‘বাস ড্রাইভার’ থেকে প্রেসিডেন্ট–কে এই মাদুরো?

চরচা ডেস্ক
চরচা ডেস্ক
‘বাস ড্রাইভার’ থেকে প্রেসিডেন্ট–কে এই মাদুরো?
নিকোলাস মাদুরো। ছবি: রয়টার্স

নিকোলাস মাদুরো বর্তমানে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। ২০১৩ সালে পূর্বসূরি হুগো চাভেজের মৃত্যুর পর তিনি ক্ষমতায় আসেন। সম্প্রতি ২০২৪ সালের নির্বাচনে তিনি পুনরায় জয়ী হওয়ার দাবি করলেও যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বের অধিকাংশ দেশ তা প্রত্যাখ্যান করেছে।

ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসি বলছে, আজ শনিবার স্থানীয় সময় ভোরে একাধিক বিস্ফোরণ ঘটে ভেনেজুয়েলার রাজধানীর সামরিক ঘাঁটির কাছে। শুরুতে এর উৎস বা কারণ বোঝা না গেলেও সংবাদমাধ্যম সিবিএসের বরাত দিয়ে বিবিসি জানায়, ট্রাম্পের নির্দেশে এই হামলা হয়।

এরপর ট্রাম্প তার ট্রুথ সোশ্যালের এক পোস্টে দাবি করেন, তিনি এই হামলার নির্দেশ দিয়েছেন। এ ছাড়া ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো ও তার স্ত্রীকে আটক করা হয়েছে।

কে এই মাদুরো?

একসময় ছিলেন বাস চালক ও ট্রেড ইউনিয়ন নেতা। পরে নিকোলাস মাদুরো বামপন্থী রাজনীতির মাধ্যমে উপরে উঠে আসেন। তিনি প্রয়াত প্রেসিডেন্ট হুগো চাভেজের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ ও বিশ্বস্ত মিত্র ছিলেন।

কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা বলছে, প্রেসিডেন্ট হওয়ার আগে তিনি ভেনেজুয়েলার পররাষ্ট্রমন্ত্রী এবং পরবর্তীতে ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।

মাদুরো নিজেকে ভেনেজুয়েলার সমাজতান্ত্রিক প্রকল্পের রক্ষক হিসেবে দাবি করেন। তিনি আমেরিকার কট্টর সমালোচক এবং ওয়াশিংটনের বিরুদ্ধে বারবার অভ্যুত্থান চেষ্টা ও অর্থনৈতিক অবরোধের অভিযোগ আনেন।

পশ্চিমা বিশ্ব এবং বিরোধী দলগুলো তার বিরুদ্ধে স্বৈরতান্ত্রিক শাসন, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান ধ্বংস এবং নির্বাচনে কারচুপির অভিযোগ এনেছে। তবে মাদুরো সবসময় এসব অভিযোগ অস্বীকার করে আসছেন।

বর্তমানে ২০২৪ সালের নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে ভেনেজুয়েলায় রাজনৈতিক অস্থিরতা চলছে, যেখানে বিরোধী দলগুলো এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় স্বচ্ছতার দাবি তুলছে।

বার্তা সংস্থা রয়টার্স বলছে, ১৯৬২ সালে এক শ্রমিক পরিবারে জন্ম নেওয়া মাদুরো ক্যারিয়ার শুরু করেছিলেন একজন বাস চালক হিসেবে। তবে ট্রেড ইউনিয়ন নেতা হিসেবে তার রাজনৈতিক প্রজ্ঞা তাকে প্রয়াত নেতা হুগো চাভেজের ঘনিষ্ঠ করে তোলে। ১৯৯২ সালে চাভেজের ব্যর্থ সামরিক অভ্যুত্থানের সময় থেকেই তিনি তার একনিষ্ঠ সমর্থক ছিলেন।

চাভেজের হাত ধরেই তিনি জাতীয় পরিষদের প্রেসিডেন্ট এবং পরবর্তীতে পররাষ্ট্রমন্ত্রী হন। ২০১৩ সালে চাভেজের মৃত্যুর আগে মাদুরোকেই তার উত্তরসূরি হিসেবে মনোনীত করা হয়।

মাদুরোর শাসনামলে এক সময়ের সমৃদ্ধ দেশ ভেনেজুয়েলা ভয়াবহ অর্থনৈতিক ধসের সম্মুখীন হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। বিশ্লেষকেরা বলছেন, তার সরকারের ভুল নীতি এবং দুর্নীতির অভিযোগে দেশটিতে অতি-মুদ্রাস্ফীতি এবং খাদ্য-ওষুধের চরম সংকট দেখা দেয়। জীবনযাত্রার মান অস্বাভাবিকভাবে নিচে নেমে যাওয়ায় গত এক দশকে প্রায় ৮০ লাখের বেশি মানুষ দেশ ছেড়ে বিদেশে পাড়ি জমিয়েছেন, যা আধুনিক ইতিহাসে অন্যতম বড় শরণার্থী সংকট।

জাতিসংঘের একটি সাম্প্রতিক ফ্যাক্ট-ফাইন্ডিং মিশনের প্রতিবেদনে ভেনেজুয়েলার নিরাপত্তা বাহিনী, বিশেষ করে ‘বলিভারিয়ান ন্যাশনাল গার্ড’–এর বিরুদ্ধে চাঞ্চল্যকর অভিযোগ আনা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, গত এক দশকে রাজনৈতিক বিরোধীদের দমনে নিরাপত্তা বাহিনী মানবতাবিরোধী অপরাধ এবং গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘন করেছে। ২০১৪, ২০১৭ এবং ২০২৪ সালের বিক্ষোভে নির্বিচারে গুলি, নির্যাতন এবং বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের প্রমাণ পাওয়া গেছে।

২০২৪ সালের নির্বাচনের পর প্রতিবাদ করায় কয়েক হাজার মানুষকে জেলে পাঠানো হয়েছে বলেও অভিযোগ আছে।

মাদুরো সরকারের ওপর যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা দেশগুলো কঠোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। ২০২০ সালে ওয়াশিংটন তার বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও মাদক পাচারের অভিযোগে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠন করে। তার গ্রেপ্তারে সহায়তার জন্য পুরস্কারও ঘোষণা করা হয়েছিল।

অন্যদিকে, ভেনেজুয়েলায় গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারে সাহসিকতার স্বীকৃতি হিসেবে ২০২৫ সালে দেশটির বিরোধী দলীয় নেত্রী মারিয়া করিনা মাচাদোকে নোবেল শান্তি পুরস্কার প্রদান করা হয়েছে। মাচাদো বর্তমানে আত্মগোপনে থাকলেও আন্তর্জাতিক মহলে মাদুরোর বিরুদ্ধে প্রধান কণ্ঠস্বর হিসেবে স্বীকৃত।

মাদুরো তার নতুন মেয়াদে ‘শান্তি ও সমৃদ্ধি’র প্রতিশ্রুতি দিলেও আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক এবং বিরোধী দল এই সরকারকে ‘অবৈধ’ বলে অভিহিত করেছে। মাচাদোর নোবেল জয় এবং জাতিসংঘের কঠোর প্রতিবেদন মাদুরো প্রশাসনের ওপর বৈশ্বিক চাপ আরও বাড়াবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। তবে এরই মধ্যে তিনি আটক হয়েছেন আমেরিকার হাতে।

সম্পর্কিত