নীল আর্মস্ট্রংয়ের চাঁদে নেমেছিলেন আজ থেকে ৫৬ বছর আগে। যদি পৃথিবীর ঘড়িতে সময় মাপা হয়, তবে এই ৫৬ বছরের সমান হবে প্রায় ১৭,৪০০,০০০,০০০ সেকেন্ড। তবে চাঁদের ঘড়িতে তা হবে এক সেকেন্ড বেশি বা ১৭,৪০০,০০০,০০১ সেকেন্ড!
সময়ের এই সামান্য পার্থক্য মহাকাশযাত্রার জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এ কারণেই হোয়াইট হাউসের অফিস অফ সাইন্স অ্যান্ড টেকনোলজি নাসা’কে সমন্বিত চন্দ্র সময় বা কো-অরডিনেটেড লুনার টাইম নামের একটি বৈশ্বিক সময় নির্ধারণের ব্যবস্থা তৈরির জন্য বলেছে।
ব্রিটিশ সাময়িকী দ্য ইকোনোমিস্টের একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পার্থক্যের মূলে রয়েছে আইনস্টাইনের আপেক্ষিকতার সাধারণ তত্ত্ব বা থিওরি অব রিলেটিভিটি। তত্ত্ব অনুসারে, কোনো বস্তুর ভরের কারণে তার চারপাশের স্থান-কালে কিছুটা পরিবর্তন আসে। আর এই পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে সময় আরও ধীরে চলে।
চাঁদ থেকে পৃথিবী অনেক দূরে, তাই সেখানে পৃথিবীর মাধ্যাকর্ষণজনিত স্থান-কালের বক্রতা কম। ফলে চাঁদের পৃষ্ঠে সময় পৃথিবীর চেয়ে সামান্য দ্রুত চলে। পার্থক্যটা এতটাই কম, যা প্রতি দুই বিলিয়নের এক ভাগের চেয়েও ছোট। তবে মহাকাশচারী ও বৈজ্ঞানিক নির্ভুলতার ক্ষেত্রে এই ব্যবধানই যথেষ্ট বড়।
সময়ের ওপর মাধ্যাকর্ষণের এই প্রভাব মানুষের প্রতিদিনের জীবনেও কাজ করে, যদিও তা বোঝা যায় না। জিপিএস বা ইউরোপের গ্যালিলিও’র মতো স্যাটেলাইট পজিশনিং সিস্টেমগুলো নির্ভুলভাবে কাজ করার জন্য এই আপেক্ষিকতার হিসাব করেই সময় সংকেত পাঠায়। উচ্চ কক্ষপথে থাকা এটমিক ঘড়িগুলোর সময়কে পৃথিবীর সময়ের সাথে মিলিয়ে রাখার জন্য এই সামঞ্জস্য করা হয়।
বর্তমানে পৃথিবীতে সময়ের ক্ষেত্রে ইউটিসি ব্যবস্থা ব্যবহৃত হয়, যা শত শত এটমিক ক্লকের গড়ের ওপর ভিত্তি করে গঠিত। চাঁদে ঘন ঘন যাতায়াত শুরু হলে, পৃথিবীর সময়ের সাথে মিল রেখে হিসাব করাটা খুবই কঠিন হয়ে দাঁড়াবে।
অফিস অব সাইন্স অ্যান্ড টেকনোলজি মনে করে, মহাকাশযানের ডকিং বা চাঁদে অবতরণের মতো সূক্ষ্ম কাজের জন্য বর্তমান পদ্ধতির চেয়ে আরও বেশি নির্ভুলতা প্রয়োজন। এতে পরবর্তী চন্দ্র অভিযান সহজ হয়ে উঠবে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, চাঁদে একটি নিজস্ব সময় ব্যবস্থা তৈরি হলে অবস্থান ও সময় মাপার জন্য বারবার পৃথিবীর সাথে তাল মেলানোর চেষ্টা করতে হবে না। দীর্ঘমেয়াদে চাঁদেও পৃথিবীর মতো এটমিক ক্লক নেটওয়ার্ক স্থাপন করতে হবে। এতে করে চাঁদে অবস্থান, দিকনির্দেশনা ও সময় নির্ধারণের একটি পূর্ণাঙ্গ পরিকাঠামো তৈরি হবে। পৃথিবীর জিপিএস এবং চাঁদের এই ব্যবস্থাটি একইভাবে কাজ করবে। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, সময়ের পার্থক্যের কারণে চাঁদ ও পৃথিবীর মধ্যে মিটার ও কিলোগ্রামের মতো পরিমাপগুলোর সামান্য পরিবর্তনও বিজ্ঞানীদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
অর্থাৎ, সমন্বিত চন্দ্র সময় তৈরি হলে তা কেবল প্রযুক্তিগত সমাধানই হবে না, বরং স্থান ও সময় পরিমাপের সূক্ষ্ম ও সমন্বিত ব্যবস্থাটিকে একটি নতুন দৃষ্টিকোণ থেকে দেখার সুযোগ করে দেবে। ১ সেকেন্ডের পার্থক্যই তখন হয়তো নতুন কোনো সম্ভাবনার সৃষ্টি করবে!