বিরল খনিজ আসলে কী? কোন কাজে লাগে?

বিরল খনিজ আসলে কী? কোন কাজে লাগে?
এই সময়ে বিরল খনিজ ও তা ব্যবহারে তৈরি নানা পণ্য মানুষের জীবনের সঙ্গে একেবারে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে। ছবি: এআই দিয়ে তৈরি

বর্তমান বিশ্বে বিরল খনিজ একটি বহুল আলোচিত বিষয়। বিশেষ করে এটি নিয়ে চীন ও আমেরিকার দ্বৈরথ পুরো ব্যাপারটিকে আরও আকর্ষণীয় করে তুলেছে। প্রশ্ন হচ্ছে–এই বিরল খনিজ আসলে কী? কী কাজেই‑বা লাগে?

এক কথায় উত্তর দিতে গেলে বলতে হয়, এই সময়ে বিরল খনিজ ও তা ব্যবহারে তৈরি নানা পণ্য মানুষের জীবনের সঙ্গে একেবারে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে। হাতে থাকা সেলফোন, কম্পিউটার, টেলিভিশন, গাড়ি থেকে শুরু করে বিচিত্র সব প্রযুক্তি পণ্য, যার ভেতরে চুম্বক থাকে বা যা তৈরিতে চুম্বক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, তার সবকিছুতেই রয়েছে এই বিরল খনিজের উপস্থিতি। যোগাযোগ ব্যবস্থা তো বটেই, চিকিৎসা সরঞ্জাম, সামরিক সরঞ্জাম, টেকসই জ্বালানি রূপান্তর–এই সবকিছুই আসলে নির্ভর করছে এই অনবায়নযোগ্য প্রাকৃতিক সম্পদের প্রাপ্যতার ওপর।

এখানে উল্লেখ্য যে, বিশ্বের মোট বিরল খনিজের ৬০ শতাংশ আকরিকের নিয়ন্ত্রণ কিন্তু চীনের হাতে। ওয়াশিংটনভিত্তিক সাময়িকী দ্য ডিপ্লোম্যাট বলছে, ৮৫ শতাংশ আকরিকের উৎপাদন চীনের নিয়ন্ত্রণে। আর বিরল খনিজ থেকে বিভিন্ন ধরনের পণ্য উৎপাদনের হিসাব ধরলে এ নিয়ন্ত্রণ ৯৫ শতাংশ। ভবিষ্যতের জ্বালানি হিসেবে বহুল আলোচিত বিরল খনিজের যে আলাপ, সেখানে বাজারের নিয়ন্ত্রণ পুরোপুরি চীনের হাতে।

electric vehichle

বিরল খনিজ কোনগুলো?
ল্যানথেনাইড সিরিজের ১৫টি মৌল এবং স্ক্যান্ডিয়াম ও ইত্রিয়াম মিলিয়ে ১৭টি ধাতুকে একসঙ্গে বিরল খনিজ বলা হয়। এর মধ্যে ল্যানথেনাইড সিরিজের মৌলগুলোকে একযোগে বলা হয় বিরল মৃত্তিকা ধাতু। এই শ্রেণির নামকরণ থেকেই বোঝা যাচ্ছে যে, মাটিতে এই মৌলগুলো পাওয়া যায়। এমনিতে একে বিরল বলার তেমন কারণ নেই। তবে এর প্রক্রিয়াকরণ জটিল এবং পরিবেশবান্ধব না হওয়ায় এগুলো ‘বিরল’ খেতাব পেয়েছে। মূলত বাণিজ্যিকভাবে এসব মৌলকে বা এগুলোর অক্সাইড উৎপাদনেই মূল জটিলতা। সব ধরনের পরিবেশগত বাধ্যবাধকতা মেনে চলতে গেলে এর উৎপাদন ব্যয় যায় বেড়ে।

