চরচা ডেস্ক

শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কার্গো ভিলেজে আগুন লাগে গত ১৮ অক্টোবর। আগুন নিয়ন্ত্রণে ফায়ার সার্ভিসের কাজ শুরু করতে সময় লেগেছিল বলে প্রত্যক্ষদর্শীদের দিক থেকে অভিযোগ আসে সে সময়ই। কিন্তু আজ শনিবার স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী বলেছেন, বিমানবন্দরে থাকা চারটি ফায়ার ইউনিট ৩০ সেকেন্ডের মধ্যেই হাজির হয়েছিল। আসলে কতটা সময় লেগেছিল?
শনিবার বিমানবন্দর পরিদর্শন শেষে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা সাংবাদিকদের বলেন, “বিমানবন্দর অথোরিটির চারটি ফায়ার সার্ভিস ইউনিট আছে। সেগুলো ৩০ সেকেন্ডের ভেতরে (ঘটনাস্থলে) চলে আসছিল। ফায়ার সার্ভিসের যে ইউনিটগুলো আছে, তার একটি দিয়াবাড়ির মেট্রোরেলের ওখানে, আরেকটি কুর্মিটোলায়। সেগুলো ২০ মিনিটের ভেতরে চলে আসছে।”
কিন্তু ঘটনার দিন সংবাদমাধ্যমকে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছিলেন, আগুন লাগার পর ফায়ার সার্ভিসের সদস্যদের ঘটনাস্থলে প্রবেশের অনুমতি মেলেনি। ফলে প্রায় আধা ঘণ্টার মতো ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি দাঁড়িয়ে ছিল বলে অভিযোগ প্রত্যক্ষদর্শীদের।
কিন্তু স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টার বক্তব্যে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। প্রশ্ন উঠছে–আসলে কত সময় লেগেছিল? যদি মাত্র ৩০ সেকেন্ডের মধ্যেই বিমানবন্দরে থাকা ৪টি ফায়ার ইউনিট ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়, তবে তারা কাজ শুরু করতে পারল না? পাশাপাশি অগ্নিকাণ্ডের অ্যালার্ম বাজা থেকে শুরু করে ঘটনাস্থলে ফায়ার ইউনিটের উপস্থিত হতে মাত্র ৩০ সেকেন্ড লাগাটা কতটা বাস্তবসম্মত, সে প্রশ্নও উঠছে।
শেষ প্রশ্নটি নিয়ে শুরু করা যাক। আমেরিকার ন্যাশনাল ফায়ার প্রোটেকশন অ্যাসোসিয়েশন (এনএফপিএ) ফায়ার সার্ভিসসহ অগ্নিনির্বাপণের ক্ষেত্রে কিছু মান নির্ধারণ করেছে। এই মানকে বিশ্বব্যাপী মান্য করা হয়। এনএফপিএ ১৭১০ নামের এই নির্ধারিত স্ট্যান্ডার্ড এ ধরনের অগ্নিকাণ্ডের ক্ষেত্রে প্রতিটি পদক্ষেপের জন্য যে ন্যুনতম সময় নির্ধারণ করে দিয়েছে, তার থেকে ৩০ সেকেন্ড অনেক কম।
এই মান অনুযায়ী ফায়ার অ্যালার্ম বাজার পর প্রথম ফায়ার ইঞ্জিন স্টেশন ত্যাগের মধ্যবর্তী সময় ধরা হয়েছে ১ মিনিট ২০ সেকেন্ড। এর পর ঘটনাস্থলে ফায়ার ইউনিট পৌঁছানোর জন্য ২৪০ সেকেন্ড বা ৪ মিনিট সময় ধরা হয়েছে। সব মিলিয়ে ৫ মিনিট ২০ সেকেন্ড সময় ধরা হয়েছে।
এনএফপিএ ১৭১০ নির্ধারিত মান অনুযায়ী এই সময়ের মধ্যে হাজির হতে পারাটাই একটি ফায়ার ইউনিটের জন্য বিরাট অর্জন। সে হিসেবে বলতে হয় শাহজালাল বিমানবন্দরে থাকা চারটি ফায়ার ইউনিট বিশ্বসেরার কাতারে পড়ে। মুশকিল হলো এ অর্জনের জন্য সংশ্লিষ্ট ফায়ার ইউনিটের সরঞ্জাম, গাড়ি থেকে শুরু করে সবকিছু হালনাগাদ ও প্রস্তুত থাকতে হবে। তাও এনএফপিএ নির্ধারিত ৫ মিনিট ২০ সেকেন্ডের যে মান, তারচেয়ে ঠিক কত কম সময়ে পুরো কাজটি করা সম্ভব সে প্রশ্ন রয়ে যায়।
