Advertisement Banner

‘ইসলামী নাম’ বদলে কেন হিন্দু-শিখ নাম রাখছে পাকিস্তান?

চরচা ডেস্ক
চরচা ডেস্ক
‘ইসলামী নাম’ বদলে কেন হিন্দু-শিখ নাম রাখছে পাকিস্তান?
পাকিস্তানের পাঞ্জাবের মুখ্যমন্ত্রী মরিয়ম নওয়াজ। ছবি: ফেসবুক

সাতচল্লিশের দেশভাগের পর কেটে গেছে দীর্ঘ আট দশক। যে পাকিস্তান একসময় নিজের বুক থেকে অমুসলিম বা ঔপনিবেশিক ইতিহাসের চিহ্ন মুছে ফেলতে মরিয়া ছিল, সেই পাকিস্তানই এবার হাঁটল উল্টো পথে। দেশটির পাঞ্জাব সরকার আচমকাই সিদ্ধান্ত নিয়েছে, লাহোরের বেশ কিছু এলাকার বর্তমান ইসলামিক নামগুলো বাদ দিয়ে সেখানে ফিরিয়ে আনা হবে দেশভাগের আগের মূল হিন্দু, শিখ ও জৈন নামগুলো।

কিন্তু হঠাৎ কেন এই ঐতিহাসিক ‘ইউ-টার্ন’?

সম্প্রতি পাকিস্তানের পাঞ্জাব প্রদেশ সরকার শহরের বেশ কিছু রাস্তা, গলি ও এলাকার নাম পরিবর্তন করে দেশভাগের আগের মূল হিন্দু, শিখ, জৈন ও ব্রিটিশ আমলের নামে ফিরিয়ে নেওয়ার একটি ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত অনুমোদন করেছে। মুখ্যমন্ত্রী মরিয়ম নওয়াজের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত পাঞ্জাব ক্যাবিনেট বৈঠকে এই অনুমোদন দেওয়া হয়।

জানা যায়, সাবেক প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফের নেতৃত্বাধীন ‘লাহোর হেরিটেজ এরিয়াস রিভাইভাল প্রজেক্ট’–এর অধীনে এই অভিনব উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। একে দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতি এবং ইতিহাস চর্চায় একটি বড় পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

লাহোর অথরিটি ফর হেরিটেজ রিভাইভাল-এর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, লাহোরের পরিচয় একক কোনো সংস্কৃতির নয়, বরং এটি মুসলিম, শিখ, হিন্দু, খ্রিস্টান এবং পার্সি সংস্কৃতির এক অপূর্ব মিশ্রণ। নতুন প্রজন্মকে শহরের প্রকৃত ও ধর্মনিরপেক্ষ ইতিহাসের সাথে পরিচয় করিয়ে দিতেই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

পাকিস্তানি সংবাদমাধ্যম পাকিস্তান টুডে এবং আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই সিদ্ধান্তের পেছনে রয়েছে ইতিহাস রক্ষা, জনমানসের মনস্তত্ত্ব এবং রাজনৈতিক ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধারের এক গভীর সমীকরণ। মূলত গত কয়েক দশকে লাহোরের বহু ঐতিহাসিক স্থানের নাম বদলে ইসলামিক, পাকিস্তানি বা স্থানীয় মুসলিম বিশিষ্ট ব্যক্তিদের নামে রাখা হয়েছিল। তবে সরকারিভাবে নাম পরিবর্তন করা হলেও লাহোরের সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন কথ্য ভাষা থেকে এই পুরনো নামগুলো কখনোই মুছে যায়নি। রিকশাচালক থেকে শুরু করে স্থানীয় দোকানদার বা সাধারণ পথচারী–সবাই চেনা এলাকাগুলোকে যুগ যুগ ধরে পুরনো নামেই ডেকে এসেছেন।

লাহোর অথরিটি ফর হেরিটেজ রিভাইভাল-এর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, লাহোরের পরিচয় একক কোনো সংস্কৃতির নয়, বরং এটি মুসলিম, শিখ, হিন্দু, খ্রিস্টান এবং পার্সি সংস্কৃতির এক অপূর্ব মিশ্রণ। নতুন প্রজন্মকে শহরের প্রকৃত ও ধর্মনিরপেক্ষ ইতিহাসের সাথে পরিচয় করিয়ে দিতেই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

পাকিস্তানের পাঞ্জাবে উন্নয়ন কার্যক্রম। ছবি: ফেসবুক
পাকিস্তানের পাঞ্জাবে উন্নয়ন কার্যক্রম। ছবি: ফেসবুক

