১৯৬৬ সালে ‘ফুল অউর পাত্থর’ ছিল তার প্রথম বড় হিট, যেখানে তিনি একটি দৃশ্যে জামা ছাড়াই ক্যামেরার সামনে এসে দর্শকদের চমকে দিয়েছিলেন।
ফাহমিদা শিকদার

ভারতীয় সিনেমার ইতিহাসে এমন কিছু অভিনেতা আছেন, যাদের উত্থান শুধু শিল্পকে সমৃদ্ধ করেনি বরং পুরো চলচ্চিত্র জগতের ভাষা, রীতি ও মানসিকতাকেই বদলে দিয়েছে। ধর্মেন্দ্র তাদের মধ্যে অন্যতম। সমালোচকদের কাছে তিনি ‘হি-ম্যান’ ‘হ্যান্ডসম হিরোর রাজা’। হৃত্বিক রোশনের আগে তাকে বলিউডের ‘গ্রিক গড’ বলা হতো। কিন্তু তার প্রভাব কেবল সৌন্দর্যে সীমাবদ্ধ নয়; তিনি ভারতীয় সিনেমাকে নতুন ধারার অভিনয়, নতুন পুরুষ-ইমেজ, নতুন বর্ণনাভঙ্গি ও নতুন দর্শক-সংস্কৃতি উপহার দিয়েছিলেন।
ভারতের পাঞ্জাবের ছোট্ট একটি গ্রাম থেকে অভিনেতা হওয়ার স্বপ্নে মুম্বাই আসেন ধর্মেন্দ্র। চলচ্চিত্রে তার এই যাত্রা সহজ ছিল না। মাইলের পর মাইল হেঁটে যেতেন প্রযোজকদের অফিসে। দিনের পর দিন পেট ভরাতে কেবল ছোলা খেতেন। এই সময় তিনি গ্যারেজে থাকতেন, কারণ মুম্বাইতে তার থাকার কোন জায়গা ছিল না। বেঁচে থাকার জন্য ড্রিলিং ফার্মে কাজ করতেন যেখানে তাকে ২০০ টাকা বেতন দেওয়া হতো এবং অতিরিক্ত অর্থ উপার্জনের জন্য ওভারটাইম করতেন।

এটা বিশ্বাস করা কঠিন, ধর্মেন্দ্র ষাটের দশকে ‘আনপড়’, ‘বন্দিনী’, ‘অনুপমা’ এবং ‘আয়া সাওয়ান ঘুম কে’-এর মতো সিনেমায় সাধারণ মানুষের ভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন। ১৯৬৬ সালে ‘ফুল অউর পাত্থর’ ছিল তার প্রথম বড় হিট, যেখানে তিনি একটি দৃশ্যে জামা ছাড়াই ক্যামেরার সামনে এসে দর্শকদের চমকে দিয়েছিলেন। এজন্য তিনি সমালোচনা এবং প্রশংসা উভয়ই অর্জন করেছিলেন।
‘মাচো’ ইমেজের নতুন সংজ্ঞা
ষাটের দশকের আগের ভারতীয় নায়করা ছিলেন মূলত রোম্যান্টিক, নরম স্বভাবের এবং গানকেন্দ্রিক চরিত্রে বেশি দেখা যেত। ধর্মেন্দ্র এসে সেই ছবিটি পুরো বদলে দিলেন। তার শক্তিশালী শরীর, আত্মবিশ্বাসী দৃষ্টিভঙ্গি ও স্বতঃস্ফূর্ত অ্যাকশন তাকে ভারতের প্রথম পূর্ণাঙ্গ অ্যাকশন-হিরোদের একজন করে তোলে। ‘ফুল অউর পাত্থর’, ‘শোলে’, ‘ধরম-বীর’ কিংবা ‘ইয়াদোঁ কি বারাত’- সব জায়গাতেই তিনি দেখালেন, নায়ক শুধু নাচ-গান করবে না; সে লড়বে, রক্ষা করবে এবং অ্যাকশনের মধ্যেও আবেগের জায়গা ধরে রাখবে। তার পরেই বলিউডে অ্যাকশন নায়ক একটি আলাদা ট্রেন্ড হয়ে ওঠে, যা পরবর্তী প্রজন্মের সানি দেওল, অক্ষয় কুমার, হৃত্বিক রোশনদের পথ তৈরি করে দেয়।
মিনিমাল অভিনয়ের পথিকৃৎ
