ভারত-বাংলাদেশের সম্পর্কের বরফ কি গলছে

চরচা ডেস্ক
চরচা ডেস্ক
ভারত-বাংলাদেশের সম্পর্কের বরফ কি গলছে
গত এপ্রিল মাসে থাইল্যান্ডের ব্যাংককে কথা বলছেন খলিলুর রহমান ও অজিত দোভাল। ছবি: এক্স থেকে নেওয়া

ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা (এনএসএ) অজিত দোভাল ১৯ নভেম্বর বাংলাদেশের নিরাপত্তা উপদেষ্টা খলিলুর রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন। সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মৃত্যুদণ্ডের রায় ঘোষণার পর দুই দেশের মধ্যে এটিই প্রথম উচ্চপর্যায়ের বৈঠক। শেখ হাসিনা বর্তমানে ভারতে আশ্রয়ে আছেন।

ভারতীয় সংবাদমাধ্যম দ্য প্রিন্ট জানায়, বাংলাদেশের নিরাপত্তা উপদেষ্টা নির্ধারিত সময়ের একদিন আগে ১৮ নভেম্বর সন্ধ্যায় দিল্লিতে পৌঁছান। কলম্বো সিকিউরিটি কনক্লেভের (সিএসসি) বৈঠকে অংশ নিতে তার বুধবার ভারত পৌঁছানোর কথা ছিল। বৈঠকটি ২০ নভেম্বর নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত হবে।

আগের পরিকল্পনায় দুই নিরাপত্তা উপদেষ্টার মধ্যে দ্বিপাক্ষিক বৈঠকের কথা উল্লেখ না থাকলেও ১৯ নভেম্বর শেষ মুহূর্তে দুই পক্ষের মধ্যে আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়।

পরিকল্পনা অনুযায়ী, খলিলুর রহমান বুধবার ভারতের নিরাপত্তা উপদেষ্টার নৈশভোজে অংশ নেন। ২০ নভেম্বর সিএসসি বৈঠকে অংশ নিয়ে তিনি ঢাকায় ফিরবেন।

ভারতে বাংলাদেশ হাইকমিশন এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানায়, জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা খলিলুর রহমানের নেতৃত্বে বাংলাদেশ প্রতিনিধিদল সিএসসির সপ্তম নিরাপত্তা উপদেষ্টা পর্যায়ের বৈঠকে অংশ নেয়। তারা ১৯ নভেম্বর নয়াদিল্লিতে ভারতের এনএসএ অজিত দোভাল এবং তার দলের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। এ সময় সিএসসি-এর চলমান কার্যক্রমসহ দ্বিপাক্ষিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা হয়।

বৈঠকে খলিলুর রহমান ভারতের নিরাপত্তা উপদেষ্টাকে বাংলাদেশ সফরের আমন্ত্রণ জানান।

বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ছবি: এআই দিয়ে তৈরি
বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ছবি: এআই দিয়ে তৈরি

২০২৪ সালের আগস্টে শেখ হাসিনার পতনের পর এটি ভারতের সফররত বাংলাদেশের দ্বিতীয় উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার সফর। রায় ঘোষণার মাত্র ৪৮ ঘণ্টা পর এই বৈঠক অনুষ্ঠিত হলো।

বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি) হাসিনাকে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে মৃত্যুদণ্ড দেন। ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে ছাত্র আন্দোলন দমনে তার সরকারের ভূমিকা নিয়ে দায়ের মামলায় তাকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়। সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালকেও একই দণ্ড দেওয়া হয়েছে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা ঢাকা থেকে পালিয়ে দিল্লিতে আসেন এবং তখন থেকেই সেখানে অবস্থান করছেন।

গত সোমবার ঢাকার সরকার ভারতের কাছে তার প্রত্যর্পণ দাবি জানায়। যদিও দুই দেশের মধ্যে প্রত্যর্পণ চুক্তি রয়েছে, তবুও বিচারের প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

