অর্ণব সান্যাল

এ দেশে হুট করেই যেন বেড়ে গেছে গণপিটুনি এবং প্রতি মাসেই বেশ আশঙ্কাজনক হারে ঘটছে এটি। পরিসংখ্যানে একটি বিষয় স্পষ্ট যে, ২০২৩ সালের তুলনায় ২০২৪ সালে গণপিটুনির হার আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে। শুধু ২০২৩ সালের সঙ্গে তুলনা করলেই দেখা যাবে, এক বছরের ব্যবধানে গণপিটুনি সংক্রান্ত নিহতের হার ১০০ শতাংশেরও বেশি বেড়েছে। ২০২৫ সালেও তা বৃদ্ধির পথেই আছে। এতেই বর্তমান অবস্থা আন্দাজ করা যায় অনেকটা। কিন্তু এমন ধারাবাহিক গণপিটুনি আসলে কীসের ইঙ্গিত দেয়?
এক্ষেত্রে আগে জানতে ও বুঝতে হবে যে, গণপিটুনি আসলে কেমন ক্রিয়া। সাধারণত অনেক মানুষ জোটবদ্ধ হয়ে এক বা একাধিক ব্যক্তিকে একই উদ্দেশে পেটায় এই প্রক্রিয়ায়। অর্থাৎ, এই পিটুনি এক ধরনের শাস্তি প্রদান প্রক্রিয়া। প্রচলিত কোনো আইনের তোয়াক্কা না করেই, সমাজের মানুষ গোষ্ঠীবদ্ধ হয়ে এমন শাস্তি প্রদান করে থাকে। অর্থাৎ, সভ্য সমাজে যেখানে আইনের আওতায় একজনকে গ্রেপ্তার করা হয়, অভিযোগপত্র গঠন হয়, আদালতে বিচার হয় এবং এসবের সর্বশেষ ধাপ হিসেবে দোষী সাব্যস্ত হলে আনুষ্ঠানিক শাস্তি প্রদান করা হয়। এতে অভিযোগকারী ও অভিযুক্ত এক ধরনের সমান সুযোগ পায়। কিন্তু এসব প্রক্রিয়াকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে সম্পাদিত হয় গণপিটুনির মতো কর্মকাণ্ড। এটি এক ধরনের ‘মব জাস্টিস’। কিছু মানুষ গোষ্ঠী বা জোটবদ্ধ হয়ে নিজেরাই শাস্তি প্রদান করে, সেটি দোষ থাকুক বা না থাকুক। অনেক ক্ষেত্রে সন্দেহের বশেও এমন কর্মকাণ্ড ঘটে। এবং সব ক্ষেত্রেই গণপিটুনির মতো মব জাস্টিস অবৈধ এবং এটি এক ধরনের হত্যাকাণ্ড। যদিও মবের সঙ্গে জাস্টিস শব্দটি আদৌ যায় কিনা, এ নিয়েও সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের মধ্যে ব্যাপক বিতর্ক রয়েছে। অনেক বিশেষজ্ঞই মবের সঙ্গে জাস্টিস শব্দটি বসাতে রাজি নন। তারা বলেন, এর চেয়ে মব ভায়োলেন্স বলা যুক্তিযুক্ত। কারণ এটিও অপরাধ।
এবার চলুন জানা যাক, মব জাস্টিস বা ভায়োলেন্স সৃষ্টির কারণ সম্পর্কে। গবেষকেরা এক্ষেত্রে কিছু কারণ বের করেছেন। তারা বলছেন, মব জাস্টিস জন্মের অন্যতম প্রধান কারণ হচ্ছে অকার্যকর বিচার বিভাগ। এই বিভাগের ওপর যখন সাধারণ মানুষ আস্থা হারিয়ে ফেলে, কোনোভাবেই যখন প্রচলিত ফৌজদারি বিচার ব্যবস্থায় বিশ্বাস ফেরাতে পারে না, তখনই মব নিজেরাই জাস্টিস প্রতিষ্ঠার কাজ শুরু করে। এছাড়া যখন সরকার আইন প্রয়োগের মাধ্যমে সুশাসন প্রতিষ্ঠায় ব্যর্থ হয়, তখনও মব জাস্টিস বা ভায়োলেন্স দেখা যায়। এই আইন প্রয়োগহীনতার বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
