আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ভাষণ ‘বিকৃতি’কে কেন্দ্র করে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসির মহাপরিচালক টিম ডেভি এবং বার্তা বিভাগের প্রধান নির্বাহী ডেবোরা টারনেস পদত্যাগ করেছেন।
বিবিসি সাম্প্রতিক সময়ে একাধিক অভিযোগের মুখে পড়েছে। বলা হচ্ছে, এই ব্রিটিশ গণমাধ্যম রাজনৈতিক নিরপেক্ষতা বজায় রাখতে ব্যর্থ হয়েছে।
ট্রাম্পের খবর প্রচার, ইসরায়েল-হামাস যুদ্ধ এবং ট্রান্সজেন্ডার ইস্যু নিয়েও তাদের প্রতিবেদনে পক্ষপাতের অভিযোগ উঠেছে।
সর্বশেষ বিতর্কের সূত্রপাত হয় ডেইলি টেলিগ্রাফের এক প্রতিবেদনে। গত ৩রা নভেম্বরের ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, বিবিসি আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ভাষণ এমনভাবে সম্পাদনা করেছিল, যাতে মনে হয় তিনি ২০২১ সালের ৬ জানুয়ারির ক্যাপিটল হিলে দাঙ্গায় উসকানি দিচ্ছেন। এমনই অভিযোগ উঠেছে সংস্থার অভ্যন্তরীণ এক হুইসেলব্লোয়ারের নথিতে, যা দ্য টেলিগ্রাফের হাতে এসেছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৪ সালে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের ঠিক এক সপ্তাহ আগে প্রচারিত প্যানোরামা অনুষ্ঠানে ট্রাম্পকে এমনভাবে দেখানো হয় যেন তিনি তার সমর্থকদের উদ্দেশে বলছেন, “আমরা ক্যাপিটলে যাব এবং শেষ পর্যন্ত লড়ব।”
বিবিসির স্ট্যান্ডার্ড কমিটির এক সাবেক সদস্য প্রণীত ১৯ পৃষ্ঠার ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ট্রাম্পের ভাষণের শুরু এবং শেষ অংশ একত্র করে বিবিসি এমন বক্তব্য তৈরি করেছে যা তিনি কখনো বলেননি। নথিতে আরও দাবি করা হয়, সংস্থার চেয়ারম্যান ও শীর্ষ কর্মকর্তারা নিজস্ব মান নিয়ন্ত্রণ কমিটির তোলা গুরুতর অভিযোগগুলোকে উপেক্ষা করেছেন।
বিবিসির পক্ষপাতিত্ব নিয়ে ওই প্রতিবেদনটি লিখেছেন মাইকেল প্রেসকট, যিনি তিন বছর ধরে বিবিসির এডিটোরিয়াল গাইডলাইনস অ্যান্ড স্ট্যান্ডার্ডস কমিটির পরামর্শক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং চলতি বছরের জুনে পদত্যাগ করেন।
সাবেক সাংবাদিক ও করপোরেট পরামর্শক প্রেসকট তার প্রতিবেদনের সঙ্গে পাঠানো এক চিঠিতে দ্য টেলিগ্রাফকে বলেন, বিবিসি কর্মকর্তাদের নিষ্ক্রিয়তায় হতাশ হয়েই তিনি এই পদক্ষেপ নিতে বাধ্য হয়েছেন।
বিবিসি ট্রাম্পের ভাষণের তিনটি আলাদা অংশ একত্র করে এমনভাবে প্রচার করেছিল, যেন তা একটি ধারাবাহিক বাক্য।