আসা যাক প্রস্তুতির প্রশ্নে। কার্গো ভিলেজের আগুনের ঘটনার পর সংবাদমাধ্যমকে দেওয়া বক্তব্যে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের সাবেক মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আলী আহাম্মেদ খান বলেন, “একটি আন্তর্জাতিক মানের বিমানবন্দরে সব ধরনের আগুন নির্বাপণের কার্যকর ব্যবস্থা থাকা দরকার। কিন্তু ঢাকার বিমানবন্দরে সেটা নেই। বিমানবন্দর পরিচালনার দায়িত্বে যারা রয়েছেন, তাদের মধ্যেও চরম অব্যবস্থাপনা ও সমন্বয়হীনতা রয়েছে।”
আলী আহাম্মেদ খান ফায়ার সার্ভিসের মহাপরিচালক থাকা অবস্থায়ও ঢাকার বিমানবন্দরে অগ্নিকাণ্ড ঘটেছিল। তখন তিনি কিছু সুপারিশ করেছিলেন উল্লেখ করে সম্প্রতি সংবাদমাধ্যমকে বলেন, “সেগুলো বাস্তবায়ন হয়নি। সুপারিশগুলো বাস্তবায়ন হলে আগুনে এত ক্ষয়ক্ষতি হতো না।”
আসলে অব্যবস্থাপনা কোন পর্যায়ে? বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) সেন্ট্রাল প্রকিউরমেন্ট, ইঞ্জিনিয়ারিং ও স্টোর ইউনিটের এক চিঠির সূত্র বলছে, দেশের আটটি বিমানবন্দরে নিজস্ব অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থার জন্য ১৯টি গাড়ি রয়েছে। এগুলোকে ‘এয়ারক্র্যাফট রেসকিউ ফায়ার ফাইটিং ভেহিকেল’ বলা হয়।
১৯টি গাড়ির মধ্যে ঢাকার হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ৪টি, চট্টগ্রামের শাহ আমানতে ৩টি, সিলেটের ওসমানীতে ৪টি, কক্সবাজারে ২টি, সৈয়দপুরে ২টি, যশোরে ১টি, শাহ মখদুমে ১টি, বরিশালে ২টি গাড়ি রয়েছে।
এসব গাড়ির সবগুলোরই মেরামত প্রয়োজন। গাড়ি মেরামতের জন্য ২০২৪ সালের ১ এপ্রিল থেকে গত জুলাই পর্যন্ত বেবিচকের সংশ্লিষ্ট ইউনিট থেকে সদর দপ্তরে ১৯বার চিঠি পাঠানো হয়েছিল। সর্বশেষ চিঠিটি পাঠানো হয় গত ৩১ জুলাই। চিঠিতে বলা হয়, এসব গাড়িতে থাকা ক্ষুদ্র ত্রুটি মেরামত না করলে ভবিষ্যতে বড় ত্রুটি দেখা দিতে পারে। তখন কার্যক্রম বন্ধ রেখে মেরামত করতে যথেষ্ট সময়ের প্রয়োজন হবে। এতে আন্তর্জাতিক সিভিল এভিয়েশন অর্গানাইজেশনের নিরীক্ষা আপত্তিতে পড়তে হতে পারে।
অর্থাৎ, ফায়ার সার্ভিসের সাবেক মহাপরিচালকের বক্তব্য ও বেবিচকের নথি উভয়ই বলছে, শাহজালাল বিমানবন্দরে থাকা চারটি ফায়ার ইউনিটের যে ফায়ার ভেহিকল, তা পূর্ণাঙ্গ ত্রুটিমুক্ত ছিল না। সঙ্গে অব্যবস্থাপনার বিষয়ও ছিল। ফলে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টার দেওয়া ৩০ সেকেন্ডের মধ্যে ঘটনাস্থলে চারটি ফায়ার ইউনিটের হাজির হওয়ার তথ্য কতটা বাস্তবসম্মত, সে প্রশ্ন ঠুনকো নয়।

শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কার্গো ভিলেজে আগুন লাগে গত ১৮ অক্টোবর। আগুন নিয়ন্ত্রণে ফায়ার সার্ভিসের কাজ শুরু করতে সময় লেগেছিল বলে প্রত্যক্ষদর্শীদের দিক থেকে অভিযোগ আসে সে সময়ই। কিন্তু আজ শনিবার স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী বলেছেন, বিমানবন্দরে থাকা চারটি ফায়ার ইউনিট ৩০ সেকেন্ডের মধ্যেই হাজির হয়েছিল। আসলে কতটা সময় লেগেছিল?
