বেসরকারি এমপিওভুক্ত শিক্ষকরা ইউনিয়ন পরিষদসহ স্থানীয় সরকার নির্বাচনে প্রার্থী হতে পারবেন কি না, তা নিয়ে আইনি ও নীতিগত জটিলতা তৈরি হয়েছে। স্থানীয় সরকার নির্বাচনের আইন সংশোধন করে এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের প্রার্থী হওয়ার অযোগ্য ঘোষণার সুপারিশ চূড়ান্ত করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)।
তবে বিদ্যমান আইনে তাদের নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সুযোগ রয়েছে বলে মনে করছে কমিশন। অন্যদিকে, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এমপিও নীতিমালায় আর্থিক লাভজনক পদে থাকার বিষয়ে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে।
নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ চরচাকে বলেছেন, “আইন পরিবর্তন না হওয়া পর্যন্ত বেসরকারি এমপিওভুক্ত শিক্ষকেরা নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন। তবে নির্বাচিত হলে শিক্ষা মন্ত্রণালয় তাদের এমপিও সুবিধা বন্ধ করাসহ শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে পারে।”
এদিকে, ১৯৯৫ সালে দায়ের করা একটি মামলায় ১৯৯৬ সালে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের রায়ে বেসরকারি শিক্ষকদের স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অংশগ্রহণের আইনি ভিত্তি নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাখ্যা আসে। অন্যদিকে, ২০২৫ সালের এমপিও নীতিমালায় আর্থিক লাভজনক পদে নিয়োজিত থাকার বিষয়ে বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে।
ফলে নির্বাচনে প্রার্থিতা, শিক্ষক পদে বহাল থাকা এবং এমপিও সুবিধা- তিনটি বিষয়কে ঘিরে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
আইন সংশোধনের উদ্যোগ ইসির
গত ২১ জুলাই স্থানীয় সরকার নির্বাচনের আইন সংশোধনের সুপারিশ চূড়ান্ত করে ইসি। ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা, উপজেলা পরিষদ ও সিটি করপোরেশন আইনে পরিবর্তনের প্রস্তাবের মধ্যে রয়েছে দ্বৈত নাগরিক এবং এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার অযোগ্য ঘোষণা করা।
সভা শেষে নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের সচিব আখতার আহমেদ সাংবাদিকদের বলেন, “এমপিওভুক্ত শিক্ষকরা যেন নির্বাচনে অংশগ্রহণের অযোগ্য হন, সে বিষয়ে কমিশনের মত রয়েছে।”
তবে কমিশনের সুপারিশ চূড়ান্ত হলেই তা আইনে পরিণত হয় না। ইসি নিজের সুপারিশ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে পাঠাবে। সরকার তা গ্রহণ করলে আইন সংশোধনের উদ্যোগ নিতে হবে। সে ক্ষেত্রে মন্ত্রিসভার অনুমোদনের পর সংসদে বিল পাসের মাধ্যমে আইন পরিবর্তন করতে হবে।
অর্থাৎ, ইসির প্রস্তাব এবং বর্তমানে কার্যকর আইনের বিধান এক বিষয় নয়। আইন সংশোধন না হওয়া পর্যন্ত প্রার্থিতার যোগ্যতা নির্ধারণে বিদ্যমান আইনই প্রাসঙ্গিক থাকবে।
এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের নির্বাচনে অংশগ্রহণ নিয়ে নির্বাচন কমিশনার মো. আনোয়ারুল ইসলাম সরকার গত ৬ সেপ্টেম্বর সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময়ে বলেছিলেন, “শিক্ষক প্রার্থী হলে তার সহকর্মীরা প্রচারে যুক্ত হতে পারেন, অথচ তাদেরই প্রিসাইডিং ও পোলিং কর্মকর্তা হিসেবে নিয়োগ দিতে হয়। এতে নির্বাচনের নিরপেক্ষতা নিয়ে বিতর্কের সুযোগ তৈরি হতে পারে।”
এটি শিক্ষকদের প্রার্থিতা সীমিত করার পক্ষে কমিশনের একটি যুক্তি। তবে কোনো শিক্ষক প্রার্থী হলেই নির্বাচন নিরপেক্ষ হবে না- এমন সিদ্ধান্ত এই বক্তব্য থেকে টানা যায় না। নির্বাচনি দায়িত্ব বণ্টন, স্বার্থের সংঘাত এড়ানো এবং আচরণবিধি প্রয়োগের মাধ্যমে এ ধরনের ঝুঁকি মোকাবিলা করা সম্ভব কি না, সেটিও বিবেচনার বিষয়।
‘লাভজনক পদ’ ও একটি মামলা
স্থানীয় সরকার (ইউনিয়ন পরিষদ) আইন, ২০০৯-এর ধারা ২(৪০)- এ ‘লাভজনক পদ’-এর সংজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। এ সংজ্ঞা অনুযায়ী, প্রজাতন্ত্র বা সরকারি সংবিধিবদ্ধ কর্তৃপক্ষ কিংবা পাবলিক লিমিটেড কোম্পানি এবং সরকারের ৫০ শতাংশের বেশি শেয়ার রয়েছে এমন কোম্পানিতে সার্বক্ষণিক বেতনভুক্ত অফিস, পদ বা অবস্থান লাভজনক পদের অন্তর্ভুক্ত।
