মব মানসিকতা মানব ইতিহাসে নতুন কিছু নয়। যুগে যুগেই পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে মব দানা বাঁধতে দেখা গেছে। কখনও ডাইনি মারতে, কখনও ধর্মীয় বিষয়ে তিলকে তাল বানিয়ে কিংবা রাজনৈতিক বিক্ষোভের রূপে মব মানসিকতার বিস্তার হয়েছে।
ট্রমা বিশেষজ্ঞ গায়ুক অং মনে করেন, এই মব মানসিকতা নানা কারণে তৈরি হতে পারে। সেসব কারণের মধ্যে আছে গোষ্ঠীতে ঢুকে ব্যক্তিগত পরিচয় হারিয়ে ফেলা, রাগ-উত্তেজনা বা হিংসার বশবর্তী হয়ে আবেগে হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ফেলা, সাধারণভাবে অগ্রহণযোগ্য বিষয়ও গ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠা, গোষ্ঠীভুক্ত হয়ে ব্যক্তির আত্মসচেতনতা হারিয়ে ফেলা, অপরাধের দায় গোষ্ঠীর ওপর চাপানোর প্রবণতা সৃষ্টি ইত্যাদি।
মবের মানসিকতা আসলে মানুষের একটি গোষ্ঠীবদ্ধ মানসিকতাই। তাই ক্রাউড মেন্টালিটি ও মব মেন্টালিটি অনেক বেশি অনুরূপ। এই গোষ্ঠীবদ্ধতার সুফল যেমন আছে, কুফলও আছে। যেমন: দাঙ্গাও একটি গোষ্ঠীবদ্ধ কর্মকাণ্ডই। কিন্তু এই দুনিয়ার ইতিহাসে আতিপাতি করে খুঁজেও কেউ কোনো শান্তিপূর্ণ দাঙ্গার উদাহরণ পাবে না। ঠিক তেমনই মবের মনও সহিংসতায় পূর্ণ, সেখানে শান্তি নিখোঁজ থাকে। আর এই গোষ্ঠীর আচরণ যদি সহিংস হয়, তবে গোষ্ঠীর আকার যত বড় হতে থাকে, সহিংসতার পরিমাণও তত বাড়তে থাকে।
কোনো সমাজে মব সৃষ্টির বেশ কিছু তত্ত্ব আছে। ইউনিভার্সিটি অব মিনেসোটার অনলাইন লাইব্রেরিতে এ সংক্রান্ত বেশ কিছু নিবন্ধ আছে। সেগুলোতে বলা হয়েছে, মোটা দাগে গোষ্ঠীবদ্ধ মানুষের সমষ্টিগত আচরণের প্রকৃতি কেমন হবে বা হয়, সে সংক্রান্ত মোট ৪টি তত্ত্ব আছে।

প্রথমটি হলো কন্ট্যাজিওন থিওরি। এই তত্ত্ব অনুযায়ী গোষ্ঠীবদ্ধ মানুষের সমষ্টিগত আচরণ মূলত আবেগীয় ও অযৌক্তিক হয় এবং গোষ্ঠীর সামগ্রিক সম্মোহনী প্রভাবে তাড়িত হয়।
দ্বিতীয় তত্ত্ব হলো, কনভারজেন্স থিওরি। এই তত্ত্ব বলে, গোষ্ঠীর আচরণ আসলে সেই গোষ্ঠীতে একই মানসিকতার ব্যক্তিদের সম্মিলিত আচরণ। অর্থাৎ, এই তত্ত্ব অনুযায়ী গোষ্ঠীর আচরণ আদতে ব্যক্তিদের আচরণ বা বিশ্বাসকেই প্রতিফলিত করে।
বিবেচ্য তৃতীয় তত্ত্বটি হলো এমারজেন্ট নর্ম থিওরি। এটি অনুযায়ী, গোষ্ঠীগত আচরণের ক্ষেত্রে কীভাবে একে অন্যের সাথে যোগাযোগ করতে হবে, সেটি সম্পর্কে মানুষ নিশ্চিত থাকে না। গোষ্ঠীভুক্ত মানুষ যখন এ নিয়ে আলোচনা করে, তখন বিদ্যমান রীতিনীতি তাদের নিয়ন্ত্রণ করতে শুরু করে এবং তৎকালীন সমাজে থাকা শৃঙ্খলা ও যৌক্তিকতার মান ওই গোষ্ঠীর আচরণের প্রকৃতি নির্ধারণ করে দেয়।
চতুর্থ তত্ত্বটি হলো, ভ্যালু অ্যাডেড থিওরি। এই তত্ত্ব অনুযায়ী, বিভিন্ন পরিস্থিতির কারণে মানুষের গোষ্ঠীগত আচরণের বহিঃপ্রকাশ ঘটে। সামাজিক নিয়ন্ত্রণের অভাব, কাঠামোগত ব্যর্থতা ও সাধারণ বিশ্বাসের প্রভাবে এই গোষ্ঠী গড়ে ওঠে এবং তার আচরণ প্রকাশ্যে আসে।
আশা করা যায়, এতক্ষণে মব সৃষ্টির কারণ, সেই মব কীভাবে গঠিত হয় এবং কখন সহিংস হয়ে ওঠে–এই বিষয়গুলো মোটামুটি বোঝা গেছে।