বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার মাত্র সাত সপ্তাহ পর ভোরবেলা যুক্তরাজ্যের কিংস কলেজ লন্ডন থেকে একটি ফোন পান খাদিজা। এই ফোন তাকে ভীত ও বিভ্রান্ত করে তোলে।
তখন ১৮ বছর বয়সী খাদিজাকে জানানো হয়, তিনি তার এক লেকচারার সম্পর্কে “অনুপযুক্ত ও আপত্তিকর মন্তব্য” করেছেন। ওই লেকচারার ইসরায়েলি সেনাবাহিনীতে কাজ করেছিলেন।
কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল–জাজিরা এক প্রতিবেদনে এই তথ্য জানিয়েছে।
পরবর্তী পাঁচ মাস ধরে তাকে একটি শৃঙ্খলাজনিত প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয়। এ সময় তাকে ওই শিক্ষকের ক্লাসে অংশগ্রহণে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয় এবং ২ হাজার শব্দের একটি ‘আত্ম-পর্যালোচনামূলক’ প্রবন্ধ লেখার নির্দেশ দেওয়া হয়।
এ ছাড়া, তাকে যুক্তরাজ্য সরকারের ‘সন্ত্রাসবিরোধী’ কর্মসূচি প্রিভেন্টে পাঠানোর বিষয়েও বিবেচনা করা হয়। অধিকার সংগঠনগুলো দীর্ঘদিন ধরে এই কর্মসূচির সমালোচনা করে আসছে। তাদের অভিযোগ, এটি অসামঞ্জস্যপূর্ণভাবে মুসলিমদের লক্ষ্যবস্তু করে এবং এর কার্যক্রমে স্বচ্ছতার অভাব রয়েছে।
ঘটনাটি ঘটে গত বছর। খাদিজা একটি ফিলিস্তিনপন্থী শিক্ষার্থী হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে লিখেছিলেন, তিনি তার লেকচারারের প্রকাশ্য লিংকডইন প্রোফাইল দেখে জানতে পেরেছেন ওই শিক্ষক চার বছর ইসরায়েলি সেনাবাহিনীতে কাজ করেছেন। পাশাপাশি তিনি ফিলিস্তিনিদের প্রতি ইসরায়েলের আচরণকে সমর্থন করে এমন কিছু পোস্ট শেয়ার ও পছন্দ করেছেন দেখে খাদিজা ‘অসুস্থ বোধ’ করেছেন বলেও মন্তব্য করেন।
ওই সময় গাজায় ইসরায়েলের যুদ্ধের কারণে কমপক্ষে ৬৭ হাজার ১৯৪ জন নিহত হয়েছিলেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
আল জাজিরা ও লিবার্টি ইনভেস্টিগেটসের দেখা বার্তা অনুযায়ী, অন্য শিক্ষার্থীরা ওই শিক্ষকের ক্লাসে ফিলিস্তিনি স্কার্ফ পরে বা পতাকা নিয়ে যাওয়া, গাজা নিয়ে শিক্ষককে ‘বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে’ প্রশ্ন করা এবং প্রজেক্টরে নিহত শিশুদের ছবি প্রদর্শনের মতো প্রতিবাদের প্রস্তাব দিয়েছিলেন।
তবে এসব কর্মসূচির কোনোটি বাস্তবায়িত হওয়ার আগেই, বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের কাছে বার্তা পৌঁছানোর ১০ দিনের মধ্যে খাদিজাকে ওই শিক্ষকের ক্লাস চলাকালে ক্যাম্পাসে উপস্থিত থাকার ওপর নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়।
খাদিজা বলেন, “এটা এক ধরনের অপমানজনক অভিজ্ঞতা মনে হয়েছিল। আমি খুব বেশি মানুষকে চিনতাম না, তখন মাত্র শিক্ষাবর্ষের শুরু…আমার সহপাঠীরা বলত, ‘তুমি ক্লাসে এলে না কেন, অথচ দুই ঘণ্টা আগেও তো ক্যাম্পাসে ছিলে?’”
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৫ সালের নভেম্বর পর্যন্ত ফিলিস্তিনপন্থী প্রতিবাদ কার্যক্রমে যুক্ত থাকার কারণে কিংস কলেজ লন্ডনের অন্তত ২৬ জন শিক্ষার্থী শৃঙ্খলাজনিত তদন্তের মুখোমুখি হয়েছেন।
আল জাজিরা ও লিবার্টি ইনভেস্টিগেটসের যৌথ অনুসন্ধান অনুযায়ী, এটি যুক্তরাজ্যের অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয়ের তুলনায় সর্বোচ্চ সংখ্যা।
তারা ১৫৬টি বিশ্ববিদ্যালয়ে তথ্য অধিকার আইনের (এফওআই) আওতায় তথ্য চেয়েছিল। প্রাপ্ত তথ্য ও সংশ্লিষ্টদের দেওয়া নথি অনুযায়ী, ৪২টি বিশ্ববিদ্যালয় গাজাপন্থী ২৩৬ জন শিক্ষার্থী ও কর্মীর বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করেছে।
লন্ডনের ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডন (ইউসিএল) অন্তত ২৪টি শৃঙ্খলাজনিত মামলা শুরু করেছে, যা দ্বিতীয় সর্বোচ্চ। এরপর রয়েছে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় ১৮টি এবং কার্ডিফ বিশ্ববিদ্যালয় ১২টি মামলা নিয়ে।
তদন্তকারীরা বলছেন, কিংস কলেজ লন্ডনের মতো অন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষেত্রেও তথ্য অধিকার আইনের মাধ্যমে প্রকাশিত সংখ্যার চেয়ে প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে।