দ্য ডিপ্লোম্যাটের নিবন্ধ

বাংলাদেশের নির্বাচন শেষ, ভবিষ্যৎ এখনো অনিশ্চিত

চরচা ডেস্ক
চরচা ডেস্ক
বাংলাদেশের নির্বাচন শেষ, ভবিষ্যৎ এখনো অনিশ্চিত
ছবি: চরচা

২০২৪ সালের ছাত্র-নেতৃত্বাধীন গণঅভ্যুত্থানে স্বৈরাচারী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পতন এবং গণতান্ত্রিক সংস্কার নিয়ে জাতীয় বিতর্কের পর অবশেষে ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি কোটি কোটি বাংলাদেশি ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছেন। দেশি-বিদেশি পর্যবেক্ষকদের মতে, এটি ছিল এ বছর দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচন।

৩২ বছর বয়সী তানভীর মহিউদ্দিন এবার প্রথমবারের মতো ভোট দিতে পেরে উচ্ছ্বসিত। ২০১২ সালে ভোটার হলেও তিনি ২০১৪, ২০১৮ কিংবা ২০২৪ সালের কোনো নির্বাচনে ভোট দেননি। রাজনৈতিক স্থবিরতা ও হতাশার কথা স্মরণ করে তিনি মার্কিন সাময়িকী দ্য ডিপ্লোম্যাট-কে বলেন, “সাজানো নির্বাচনে ভোট দিয়ে লাভ কী?”

তবে এবার পরিস্থিতি ভিন্ন ছিল। তার মতো অনেক ভোটারই কেন্দ্রে উপস্থিত ছিলেন। শত শত মানুষ রোদে দাঁড়িয়ে লাইনে অপেক্ষা করেন। মহিউদ্দিন বলেন, “ভোটকেন্দ্র ছিল স্বচ্ছ, সুশৃঙ্খল এবং নিরাপদ।” আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সক্রিয় উপস্থিতি দেখে তিনি যোগ করেন, “অবশেষে মনে হচ্ছে আমার ভোটের দাম আছে।”

শান্তিপূর্ণ ও সুশৃঙ্খল ভোটগ্রহণ শেষে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) নিরঙ্কুশ জয় লাভ করে। ঘোষিত ২৯৭টি আসনের মধ্যে দলটি এককভাবে ২০৯টি আসনে জয়ী হয়। জোটসহ মোট ২১২টি আসন পেয়ে জাতীয় সংসদে তারা স্পষ্ট সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিশ্চিত করে। প্রায় দুই দশক পর ক্ষমতায় ফেরা বিএনপির জন্য এটি একটি ঐতিহাসিক প্রত্যাবর্তন।

প্রধান বিরোধী শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয় জামায়াতে ইসলামী ও তরুণদের নেতৃত্বাধীন জাতীয় নাগরিক কমিটি (এনসিপি) জোট, যারা মোট ৭৭টি আসন পায়। এর মধ্যে জামায়াতে ইসলামী ৬৮টি এবং এনসিপি ৬টি আসনে জয়ী হয়।

গত ১৫ জানুয়ারি জামায়াতের নেতৃত্বে ১১ দলীয় জোট গঠিত হয়। ছবি: বাসস
গত ১৫ জানুয়ারি জামায়াতের নেতৃত্বে ১১ দলীয় জোট গঠিত হয়। ছবি: বাসস

নির্বাচনের পাশাপাশি ‘জুলাই সনদ’ বাস্তবায়নের লক্ষ্যে একটি দেশব্যাপী সাংবিধানিক গণভোট অনুষ্ঠিত হয়। শাসনব্যবস্থার সংস্কার ও প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিতা জোরদারের পক্ষে বিপুলসংখ্যক ভোটার ‘হ্যাঁ’ ভোট দেন। এবারের নির্বাচনে মোট ভোটার উপস্থিতি ছিল ৫৯.৪৪ শতাংশ।

৫০টি রাজনৈতিক দল এবং ১২ কোটি ৭০ লাখের বেশি নিবন্ধিত ভোটারের অংশগ্রহণ এই নির্বাচনের গুরুত্ব আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা একে ২০২৬ সালের বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ ও তাৎপর্যপূর্ণ নির্বাচন হিসেবে আখ্যায়িত করেন। ইউরোপীয় ইউনিয়নের পর্যবেক্ষণ মিশন ভোটগ্রহণকে বিশ্বাসযোগ্য ও দক্ষভাবে পরিচালিত বলে মন্তব্য করে এবং নির্বাচন কমিশনের পেশাদারিত্বের প্রশংসা করে। তাদের মতে, এটি ছিল প্রকৃত অর্থেই প্রতিযোগিতামূলক নির্বাচন, যা ভবিষ্যতের জন্য একটি নতুন মানদণ্ড স্থাপন করেছে।

ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের ড. মির্জা এম. হাসান বলেন, ‘‘দীর্ঘ রাজনৈতিক সংকটের পর শান্তিপূর্ণভাবে একটি নির্বাচন সম্পন্ন হওয়াটাই ছিল বড় অর্জন। অনেক আশঙ্কা থাকলেও সহিংসতা বা রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতা দেখা যায়নি, যা এই নির্বাচনকে স্বস্তিদায়ক করে তুলেছে।’’

বিশ্লেষকদের মতে, দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে বিএনপি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদে অত্যন্ত সুবিধাজনক অবস্থান থেকে যাত্রা শুরু করবে। সাধারণ সংখ্যাগরিষ্ঠতার জন্য প্রয়োজনীয় ১৫১ আসনের সীমা তারা অনায়াসেই অতিক্রম করেছে। এই ফলাফল বিএনপিকে বড় কোনো জোট ছাড়াই সরকার পরিচালনার সুযোগ দিয়েছে।

তবে এই নির্বাচনের অন্যতম উল্লেখযোগ্য দিক হলো প্রধান বিরোধী দল হিসেবে জামায়াতে ইসলামীর পুনরুত্থান। ২০২৪ সালের অন্তর্বর্তী সরকার জামায়াতে ইসলামীর ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করার আগে দলটি এক দশকেরও বেশি সময় রাজনৈতিকভাবে কোণঠাসা ছিল। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরোধিতা এবং সংবিধান লঙ্ঘনের অভিযোগে ২০১৩ সালে দলটির নিবন্ধন বাতিল করা হয়, যার ফলে তারা নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে পারেনি।

ইতিহাসে সংসদে জামায়াতের প্রতিনিধিত্ব ছিল উল্লেখযোগ্য। দলটি ১৯৯১ সালে ১৮টি, ১৯৯৬ সালে ৩টি এবং ২০০১ সালে ১৭টি আসনে জয়ী হয় এবং বিএনপির সঙ্গে জোট সরকারে থেকে মন্ত্রিত্বও পায়। তবে মুক্তিযুদ্ধে দলটির বিতর্কিত ভূমিকার কারণে ধর্মনিরপেক্ষ কর্মী ও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের কাছে জামায়াত বরাবরই প্রশ্নবিদ্ধ থেকেছে। বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরোধিতা এবং ছাত্র শিবিরের মতো উগ্রপন্থী ছাত্র সংগঠনের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা তাদের এই বিতর্ক আরও ঘনীভূত করেছে।

দীর্ঘ সময় পর ২০২৬ সালে জামায়াতের এই প্রত্যাবর্তন তাদের সাংগঠনিক শক্তি এবং গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী রাজনৈতিক বাস্তবতার পরিবর্তনেরই ইঙ্গিত দেয়। বিরোধী দল হিসেবে তাদের উত্থান সংসদীয় আলোচনার ধরণ ও অগ্রাধিকারে পরিবর্তন আনতে পারে। আসনসংখ্যার কারণে তারা সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় ইস্যুতে বিএনপির নীতিকে চ্যালেঞ্জ জানানোর একটি শক্ত অবস্থান অর্জন করেছে।

অন্যান্য দলগুলোও নির্দিষ্ট কিছু ইস্যুতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। জাতীয় নাগরিক কমিটি (এনসিপি) মাত্র ৬টি আসন পেলেও তরুণ সমাজ, শ্রমনীতি ও সামাজিক নীতি নির্ধারণে তাদের প্রভাব থাকতে পারে। পাশাপাশি স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য এবং ছোট ইসলামী দলগুলো গ্রামীণ উন্নয়ন, শিক্ষা ও সংখ্যালঘু অধিকারের মতো বিষয়ে ভূমিকা রাখতে সক্ষম হতে পারে।

শপথ নিচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহময়ান। ফাইল ছবি
শপথ নিচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহময়ান। ফাইল ছবি

এই নির্বাচনে আঞ্চলিক ভোটের একটি স্পষ্ট ধরণ লক্ষ্য করা গেছে। ঢাকা, চট্টগ্রাম ও সিলেটে বিএনপির দাপট সবচেয়ে বেশি থাকলেও উত্তর ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সীমান্তবর্তী জেলাগুলোতে জামায়াত উল্লেখযোগ্য সাফল্য পেয়েছে। এর ফলে সংসদীয় অধিবেশনে আঞ্চলিক ইস্যুগুলো আরও গুরুত্ব পেতে পারে।

