Advertisement Banner

যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল সামরিক শক্তি ভাঙনের ইঙ্গিত

চরচা ডেস্ক
চরচা ডেস্ক
যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল সামরিক শক্তি ভাঙনের ইঙ্গিত
এআই দিয়ে তৈরি প্রতীকী ছবি

মধ্যপ্রাচ্যে ইরানকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল সামরিক অভিযানের সাম্প্রতিক পরিস্থিতি শুধু একটি আঞ্চলিক যুদ্ধের চিত্রই তুলে ধরছে না; বরং এটি উন্মোচন করছে এক গভীর কাঠামোগত সংকট–যা যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক শক্তির মূল ভিত্তিকেই প্রশ্নবিদ্ধ করছে।

দ্য ক্রেডেল-এ প্রকাশিত বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এই যুদ্ধ দেখিয়ে দিয়েছে যে আধুনিক যুদ্ধ কেবল প্রযুক্তি বা অর্থের ওপর নির্ভর করে না; বরং টেকসই শিল্প উৎপাদন ক্ষমতা ছাড়া কোনো সামরিক শক্তিই দীর্ঘমেয়াদে টিকে থাকতে পারে না।

যুদ্ধের প্রথম কয়েক সপ্তাহেই যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা বিপুল পরিমাণ উচ্চমূল্যের অস্ত্র ব্যবহার করেছে। টমাহক ক্রুজ মিসাইল, এটিএসিএমএস (ATACMS), প্যাট্রিয়ট ও থাড-এর মতো প্রতিরক্ষা ও আক্রমণাত্মক অস্ত্র ব্যবহারের হার এতটাই বেশি ছিল যে, তা বিদ্যমান মজুদকে প্রায় তলানিতে নিয়ে আসে। মাত্র ১৬ দিনে ১১ হাজারেরও বেশি যুদ্ধাস্ত্র ব্যবহারের ঘটনা শুধু যুদ্ধের তীব্রতা নয়, বরং শিল্প সক্ষমতার সীমাবদ্ধতাকেও সামনে এনেছে। যুদ্ধক্ষেত্রে দ্রুত ক্ষয়ক্ষতি এখন সরাসরি শিল্প সংকটে রূপ নিচ্ছে–যেখানে ব্যবহৃত অস্ত্র পুনরায় উৎপাদন করার ক্ষমতা যুদ্ধের গতিকে নির্ধারণ করছে।

বিশেষভাবে লক্ষণীয়, আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাগুলো এই যুদ্ধে সবচেয়ে বেশি চাপের মুখে পড়েছে। মাত্র চার দিনে প্রায় এক হাজার প্যাট্রিয়ট ইন্টারসেপ্টর ব্যবহৃত হয়েছে, যা উৎপাদন করতে লাগে প্রায় দেড় বছর। থাড ও ইসরায়েলের অ্যারো সিস্টেমের ক্ষেত্রেও একই চিত্র দেখা গেছে। ফলে বোঝা যাচ্ছে, যুদ্ধের তীব্রতা এতটাই বেশি যে, প্রচলিত অস্ত্র উৎপাদন ব্যবস্থা তার সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে পারছে না। এই অবস্থায় প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার কার্যকারিতা ধরে রাখতে একাধিক ইন্টারসেপ্টর ব্যবহার করতে হচ্ছে, যা ব্যয় ও ক্ষয়–দুইই বাড়িয়ে দিচ্ছে।

অন্যদিকে, আক্রমণাত্মক অস্ত্রের ক্ষেত্রেও একই সমস্যা দেখা যাচ্ছে। প্রথম ১৬ দিনে পাঁচ শর বেশি টমাহক মিসাইল ব্যবহার করা হয়েছে যা পুনরায় তৈরি করতে ৫৩ মাস সময় লাগতে পারে। এর অর্থ হলো, একবার ব্যবহারের পর এই অস্ত্র দ্রুত আবার মজুদ করা সম্ভব নয়। ফলে দীর্ঘমেয়াদি সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্র একই মাত্রার আক্রমণাত্মক সক্ষমতা বজায় রাখতে পারবে না। JASSM-ER বা HARM-এর মতো উন্নত অস্ত্রগুলোর উৎপাদনও নির্ভর করে জটিল সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর, যা ইতিমধ্যেই বৈশ্বিক সংকটে পড়েছে।

এই যুদ্ধ আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা সামনে এনেছে– যেখানে প্রযুক্তিগত শ্রেষ্ঠত্ব থাকা সত্ত্বেও তা স্থায়িত্ব নিশ্চিত করতে পারছে না। উদাহরণস্বরূপ, একটি F-15E যুদ্ধবিমান ভূপাতিত হওয়ার ঘটনা শুধু একটি সামরিক ক্ষতি নয়; বরং এটি দেখিয়েছে যে, আধুনিক যুদ্ধক্ষেত্রে উচ্চমূল্যের একটি সম্পদের ক্ষতি কীভাবে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতে পারে। একজন পাইলটকে উদ্ধারে শতাধিক বিমান, বিশেষ বাহিনী এবং বিপুল সম্পদ ব্যবহার করতে হয়েছে, যা সামগ্রিকভাবে যুদ্ধের খরচ ও ঝুঁকি বাড়িয়ে দিয়েছে।

