Advertisement Banner

পশ্চিমবঙ্গে তালিকা থেকে ৮৯ লাখ ভোটারের নাম বাদ

চরচা ডেস্ক
চরচা ডেস্ক
পশ্চিমবঙ্গে তালিকা থেকে ৮৯ লাখ ভোটারের নাম বাদ
একটি নিখুঁত ভোটার তালিকা নিশ্চয়ই প্রয়োজন, কিন্তু যদি সেই প্রক্রিয়ায় লাখ লাখ মানুষ ভোটাধিকার হারায়, তাহলে সেই শুদ্ধতার মূল্য কী? ছবি: রয়টার্স

পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনকে সামনে রেখে বিশেষ নিবিড় পুনর্বিবেচনা (এসআইআর) প্রক্রিয়ার মাধ্যমে প্রায় ৮৯ লাখ ভোটারের নাম বাদ পড়ার ঘটনা নিছক প্রশাসনিক সংশোধন নয়–এটি এক গভীর রাজনৈতিক ও গণতান্ত্রিক প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।

দ্য ওয়্যারে অপর্ণা ভট্টাচার্যের বিশ্লেষণ অনুসারে, এই বিশাল সংখ্যক নাম মুছে যাওয়া শুধুমাত্র তালিকা ‘পরিষ্কার’ করার প্রয়াস নয়, বরং এমন এক বাস্তবতা তৈরি করেছে যেখানে প্রশাসনিক প্রক্রিয়া কার্যত বহু নাগরিককে ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত করেছে।

নির্বাচন কমিশন (ইসিআই) যে যুক্তিতে এই পদক্ষেপ নিয়েছে–অর্থাৎ একটি ‘শুদ্ধ’ ভোটার তালিকা নিশ্চিত করা–তা বাস্তবে ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগকে সংকুচিত করেছে বলেই প্রতীয়মান।

এই প্রক্রিয়ার সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ দিক হলো এর পরিসর। প্রায় ৬০ লাখ ভোটারকে বিচারাধীন তালিকায় এনে, তাদের মধ্যে ২৭ লাখেরও বেশি মানুষকে অযোগ্য ঘোষণা করা হয়েছে। এর ফলে মোট ভোটার তালিকা ১১.৬১ শতাংশ সংকুচিত হয়েছে–যা সাম্প্রতিক ভারতের নির্বাচনি ইতিহাসে বিরল। কিন্তু আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এই বিশাল পরিসরের তথ্য জনসমক্ষে এসেছে তালিকা চূড়ান্ত হওয়ার পর। অর্থাৎ, যখন নাগরিকদের প্রতিক্রিয়া জানানোর বা আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার সুযোগ কার্যত শেষ হয়ে গেছে, তখনই এই ‘স্বচ্ছতা’ প্রদর্শিত হয়েছে।

জেলা-ভিত্তিক পরিসংখ্যান এই প্রক্রিয়ার কঠোরতা আরও স্পষ্ট করে। নদিয়া জেলায় বিচারাধীন ভোটারদের মধ্যে প্রায় ৭৮ শতাংশকে অযোগ্য ঘোষণা করা হয়েছে–যা এক ধরনের ‘প্রশাসনিক গিলোটিন’-এর মতো কাজ করেছে। হুগলি, উত্তর কলকাতা, পূর্ব বর্ধমান এবং উত্তর ২৪ পরগনাতেও এই হার অত্যন্ত বেশি। অর্থাৎ, একবার যদি কোনো ভোটার এই বিচারাধীন তালিকায় পড়ে, তাহলে তার ভোটাধিকার হারানোর সম্ভাবনা প্রায় নিশ্চিত হয়ে পড়েছে।

অপর্ণা লিখেছেন, এই বাছাই প্রক্রিয়ার ভৌগোলিক ও জনসংখ্যাগত দিক বিশ্লেষণ করলে আরও জটিল চিত্র সামনে আসে। মুসলিম অধ্যুষিত জেলা যেমন মুর্শিদাবাদ, মালদহ, উত্তর দিনাজপুর– এখানেই সবচেয়ে বেশি সংখ্যক ভোটার বাদ পড়েছেন। মুর্শিদাবাদেই প্রায় ৪.৫৫ লাখ ভোটারকে অযোগ্য ঘোষণা করা হয়েছে। একইভাবে মতুয়া সম্প্রদায়ের ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত উত্তর ২৪ পরগনা ও নদিয়াতেও ব্যাপক হারে নাম বাদ পড়েছে। এই পরিসংখ্যানগুলি ইঙ্গিত দেয় যে, এই প্রক্রিয়া নির্দিষ্ট কিছু সম্প্রদায়কে তুলনামূলকভাবে বেশি প্রভাবিত করেছে, যা নিছক কাকতালীয় বলে মনে হয় না।

