যখন মার্কিন কোনো যুদ্ধবিমান শত্রু ভূখণ্ডে বিধ্বস্ত হয়, তখন সামরিক বাহিনী তাৎক্ষণিকভাবে একটি সুশৃঙ্খল ও সমন্বিত অভিযানে ঝাঁপিয়ে পড়ে। এই অভিযানের নকশা এমনভাবে করা হয় যাতে ক্রুদের উদ্ধার করা যায়, গোপন প্রযুক্তি রক্ষা করা যায়। কারণ ওই ক্রুরা ধরা পড়লে শত্রুপক্ষ যেকোনো ধরনের গোয়েন্দা তথ্য পেতে পারে।
এই ধরনের মিশনের রূপরেখা তৈরি করা হয় ‘পার্সোনেল রিকভারি জয়েন্ট পাবলিকেশন’ (পিআরজেপি) নামের একটি ব্লু-প্রিন্ট থেকে, যেখানে দুটি প্রধান বিষয়কে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। প্রথমত, বিমান ক্রুদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা এবং দ্বিতীয়ত, সংবেদনশীল সিস্টেমগুলো নিরাপদ করা।
ওই নথিতে বলা হয়েছে, ‘আমাদের মানুষ আমাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। এছাড়া, ঐতিহাসিকভাবে দেখা গেছে শত্রুরা বন্দী হওয়া ব্যক্তিদের কাছ থেকে গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ করে। পাশাপাশি প্রোপাগান্ডা চালানো বা আলোচনার ক্ষেত্রে সুবিধা নিয়ে থাকে।’
ওই নথিতে বলা হয়, একটি যুদ্ধবিমান বিধ্বস্ত হওয়ার সাথে সাথে আগে থেকেই অবস্থান নেওয়া উদ্ধারকারী দলগুলোকে তৎক্ষণাৎ মোতায়েন করা হয়। এরপর শুরু হয় একটি বহুমুখী উদ্ধার অভিযান, যেখানে বিশেষ অপারেশন ফোর্স থেকে শুরু করে আকাশপথের নজরদারি প্ল্যাটফর্ম—সবই প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যে কাজ করে যাতে শত্রুর আগে পাইলটের কাছে পৌঁছানো যায়।
যদি পাইলট ইজেক্ট (বিমানের সিটসহ বেরিয়ে আসা) করেন এবং বেঁচে থাকেন, তবে তার প্রাথমিক লক্ষ্য থাকে শত্রুর চোখ এড়িয়ে চলা। মোতায়েনের আগে তারা যে সারভাইভাল বা টিকে থাকার কৌশল শিখেছেন, তার ওপর ভিত্তি করে তারা লুকিয়ে থাকেন, বন্ধুভাবাপন্ন বাহিনীর সঙ্গে নিয়ন্ত্রিত যোগাযোগ করেন এবং এমনভাবে চলাফেরা করেন যাতে ধরা পড়ার ঝুঁকি কমে যায়।
পিআরজেপি ব্লুপ্রিন্টে আরও বলা হয়, উদ্ধার কাজে বিমানবাহিনীর প্যারারেসকিউ জাম্পার, নেভি সিল বা সেনাবাহিনীর বিশেষ অপারেশন ইউনিট পাঠানো হতে পারে। প্রায়ই এদের পাহারায় থাকে সশস্ত্র হেলিকপ্টার বা ফাইটার জেট। পাইলটের অবস্থান শনাক্ত করতে ড্রোন, স্যাটেলাইট এবং অন্যান্য নজরদারি বিমান রিয়েল-টাইমে কাজ করে।
বিধ্বস্ত স্থানটি সুরক্ষিত করা আরেকটি জরুরি অগ্রাধিকার। রাডার অ্যারে, যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং অস্ত্র সিস্টেমের মতো সংবেদনশীল যন্ত্রাংশ যাতে শত্রুর হাতে না পড়ে, তা নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যদি স্থল সেনারা ধ্বংসাবশেষের কাছে পৌঁছাতে না পারে, তবে শত্রু যেন কিছু উদ্ধার করতে না পারে সেজন্য যুক্তরাষ্ট্র আকাশ থেকে বোমা মেরে সেগুলো ধ্বংস করে দিতে পারে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, বিধ্বস্ত বিমানের কাছে পৌঁছাতে প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলো মরিয়া হয়ে ওঠে, কারণ ওই যুদ্ধবিমান থেকে প্রচুর গোয়েন্দা তথ্য পাওয়া সম্ভব।
যদি একজন পাইলট ধরা পড়েন, তবে শত্রুরা তার কাছ থেকে গোপন তথ্য বের করার চেষ্টা করতে পারে, যা যুক্তরাষ্ট্র যেকোনো মূল্যে এড়াতে চায়। তাই ভূপাতিত ক্রুদের কাছে পৌঁছানোর এই প্রতিযোগিতা অনেক সময় মিনিটের ব্যবধানে নির্ধারিত হয়।
সারভাইভাল, ইভেশন, রেজিস্ট্যান্স এবং এস্কেপ (এসইআরই) প্রশিক্ষণের মাধ্যমে পাইলটরা শিখেন কীভাবে শত্রুর সীমানার পেছনে লুকিয়ে থাকতে হয়, গোপনে যোগাযোগ করতে হয় এবং চরম চাপ সহ্য করতে হয়। তাদের মূল নীতি হলো— বন্দিত্ব এড়িয়ে জীবিত থাকা।
২০১২ সালে পূর্ব আফগানিস্তানে একটি মার্কিন সামরিক হেলিকপ্টার বিধ্বস্ত হওয়ার পর, ওই এলাকায় তালেবান বাহিনী থাকা সত্ত্বেও মার্কিন বাহিনী দ্রুত দুই পাইলটকে উদ্ধার করতে সক্ষম হয়েছিল।
বর্তমান সংকটে মার্কিন সামরিক বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইরানে ভূপাতিত এফ-১৫ বিমানের নিখোঁজ পাইলট অন্ধকারের সুবিধা পাচ্ছেন। রাতের অপারেশন যুক্তরাষ্ট্রের অনুকূলে থাকে, কারণ তাদের বাহিনীর কাছে অত্যন্ত উন্নত নাইট ভিশন টুলস এবং ইনফ্রারেড যোগাযোগ ব্যবস্থা, যা পাইলটকে শত্রুর চোখ এড়িয়ে চলতে সাহায্য করে।
মার্কিন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, শুক্রবার ইরান একটি এফ-১৫-ই যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করেছে। এ ঘটনার পর ওই যুদ্ধবিমানে থাকা দুজনকেই উদ্ধার করা হয়েছে বলে জানিয়েছে আমেরিকা। ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে যে, ইরানি প্রতিরক্ষা বাহিনীর আঘাতে একটি মার্কিন এ-১০ অ্যাটাক এয়ারক্রাফটও বিধ্বস্ত হয়।