ধর্মেন্দ্র অভিনয়ে কখনো অতিরঞ্জন পছন্দ করতেন না। তার সংলাপ বলার ধরন ছিল নির্ভার, চোখের ভাষা ছিল পরিষ্কার এবং আবেগ প্রকাশ ছিল খুবই স্বাভাবিক। এই স্টাইলটি তখনকার মূলধারার ‘মেলোড্রামাটিক’ অভিনয়ের বিপরীত এক প্রবাহ তৈরি করে। তিনি দেখালেন, হিরো হওয়ার জন্য গলা চড়াতে হয় না; স্বাভাবিক অঙ্গভঙ্গির মিনিমাল অভিনয় এবং চোখের অভিব্যক্তি গল্পকে এগিয়ে নিতে পারে।
রোম্যান্সে সংযম ও মর্যাদাবোধ
‘সীতা অউর গীতা’, ‘চুপকে চুপকে’, ‘আনপড়’, ‘কাজল’- এই ছবিগুলোতে রোম্যান্টিক ধর্মেন্দ্র ছিলেন সমসাময়িক নায়কদের থেকে একদম আলাদা। তিনি কোমল, স্নিগ্ধ, সংযত। তার রোম্যান্স ছিল ‘গ্ল্যামার’- এর চেয়েও বেশি ‘জেন্টেলম্যান’-ধর্মী, যা নায়িকার প্রতি সম্মানকে গুরুত্ব দেয়। ভারতীয় দর্শক প্রথম দেখল, রোম্যান্স মানেই নয় অতিরিক্ত নাটক নয়। এটি হতে পারে শ্রদ্ধাশীল ও হাস্যরসপূর্ণ।

বহুমুখী চরিত্রের ‘ক্ল্যাসিক স্টার’
ধর্মেন্দ্র ছিলেন বৈচিত্র্যময়। মাচো ম্যান বা অ্যাকশন হিরোর বাইরে গিয়েও নিজের অভিনয় নিয়ে বেশ নিরীক্ষা করেছেন। অনেক পরিচালক মনে করতেন সংবেদনশীল চরিত্রের জন্য ধর্মেন্দ্র সেরা। ‘শোলে’র বীর, ‘চুপকে চুপকে’র অধ্যাপক, ‘আঁখে’র দেশপ্রেমী স্পাই, ‘সত্যকাম’র সত্যপ্রিয়া আচার্যর মতো আদর্শিক চরিত্রগুলোতে তিনি ছিলেন অনন্য। দর্শকের কাছে তিনি এক ঘরানার নায়ক নন বরং বহুরূপী অভিনেতা।
ভরসা জাগানো 'মধ্যবিত্ত' নায়ক
ধর্মেন্দ্রকে দর্শক ভালোবাসত কারণ তিনি সেই যুগের ভারতীয় যুবকের প্রতীক হয়ে উঠেছিলেন। সৎ, পরিশ্রমী, পরিবারের জন্য সর্বস্ব বিলিয়ে দিতে প্রস্তুত, কিন্তু নিজের মর্যাদা নিয়ে আপসহীন। এই ইমেজ ভারতীয় সামাজিক-বাস্তবতার সঙ্গে গভীরভাবে মিলে যায়।
দর্শক এমন নায়কের মাঝে নিজের জীবনের প্রতিফলন খুঁজে পায়। এজন্য ধর্মেন্দ্র ‘সবার’ হয়ে ওঠেন।
ব্যবসায়ী ও শিল্পী- দুই দিকেই সমান সফল
ধর্মেন্দ্র শুধু সফল অভিনেতাই নন; তিনি ‘বর্মা প্রোডাকশনস’ (পরে ভিজিআই) প্রতিষ্ঠা করে নতুন প্রতিভা, নতুন পরিচালক এবং নতুন ধারার ছবি প্রযোজনা করেন। তার প্রযোজনায় তৈরি ‘বেতাব’, ‘ঘায়াল’, ‘দিল্লেগি’, ‘আপনে’- সবই ভারতীয় বাণিজ্যিক ছবিতে বড় ভূমিকা রেখেছে।
পরবর্তী প্রজন্মের অনুপ্রেরণা
অমিতাভ বচ্চন বহুবার বলেছেন, ধর্মেন্দ্র তার সবচেয়ে প্রিয় সহ-অভিনেতা। নারী সহকর্মীদের কাছেও তিনি ছিলেন সমানভাবে জনপ্রিয়। আজকের বেশিরভাগ অ্যাকশন-হিরোও তাকে রোল মডেল মনে করেন। পরবর্তী ৪-৫ প্রজন্মের অভিনেতাদের কাছে ধর্মেন্দ্র ‘ভারতীয় পুরুষত্ব, শ্রদ্ধাশীল রোম্যান্স ও ন্যাচারাল অভিনয়ের মিলিত প্রতীক।’
ধর্মেন্দ্র শুধু বলিউডকে বদলাননি; তিনি দর্শকের নায়ক চিন্তাকে বদলে দিয়েছিলেন। তার মধ্যে ছিল শক্তি, সৌন্দর্য, কোমলতা, রসিকতা এবং মানবিকতা- যা একসঙ্গে ভারতীয় সিনেমাকে নিয়ে গেছে এক নতুন যুগে।