শনিবার বিমানবন্দর পরিদর্শন শেষে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা সাংবাদিকদের বলেন, “বিমানবন্দর অথোরিটির চারটি ফায়ার সার্ভিস ইউনিট আছে। সেগুলো ৩০ সেকেন্ডের ভেতরে (ঘটনাস্থলে) চলে আসছিল। ফায়ার সার্ভিসের যে ইউনিটগুলো আছে, তার একটি দিয়াবাড়ির মেট্রোরেলের ওখানে, আরেকটি কুর্মিটোলায়। সেগুলো ২০ মিনিটের ভেতরে চলে আসছে।”
কিন্তু ঘটনার দিন সংবাদমাধ্যমকে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছিলেন, আগুন লাগার পর ফায়ার সার্ভিসের সদস্যদের ঘটনাস্থলে প্রবেশের অনুমতি মেলেনি। ফলে প্রায় আধা ঘণ্টার মতো ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি দাঁড়িয়ে ছিল বলে অভিযোগ প্রত্যক্ষদর্শীদের।
কিন্তু স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টার বক্তব্যে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। প্রশ্ন উঠছে–আসলে কত সময় লেগেছিল? যদি মাত্র ৩০ সেকেন্ডের মধ্যেই বিমানবন্দরে থাকা ৪টি ফায়ার ইউনিট ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়, তবে তারা কাজ শুরু করতে পারল না? পাশাপাশি অগ্নিকাণ্ডের অ্যালার্ম বাজা থেকে শুরু করে ঘটনাস্থলে ফায়ার ইউনিটের উপস্থিত হতে মাত্র ৩০ সেকেন্ড লাগাটা কতটা বাস্তবসম্মত, সে প্রশ্নও উঠছে।
শেষ প্রশ্নটি নিয়ে শুরু করা যাক। আমেরিকার ন্যাশনাল ফায়ার প্রোটেকশন অ্যাসোসিয়েশন (এনএফপিএ) ফায়ার সার্ভিসসহ অগ্নিনির্বাপণের ক্ষেত্রে কিছু মান নির্ধারণ করেছে। এই মানকে বিশ্বব্যাপী মান্য করা হয়। এনএফপিএ ১৭১০ নামের এই নির্ধারিত স্ট্যান্ডার্ড এ ধরনের অগ্নিকাণ্ডের ক্ষেত্রে প্রতিটি পদক্ষেপের জন্য যে ন্যুনতম সময় নির্ধারণ করে দিয়েছে, তার থেকে ৩০ সেকেন্ড অনেক কম।
এই মান অনুযায়ী ফায়ার অ্যালার্ম বাজার পর প্রথম ফায়ার ইঞ্জিন স্টেশন ত্যাগের মধ্যবর্তী সময় ধরা হয়েছে ১ মিনিট ২০ সেকেন্ড। এর পর ঘটনাস্থলে ফায়ার ইউনিট পৌঁছানোর জন্য ২৪০ সেকেন্ড বা ৪ মিনিট সময় ধরা হয়েছে। সব মিলিয়ে ৫ মিনিট ২০ সেকেন্ড সময় ধরা হয়েছে।
এনএফপিএ ১৭১০ নির্ধারিত মান অনুযায়ী এই সময়ের মধ্যে হাজির হতে পারাটাই একটি ফায়ার ইউনিটের জন্য বিরাট অর্জন। সে হিসেবে বলতে হয় শাহজালাল বিমানবন্দরে থাকা চারটি ফায়ার ইউনিট বিশ্বসেরার কাতারে পড়ে। মুশকিল হলো এ অর্জনের জন্য সংশ্লিষ্ট ফায়ার ইউনিটের সরঞ্জাম, গাড়ি থেকে শুরু করে সবকিছু হালনাগাদ ও প্রস্তুত থাকতে হবে। তাও এনএফপিএ নির্ধারিত ৫ মিনিট ২০ সেকেন্ডের যে মান, তারচেয়ে ঠিক কত কম সময়ে পুরো কাজটি করা সম্ভব সে প্রশ্ন রয়ে যায়।
