পাকিস্তানের রাজধানী ইসলালামাবাদে এখন প্রায়ই একটি পরিচিত দৃশ্য চোখে পড়ে—সড়কের পাশে সারি সারি কনটেইনার রাখা অথবা গুরুত্বপূর্ণ সড়কপথের ওপর বসিয়ে দেওয়া হয়। এর উদ্দেশ্য হলো বিক্ষোভের আশঙ্কা দেখা দিলেই বিক্ষোভকারীদের চলাচল সীমিত করা এবং তাদের স্পর্শকাতর এলাকাগুলোতে পৌঁছাতে বাধা দেওয়া।
ইসলামাবাদের বাসিন্দাদের কাছে এসব ইস্পাতের প্রতিবন্ধক এখন কী ঘটতে যাচ্ছে তার স্পষ্ট সতর্কসংকেত। এর অর্থ হলো—সড়ক বন্ধ, তীব্র যানজট এবং ইসলামাবাদ ও পাশের রাওয়ালপিন্ডিতে দীর্ঘ বিকল্প পথে চলাচল।
বার্তা সংস্থা এপির বরাতে বার্তা সংস্থা ইউএনবি এক প্রতিবেদনে এই তথ্য জানিয়েছে।
কারাগারে থাকা সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের মুক্তির দাবিতে তার সমর্থকদের আয়োজিত পদযাত্রার আগে সর্বশেষ দফায় কনটেইনার মোতায়েন করা হয়েছে। ক্রেন দিয়ে ট্রাক থেকে লাল, নীল ও সবুজ রঙের কনটেইনার তুলে সড়কের বিভিন্ন স্থানে বসানো হচ্ছে।
২৭ সেপ্টেম্বর এই পদযাত্রা হওয়ার কথা ছিল। পরে তা পিছিয়ে ৪ অক্টোবর করা হয়। তবে অনেক কনটেইনার এখনো সরানো হয়নি। গত সপ্তাহ থেকে পুলিশ রেড জোনের দিকে যাওয়া গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলোতে কনটেইনার বসিয়েছে। এই এলাকায় রয়েছে পার্লামেন্ট, সরকারি দপ্তর এবং বিভিন্ন দেশের দূতাবাস।
সাবেক ক্রিকেট তারকা থেকে রাজনীতিক হয়ে ওঠা ইমরান খান প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের প্রধান রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী। ২০২৩ সাল থেকে তিনি কারাগারে রয়েছেন। দুর্নীতি ও অন্য অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত হওয়ার পর তিনি একাধিক কারাদণ্ড ভোগ করছেন। ইমরান খান ও তার দল পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফ (পিটিআই) বলছে, এসব মামলা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।
২০২২ সালের এপ্রিলে পার্লামেন্টে অনাস্থা ভোটে ক্ষমতাচ্যুত হন খান। ২০২৪ সালের ৮ ফেব্রুয়ারির পার্লামেন্ট নির্বাচনের পর আইনপ্রণেতারা শাহবাজ শরিফকে প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত করলে তিনি আবারও প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নেন। ইমরান খান তার দলের দাবি অনুযায়ী ওই নির্বাচনে জনরায় চুরি করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেন। সরকার অবশ্য এই অভিযোগ অস্বীকার করে।
শহরজুড়ে কনটেইনারের সারি সহজেই চোখে পড়ে
ইসলামাবাদের সবুজ পাহাড় আর গাছঘেরা সড়কের বিপরীতে এখন উজ্জ্বল রঙের কনটেইনারের সারি সহজেই চোখে পড়ে। কিছু কনটেইনার ব্যস্ত সড়কের পাশে রাখা হয়েছে, প্রয়োজন হলে সরিয়ে নেওয়ার জন্য। অন্যগুলো দুই স্তরে সাজানো হয়েছে কিংবা যান চলাচলের লেনের ওপর বসানো হয়েছে। এতে প্রশস্ত সড়কগুলো সরু ও নিয়ন্ত্রিত পথে পরিণত হয়েছে।
ইসলামাবাদের গৃহিণী সাহিবা বিবি বলেন, “দেখে মনে হচ্ছে এটা কনটেইনারের শহর।”
তিনি বলেন, এবার বিক্ষোভকারীরা দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে, বিশেষ করে উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় খাইবার পাখতুনখোয়া প্রদেশ থেকে ইসলামাবাদের উদ্দেশে রওনা হওয়ার আগেই যান চলাচলে বিঘ্ন শুরু হয়েছে। ওই প্রদেশে ইমরান খানের দল সরকার পরিচালনা করছে।
