধা দেওয়া হয়। একই বছর আলীনগরে অবৈধ বসতি ভাঙতে গেলে আলীনগরের সন্ত্রাসীরা পুলিশের ওপর হামলা চালায়।
ওই বছরই জঙ্গল সলিমপুর এলাকায় চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারের শাখা, মডেল মসজিদ, স্পোর্টস ভিলেজ ও নভোথিয়েটারসহ বিভিন্ন প্রকল্পের উদ্যোগ নেওয়া হয়। কিন্তু জঙ্গল সলিমপুরের নিয়ন্ত্রণ প্রশাসনের হাতে না থাকায় প্রকল্পগুলোর কোনো অগ্রগতি হয়নি।