খেত থেকে খুচরা বাজার পর্যন্ত পৌঁছাতে নিত্য প্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্যের দাম প্রায় দ্বিগুণ হয়ে উঠছে, যার সরাসরি খেসারত দিতে হচ্ছে দেশের সাধারণ ভোক্তাদের। যে চাল কৃষক কেজি প্রতি ৩০ টাকা ৬৫ পয়সায় বিক্রি করছেন, তা হাত বদলের চক্রে খুচরা বাজারে এসে ঠেকছে প্রায় ৬০ টাকায়। দেশে দীর্ঘ চার বছর ধরে চলা অনিয়ন্ত্রিত মূল্যস্ফীতির পেছনে অদক্ষ সরবরাহ শৃঙ্খল, অতিরিক্ত লজিস্টিক খরচ, বাজারজাতকরণে প্রতিযোগিতার অভাব এবং মধ্যস্বত্বভোগী ওফড়িয়াদের দৌরাত্ম্যকে দায়ী করেছে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)।
রাজধানীর মহাখালীর ব্র্যাক ইন সেন্টারে আজ বৃহস্পতিবার ‘খাদ্যের মূল্যশৃঙ্খল: বাংলাদেশের বাজার ব্যবস্থা, মুনাফার ও মধ্যস্বত্বভোগী’ শীর্ষক এক জাতীয় সংলাপে বাজারব্যবস্থার এই আশঙ্কাজনক চিত্রতুলে ধরা হয়।
অনুষ্ঠানে মূল নিবন্ধ উপস্থাপনকরেন সিপিডির জ্যেষ্ঠ গবেষণা সহযোগী ফখরুদ্দিন আল কবীর। দেশের ১০টি অত্যাবশ্যকীয় খাদ্যপণ্যের গতিপথ পর্যবেক্ষণ করে প্রাপ্ত তথ্যে তিনি জানান, উৎপাদনকারীর কাছ থেকে ভোক্তার থালা পর্যন্ত প্রতিটি পণ্যের মূল্য অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পায় ।
সিপিডির তথ্যমতে, হাত বদলের প্রক্রিয়ায় সবচেয়ে বেশি দাম বাড়ে কাঁচা মরিচের, যা সর্বোচ্চ ১১৬ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পায়। এছাড়া পাইজাম চালের দাম বাড়ে ৯৫ শতাংশ (কৃষকের ৩০.৬৫ টাকা থেকে খুচরায় ৫৯.৬৯ টাকা)। অন্যান্য পণ্যেরমধ্যে পেঁয়াজে ৮৭ শতাংশ, মসুরডালে ৭৮ শতাংশ, বেগুনে ৭২ শতাংশ এবং আলুতে ৫০ শতাংশ মূল্যবৃদ্ধি ঘটে। পাশাপাশি ডিমেরদাম ২৫ শতাংশ, ব্রয়লার মুরগি ২২ শতাংশ, গরুর মাংস ১৩ শতাংশ ও মাছের দাম ১০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়ে ভোক্তাদের হাতে পৌঁছায়।
অনুষ্ঠানে সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন বলেন, ‘‘আজ যে অর্থদিয়ে বাজার করা সম্ভব হচ্ছে, পরদিন সমপরিমাণ টাকা দিয়ে একইপণ্য কেনা যাচ্ছে না।’’ লাগাতার দরবৃদ্ধির প্রভাবে দেশের নিম্নআয়ের মানুষ শিক্ষা, চিকিৎসা ও পুষ্টির মতো মৌলিক চাহিদা কাটছাঁট করতে বাধ্য হচ্ছেন বলে তিনি উল্লেখ করেন। তিনি জানান, বর্তমানে দেশের প্রায় ৩০ শতাংশ মানুষখাদ্য নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। প্রকৃত আয় ও মজুরি না বাড়ায় সাধারণ মানুষ সঞ্চয় ভাঙতে বা ঋণ নিতে বাধ্য হচ্ছেন, যা দেশে দারিদ্র্যের ঝুঁকিকে আরও ঘনীভূত করছে।
গবেষণার উপাত্ত বিশ্লেষণে দেখা যায়, দেশেরসবচেয়ে দরিদ্র ৫ শতাংশ পরিবারতাদের মোট উপার্জনের প্রায় ৫৮.৮ শতাংশ বাপ্রায় ৬০ শতাংশই ব্যয় করে খাদ্য ক্রয়ে। অন্যদিকে, দেশের শীর্ষ ধনী ৫ শতাংশ পরিবার তাদের আয়ের মাত্র ২৮.৯ শতাংশ অর্থ খাদ্যের পেছনে ব্যয় করে থাকে।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে বাণিজ্য ও শিল্পমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির স্বীকার করেন যে, বৈশ্বিক মহামারি কোভিড-পরবর্তী সময়ে বিশ্বের অনেক দেশ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আনলেও বাংলাদেশে তা সম্ভব হয়নি।তিনি দীর্ঘদিন ধরে মূল্যস্ফীতি চড়াথাকার পেছনে লজিস্টিক খাতের অতিরিক্ত ও অনিয়ন্ত্রিত ব্যয়কেপ্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিতকরেন। মন্ত্রী জানান, বিশ্বজুড়ে লজিস্টিক খাতে গড় ব্যয়মোট জিডিপির প্রায় ১০ শতাংশ হলেও বাংলাদেশে তা দাঁড়িয়েছে ১৬শতাংশে।
আলু চাষিদের দুর্দশার কথা তুলে ধরে বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, “টানা দুই বছরধরে দেশে এক কোটিটনের বেশি আলু উৎপাদনহওয়া সত্ত্বেও চাষিরা উপযুক্ত মূল্য পাচ্ছেন না। উৎপাদনের শুরু থেকে বাজার পর্যন্ত অদৃশ্য খরচ কমাতে হবে।” উৎপাদিত পণ্যের ক্ষেত্রে এ ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত খরচ ও চাঁদাবাজি বন্ধের পাশাপাশি সরবরাহ ব্যবস্থার দুর্বলতা দূর করতে সরকার শিগগিরই কার্যকর পদক্ষেপ নেবে বলে তিনিআশ্বাস দেন।
কৃষি অর্থনীতিবিদ এম এ সাত্তার মণ্ডলসহ বিভিন্ন খাতের সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা উক্ত সংলাপে অংশগ্রহণকরেন। বাজার ব্যবস্থায় অন্যায্য মূল্যবৃদ্ধি রোধ করতে সরবরাহ শৃঙ্খল অবিলম্বে সংস্কার করা এবং কঠোর নীতিমালা প্রণয়নের জোর দাবি জানান বক্তারা।