গবেষকেরা বলছেন, যখন মানুষ নিরাপত্তাহীনতায় ভোগে, তখনই তারা আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার প্ররোচনা পায়। এই নিরাপত্তাহীনতা তখনই প্রবল হয়ে ওঠে যখন আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্বে থাকা আনুষ্ঠানিক বাহিনী এক অর্থে অকার্যকর হয়ে যায়। অর্থাৎ, এসব বাহিনীর নিষ্ক্রিয়তা বা নিষ্ক্রিয় করে ফেলার কারণেই নিরাপত্তাহীনতার জন্ম হয়। এক্ষেত্রে সরকারের কর্মনৈপুণ্যহীনতাকেও কাঠগড়ায় তোলা হয়। সুতরাং, একটি বিষয় স্পষ্ট যে, প্রচলিত সরকার ব্যবস্থা, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও বিচার বিভাগের ব্যর্থতাই মোটা দাগে মব জাস্টিস বা ভায়োলেন্স সৃষ্টির অন্যতম কারণ।

গণপিটুনির মতো মব ভায়োলেন্স নিয়ে যেসব আন্তর্জাতিক গবেষণা হয়েছে, সেসবে এটি স্পষ্ট যে, এ ধরনের ঘটনা কমাতে হলে কিছু গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নিতেই হবে। এগুলো কম–বেশি বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও সত্য। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি যে ঘটাতেই হবে, সেটি বোঝার জন্য বিশেষজ্ঞ হতে হয় না। তবে সেই সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও আদালতের প্রতি জনমানুষের আস্থা ফেরাতে দুর্নীতির পরিমাণ কমিয়ে আনতে হবে। একইসঙ্গে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড ঘটার পর সেগুলো সামাল দিতে হবে স্বচ্ছ উপায়ে। বিদ্যমান বিচার ব্যবস্থাকে স্বচ্ছ ও গতিশীল করতেই হবে। সেই সঙ্গে অপরাধমূলক কর্মকান্ডের ক্ষেত্রে যেসব আইনি প্রক্রিয়া কার্যকর থাকে, সেসব সম্পর্কে সাধারণ মানুষকে শিক্ষিতও করে তুলতে হবে। নাগরিক বানাতে হলে জনসাধারণকে নাগরিক হওয়ার শিক্ষাও দিতে হবে।
এসব না হলে গণপিটুনির ঘটনা গণহারে ঘটতেই থাকবে। তা থেকে আর রক্ষা পাওয়া হবে না।

এ দেশে হুট করেই যেন বেড়ে গেছে গণপিটুনি এবং প্রতি মাসেই বেশ আশঙ্কাজনক হারে ঘটছে এটি। পরিসংখ্যানে একটি বিষয় স্পষ্ট যে, ২০২৩ সালের তুলনায় ২০২৪ সালে গণপিটুনির হার আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে। শুধু ২০২৩ সালের সঙ্গে তুলনা করলেই দেখা যাবে, এক বছরের ব্যবধানে গণপিটুনি সংক্রান্ত নিহতের হার ১০০ শতাংশেরও বেশি বেড়েছে। ২০২৫ সালেও তা বৃদ্ধির পথেই আছে। এতেই বর্তমান অবস্থা আন্দাজ করা যায় অনেকটা। কিন্তু এমন ধারাবাহিক গণপিটুনি আসলে কীসের ইঙ্গিত দেয়?