অন্যদিকে, একই আইনের ধারা ২৬(২)(ঙ) অনুযায়ী, প্রজাতন্ত্রের, ইউনিয়ন পরিষদের বা অন্য কোনো স্থানীয় কর্তৃপক্ষের কোনো কর্মে লাভজনক সার্বক্ষণিক পদে অধিষ্ঠিত ব্যক্তি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান বা সদস্য পদে নির্বাচিত হওয়ার এবং পদে থাকার যোগ্য নন। এ আইনের ধারা ২৬(৩) অনুযায়ী, প্রার্থীদের মনোনয়নপত্র দাখিলের সময় এ-সংক্রান্ত অযোগ্যতা না থাকার বিষয়ে হলফনামা দিতে হয়।
তবে এমপিওভুক্ত বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মচারীদের ক্ষেত্রে এই বিধান প্রযোজ্য কি না, তা নির্ধারণে তাদের চাকরির আইনগত অবস্থান, নিয়োগের ধরন এবং সংশ্লিষ্ট বিধিমালা বিবেচনা করা প্রয়োজন। এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীরা সরকারি অনুদান থেকে বেতন-ভাতার অংশ পেলেও তাদের চাকরি সরাসরি সরকারি চাকরির সমতুল্য কি না, সেটি আলাদাভাবে বিবেচ্য। ফলে শুধু এমপিওভুক্ত হওয়ার ভিত্তিতে তাদের ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার যোগ্য বা অযোগ্য ঘোষণা করা যায় না; এ বিষয়ে প্রযোজ্য আইন, বিধিমালা ও নির্বাচন কমিশনের নির্দেশনা যাচাই করা প্রয়োজন।
অন্যান্য স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রেও এ-সংক্রান্ত বিধান রয়েছে। স্থানীয় সরকার (পৌরসভা) আইন, ২০০৯-এর ধারা ১৯(২)(ঙ)-এ পৌরসভার মেয়র বা কাউন্সিলর পদে নির্বাচনের অযোগ্যতা নির্ধারণে লাভজনক সার্বক্ষণিক পদের বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে। একইভাবে, স্থানীয় সরকার (সিটি করপোরেশন) আইন, ২০০৯-এর ধারা ৯(২)(ঙ) এবং উপজেলা পরিষদ আইন, ১৯৯৮-এর ধারা ৮(২)(ঙ)-এ সংশ্লিষ্ট পদে নির্বাচনের যোগ্যতা ও অযোগ্যতার বিধান রয়েছে। তবে প্রতিষ্ঠানভেদে আইনের ভাষা ও প্রয়োগে পার্থক্য থাকায় সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের আইন অনুসারে বিষয়টি বিবেচনা করতে হয়।
বেসরকারি শিক্ষকদের নির্বাচনে অংশগ্রহণের প্রশ্নে ঐতিহাসিক নজির রয়েছে মফিজুল হক বনাম মফিজুর রহমান এবং অন্যান্য মামলায়। ১৯৯৫ সালের এই মামলার রায় হয় পরের বছরের ৭ মার্চ।
মামলাটির সূত্রপাত বাগেরহাটের মোরেলগঞ্জ থানার হোগলাপাশা ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে। ১৯৯২ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ওই নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা প্রার্থীদের একজন ছিলেন বেসরকারি বিদ্যালয়ের শিক্ষক। হাইকোর্ট বিভাগ প্রথমে তার প্রার্থিতার বিরুদ্ধে রায় দিয়েছিলেন। পরে আপিল বিভাগ সেই সিদ্ধান্ত বাতিল করেন।
রায়ের মূল আইনি তাৎপর্য ছিল, শিক্ষা বোর্ড সংবিধিবদ্ধ সংস্থা হলেও বোর্ডের স্বীকৃতিপ্রাপ্ত বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নিজে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ বা সরকারি প্রতিষ্ঠান হয়ে যায় না। একইভাবে, সরকার এমপিওর মাধ্যমে শিক্ষকদের বেতন-ভাতার অর্থ দিলেও তারা সরাসরি সরকারের নিয়োগ করা কর্মচারী নন। তাদের নিয়োগ দেয় সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা কমিটি বা গভর্নিং বডি।
এই ব্যাখ্যা বেসরকারি শিক্ষকদের পদকে প্রজাতন্ত্রের বা স্থানীয় কর্তৃপক্ষের অধীনে লাভজনক পদ হিসেবে গণ্য করার প্রশ্নে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ চরচাকে বলেন, “সুপ্রিম কোর্টের সর্বশেষ রুলিং বলছে, ওই তিনটা ক্যাটাগরিতে পড়ে না। যদি না পড়ে, তাহলে তিনি নির্বাচন করতে পারবেন।”
তার মতে, যতক্ষণ না পর্যন্ত এই বিষয়ে সর্বোচ্চ আদালতের রুলিং পরিবর্তিত হয় অথবা তার পরিবর্তে কোনো আইন প্রণয়ন করে, ততক্ষণ পর্যন্ত এটা সংবিধানের ১১১ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সকলের উপর বাধ্য।