আসলে ট্রাম্প বলেছিলেন, “আমরা সামনে এগিয়ে যাব। আমি আপনাদের সঙ্গে থাকব। আমরা যেকোনো দিকে যেতে পারি। কিন্তু আমি মনে করি এখান থেকেই আমরা ক্যাপিটল ভবনের দিকে হেঁটে যাব এবং আমাদের সাহসী সিনেটর ও কংগ্রেস সদস্যদের উৎসাহ দেব। তবে কিছুজনের জন্য হয়ত আমরা তেমন উচ্ছ্বাস দেখাব না, কারণ দুর্বলতা দিয়ে দেশকে ফিরে পাওয়া যায় না। আমাদের সবাইকে শক্তি দেখাতে হবে, দৃঢ় হতে হবে। আমি জানি, এখানকার সবাই শিগগিরই ক্যাপিটল ভবনের দিকে শান্তিপূর্ণ ও দেশপ্রেমিকভাবে নিজেদের কণ্ঠ তুলে ধরতে মার্চ করবে।”
প্রায় ৫৪ মিনিট পর, যখন ট্রাম্প নির্বাচনকে দুর্নীতিগ্রস্ত আখ্যা দিয়ে ভোটারদের উদ্দেশে বলেন, “আমরা প্রাণপণ লড়াই করব, আর যদি আপনারা প্রাণপণ লড়াই না করেন তাহলে আমাদের দেশ বাঁচবে না।”
বিবিসির নিরপেক্ষতা লঙ্ঘনের ঘটনাগুলোকে ‘জঘন্য’ আখ্যা দেন বিবিসির সাবেক একজন উপদেষ্টা।বিবিসির নিরপেক্ষতা লঙ্ঘনের ঘটনাগুলোকে ‘জঘন্য’ আখ্যা দেন বিবিসির সাবেক একজন উপদেষ্টা। তিনি ট্রাম্পের ভাষণ বিকৃতির ঘটনার তুলনা করেছেন ২০০৭ সালের ক্রাউনগেট কেলেঙ্কারির সঙ্গে। সেই ঘটনায় বিবিসি ওয়ানের কন্ট্রোলার পদত্যাগে বাধ্য হন।
এ ঘটনায় ব্রিটেনের বিভিন্ন মহল থেকে সমালোচনা ও উদ্বেগ প্রকাশ করতে দেখা যায়। এমনকি সাবেক ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসনকেও তীব্র সমালোচনা করতে দেখা গেছে। এই কেলেঙ্কারি বিবিসি ও হোয়াইট হাউসের মধ্যকার ইতোমধ্যেই টানাপোড়েনপূর্ণ সম্পর্ককে আরও জটিল করে তুলবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ঘটনাটি এমন সময় সামনে এল, যখন ২০২৭ সালে বিবিসির রয়্যাল চার্টার নবায়ন নিয়ে ব্রিটিশ সংস্কৃতি দপ্তরের সঙ্গে আলোচনার প্রস্তুতি চলছে।
নিজের পদত্যাগের ঘোষণায় টিম ডেভি বলেন, “এটি সম্পূর্ণ আমার নিজের সিদ্ধান্ত। আমার পুরো কর্মজীবনে, বিশেষ করে সাম্প্রতিক সময়ে, বোর্ড ও চেয়ারম্যানের নিঃশর্ত সমর্থনের জন্য আমি কৃতজ্ঞ। বহু বছর ধরে এই দায়িত্ব পালনের ব্যক্তিগত ও পেশাগত চাপ নিয়ে আমি ভেবেছি। এখন আমি চাই, আমার পরে যিনি আসবেন তিনি যেন নতুন চার্টার পরিকল্পনা সাজানোর জন্য যথেষ্ট সময় পান।”
অন্যদিকে, ট্রাম্পের প্রেস সচিব ক্যারোলিন লেভি বিবিসিকে শতভাগ ‘ভুয়া সংবাদমাধ্যম এবং একটি প্রোপাগান্ডা যন্ত্র’ বলে মন্তব্য করেছেন।
ট্রাম্পের প্রেস সচিব ক্যারোলিন লেভি বিবিসিকে শতভাগ ‘ভুয়া সংবাদমাধ্যম এবং একটি প্রোপাগান্ডা যন্ত্র’ বলে মন্তব্য করেছেন৯ নভেম্বর বিবিসির মহাপরিচালক টিম ডেভি পদত্যাগ করার কয়েক ঘণ্টা পর ডোনাল্ড ট্রাম্প ট্রুথ সোশ্যালে এক পোস্টে দ্য টেলিগ্রাফকে ধন্যবাদ জানিয়ে লেখেন, “এই দুর্নীতিগ্রস্ত সাংবাদিকদের মুখোশ উন্মোচন করার জন্য দ্য টেলিগ্রাফকে ধন্যবাদ।”
ডেভি আরও কয়েক মাস দায়িত্বে থাকবেন, যতক্ষণ না নতুন মহাপরিচালক নিয়োগ দেওয়া হয়। সূত্র জানিয়েছে, ডেভির পদত্যাগের সিদ্ধান্তে বিবিসি বোর্ড হতবাক হয়েছে।