এক্ষেত্রে আগে জানতে ও বুঝতে হবে যে, গণপিটুনি আসলে কেমন ক্রিয়া। সাধারণত অনেক মানুষ জোটবদ্ধ হয়ে এক বা একাধিক ব্যক্তিকে একই উদ্দেশে পেটায় এই প্রক্রিয়ায়। অর্থাৎ, এই পিটুনি এক ধরনের শাস্তি প্রদান প্রক্রিয়া। প্রচলিত কোনো আইনের তোয়াক্কা না করেই, সমাজের মানুষ গোষ্ঠীবদ্ধ হয়ে এমন শাস্তি প্রদান করে থাকে। অর্থাৎ, সভ্য সমাজে যেখানে আইনের আওতায় একজনকে গ্রেপ্তার করা হয়, অভিযোগপত্র গঠন হয়, আদালতে বিচার হয় এবং এসবের সর্বশেষ ধাপ হিসেবে দোষী সাব্যস্ত হলে আনুষ্ঠানিক শাস্তি প্রদান করা হয়। এতে অভিযোগকারী ও অভিযুক্ত এক ধরনের সমান সুযোগ পায়। কিন্তু এসব প্রক্রিয়াকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে সম্পাদিত হয় গণপিটুনির মতো কর্মকাণ্ড। এটি এক ধরনের ‘মব জাস্টিস’। কিছু মানুষ গোষ্ঠী বা জোটবদ্ধ হয়ে নিজেরাই শাস্তি প্রদান করে, সেটি দোষ থাকুক বা না থাকুক। অনেক ক্ষেত্রে সন্দেহের বশেও এমন কর্মকাণ্ড ঘটে। এবং সব ক্ষেত্রেই গণপিটুনির মতো মব জাস্টিস অবৈধ এবং এটি এক ধরনের হত্যাকাণ্ড। যদিও মবের সঙ্গে জাস্টিস শব্দটি আদৌ যায় কিনা, এ নিয়েও সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের মধ্যে ব্যাপক বিতর্ক রয়েছে। অনেক বিশেষজ্ঞই মবের সঙ্গে জাস্টিস শব্দটি বসাতে রাজি নন। তারা বলেন, এর চেয়ে মব ভায়োলেন্স বলা যুক্তিযুক্ত। কারণ এটিও অপরাধ।
এবার চলুন জানা যাক, মব জাস্টিস বা ভায়োলেন্স সৃষ্টির কারণ সম্পর্কে। গবেষকেরা এক্ষেত্রে কিছু কারণ বের করেছেন। তারা বলছেন, মব জাস্টিস জন্মের অন্যতম প্রধান কারণ হচ্ছে অকার্যকর বিচার বিভাগ। এই বিভাগের ওপর যখন সাধারণ মানুষ আস্থা হারিয়ে ফেলে, কোনোভাবেই যখন প্রচলিত ফৌজদারি বিচার ব্যবস্থায় বিশ্বাস ফেরাতে পারে না, তখনই মব নিজেরাই জাস্টিস প্রতিষ্ঠার কাজ শুরু করে। এছাড়া যখন সরকার আইন প্রয়োগের মাধ্যমে সুশাসন প্রতিষ্ঠায় ব্যর্থ হয়, তখনও মব জাস্টিস বা ভায়োলেন্স দেখা যায়। এই আইন প্রয়োগহীনতার বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
গবেষকেরা বলছেন, যখন মানুষ নিরাপত্তাহীনতায় ভোগে, তখনই তারা আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার প্ররোচনা পায়। এই নিরাপত্তাহীনতা তখনই প্রবল হয়ে ওঠে যখন আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্বে থাকা আনুষ্ঠানিক বাহিনী এক অর্থে অকার্যকর হয়ে যায়। অর্থাৎ, এসব বাহিনীর নিষ্ক্রিয়তা বা নিষ্ক্রিয় করে ফেলার কারণেই নিরাপত্তাহীনতার জন্ম হয়। এক্ষেত্রে সরকারের কর্মনৈপুণ্যহীনতাকেও কাঠগড়ায় তোলা হয়। সুতরাং, একটি বিষয় স্পষ্ট যে, প্রচলিত সরকার ব্যবস্থা, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও বিচার বিভাগের ব্যর্থতাই মোটা দাগে মব জাস্টিস বা ভায়োলেন্স সৃষ্টির অন্যতম কারণ।

গণপিটুনির মতো মব ভায়োলেন্স নিয়ে যেসব আন্তর্জাতিক গবেষণা হয়েছে, সেসবে এটি স্পষ্ট যে, এ ধরনের ঘটনা কমাতে হলে কিছু গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নিতেই হবে। এগুলো কম–বেশি বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও সত্য। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি যে ঘটাতেই হবে, সেটি বোঝার জন্য বিশেষজ্ঞ হতে হয় না। তবে সেই সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও আদালতের প্রতি জনমানুষের আস্থা ফেরাতে দুর্নীতির পরিমাণ কমিয়ে আনতে হবে। একইসঙ্গে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড ঘটার পর সেগুলো সামাল দিতে হবে স্বচ্ছ উপায়ে। বিদ্যমান বিচার ব্যবস্থাকে স্বচ্ছ ও গতিশীল করতেই হবে। সেই সঙ্গে অপরাধমূলক কর্মকান্ডের ক্ষেত্রে যেসব আইনি প্রক্রিয়া কার্যকর থাকে, সেসব সম্পর্কে সাধারণ মানুষকে শিক্ষিতও করে তুলতে হবে। নাগরিক বানাতে হলে জনসাধারণকে নাগরিক হওয়ার শিক্ষাও দিতে হবে।
এসব না হলে গণপিটুনির ঘটনা গণহারে ঘটতেই থাকবে। তা থেকে আর রক্ষা পাওয়া হবে না।