পরবর্তী সংসদের স্পিকারসহ অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ পদে বিএনপির অভিজ্ঞ সংসদ সদস্যদের দেখা যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, বিএনপির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হবে দলের ভেতরের শৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং কট্টরপন্থী ও তুলনামূলক উদার অংশের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করে বিরোধী দল থেকে শাসক দলে রূপান্তর সম্পন্ন করা।

এবার বিএনপির সামনে রাজনৈতিক বাস্তবতা আগের তুলনায় ভিন্ন। অতীতে আওয়ামী লীগের তুলনামূলক প্রগতিশীল অবস্থানের বিপরীতে বিএনপি নিজেদের মধ্যপন্থী রক্ষণশীল হিসেবে উপস্থাপন করতে পারত। কিন্তু এবার প্রধান বিরোধী শক্তি হিসেবে জামায়াত-নেতৃত্বাধীন ইসলামপন্থী জোট থাকায় এই সমীকরণ জটিল হয়ে উঠেছে।

১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে জামায়াতের বিতর্কিত ভূমিকা এবং কঠোর ইসলামী শাসনের পক্ষে তাদের অবস্থানের কারণে সংসদীয় বিতর্ক ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক ইস্যুকেন্দ্রিক হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এর ফলে শিক্ষা, লিঙ্গ সমতা ও নাগরিক স্বাধীনতার মতো ক্ষেত্রে প্রগতিশীল সংস্কার আনা বিএনপির জন্য কঠিন হয়ে উঠতে পারে। বিএনপির বাস্তববাদী রক্ষণশীলতা ও জামায়াতের অনমনীয় ইসলামী আদর্শের দ্বন্দ্ব নীতিনির্ধারণী প্রক্রিয়াকে ধীর করে দিতে পারে।

অন্তর্বর্তী সরকারের সময় প্রগতিশীল সামাজিক সংস্কারের উদ্যোগগুলো ধর্মীয় গোষ্ঠীগুলোর তীব্র বিরোধিতার মুখে পড়ে। উদাহরণ হিসেবে নারী বিষয়ক সংস্কার কমিশনের সুপারিশ বাতিলের দাবি এবং ২০২৫ সালের নভেম্বরে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সংগীত ও শারীরিক শিক্ষার শিক্ষক নিয়োগের সিদ্ধান্ত বাতিলের ঘটনাগুলো উল্লেখযোগ্য। নতুন সংসদেও এই সাংস্কৃতিক ও নীতিগত দ্বন্দ্ব অব্যাহত থাকার সম্ভাবনা রয়েছে।

ড. মির্জা এম. হাসানের মতে, গণতন্ত্রের জন্য হয়তো ভালো হতো যদি বিএনপি কেবল সাধারণ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করত। তার ভাষায়, দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা কমিয়ে দেয় এবং বাংলাদেশের ইতিহাসে এমন জনমতের অপব্যবহারের নজির রয়েছে, যার চরম উদাহরণ ছিল শেখ হাসিনার শাসনকাল।

এই বিশ্লেষক সতর্ক করে বলেন, এমন একাধিপত্য শাসক দলকে সংবিধান সংশোধন বা আইন পরিবর্তনের মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাকে নিজেদের মতো করে সাজানোর সুযোগ দেয়। তার মতে, আগামী কয়েক বছর হবে বিএনপির গণতান্ত্রিক অঙ্গীকারের প্রকৃত অগ্নিপরীক্ষা।

হাসান আরও বলেন, বর্তমানে বিএনপিকে সেন্টার-রাইট হিসেবে দেখা হলেও পরিস্থিতির চাপে তারা আরও ডানপন্থার দিকে সরে যেতে পারে, যা নারী অধিকার ও শিক্ষা নীতির মতো ক্ষেত্রে প্রভাব ফেলতে পারে।

তার ভাষায়, আগে জামায়াত সাধারণত ৮–১২ শতাংশ ভোট পেত, কিন্তু এবার তারা প্রায় ৩০–৩১ শতাংশ ভোট অর্জন করেছে। অন্যান্য ধর্মভিত্তিক দল মিলিয়ে ইসলামপন্থী শক্তির ভোট এখন প্রায় ৩০–৩৫ শতাংশে পৌঁছেছে। ফলে বিএনপি এমন কোনো পদক্ষেপ নিতে চাইবে না, যা এই শক্তিগুলোকে ক্ষুব্ধ করতে পারে। এর ফলে বাংলাদেশ আরও ডানপন্থার দিকে ঝুঁকতে পারে এবং রাজনৈতিক ইসলামের ভিত্তি আরও শক্ত হতে পারে।

