গরিবের হাতে জন্ম, কিন্তু নাম কেন শাহী টুকরা

বোটি কাবাব থেকে গালৌটি, আওয়াধি বিরিয়ানি থেকে কড়াই মুর্গ এবং শাহী কোরমা পর্যন্ত মোগল রান্নাঘরের রন্ধন প্রতিভা উদযাপন করার মতো।

গরিবের হাতে জন্ম, কিন্তু নাম কেন শাহী টুকরা
শাহী টুকরা। ছবি: পেক্সেলস

ঘন দুধের মধ্যে টুকরো টুকরো পাউরুটি, ওপরে পেস্তা কিংবা কাজু বাদাম ছিটানো কিংবা ক্রিম দেওয়া। বিয়ে বাড়িতে বা বিশেষ দাওয়াতে এই খাবারটি অনেক জায়গাতেই পরিবেশন করা হয়। হ্যাঁ, শাহী টুকরার কথা হচ্ছিল। যার নামের সঙ্গেই ‘শাহী’ শব্দটি জড়িয়ে আছে তার জন্ম নিশ্চয় অভিজাত ব্যাপার? আসলে কি তাই? তাহলে দুটি গল্প জেনে যাওয়া যাক।

শাহী টুকরা খাবারটির কথা উঠলেই এক লহমায় সবাই বলবে এটি মোগলাই খাবার। হয়তো তাই। কিন্তু তাতে পাউরুটি কেন? পাউরুটিতো উপমহাদেশে এনেছে পর্তুগিজরা। তাহলে?

প্রায় ৪০০ বছরের রাজত্বকালে মোগলরা এই উপমহাদেশে স্থাপত্য, সাহিত্য এবং সংস্কৃতির বহু বিস্ময়কর সৃষ্টি উপহার দিয়েছে। মোগল সম্রাট এবং অভিজাতরা সংগীত ও শিল্পের সঙ্গে সম্পর্কিত অনেক ক্ষেত্রে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করার জন্য নিরলস কাজ করলেও, তাদের রাজকীয় রান্নাঘরেও ইতিহাসের এক গৌরবময় অধ্যায় রচিত হচ্ছিল। বোটি কাবাব থেকে গালৌটি, আওয়াধি বিরিয়ানি থেকে কড়াই মুর্গ এবং শাহী কোরমা পর্যন্ত মোগল রান্নাঘরের রন্ধন প্রতিভা উদযাপন করার মতো। তবে মোগল রান্নার মধ্যে শুধু তাদের মাংসের পদই নয়, আরও অনেক কিছু আছে। এর প্রধান উদাহরণ হলো সেই ব্রেড পুডিং যার কথা শুরুতেই বলা হয়েছে। শাহী টুকরা। যার আভিধানিক অর্থ হলো ‘রাজকীয় টুকরা’ বা ‘রাজকীয় কামড়’।

এই শাহী টুকরার উৎপত্তির বিষয়ে একাধিক গল্প আছে। কেউ কেউ বলেন যে পদটি ষোড়শ শতকে সম্রাট বাবরের সঙ্গে ভারতে এসেছিল, আবার কেউ কেউ মনে করেন যে এটি ইউরোপীয় ব্রেড পুডিংয়ের একটি দেশীয় রূপ হতে পারে, যা মধ্যযুগে মধ্য এশিয়া এবং আফ্রিকা জুড়ে জনপ্রিয় ছিল এবং বাবর ও তার দল এটিকে দেশে নিয়ে এসেছিলেন।

এই শাহী টুকরার উৎপত্তির বিষয়ে একাধিক গল্প আছে। কেউ কেউ বলেন যে পদটি ষোড়শ শতকে সম্রাট বাবরের সঙ্গে ভারতে এসেছিল
এই শাহী টুকরার উৎপত্তির বিষয়ে একাধিক গল্প আছে। কেউ কেউ বলেন যে পদটি ষোড়শ শতকে সম্রাট বাবরের সঙ্গে ভারতে এসেছিল