এই ১৭টি বিরল মৌলের মধ্যে রয়েছে–স্ক্যান্ডিয়াম, ইত্রিয়াম, সেরিয়াম, প্রাসিওডিমিয়াম, ডিসপ্রোসিয়াম, টারবিয়াম, ল্যানথেনাম, গ্যাডোলিনিয়াম, থুলিয়াম, ইটারবিয়াম, নিওডিমিয়াম, ইউরোপিয়াম, প্রোমিথিয়াম, হলমিয়াম, লুটেসিয়াম, আরবিয়াম ও সামারিয়াম।

তবে এই ১৭ মৌলের মধ্যে মোটাদাগে পাঁচটির গুরুত্ব অন্যগুলোর চেয়ে বেশি। খনি সম্পর্কিত ওয়েবসাইট মাইনিং ডটকমের তথ্যমতে, এই ১৭ বিরল খনিজের মধ্যে নিওডিমিয়াম, ইউরোপিয়াম, টারবিয়াম, ডিসপ্রোসিয়াম ও ইত্রিয়ামের ব্যবহার তুলনামূলক বেশি।

কোন কোন কাজে প্রয়োজন বিরল খনিজ
বিরল খনিজের সবচেয়ে বেশি ব্যবহার আলো বিকীরণ ও চৌম্বক ধর্মের ওপর নির্ভর করে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, আমাদের হাতে হাতে আজ যে স্মার্টফোন, তার রঙিন স্ক্রিন, কানে থাকা হেডফোন, ব্যাঙ্কনোটের গোপন নিরাপত্তা সংকেত, ক্ষেপণাস্ত্রের শরীরে থাকা তাপসংবেদী কাঠামো, কিংবা সাগরতলে থাকা ফাইবার অপটিক সরবরাহ লাইন–এই সবকিছুতেই ব্যবহৃত হয় বিরল খনিজ। বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী ও নির্ভরযোগ্য চুম্বক তৈরির পেছনেও রয়েছে এরা। আর যদি বায়ুশক্তি, বিদ্যুচ্চালিত গাড়ির (ইভি) মতো টেকসই প্রযুক্তির কথা বলা হয়, তবে এই বিরল খনিজ ছাড়া উপায়ই নেই। এমনকি কোয়ান্টাম কম্পিউটার নিয়ে এই এত এত যে গবেষণা, তা হয়তো আর ভবিষ্যৎ দেখবে না, যদি এই বিরল খনিজ না থাকে।

আধুনিক প্রযুক্তি দুনিয়া অনেকাংশেই বিরল খনিজের ওপর নির্ভরশীল। বিজ্ঞান সম্পর্কিত ওয়েবসাইট সায়েন্সনিউজ ডটকমে প্রকাশিত নিবন্ধে বলা হয়েছে, তুলনায় কম গুরুত্বপূর্ণ ধরা হলেও সেরিয়াম পেট্রোলিয়াম পরিশোধনে ব্যবহৃত হয়, আর নিউক্লিয়ার চুল্লিতে নিউট্রন ক্যাপচারের জন্য ব্যহৃত হয় গ্যাডোলিনিয়াম।

rare earth mineral 2

অন্যদিকে কম্পিউটার মনিটর, টেলিভিশন স্ক্রিন কিংবা স্মার্টফোনের স্ক্রিন রঙিন করতে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয় টারবিয়াম ও ইউরোপিয়াম। এগুলোতে থাকা এফ‑ইলেকট্রনের কল্যাণেই তাদের এই ব্যবহার। আবার ইত্রিয়ামের ব্যবহার রয়েছে উচ্চ সক্ষমতার লেজারে। মূলত ইত্রিয়াম‑অ্যালুমিনিয়াম‑গারনেট বা ওয়াইএজি ব্যবহার করা হয়। আর এর সাথে যদি নিওডিমিয়ামকে জুড়ে দেওয়া হয়, তবে এর ব্যবহারিক বৈচিত্র্য বেড়ে যায় বহুগুণে। কী কী ক্ষেত্রে? স্টিল কাটা থেকে শুরু করে শরীরে ট্যাটু আঁকা–সবকিছুতেই এর ব্যবহার আছে। একইভাবে আরবিয়াম‑ওয়াইএজি লেজার ব্যবহার করা হয় চিকিৎসায় নানা ধরনের অস্ত্রোপচারের সময়।