ভারতীয় সিনেমার ইতিহাসে এমন কিছু অভিনেতা আছেন, যাদের উত্থান শুধু শিল্পকে সমৃদ্ধ করেনি বরং পুরো চলচ্চিত্র জগতের ভাষা, রীতি ও মানসিকতাকেই বদলে দিয়েছে। ধর্মেন্দ্র তাদের মধ্যে অন্যতম। সমালোচকদের কাছে তিনি ‘হি-ম্যান’ ‘হ্যান্ডসম হিরোর রাজা’। হৃত্বিক রোশনের আগে তাকে বলিউডের ‘গ্রিক গড’ বলা হতো। কিন্তু তার প্রভাব কেবল সৌন্দর্যে সীমাবদ্ধ নয়; তিনি ভারতীয় সিনেমাকে নতুন ধারার অভিনয়, নতুন পুরুষ-ইমেজ, নতুন বর্ণনাভঙ্গি ও নতুন দর্শক-সংস্কৃতি উপহার দিয়েছিলেন।
ভারতের পাঞ্জাবের ছোট্ট একটি গ্রাম থেকে অভিনেতা হওয়ার স্বপ্নে মুম্বাই আসেন ধর্মেন্দ্র। চলচ্চিত্রে তার এই যাত্রা সহজ ছিল না। মাইলের পর মাইল হেঁটে যেতেন প্রযোজকদের অফিসে। দিনের পর দিন পেট ভরাতে কেবল ছোলা খেতেন। এই সময় তিনি গ্যারেজে থাকতেন, কারণ মুম্বাইতে তার থাকার কোন জায়গা ছিল না। বেঁচে থাকার জন্য ড্রিলিং ফার্মে কাজ করতেন যেখানে তাকে ২০০ টাকা বেতন দেওয়া হতো এবং অতিরিক্ত অর্থ উপার্জনের জন্য ওভারটাইম করতেন।

এটা বিশ্বাস করা কঠিন, ধর্মেন্দ্র ষাটের দশকে ‘আনপড়’, ‘বন্দিনী’, ‘অনুপমা’ এবং ‘আয়া সাওয়ান ঘুম কে’-এর মতো সিনেমায় সাধারণ মানুষের ভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন। ১৯৬৬ সালে ‘ফুল অউর পাত্থর’ ছিল তার প্রথম বড় হিট, যেখানে তিনি একটি দৃশ্যে জামা ছাড়াই ক্যামেরার সামনে এসে দর্শকদের চমকে দিয়েছিলেন। এজন্য তিনি সমালোচনা এবং প্রশংসা উভয়ই অর্জন করেছিলেন।
‘মাচো’ ইমেজের নতুন সংজ্ঞা
ষাটের দশকের আগের ভারতীয় নায়করা ছিলেন মূলত রোম্যান্টিক, নরম স্বভাবের এবং গানকেন্দ্রিক চরিত্রে বেশি দেখা যেত। ধর্মেন্দ্র এসে সেই ছবিটি পুরো বদলে দিলেন। তার শক্তিশালী শরীর, আত্মবিশ্বাসী দৃষ্টিভঙ্গি ও স্বতঃস্ফূর্ত অ্যাকশন তাকে ভারতের প্রথম পূর্ণাঙ্গ অ্যাকশন-হিরোদের একজন করে তোলে। ‘ফুল অউর পাত্থর’, ‘শোলে’, ‘ধরম-বীর’ কিংবা ‘ইয়াদোঁ কি বারাত’- সব জায়গাতেই তিনি দেখালেন, নায়ক শুধু নাচ-গান করবে না; সে লড়বে, রক্ষা করবে এবং অ্যাকশনের মধ্যেও আবেগের জায়গা ধরে রাখবে। তার পরেই বলিউডে অ্যাকশন নায়ক একটি আলাদা ট্রেন্ড হয়ে ওঠে, যা পরবর্তী প্রজন্মের সানি দেওল, অক্ষয় কুমার, হৃত্বিক রোশনদের পথ তৈরি করে দেয়।
মিনিমাল অভিনয়ের পথিকৃৎ
ধর্মেন্দ্র অভিনয়ে কখনো অতিরঞ্জন পছন্দ করতেন না। তার সংলাপ বলার ধরন ছিল নির্ভার, চোখের ভাষা ছিল পরিষ্কার এবং আবেগ প্রকাশ ছিল খুবই স্বাভাবিক। এই স্টাইলটি তখনকার মূলধারার ‘মেলোড্রামাটিক’ অভিনয়ের বিপরীত এক প্রবাহ তৈরি করে। তিনি দেখালেন, হিরো হওয়ার জন্য গলা চড়াতে হয় না; স্বাভাবিক অঙ্গভঙ্গির মিনিমাল অভিনয় এবং চোখের অভিব্যক্তি গল্পকে এগিয়ে নিতে পারে।