শাহী টুকরা এবং মিসরীয় বেকড ব্রেড ডেজার্ট ‘উম আলি’র মধ্যে সম্ভাব্য যোগসূত্র নিয়ে অনেক জল্পনা রয়েছে। গল্প আছে, একদিন এক রাজা তার দলবল নিয়ে শিকারের জন্য বেরিয়েছিলেন। তখন তারা নীলনদের তীরবর্তী একটি গ্রামে খাওয়ার জন্য থেমেছিলেন। উৎফুল্ল গ্রামবাসীরা রাজকীয় অতিথিদের খাবার রান্না করার জন্য স্থানীয় রাঁধুনি উম আলি নামের এক ভদ্রলোককে ডেকে আনলেন। উম আলি কিছু বাসি রুটি নিয়ে ক্রিম, দুধ, চিনি ও বাদামের সাহায্যে এমন একটি মিষ্টি তৈরি করেছিলেন যা খেয়ে ক্ষুধার্ত অতিথিরা আঙুল চাটতে বাধ্য হয়েছিলেন। এরপর সেই ব্রেড পুডিং মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে ছড়িয়ে পড়ে এবং একটি জনপ্রিয় খাবারে পরিণত হয়। যাকে আজ আমরা শাহী টুকরা বলছি।

আরব অঞ্চলের কাছাকাছি একটি মিষ্টান্ন হলো ‘ঈশ এস সেরনি’। যার অর্থ অর্থাৎ ‘প্যালেস ব্রেড’। শুকনো রুটি টুকরো করে মধু ও চিনির সিরায় ফুটিয়ে, গোলাপজল ও ক্যারামেল দিয়ে সাজানো হয়। অনেকে বলেন, আরব থেকে ভ্রমণ করতে করতে আমাদের উপমহাদেশে এসে এটি রূপ নেয় শাহী টুকরাতে।

দিল্লির জামে মসজিদ এলাকায় বিক্রি হচ্ছে শাহী টুকরা
দিল্লির জামে মসজিদ এলাকায় বিক্রি হচ্ছে শাহী টুকরা

এবার আরেকটি গল্প। মুসলিম সংস্কৃতিতে শাহী টুকরা ইফতার এবং ঈদের আয়োজনে একটি অপরিহার্য পদ ছিল। এখনো এই ঐতিহ্য বর্তমান। অনেক জায়গায় শাহী টুকরা দিয়ে ইফতারও করা হতো। বেঁচে যাওয়া রুটি মোগল খানসামারা ঘিয়ে ভেজে নিতেন এবং সেটি ঘন দুধে ভিজিয়ে নিতেন। প্রথমাবস্থায় খানসামারা নিজেদের সাদামাটা ভাবে এই পদটি বানাতেন। পরে রাজ পরিবারে এই খাবারের কথা ছড়িয়ে পড়ল। ওই সাদামাটা দুধে ভোজানো রুটিতো শাহী ডাইনিং হলে পরিবেশন করা যায় না। তখন বানানো হলো খুব ভালোভাবে খামির করা রুটি। দুধে পড়ল সুগন্ধি, জাফরান, এলাচ ও গোলাপ জল। কাঠবাদাম, পেস্তা, কাজুবাদামের মতো শুকনো ফল দিয়ে সজ্জিত করে এবং সোনা বা রুপার বরক দিয়ে সাজিয়ে গেল বাদশাহের সামনে। এই মিষ্টিটি রাজকীয় পরিবারের অন্যতম প্রিয় পদ ছিল বলে জানা যায়।

এবার তাহলে একটা সিদ্ধান্ত পাওয়া যাচ্ছে। দুটি গল্পই বলছে, নামে শাহী হলেও এই খাবারের জন্ম গরীবের হাতে। বেঁচে যাওয়া রুটি থেকে তৈরি হোক বা গ্রামের বাবুর্চির হাতে থৈরি হোক সাধারণের খাবার হয়ে উঠল শাহী।

এই শাহী টুকরার একটি হায়দ্রাবাদী আত্মীয় আছে। যার নাম ‘ডাবল কা মিঠা’। স্বাদ এবং পরিবেশনায় একে অপরের সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ হলেও, এই দুটির মধ্যে পার্থক্য কেবল ঘনত্বের দিক থেকে। ‘ডাবল কা মিঠা’ কিছুটা বেশি তুলতুলে। অন্ধ্রপ্রদেশের স্থানীয় ভাষায় রুটিকে ‘ডাবল রোটি’ বলা হয় এবং সেই থেকেই এই পদের নাম হয়েছে, ‘ডাবল কা মিঠা’।

কলকাতার রয়েল হোটেলের শাহী টুকরা
কলকাতার রয়েল হোটেলের শাহী টুকরা

সেই মিসর, আরব কিংবা মোগলদের শাহী টুকরার জন্য বেঁচে যাওয়া কিংবা আলাদা করে তৈরি রুটির জায়গায় কালে কালে এলো সহজলভ্য পাউরুটি। সে অর্থে শাহী টুকরাকে ‘মিলাবে মিলিবের’ খেলা বলাই যায়।

সম্পর্কিত