তবে ওই রায়ের ব্যাখ্যা স্থানীয় সরকার নির্বাচনের সব আইনে কীভাবে প্রযোজ্য, তা নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট আইন ও পরবর্তী বিচারিক সিদ্ধান্তও বিবেচনায় নিতে হবে।
এমপিও নীতিমালায় আর্থিক লাভজনক পদে নিষেধাজ্ঞা
বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জন্য জনবল কাঠামো ও এমপিও নীতিমালা-২০২৫ প্রকাশ করে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগ। ২০২৫ সালের ১০ ডিসেম্বর প্রকাশিত নীতিমালার ১১.১৭-এর ‘ক’ ধারায় বলা হয়েছে, এমপিওভুক্ত কোনো শিক্ষক-কর্মচারী একই সঙ্গে একাধিক পদে বা চাকরিতে কিংবা আর্থিক লাভজনক কোনো পদে নিয়োজিত থাকতে পারবেন না।
‘খ’ ধারায় আর্থিক লাভজনক পদের সংজ্ঞায় সরকার প্রদত্ত বেতন, ভাতা বা সম্মানির পাশাপাশি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান বা সংস্থা, বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠান, সাংবাদিকতা ও আইন পেশায় কাজের বিনিময়ে পাওয়া বেতন, ভাতা বা সম্মানিকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। বিধান লঙ্ঘনের বিষয়টি তদন্তে প্রমাণিত হলে এমপিও বাতিলসহ শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে।
এখানে দুটি প্রশ্ন আলাদা করে দেখা প্রয়োজন। প্রথমত, কোনো শিক্ষক নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার যোগ্য কি না? দ্বিতীয়ত, নির্বাচিত হওয়ার পর শিক্ষক পদে বহাল থাকা এবং এমপিও সুবিধা পাওয়ার ক্ষেত্রে নীতিমালার বিধান কীভাবে প্রযোজ্য হবে?
নির্বাচন কমিশনার মাছউদ চরচাকে বলেন, “আইন পরিবর্তন না হলে বেসরকারি এমপিওভুক্ত স্কুলের শিক্ষক, প্রফেসর যারাই হোক, তারা নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে পারবেন। তবে শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে নীতিমালায় বলা হয়েছে যে, তারা কোনো লাভজনক পদে একই সঙ্গে থাকতে পারবেন না। নির্বাচন করতে অসুবিধা নাই। কিন্তু তারা যদি বিজয়ী হয়, ইন দ্যাট কেস শিক্ষা মন্ত্রণালয় তার এমপিও কেটে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারবে।”
অর্থাৎ, কমিশনারের ব্যাখ্যায় নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার যোগ্যতা এবং নির্বাচিত হওয়ার পর এমপিও সুবিধা বহাল থাকার প্রশ্ন দুটি পৃথক। তবে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধির পদকে নীতিমালার আওতায় আর্থিক লাভজনক পদ হিসেবে বিবেচনা করা হবে কি না, তা মূল বিধান ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ব্যাখ্যার ভিত্তিতে নির্ধারণ করা প্রয়োজন।
সরকার ও বিরোধীদলের অবস্থান
এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের প্রার্থিতার প্রশ্নে স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমের বক্তব্যেও পরিবর্তন এসেছে। গত ১৩ সেপ্টেম্বর তিনি বলেছিলেন, “স্থানীয় সরকার আইন ও এমপিও নীতিমালার বিধান বিবেচনায় নিয়ে নির্বাচন কমিশন সিদ্ধান্ত দেবে।” তবে ৮ অক্টোবর তিনি বলেন, “বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পূর্ণাঙ্গ জাতীয়করণ না হওয়া পর্যন্ত শিক্ষকদের স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অংশ নিতে আইনি বা নীতিগত কোনো বাধা নেই।”
আর ১ সেপ্টেম্বর নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে বৈঠক শেষে জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের স্থানীয় নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার সুযোগ বহাল রাখার দাবি জানান। তার ভাষ্য, দেশে এ ধরনের ৩০ হাজারের বেশি শিক্ষক রয়েছেন।
এখন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ইসির সুপারিশ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে, সরকার তা গ্রহণ করেছে কি না এবং আইন সংশোধনের কোনো খসড়া তৈরি হয়েছে কি না। পাশাপাশি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কাছে জানতে হবে, নির্বাচিত হলে এমপিও বন্ধ বা শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার আইনি ভিত্তি কী এবং তা কীভাবে প্রয়োগ করা হবে?