আসা যাক প্রস্তুতির প্রশ্নে। কার্গো ভিলেজের আগুনের ঘটনার পর সংবাদমাধ্যমকে দেওয়া বক্তব্যে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের সাবেক মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আলী আহাম্মেদ খান বলেন, “একটি আন্তর্জাতিক মানের বিমানবন্দরে সব ধরনের আগুন নির্বাপণের কার্যকর ব্যবস্থা থাকা দরকার। কিন্তু ঢাকার বিমানবন্দরে সেটা নেই। বিমানবন্দর পরিচালনার দায়িত্বে যারা রয়েছেন, তাদের মধ্যেও চরম অব্যবস্থাপনা ও সমন্বয়হীনতা রয়েছে।”
আলী আহাম্মেদ খান ফায়ার সার্ভিসের মহাপরিচালক থাকা অবস্থায়ও ঢাকার বিমানবন্দরে অগ্নিকাণ্ড ঘটেছিল। তখন তিনি কিছু সুপারিশ করেছিলেন উল্লেখ করে সম্প্রতি সংবাদমাধ্যমকে বলেন, “সেগুলো বাস্তবায়ন হয়নি। সুপারিশগুলো বাস্তবায়ন হলে আগুনে এত ক্ষয়ক্ষতি হতো না।”
আসলে অব্যবস্থাপনা কোন পর্যায়ে? বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) সেন্ট্রাল প্রকিউরমেন্ট, ইঞ্জিনিয়ারিং ও স্টোর ইউনিটের এক চিঠির সূত্র বলছে, দেশের আটটি বিমানবন্দরে নিজস্ব অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থার জন্য ১৯টি গাড়ি রয়েছে। এগুলোকে ‘এয়ারক্র্যাফট রেসকিউ ফায়ার ফাইটিং ভেহিকেল’ বলা হয়।
১৯টি গাড়ির মধ্যে ঢাকার হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ৪টি, চট্টগ্রামের শাহ আমানতে ৩টি, সিলেটের ওসমানীতে ৪টি, কক্সবাজারে ২টি, সৈয়দপুরে ২টি, যশোরে ১টি, শাহ মখদুমে ১টি, বরিশালে ২টি গাড়ি রয়েছে।
এসব গাড়ির সবগুলোরই মেরামত প্রয়োজন। গাড়ি মেরামতের জন্য ২০২৪ সালের ১ এপ্রিল থেকে গত জুলাই পর্যন্ত বেবিচকের সংশ্লিষ্ট ইউনিট থেকে সদর দপ্তরে ১৯বার চিঠি পাঠানো হয়েছিল। সর্বশেষ চিঠিটি পাঠানো হয় গত ৩১ জুলাই। চিঠিতে বলা হয়, এসব গাড়িতে থাকা ক্ষুদ্র ত্রুটি মেরামত না করলে ভবিষ্যতে বড় ত্রুটি দেখা দিতে পারে। তখন কার্যক্রম বন্ধ রেখে মেরামত করতে যথেষ্ট সময়ের প্রয়োজন হবে। এতে আন্তর্জাতিক সিভিল এভিয়েশন অর্গানাইজেশনের নিরীক্ষা আপত্তিতে পড়তে হতে পারে।
অর্থাৎ, ফায়ার সার্ভিসের সাবেক মহাপরিচালকের বক্তব্য ও বেবিচকের নথি উভয়ই বলছে, শাহজালাল বিমানবন্দরে থাকা চারটি ফায়ার ইউনিটের যে ফায়ার ভেহিকল, তা পূর্ণাঙ্গ ত্রুটিমুক্ত ছিল না। সঙ্গে অব্যবস্থাপনার বিষয়ও ছিল। ফলে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টার দেওয়া ৩০ সেকেন্ডের মধ্যে ঘটনাস্থলে চারটি ফায়ার ইউনিটের হাজির হওয়ার তথ্য কতটা বাস্তবসম্মত, সে প্রশ্ন ঠুনকো নয়।