আবার ল্যানথেনামের ব্যবহার রয়েছে নাইট ভিশন গগলসে। আরবিয়ামের কল্যাণেই বাধাহীন ইন্টারনেট সেবা সারা দুনিয়ায় পাওয়া সম্ভব হচ্ছে। ইন্টারনেটের মাধ্যমে যে তথ্যপ্রবাহের সঙ্গে আমরা যুক্ত, তা যে আলোক তরঙ্গের মাধ্যমে পাঠানো হয়, তার তরঙ্গদৈর্ঘ্য ১৫৫০ ন্যানোমিটার, আরবিয়ামও একই দৈর্ঘ্যের তরঙ্গ বিকীরণ করে।

স্মার্টফোনের ভাইব্রেশন, হেডফোনের বা ইয়ারবাডসের শব্দ, হার্ড ডিস্কে তথ্য সংরক্ষণ কিংবা এমআরআই মেশিনে চৌম্বক ক্ষেত্র তৈরিতে নিওডিমিয়াম‑আয়রন‑বোরনের শঙ্করে গড়া চুম্বক ব্যবহার করা হয়। এর সাথে যদি আরেক বিরল খনিজ ডিসপ্রোসিয়াম জুড়ে দেওয়া হয়, তবে এই চুম্বক হয়ে উঠবে তাপসহ, যা ব্যবহার করা হয় বিভিন্ন বিদ্যুচ্চালিত যানবাহনের মোটরে। তবে এ ক্ষেত্রে জনপ্রিয় সামারিয়াম‑কোবাল্ট ম্যাগনেট। এর ব্যবহার রয়েছে উড়োজাহাজ থেকে শুরু করে নানা ধরনের যানবাহন, জেনারেটর, স্পিড সেন্সর, রাডার সিস্টেম, কমিউনিকেশন স্যাটেলাইটে।

এবার আসা যাক বায়ুবিদ্যুৎকলের কাছে। বৈশ্বিক উষ্ণায়ন ও জলবায়ু পরিবর্তনের বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে গোটা বিশ্ব ক্রমে পরিবেশবান্ধব জ্বালানির দিকে ঝুঁকছে। এ ক্ষেত্রে উইন্ডমিল ও সোলার প্যানেল মনোযোগের কেন্দ্রে চলে এসেছে। এ দুই ক্ষেত্রেই রয়েছে বিরল খনিজের উল্লেখযোগ্য ব্যবহার। বিজ্ঞানীরা বলছেন, কোয়ান্টাম কম্পিউটিং নিয়ে আজকের যে হইচই, তার উন্নয়নেও বিরল খনিজ ক্রমশ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। এ ক্ষেত্রেও এর এফ‑ইলেকট্রন ও এফ অর্বিটালে থাকা ফাঁকা স্থান বিশেষ হয়ে উঠেছে। কারণ, এই ফাঁকা স্থানই এই মৌলগুলোকে বাড়তি তথ্য সংরক্ষণের সক্ষমতা দিচ্ছে।

সুতরাং, বলাই যায় যে, বিরল খনিজ গুরুত্বের দিক থেকে ভবিষ্যতে জ্বালানি তেলের জায়গা দখল করে নিতেই পারে। কারণ চিকিৎসা সরঞ্জাম, সামরিক সরঞ্জাম থেকে শুরু করে হাতে বা পকেটে নিয়ে ঘোরা নানা প্রযুক্তি পণ্যের উৎপাদন এর প্রাপ্যতার ওপর অনেক বেশি নির্ভরশীল। আর তাই বিরল খনিজের বাজারও বড় হচ্ছে ক্রমশ।

সম্পর্কিত