রোম্যান্সে সংযম ও মর্যাদাবোধ
‘সীতা অউর গীতা’, ‘চুপকে চুপকে’, ‘আনপড়’, ‘কাজল’- এই ছবিগুলোতে রোম্যান্টিক ধর্মেন্দ্র ছিলেন সমসাময়িক নায়কদের থেকে একদম আলাদা। তিনি কোমল, স্নিগ্ধ, সংযত। তার রোম্যান্স ছিল ‘গ্ল্যামার’- এর চেয়েও বেশি ‘জেন্টেলম্যান’-ধর্মী, যা নায়িকার প্রতি সম্মানকে গুরুত্ব দেয়। ভারতীয় দর্শক প্রথম দেখল, রোম্যান্স মানেই নয় অতিরিক্ত নাটক নয়। এটি হতে পারে শ্রদ্ধাশীল ও হাস্যরসপূর্ণ।

বহুমুখী চরিত্রের ‘ক্ল্যাসিক স্টার’
ধর্মেন্দ্র ছিলেন বৈচিত্র্যময়। মাচো ম্যান বা অ্যাকশন হিরোর বাইরে গিয়েও নিজের অভিনয় নিয়ে বেশ নিরীক্ষা করেছেন। অনেক পরিচালক মনে করতেন সংবেদনশীল চরিত্রের জন্য ধর্মেন্দ্র সেরা। ‘শোলে’র বীর, ‘চুপকে চুপকে’র অধ্যাপক, ‘আঁখে’র দেশপ্রেমী স্পাই, ‘সত্যকাম’র সত্যপ্রিয়া আচার্যর মতো আদর্শিক চরিত্রগুলোতে তিনি ছিলেন অনন্য। দর্শকের কাছে তিনি এক ঘরানার নায়ক নন বরং বহুরূপী অভিনেতা।
ভরসা জাগানো 'মধ্যবিত্ত' নায়ক
ধর্মেন্দ্রকে দর্শক ভালোবাসত কারণ তিনি সেই যুগের ভারতীয় যুবকের প্রতীক হয়ে উঠেছিলেন। সৎ, পরিশ্রমী, পরিবারের জন্য সর্বস্ব বিলিয়ে দিতে প্রস্তুত, কিন্তু নিজের মর্যাদা নিয়ে আপসহীন। এই ইমেজ ভারতীয় সামাজিক-বাস্তবতার সঙ্গে গভীরভাবে মিলে যায়।
দর্শক এমন নায়কের মাঝে নিজের জীবনের প্রতিফলন খুঁজে পায়। এজন্য ধর্মেন্দ্র ‘সবার’ হয়ে ওঠেন।
ব্যবসায়ী ও শিল্পী- দুই দিকেই সমান সফল
ধর্মেন্দ্র শুধু সফল অভিনেতাই নন; তিনি ‘বর্মা প্রোডাকশনস’ (পরে ভিজিআই) প্রতিষ্ঠা করে নতুন প্রতিভা, নতুন পরিচালক এবং নতুন ধারার ছবি প্রযোজনা করেন। তার প্রযোজনায় তৈরি ‘বেতাব’, ‘ঘায়াল’, ‘দিল্লেগি’, ‘আপনে’- সবই ভারতীয় বাণিজ্যিক ছবিতে বড় ভূমিকা রেখেছে।
পরবর্তী প্রজন্মের অনুপ্রেরণা
অমিতাভ বচ্চন বহুবার বলেছেন, ধর্মেন্দ্র তার সবচেয়ে প্রিয় সহ-অভিনেতা। নারী সহকর্মীদের কাছেও তিনি ছিলেন সমানভাবে জনপ্রিয়। আজকের বেশিরভাগ অ্যাকশন-হিরোও তাকে রোল মডেল মনে করেন। পরবর্তী ৪-৫ প্রজন্মের অভিনেতাদের কাছে ধর্মেন্দ্র ‘ভারতীয় পুরুষত্ব, শ্রদ্ধাশীল রোম্যান্স ও ন্যাচারাল অভিনয়ের মিলিত প্রতীক।’
ধর্মেন্দ্র শুধু বলিউডকে বদলাননি; তিনি দর্শকের নায়ক চিন্তাকে বদলে দিয়েছিলেন। তার মধ্যে ছিল শক্তি, সৌন্দর্য, কোমলতা, রসিকতা এবং মানবিকতা- যা একসঙ্গে ভারতীয় সিনেমাকে নিয়ে গেছে এক নতুন যুগে।