Advertisement Banner

ইকোনমিস্টের নিবন্ধ

ট্রাম্পের অনিশ্চয়তায় এশিয়ার বাণিজ্যে নির্ভরযোগ্য হতে মরিয়া চীন

চরচা ডেস্ক
চরচা ডেস্ক
ট্রাম্পের অনিশ্চয়তায় এশিয়ার বাণিজ্যে নির্ভরযোগ্য হতে মরিয়া চীন
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিনপিং। ছবি: রয়টার্স

২০২৬ সালের শেষ দিকে সি চিনপিং বিশ্ব অর্থনীতির তিন-পঞ্চমাংশেরও বেশি প্রতিনিধিত্বকারী দেশের নেতাদের নিয়ে এশিয়া প্যাসিফিক ইকনোমিক কো-অপারেশন (এপেক) সম্মেলন আয়োজন করবে। ২০১৪ সালের পর প্রথমবার চীনে বসতে যাওয়া এপেক শীর্ষ সম্মেলনকে চীনের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধারের এক গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত হিসেবে দেখা হচ্ছে। সি চান বিশ্ব বিশেষ করে এশিয়ার দেশগুলো চীনকে তাদের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য অর্থনৈতিক অংশীদার হিসেবে বিবেচনা করুক।

এই লক্ষ্য বাস্তবায়নে চীন এ বছরই সক্রিয় হয়ে উঠেছে। অক্টোবরের শেষে দেশটি দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় জোট আসিয়ানের সঙ্গে তাদের মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির হালনাগাদ সংস্করণে স্বাক্ষর করে। দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় দেশগুলোর জন্য এটি সহজ সিদ্ধান্ত ছিল না; তাদের অভিযোগ, চীন সস্তা পণ্য ঢুকিয়ে স্থানীয় শিল্পকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। বিশ্লেষকদের মতে, নতুন চুক্তি তাদের জন্য চীনের অতিরিক্ত উৎপাদিত পণ্য রপ্তানিতে বাধা দেওয়া আরও কঠিন করে তুলবে।

তবুও ছোট দেশগুলোর সামনে বিকল্প কম, কারণ বর্তমানে ভূ-রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার মূল উৎস হয়ে উঠেছে আমেরিকা। বিশ্লেষকরা বলছেন, ট্রাম্পের তুলনায় সি অনেক বেশি স্থিতিশীল ও নির্ভরযোগ্য অর্থনৈতিক অংশীদার। আগামী বছর চীন উপসাগরীয় দেশসমূহ, সুইজারল্যান্ড ও দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে নতুন বাণিজ্য চুক্তি করতে চায়। ২০২৫ সালের জুনে সি আফ্রিকা থেকে আমদানিতে একতরফা শুল্ক হ্রাসের ঘোষণা দেন। এর কয়েকমাস পরেই মুক্তবাজার নীতির শর্তে আমেরিকান বাজারে আফ্রিকান দেশগুলোর প্রবেশাধিকার বাতিল করেন ট্রাম্প।

চীনের আরও বৃহৎ লক্ষ্য হলো ট্রান্স-প্যাসিফিক পার্টনারশিপে (টিপিপি) যোগ দেওয়া। এই জোটকে ব্যবহার করে ওবামা একসময় এশিয়ার অর্থনৈতিক ভারসাম্য চীনের দিক থেকে আমেরিকার দিকে টেনে আনতে চেয়েছিলেন। ট্রাম্প হোয়াইট হাউসে ফেরার প্রথম দিনেই সেই চুক্তি থেকে আমেরিকাকে সরিয়ে নেন। জাপান ও অস্ট্রেলিয়া চীনকে অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়ে সন্দিহান, কারণ সাম্প্রতিক অতীতে তারা চীনা অর্থনৈতিক চাপে পড়েছে। কিন্তু বিশ্বজুড়ে বাণিজ্যবাধা বাড়তে থাকায় তাদের এই কঠোর অবস্থান শিথিল হতে পারে। ২০২৬ সালের শেষ দিকে চীন টিপিপিতে অন্তর্ভুক্তির পথে অগ্রগতি অর্জন করতে পারে।

