ইসরায়েলের দিকে কেন শুধু ‘নিন্দার ক্ষেপণাস্ত্র’ আরব নেতাদের

ইয়াসিন আরাফাত
ইয়াসিন আরাফাত
ইসরায়েলের দিকে কেন শুধু ‘নিন্দার ক্ষেপণাস্ত্র’ আরব নেতাদের
প্রতীকী ছবি। ছবি: এআই জেনারেটেড

ফিলিস্তিনিদের ওপর ইসরায়েলের হামলার প্রেক্ষাপটে গত সপ্তাহে দোহায় অনুষ্ঠিত আরব-ইসলামিক সম্মেলনে আবারও একটি পুরনো বাস্তবতা সামনে এসেছে। আরব নেতাদের কণ্ঠস্বর যতই কঠিন হোক, তাদের কার্যকর পদক্ষেপ ততটাই দুর্বল।

গাজায় ইসরায়েলের হামলা নিয়ে নিন্দার ঝড় উঠলেও কোনো বাস্তব শাস্তিমূলক ব্যবস্থা—যেমন অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা, তেল রপ্তানি বন্ধ বা কূটনৈতিক সম্পর্ক হ্রাসের মতো কঠোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি। এ কারণেই প্রশ্ন উঠছে, আরব বিশ্বের ঐক্য আসলে কি শুধুই দেখানোর জন্য?

এ সম্মেলনের চূড়ান্ত বিবৃতিতে আরব রাষ্ট্রগুলোকে আহ্বান জানানো হয়, যেন তারা ইসরায়েলকে ফিলিস্তিনিদের ওপর হামলায় বাধা দিতে সব আইনগত ও কার্যকর পদক্ষেপ নেয়।

আব্রাহাম চুক্তির স্বাক্ষরকারীরা ছিলেন নীরব

ইসরায়েলের সঙ্গে আব্রাহাম চুক্তির স্বাক্ষরকারী দেশগুলোকে এই সম্মেলনে নীরব দেখা গেছে। সম্মেলনে সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন ও মরক্কোকে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে তেমন কোনো গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য দিতে দেখা যায়নি।

এমবিএসও নীরব

salman

সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানও (এমবিএস) এই সম্মেলনে ছিলেন। তবে তিনি কোনো বক্তব্য দেননি, যা অনেককে বিস্মিত করেছে।

বিশ্লেষকরা বক্তাদের তালিকায় এমবিএসের অনুপস্থিতিকে সৌদি আরবের সতর্কতার হিসেবে দেখেছেন, যা সম্ভবত ভূরাজনৈতিক হিসাব-নিকাশ দ্বারা প্রভাবিত।

শেষ পর্যন্ত দোহা সম্মেলন আরব বিশ্বের এক পরিচিত ধারাই ফুটিয়ে তুলেছে। আরব নেতারা বড় বড় কথা বললেও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে তারা কোনো কার্যকর সিদ্ধান্তের কথা জানাতে পারেনি।

অনেক পর্যবেক্ষক এখন প্রশ্ন তুলছেন, গাজায় ইসরায়েলের চালানো এই তাণ্ডব নিয়ে আরব বিশ্বের ঐক্য কি শুধু লোক দেখানো?

বিশ্লেষকদের মতে, আরবের এই নিষ্ক্রিয়তার পেছনে একাধিক কারণ রয়েছে।

netanyahu

প্রথমত, আরব সেনাবাহিনী সামরিক ব্যয় ও আধুনিক সরঞ্জাম থাকা সত্ত্বেও কার্যকর শক্তি হয়ে উঠতে পারেনি। উদাহরণস্বরূপ, উপসাগরীয় সহযোগিতা সংস্থা (জিসিসি)-এর ছয়টি দেশ বছরে প্রায় ১২০ বিলিয়ন ডলার সামরিক খাতে ব্যয় করলেও তাদের বাহিনী সমন্বয়হীন, প্রশিক্ষণে পিছিয়ে এবং অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক স্বার্থে সীমাবদ্ধ। পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখতে তারা চটকদার যুদ্ধবিমান ও জাহাজ কিনলেও সেগুলোর ব্যবহারযোগ্যতা প্রশ্নবিদ্ধ।

দ্বিতীয়ত, রাজনৈতিক কাঠামো এখানে বড় প্রতিবন্ধক। কর্তৃত্ববাদী শাসকরা সেনাদের স্বাধীনভাবে অভিযান চালাতে দেন না; বরং বাহিনীকে প্রাইটোরিয়ান গার্ডে পরিণত করেন। যারা মূলত রাজপরিবার বা ক্ষমতা রক্ষায় নিয়োজিত।

তৃতীয়ত, আরব দেশগুলোর পারস্পরিক আস্থার ঘাটতি ও বিভাজন সামরিক সমন্বয় বাধাগ্রস্ত করছে। ২০১৪ ও ২০১৮ সালে যৌথ জিসিসি সামরিক কাঠামো গঠনের প্রস্তাব বাতিল হওয়া তারই প্রমাণ। যদিও এবারের সম্মেলন থেকে ন্যাটোর আদলে ‘জয়েন্ট আরব ফোর্সেস’ বা যৌথ আরব বাহিনী গঠনের তাগিদ উঠে এসেছে বলে খবর প্রকাশ করেছে মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক সংবাদ সংস্থাগুলো।

যুক্তরাজ্যের কিংস কলেজের গবেষক আন্দ্রেয়াস ক্রেইগের মতে, অনেক চটকদার সামরিক কেনাকাটা মূলত পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গে রাজনৈতিক সম্পর্ক বজায় রাখার জন্য। উদাহরণস্বরূপ, কাতার ও সৌদি এফ-১৫, রাফায়েল ও টাইফুন যুদ্ধবিমান কিনেছে। তবে বাস্তব যুদ্ধক্ষেত্রে তাদের এসব অস্ত্র-সরঞ্জামের কার্যকরিত দেখা যায় না।

সব মিলিয়ে বোঝা যায়, আরব নেতাদের জন্য নিন্দা জানানো সহজ, কিন্তু বাস্তবে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া জটিল। অর্থ, অস্ত্র ও সামরিক ব্যয় থাকা সত্ত্বেও রাজনৈতিক সংকীর্ণতা, সামাজিক বিভাজন ও বাস্তব যুদ্ধ দক্ষতার অভাবে তারা ইসরায়েলের বিরুদ্ধে কার্যকর প্রতিরোধ গড়তে ব্যর্থ হচ্ছে। ফলে আরব বিশ্বে নিন্দার ক্ষেপণাস্ত্রই সবচেয়ে ব্যবহৃত অস্ত্র হয়ে রয়ে গেছে।

তথ্যসূত্র: বিবিসি, রয়টার্স, মিডল ইস্ট রিভিউ অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যাফেয়ার্স , দ্য ইকোনমিস্ট, এনডিটিভি

সম্পর্কিত