দেশটির সংবাদমাধ্যম ট্রিবিউন বলছে, নতুন এই সিদ্ধান্তের ফলে লাহোরের বেশ কিছু প্রধান এলাকার নাম আনুষ্ঠানিকভাবে তাদের পুরনো রূপে ফিরছে। যেমন, বহু বছর ধরে ‘ইসলামপুরা’ নামে পরিচিত এলাকাটি এখন আবার তার আদি নাম ‘কৃষ্ণ নগর’ ফিরে পাচ্ছে। একইভাবে ‘সুন্নাত নগর এলাকাটি পুনরায় ‘সান্ত নগর’ এবং ‘মোস্তফাবাদ’ এলাকাটি তার পুরনো নাম ‘ধরমপুরা’ হিসেবে স্বীকৃতি পাচ্ছে।

এ ছাড়া সাবেক বাবরি মসজিদ চকের নাম বদলে করা হচ্ছে ‘জৈন মন্দির চক’ এবং মওলানা জাফর আলী খান চকের নাম পুনরুজ্জীবিত করে রাখা হচ্ছে ‘লক্ষ্মী চক’। শুধু ধর্মীয় নামই নয়, ব্রিটিশ আমলের ঐতিহাসিক নামগুলোকেও ফিরিয়ে আনা হচ্ছে, যার ফলে ‘বাগ-ই-জিন্নাহ’ এলাকার রাস্তাটি আবার ‘লরেন্স রোড’ এবং ‘ফাতিমা জিন্নাহ রোড’ তার পুরনো নাম ‘কুইন্স রোড’ হিসেবে পরিচিতি পাবে। এ ছাড়াও মোহন লাল বাজার, ভগবান পুরা, রাম গলি এবং শান্তি নগরের মতো ঐতিহ্যবাহী এলাকাগুলোও তাদের পুরনো নাম ও গৌরব ফিরে পাচ্ছে।

পাকিস্তানের অন্যতম প্রধান সংবাদমাধ্যম ডন বলছে, এই প্রকল্পের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, লাহোরের ঐতিহাসিক মিন্টো পার্কের (বর্তমান গ্রেটার ইকবাল পার্ক) তিনটি ক্রিকেট মাঠ এবং একটি ঐতিহ্যবাহী কুষ্টির আখড়া পুনর্নির্মাণের প্রস্তাব। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এটি আসলে শরিফ পরিবারের একটি রাজনৈতিক ক্ষতিপূরণ বা ‘ড্যামেজ কন্ট্রোল’-এর চেষ্টা। ২০১৫ সালে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ যখন পাঞ্জাবের মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন, তখন একটি নগর উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য এই ঐতিহাসিক মাঠ ও আখড়াগুলো ভেঙে ফেলা হয়েছিল, যা ক্রীড়ামোদীদের মধ্যে তীব্র সমালোচনার জন্ম দেয়। অথচ দেশভাগের আগে ও পরে এই মাঠেই অনুশীলন করেছিলেন পাকিস্তানের কিংবদন্তি ক্রিকেটার ইনজামাম-উল-হক এবং ভারতের ক্রিকেট ইতিহাসের অন্যতম সেরা ব্যক্তিত্ব লালা অমরনাথ। একই সাথে বিশ্ববিখ্যাত অপরাজেয় কুস্তিগীর গামা পেহলওয়ান এই আখড়াতেই লড়াই করতেন। তাছাড়া পার্কটি প্রাক-দেশভাগ আমলে হিন্দু সম্প্রদায়ের অন্যতম প্রধান ধর্মীয় উৎসব দশেরার মূল কেন্দ্রও ছিল।

মরিয়ম নওয়াজ, নওয়াজ শরিফ ও শাহবাজ শরিফ। ছবি: ফেসবুক
মরিয়ম নওয়াজ, নওয়াজ শরিফ ও শাহবাজ শরিফ। ছবি: ফেসবুক

পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস ও প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের গবেষকরা এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়ে বলেছেন, গঙ্গা রাম হাসপাতাল বা লক্ষ্মী চকের মতো নামগুলো লাহোরের ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ, যা মুছে ফেলা সম্ভব নয়।

তবে কিছু কিছু পাকিস্তানি সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, স্থানীয় স্তরে জাতীয় ব্যক্তিত্বদের নাম সংবলিত রাস্তা পরিবর্তনের বিষয়ে সামান্য বিতর্কও তৈরি হয়েছে। সরকার অবশ্য আশ্বস্ত করেছে, সামাজিক সম্প্রীতি ও ইতিহাসকে যথাযথ মর্যাদা দিয়ে বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ মেনেই পর্যায়ক্রমে এই কাজ সম্পন্ন করা হচ্ছে।

ভারতীয় সংবাদমাধ্যম দ্য প্রিন্ট বলছে, লাহোরের দেয়ালে দেয়ালে নতুন সাইনবোর্ডে ‘কৃষ্ণ নগর’ বা ‘জৈন মন্দির’-এর মতো নামগুলো ফিরে আসা কেবলই কোনো প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়। এটি আসলে আধুনিক পাকিস্তানের বুকে এক সময়ের অবিভক্ত পাঞ্জাবের বহুত্ববাদী ও সম্প্রীতির ইতিহাসকে নতুন করে মেনে নেওয়ার প্রয়াস।

সম্পর্কিত