পিটিআইয়ের শীর্ষ নেতৃত্ব বলেছে, রাজধানীতে প্রবেশের গুরুত্বপূর্ণ পথগুলো কর্তৃপক্ষ বন্ধ করে দেওয়ায় তারা পদযাত্রা পিছিয়ে দিয়েছে। এর মধ্যে খাইবার পাখতুনখোয়া থেকে আসা বহরের জন্য গুরুত্বপূর্ণ পারাপারের পথ অ্যাটক সেতুও রয়েছে। দলটির আয়োজকেরা বলেন, খাইবার পাখতুনখোয়ার মুখ্যমন্ত্রী সোহেল আফ্রিদি ও তার সমর্থকদের যে পথ দিয়ে যাওয়ার কথা ছিল, সেখানে কনটেইনার ও ধারালো ধাতব পাত বসানো হয়েছিল।
যেসব সড়ক খোলা ছিল, সেখানেও প্রস্তুতির কারণে যান চলাচলের লেন সংকুচিত হয়ে যায় এবং দীর্ঘ যানজট তৈরি হয়। যাত্রীরা বিকল্প পথ খুঁজতে থাকেন। সম্ভাব্য বিক্ষোভের পথের পাশের দোকানিরাও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখবেন কি না, তা নিয়ে চিন্তায় পড়েন। অস্থিরতা বা সংঘর্ষ শুরু হলে দোকানপাট ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থেকেই তাদের এই উদ্বেগ।
কর্তৃপক্ষ বলছে, কনটেইনার ব্যবহারের জন্য তারা কনটেইনারবাহী ট্রাকের মালিকদের ভাড়া দেয়। তবে কয়েকজন চালক বলেন, পুলিশ মহাসড়কে তাদের থামিয়ে ট্রাক জব্দ করে এবং চাবি নিয়ে নেয়।
কনটেইনারবাহী ট্রাকের চালক রহমত গুল বলেন, পুলিশ তাকে থামিয়ে চাবি নিয়ে তার ট্রাকটি জব্দ করে। পরে তার কনটেইনারটি রাওয়ালপিন্ডির কাছে একটি সড়কে বসানো হয় বলে জানান তিনি।
কনটেইনার এলেই মানুষ বুঝতে পারে জীবনযাত্রা ব্যাহত হবে
রাওয়ালপিন্ডি থেকে ইসলামাবাদে কাজের জন্য যাতায়াতকারী সরকারি কর্মচারী আবদুল হাফিজ বলেন, “যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের চলমান উত্তেজনার কারণে জ্বালানির দাম প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। এমন সময়ে যখন সংসারের খরচ চালাতেই আমাদের হিমশিম খেতে হচ্ছে, তখন সড়ক বন্ধ থাকায় আরও দূরপথ পাড়ি দিতে হয়।”
তিনি বলেন, “সরকার যদি সড়ক বন্ধ না করে, তাহলে এসব বিক্ষোভ নিয়ে আমাদের কোনো সমস্যা নেই।”
অনেক বাসিন্দার কাছে কনটেইনার এখন আর শুধু নিরাপত্তার ব্যবস্থা নয়। কনটেইনার আসার অর্থই হলো—আরেকটি রাজনৈতিক সংঘাত সামনে আসছে এবং স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হতে পারে।
তবে সরকার বলছে, সতর্কতামূলক এসব ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।
তথ্যমন্ত্রী আতাউল্লাহ তারার গত সপ্তাহে পেশোয়ারে সাংবাদিকদের বলেন, “বিক্ষোভের সময় পিটিআইয়ের বিশৃঙ্খলা ও ভাঙচুরের রেকর্ড রয়েছে। তাদের সমর্থকদের রাজধানীতে প্রবেশ করতে দেওয়া হবে না।”
সরকারের এই বক্তব্য প্রত্যাখ্যান করে আফ্রিদি বলেন, ইমরান খানের মুক্তির দাবিতে শান্তিপূর্ণ সমাবেশ করাই পিটিআইয়ের একমাত্র উদ্দেশ্য।
২০২৪ সালের নভেম্বরেও কর্তৃপক্ষ একই ধরনের ব্যবস্থা নিয়েছিল। সে সময় সমাবেশের ওপর নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও ইমরান খানের সমর্থকেরা রাজধানীতে প্রবেশের চেষ্টা করলে ইসলামাবাদে ঢোকার সড়কগুলো বন্ধ করে দেওয়া হয়। বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস নিক্ষেপ করে।
সেই অভিজ্ঞতা থেকে বাসিন্দারা এখন আনুষ্ঠানিকভাবে সড়ক বন্ধের ঘোষণা দেওয়ার অপেক্ষায় থাকেন না।
ক্রেন দিয়ে কনটেইনার নামিয়ে সড়কে বসানো শুরু হলেই অনেকেই তাদের চলাচলের পথ বদলে ফেলেন। কেউ কেউ আবার আগেভাগেই খাবার মজুত করতে শুরু করেন।