শেখ হাসিনার পতনের পর গত এক বছরে ভারত-বাংলাদেশের রাজনৈতিক সম্পর্ক টানাপোড়েনের মধ্য দিয়ে গেলেও বিভিন্ন স্তরে আলোচনার ধারাবাহিকতা বজায় রয়েছে। গত ডিসেম্বর ভারতীয় পররাষ্ট্র সচিব বিক্রম মিশ্রি পররাষ্ট্র পরামর্শ বৈঠকের জন্য ঢাকা সফর করেন। এবার নিরাপত্তা উপদেষ্টা খলিলের দিল্লি সফর দুই দেশের প্রশাসনের মধ্যে যোগাযোগ বজায় থাকার আরও একটি ইঙ্গিত।

তবে সর্বোচ্চ পর্যায়ে সম্পর্ক এখনও সীমিত। অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসকে ভারত এখনো আনুষ্ঠানিক সফরের আমন্ত্রণ জানায়নি। এ বছরের শুরুতে থাইল্যান্ডে বিমসটেক সম্মেলনের ফাঁকে মোদি ও ইউনুসের প্রথম আনুষ্ঠানিক সাক্ষাৎ হয়।

সম্প্রতি হাসিনার বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মিডিয়াকে দেওয়া সাক্ষাৎকারকে কেন্দ্র করে দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা বেড়েছে। গত সপ্তাহে এ নিয়ে ভারতের উপ-হাইকমিশনার পাওয়ান বাধেকে ডেকে প্রতিবাদ জানায় ঢাকা।

এ বছরের শুরুতে বাংলাদেশের জ্বালানি উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান ‘ইন্ডিয়া এনার্জি উইক’-এ অংশ নিতে ভারতে যান।

বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান মুহাম্মদ ইউনূস। ছবি: বাসস
বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান মুহাম্মদ ইউনূস। ছবি: বাসস

ভারতে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া সিএসসির নিরাপত্তা উপদেষ্টা পর্যায়ের সপ্তম বৈঠকে মালদ্বীপ, মরিশাস, শ্রীলঙ্কা এবং বাংলাদেশ অংশ নেবে। সেশেলস থাকবে পর্যবেক্ষক হিসেবে, আর মালয়েশিয়াকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে অতিথি হিসেবে।

ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, সিএসসি গঠিত হয়েছে সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে নিরাপত্তা বিষয়ে ঘনিষ্ঠ সহযোগিতা বাড়ানো এবং ভারত মহাসাগর অঞ্চলে আঞ্চলিক নিরাপত্তা জোরদার করার জন্য।

বিবৃতিতে আরও বলা হয়েছে, এই বৈঠকে সামুদ্রিক নিরাপত্তা, সন্ত্রাসবাদ ও উগ্রবাদ দমন, আন্তর্জাতিক সংগঠিত অপরাধ মোকাবিলা, সাইবার নিরাপত্তা, গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো রক্ষা, মানবিক সহায়তা ও দুর্যোগ ত্রাণ এসব ক্ষেত্রে অগ্রগতির মূল্যায়ন এবং ২০২৬ সালের রোডম্যাপ ও কর্মপরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা হবে।

সিএসসি-এর সর্বশেষ নিরাপত্তা উপদেষ্টা পর্যায়ের বৈঠক ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে মরিশাসে অনুষ্ঠিত হয়। ২০২৪ সালের আগস্টে সদস্য রাষ্ট্রগুলো কলম্বোতে সংস্থাটির প্রতিষ্ঠা দলিলেও স্বাক্ষর করে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, ভারত–বাংলাদেশ সম্পর্ক বর্তমানে সংবেদনশীল এক পর্যায়ে দাঁড়িয়ে আছে। শেখ হাসিনার মৃত্যুদণ্ডের রায় এবং তার ভারতে আশ্রয় নেওয়া এই দুটো বিষয়ই সম্পর্ককে জটিল করেছে। তবুও নিরাপত্তা উপদেষ্টা পর্যায়ে বৈঠক হওয়া ইঙ্গিত দেয় যে দিল্লি ও ঢাকা উভয় পক্ষই যোগাযোগের দরজা খোলা রাখতে চায়। এটি শুধু দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের জন্য নয়, ভারত মহাসাগর অঞ্চলের নিরাপত্তা স্থিতিশীলতার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ।

সম্পর্কিত