এই প্রেক্ষাপটে সরবরাহ শৃঙ্খল নিজেই একটি নতুন যুদ্ধক্ষেত্র হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। আধুনিক অস্ত্র উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় কাঁচামাল–যেমন গ্যালিয়াম, নিওডিমিয়াম, ডাইসপ্রোসিয়াম–এর বেশির ভাগই চীনের মতো দেশের নিয়ন্ত্রণে। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উৎপাদন ক্ষমতা শুধু তার নিজস্ব শিল্পের ওপর নির্ভরশীল নয়; বরং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ও ভৌগোলিক বাস্তবতার সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। এই নির্ভরতা যুদ্ধকালীন সময়ে একটি বড় দুর্বলতা হিসেবে দেখা দিয়েছে।

অর্থনৈতিক ব্যয়ের দিক থেকেও এই যুদ্ধ একটি অসম ভারসাম্য তৈরি করেছে। একদিকে, ইরানের তুলনামূলক সস্তা ড্রোন ও মিসাইল ব্যবহার; অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের ব্যয়বহুল প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা–এই বৈপরীত্য যুদ্ধকে এক ধরনের কস্ট ইমব্যালান্স ট্রাপ বা অনিয়ন্ত্রত খরচের ফাঁদ-এ পরিণত করেছে। অর্থাৎ, প্রতিপক্ষ কম খরচে আক্রমণ চালাতে পারছে, আর যুক্তরাষ্ট্রকে তা প্রতিহত করতে বিপুল ব্যয় করতে হচ্ছে। ফলে দীর্ঘমেয়াদে এই মডেল টেকসই নয়।

এই বিশ্লেষণে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক উঠে এসেছে–যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা শিল্পের কাঠামোগত সীমাবদ্ধতা। যুদ্ধের চাহিদা বাড়লেও উৎপাদন দ্রুত বাড়ানো সম্ভব হচ্ছে না। কারণ, প্রতিরক্ষা কোম্পানিগুলো দীর্ঘমেয়াদি নিশ্চয়তা ছাড়া উৎপাদন বাড়াতে আগ্রহী নয়। অতীতের অভিজ্ঞতা অনুযায়ী, রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি অনেক সময় বাস্তবায়িত হয় না, ফলে শিল্প খাত ঝুঁকি নিতে চায় না। এর ফলে উৎপাদন ক্ষমতা স্থির থেকে যাচ্ছে, যা যুদ্ধকালীন চাহিদার সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ।

এই পরিস্থিতির প্রভাব শুধু ইরান যুদ্ধেই সীমাবদ্ধ নয়। যুক্তরাষ্ট্রের বৈশ্বিক সামরিক উপস্থিতি–যেমন পূর্ব এশিয়া বা ইউরোপে–এই সংকটের কারণে দুর্বল হয়ে পড়তে পারে। কারণ, একটি অঞ্চলে ব্যবহৃত প্রতিটি অস্ত্র অন্য অঞ্চলে ব্যবহারের সক্ষমতা কমিয়ে দেয়। ফলে যুক্তরাষ্ট্রকে এখন একাধিক ফ্রন্টে তার কৌশল পুনর্বিবেচনা করতে হচ্ছে।

সবশেষে, এই যুদ্ধ একটি বড় মিথ ভেঙে দিয়েছে যে, পশ্চিমা সামরিক শক্তি সীমাহীন। বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, প্রযুক্তিগতভাবে উন্নত হলেও তাদের ক্ষমতা সীমিত, বিশেষ করে যখন তা দীর্ঘমেয়াদি সংঘাতের মুখোমুখি হয়। আধুনিক যুদ্ধের নতুন সমীকরণে শুধু অস্ত্রের ক্ষমতা নয়, বরং উৎপাদন ও সরবরাহের ধারাবাহিকতা বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।

দ্য ক্রডেল-এ প্রকাশিত এই বিশ্লেষণ স্পষ্টভাবে দেখায় যে, ভবিষ্যতের যুদ্ধ আর শুধু যুদ্ধক্ষেত্রে জেতা যাবে না; বরং শিল্প, অর্থনীতি এবং সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর নিয়ন্ত্রণই নির্ধারণ করবে–কে টিকে থাকবে। এই বাস্তবতায় যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল জোটের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো–তারা কি তাদের সামরিক শক্তিকে দীর্ঘমেয়াদে টিকিয়ে রাখার মতো শিল্পভিত্তি গড়ে তুলতে পারবে, নাকি এই যুদ্ধই তাদের সীমাবদ্ধতার প্রকৃত চিত্র উন্মোচন করে দেবে?

সম্পর্কিত