খিচুড়ি পছন্দ করেন না এমন বাঙালি বোধহয় কমই আছেন! বর্ষা ঋতু হোক, কিংবা কনকনে শীতের দুপুর। ভুনা হোক বা ল্যাটকা; মাংস দিয়ে হোক কিংবা নিরামিষ-খিচুড়ি হলেই অনেকে আর কোনো দিকে তাকান না।
খিচুড়ি হচ্ছে যাকে বলে আদি অকৃত্রিম উপমহাদেশীয় খাবার। আপনি যদি সিন্ধু সভ্যতার ইতিহাস নতুন করে খুঁজতে শুরু করেন হয়তো এখানে ওখানে একটু লেগে থাকা খিচুড়ি দেখতে পারবেন। আজকের বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকায় রোজার মাসে বহু বাড়িতে খিচুড়ি খাওয়ার চল আছে। এবং এই রীতি যেমন আছে তামিল মুসলমানদের মধ্যে। নম্বুকাজি বলে যে পদটি রোজার মাসে ইফতারে খাওয়া হয় সেটা আদপে খিচুড়ি।
ব্রিটিশদের Kedgeree তো খিচুড়ি ভিন্ন কিছু নয়। স্প্যানিশ Paella খিচুড়িরই আরেক রূপ। ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যাবে আরবরা বস্তুটি স্পেনে চালু করে। দশম শতাব্দীতে আরবরা ইবেরিয়ান পেনিনসুলায় চাল উৎপাদন শুরু করে। সেই চাল আর রোমানদের থেকে Paella রান্নার পাত্র ব্যবহার শেখে ভ্যালেনসিয়ানরা। তারপর কত রঙ, রূপ পরিবর্তন করে আজ নানা পদের Paella খাচ্ছে বিশ্ববাসী। আরবদের ভারতীয় উপমহাদেশে আসার ইতিহাস কিন্তু আরও প্রাচীন।
ভুনা খিচুড়িআপাতত আমরা ভারতবর্ষে থাকি। খ্রিস্টপূর্ব ৩০০ বছর আগে ভারতে গ্রিক ও মৌর্য সেনাদের মধ্যে যুদ্ধ হয়। ওই সময়ই সেনাপতি সেলুকাস খিচুড়ির কথা লিখেছেন। সেই সেলুকাস যার উদ্দেশে বীর আলেকজান্ডার বলেছিলেন, ‘‘সেলুকাস, কী বিচিত্র্য এ দেশ!’’ সেলুকাসের বহুপরের পর্যটক ইবনে বতুতাও ভারতবর্ষে এসে খিচুড়ির কথা লিখেছেন। ঐতিহাসিক আবুল ফজলের ‘আইন-ই-আকবরি’তে সাত রকমের খিচুড়ির কথা উল্লেখ আছে। গল্প আছে, মোঘল বাদশাহ হুমায়ুন শের শাহের তাড়া খেয়ে পারস্যে গিয়ে সেখানকার শাহকে খিচুড়ি খাইয়ে হাত করেছিলেন। মাছ আর সেদ্ধ ডিম দিয়ে তৈরি ‘আলমগিরি খিচুড়ি’ নাকি সম্রাট ঔরঙ্গজেব নাকি বেশ তরিবৎ করে খেতেন। মুঘল হেঁশেলে জাহাঙ্গীরের প্রিয় বিশেষ ধরনের খচু়ড়ি তৈরি করা হতো পেস্তা, কিসমিস দিয়ে। বাদশাহ সেই খিচুড়ির নাম দিয়েছিলেন ‘লাজিজান’।