এশিয়ার বাণিজ্যে নির্ভরযোগ্য হতে চীন সক্রিয় হয়ে উঠছে। ছবি: এআই দিয়ে তৈরি
এশিয়ার বাণিজ্যে নির্ভরযোগ্য হতে চীন সক্রিয় হয়ে উঠছে। ছবি: এআই দিয়ে তৈরি

বিশ্লেষকদের মতে, চীনের অর্থনৈতিক কূটনীতির সাফল্য অনেকটাই নির্ভর করবে তারা কীভাবে এপেক সামলায় তার ওপর। ২১ দেশের এই জোট সাধারণত স্পটলাইটের বাইরে থাকে। ১৯৯০-এর দশকে প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে বাণিজ্য উদারীকরণের লক্ষ্যে যাত্রা শুরু করলেও ১৯৯৭ সালের এশীয় আর্থিক সংকটের পর তা থমকে যায়। এটি এখন এক বার্ষিক মঞ্চ যেখানে নেতারা অর্থনৈতিক আলোচনা করেন, সেখানে মার্কিন ও চীনা প্রেসিডেন্ট নিয়মিত অংশ নেন।

তবে চীনের মতো বড় অর্থনীতি যখন এপেক আয়োজন করে, তখন এটি ভিন্ন মাত্রা পায়। আয়োজনকারী হিসেবে চীন ডজনেরও বেশি অর্থনৈতিক নীতিবিষয়ক বৈঠকের সভাপতিত্ব করবে এবং স্বাভাবিকভাবেই এজেন্ডা ঠিক করার ক্ষমতা পাবে। বড় দেশগুলো তাদের পছন্দের অর্থনৈতিক মডেল সামনে আনার সুযোগ হিসেবে এপেকের মঞ্চ ব্যবহার করে। যদিও চীন এখনো জানায়নি ২০২৬ সালের এজেন্ডা কীভাবে কাজে লাগাবে। ধারণা করা হচ্ছে, তারা সদস্য দেশগুলোর সঙ্গে নিজেদের অর্থনৈতিক সম্পর্ক আরও জোরদার করার চেষ্টা করবে। কিন্তু বিপরীত দিকে আমেরিকা এই সম্পর্ক শিথিল করছে।

বিশ্লেষকদের মতে, চীন দুটি ক্ষেত্রে নিজেদেরকে ট্রাম্প প্রশাসনের বিপরীতে দাঁড় করাতে চায়। একটি হলো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), অন্যটি হলো জলবায়ু পরিবর্তন। যেখানে আমেরিকা ‘এআই দৌড়ে এগিয়ে থাকা’ নিয়ে আত্মপ্রশংসায় ব্যস্ত, সেখানে চীন এআই-কে উন্নয়নশীল দেশগুলোর উন্নতির সুযোগ হিসেবে তুলে ধরছে।

চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিনপিং। ছবি: এক্স থেকে নেওয়া
চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিনপিং। ছবি: এক্স থেকে নেওয়া

জলবায়ু ইস্যুতেও চীন তুলনামূলকভাবে দায়িত্বশীল অবস্থান নিয়েছে। চীন কার্বন নিঃসরণ কমাতে স্থায়ী লক্ষ্য ঘোষণা করেছে। অন্যদিকে ট্রাম্প জলবায়ু পরিবর্তনকে ‘একটি প্রতারণা’ বলে অভিহিত করছেন।

তবুও, আমেরিকা পরিস্থিতি জটিল করতে পারে। ট্রাম্পের ‘ট্রান্স-শিপড’ পণ্যের ওপর ৪০ শতাংশ শুল্ক আরোপের হুমকি এখনো অস্পষ্ট, কারণ এই শব্দের স্পষ্ট সংজ্ঞাই নেই। কিন্তু বিশ্লেষকদের মতে, চীন-আমেরিকা বাণিজ্য সম্পর্ক ২০২৬ সালে আরও অবনতি হলে, ট্রাম্প এই নিয়ম ব্যবহার করে চীনের সঙ্গে নতুন বাণিজ্য চুক্তিতে জড়িত দেশগুলোকেও শাস্তি দিতে পারেন। এতে যুক্তরাষ্ট্রের নির্ভরযোগ্য অর্থনৈতিক অংশীদার হিসেবে ভাবমূর্তি আরও দুর্বল হবে।

সম্পর্কিত