শুধু গ্রামীণ বা সীমান্তবর্তী অঞ্চলই নয়, শহর ও শিল্পাঞ্চলেও এই প্রক্রিয়ার প্রভাব গভীর। উত্তর কলকাতায় প্রায় ২৯ শতাংশ ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়েছে, দক্ষিণ কলকাতায় এই হার ২৭ শতাংশের বেশি। শিল্পাঞ্চল যেমন পশ্চিম বর্ধমান বা হাওড়াতেও লক্ষাধিক ভোটার তালিকা থেকে মুছে গেছে। এই প্রবণতা দেখায় যে, যেসব মানুষ কাজের খোঁজে বারবার স্থান পরিবর্তন করেন, যেমন ভাড়াটে, পরিযায়ী শ্রমিক–তারাই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। অর্থাৎ, আধুনিক নগর অর্থনীতির এক গুরুত্বপূর্ণ অংশ এই প্রক্রিয়ায় কার্যত অদৃশ্য হয়ে গেছেন।

দুই দফায় অনুষ্ঠেয় নির্বাচনের ক্ষেত্রেও এই বাছাইয়ের ভারসাম্য প্রশ্নের মুখে। প্রথম দফার ১৫টি জেলায় যেখানে প্রায় ৩৯.৫৭ লাখ ভোটার বাদ পড়েছে, দ্বিতীয় দফার ৮টি জেলায় সেই সংখ্যা ৪৯.৩৮ লাখ– যা মোট বাদ পড়া ভোটারের ৫৫.৫ শতাংশ। অথচ আসনসংখ্যার বিচারে এই দুই দফার মধ্যে তেমন পার্থক্য নেই। ফলে, নির্বাচনী ফলাফলের ওপর এই অসম প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো, এই বর্জনের পেছনে শুধুমাত্র চূড়ান্ত বিচার নয়, বরং প্রাথমিক ‘আনম্যাপিং’ বা পূর্বতালিকার সঙ্গে সংযোগ না থাকার বিষয়টি বড় ভূমিকা রেখেছে। অর্থাৎ, অনেক ক্ষেত্রে ভোটারদের নাম বাদ পড়েছে কেবলমাত্র প্রশাসনিক তথ্যের অসামঞ্জস্যতার কারণে, যা পরে সংশোধনের সুযোগও পায়নি।

আইনগতভাবে নির্বাচন কমিশন বলছে, যাদের নাম বাদ পড়েছে তারা ট্রাইব্যুনালে আপিল করতে পারবেন। কিন্তু বাস্তব পরিস্থিতি ভিন্ন। সুপ্রিম কোর্ট অন্তর্বর্তীকালীন কোনো স্বস্তি দেয়নি এবং ট্রাইব্যুনালগুলিও এখনো কার্যকরভাবে কাজ শুরু করেনি। ফলে, বর্তমান নির্বাচনে এই ভোটারদের অংশগ্রহণ কার্যত অসম্ভব হয়ে পড়েছে। অর্থাৎ, আইনি অধিকার থাকলেও তার বাস্তব প্রয়োগের সুযোগ নেই–যা এক ধরনের নীরব বঞ্চনার শামিল।

এই পুরো প্রক্রিয়া এক মৌলিক প্রশ্ন তোলে: গণতন্ত্রে কি ‘শুদ্ধতা’ বেশি গুরুত্বপূর্ণ, নাকি ‘অন্তর্ভুক্তি’? একটি নিখুঁত ভোটার তালিকা নিশ্চয়ই প্রয়োজন, কিন্তু যদি সেই প্রক্রিয়ায় লাখ লাখ মানুষ ভোটাধিকার হারায়, তাহলে সেই শুদ্ধতার মূল্য কী? প্রশাসনিক দক্ষতা যদি গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণকে সংকুচিত করে, তবে তা কি সত্যিই সাফল্য?

অপর্ণা বলছেন, পশ্চিমবঙ্গের এই অভিজ্ঞতা ভবিষ্যতের জন্য এক সতর্কবার্তা। নির্বাচন শুধু একটি প্রক্রিয়া নয়, এটি নাগরিকের মৌলিক অধিকার। সেই অধিকার যদি প্রশাসনিক জটিলতা, বিলম্ব বা কঠোরতার কারণে ক্ষুণ্ণ হয়, তবে গণতন্ত্রের ভিতই দুর্বল হয়ে পড়ে। এই প্রেক্ষাপটে, এসআইআর প্রক্রিয়ার এই ‘নীরব সংকোচন’ কেবল একটি রাজ্যের সমস্যা নয়–এটি সমগ্র ভারতের গণতান্ত্রিক কাঠামোর জন্য এক গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা।

সম্পর্কিত