এই যে খিচুড়ি নিয়ে এত কথা বলছি, তা ‘খিচুড়ি’ শব্দটি এল কোথা থেকে? এক সময়ের উচ্চজাতের ভাষা সংস্কৃতে ‘Khicca’ বলে একটি শব্দ আছে, যার বাংলা করা হয়েছে খিচুড়ি। হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায় ‘বঙ্গীয় শব্দকোষ’ বইয়ে আমাদের জানাচ্ছেন, প্রাকৃত শব্দ ‘কিসর/কৃসরা’ ক্রমান্বয়ে খিচরি/রী/ড়ি/ড়ী হয়ে খিচুড়ি শব্দে বিবর্তন হয়েছে। মধ্যযুগের মঙ্গলকাব্য মনসামঙ্গলে শিব পার্বতীকে মুগডালের খিচুড়ি রান্নার ফরমায়েশ দিয়েছেন বলে লেখা আছে। অন্যত্র বলা হয়েছে, ‘আদা কাসন্দা দিয়া করিবা খিচুড়ি’।
বাংলা ভাষায় অতিপরিচিত একটি শব্দবন্ধ হলো ‘জগাখিচুড়ি’। আমাদের দৈনন্দিন কথ্যভাষায় জগাখিচুড়ি শব্দটি আহার্য হিসেবে ব্যবহার হয় না। তালগোল পাকানোর প্রতিশব্দ হিসেবে পরিণত হয়েছে শব্দটি।
আক্ষরিকভাবে জগাখিচুড়ি শব্দের অর্থ হলো বিবিধ তরিতরকারি মিশিয়ে রাঁধা খিচুড়ি। এর আলংকারিক অর্থ হলো বিবিধ বিসদৃশ বস্তুর সংমিশ্রণ বা একত্র সমাবেশ। জগাখিচুড়ির ব্যুৎপত্তি বিষয়ে দুটি গল্প পাওয়া যায়, একটি হলো ভারতের উড়িষ্যার পুরী শহরে জগন্নাথদেবের মন্দিরে প্রতিদিন ভক্তদের মধ্যে যে খিচুড়ি বিতরণ করা হয়, সেটিই জগাখিচুড়ি। আরেকটি মত হলো, কোনো এক জগাই ব্রাহ্মণের রান্না করা চাল-ডাল মেশানো খাদ্যবস্তুটিই হলো জগাখিচুড়ি।
ল্যাটকা খিচুড়ি। ছবি: এআই দিয়ে তৈরি‘জগ’ শব্দের অর্থ হচ্ছে জগৎ, ভুবন, বিশ্ব। এর সঙ্গে জগন্নাথদেবের অবশ্যই সম্পর্ক রয়েছে। জগন্নাথ মানে পৃথিবীর প্রভু, পরমেশ্বর, বিষ্ণু, শ্রীকৃষ্ণ। ভারতের উড়িষ্যার পুরীতে অবস্থিত জগন্নাথদেবের মন্দিরে প্রসাদ হিসেবে ভক্তদের খিচুড়ি দেওয়া হয়। নানারকম তরিতরকারি দিয়ে অল্প আঁচে এ খিচুড়ি রান্না করা হয়। ‘জগন্নাথদেবের খিচুড়ি’ লোকমুখে সংক্ষেপে হয়েছে ‘জগাখিচুড়ি’।
জগাখিচুড়ির আরেকটি প্রচলিত গল্প হলো, জগন্নাথ নামে একজন বৈষ্ণব সাধক ছিলেন। তিনি সারা দিন ইশ্বরচিন্তায় মগ্ন থাকতেন। দিনের বেলা একবার মাত্র কুটির থেকে বের হয়ে কয়েকটি গৃহস্থের বাড়িতে মাধুকরী করে চাল, ডাল, আলু, শাকসবজি যা পেতেন, সব একসঙ্গে সেদ্ধ করে সারা দিনে একবার আহার করতেন। স্থানীয়দের কাছে জগন্নাথের অপভ্রংশ ‘জগা’ নামে তিনি পরিচিত ছিলেন। ধরে নেওয়া হয়, এর থেকেই জগাখিচুড়ি শব্দের উদ্ভব।