গণভোটে বাংলাদেশের জনগণ একটি বিস্তৃত সংস্কার প্যাকেজের পক্ষে রায় দিয়েছে। নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ৪ কোটি ৮০ লাখ ৭৪ হাজার ৪২৯ জন ভোটার (৬৮ শতাংশ) সংস্কারের পক্ষে ‘হ্যাঁ’ ভোট দেন, আর প্রায় ২ কোটি ২৫ লাখ ৬৫ হাজার ৬২৭ জন (৩২ শতাংশ) ‘না’ ভোট দেন। এই বিপুল সমর্থন সংস্কার এজেন্ডাকে একটি আনুষ্ঠানিক রাজনৈতিক বৈধতা দিয়েছে, যা আগে সীমিত জনপরামর্শের কারণে সমালোচিত হয়েছিল।

‘জুলাই সনদ’-এ মোট ৮৪টি সংস্কার প্রস্তাব রয়েছে, যার মধ্যে ৪৮টির জন্য সংবিধান সংশোধন প্রয়োজন। গণভোটে মূলত এসব প্রস্তাব গ্রহণ বা বর্জনের বিষয়ে ভোটারদের মতামত নেওয়া হয়। বাকি সংস্কারগুলো সাধারণ আইন, অধ্যাদেশ বা নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে বাস্তবায়িত হবে।

এই ফলাফলের তাৎক্ষণিক সাংবিধানিক প্রভাব রয়েছে। সনদের রূপরেখা অনুযায়ী, নবনির্বাচিত সংসদ পরবর্তী ১৮০ দিন একই সঙ্গে আইনসভা ও ‘গণপরিষদ’ হিসেবে কাজ করবে, যাতে সংস্কারগুলো সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করা যায়।

এই প্রক্রিয়ার মধ্যে রয়েছে উচ্চকক্ষ প্রতিষ্ঠা, সংসদীয় ব্যবস্থায় আংশিক আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব চালু এবং ভবিষ্যতে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের প্রক্রিয়া সংশোধন।

এই বিপুল জনসমর্থন দীর্ঘ স্বৈরশাসন ও রাজনৈতিক অস্থিরতার পর কাঠামোগত সাংবিধানিক পরিবর্তনের জনগণের আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করে। তবে একই সঙ্গে এটি নতুন সরকারের ওপর বড় রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক দায়িত্বও চাপিয়ে দিয়েছে। যদিও সংস্কারগুলো স্বচ্ছতা, নাগরিক স্বাধীনতা ও নির্বাহী ক্ষমতা নিয়ন্ত্রণের আইনি কাঠামো প্রদান করে, তবু এগুলো বাস্তবায়নে বিস্তারিত আইন প্রণয়ন ও রাজনৈতিক ঐকমত্য অপরিহার্য। কারণ বিএনপির মতো বড় দল আগে সনদের কিছু অংশে আপত্তি জানিয়েছিল।

প্রতীকী ছবি
প্রতীকী ছবি

এই গণভোট নতুন সংসদ ও সরকারকে আইনি পুনর্গঠনের একটি স্পষ্ট ম্যান্ডেট দিয়েছে। বিএনপির জন্য এটি একদিকে সুযোগ, অন্যদিকে বড় পরীক্ষা। সফল বাস্তবায়ন গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানের প্রতি আস্থা পুনর্গঠন করতে পারে; ব্যর্থ হলে রাজনৈতিক বিভাজন আরও গভীর হবে এবং সংস্কারকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের অভিযোগ জোরালো হবে।

ড. মির্জা এম. হাসান বলেন, ‘‘গণভোটের আইনি বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন থাকলেও রাজনৈতিক বাস্তবতা হলো জনগণ এটি সমর্থন করেছে। তার মতে, এখন সবকিছু নির্ভর করছে রাজনৈতিক শক্তির ভারসাম্যের ওপর, বিশেষ করে জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপি কতটা চাপ সৃষ্টি করতে পারে তার ওপর।’’

নির্বাচনে বড় জয় ও গণভোটে ব্যাপক সমর্থন সত্ত্বেও বিএনপি সরকারকে প্রথম মেয়াদেই একাধিক কঠিন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে। দীর্ঘ রাজনৈতিক মেরুকরণ ও অন্তর্বর্তী শাসনের পর দ্রুত কার্যকর শাসন নিশ্চিত করা জরুরি। জনগণ কর্মসংস্থান, মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, সরকারি পরিষেবার উন্নয়ন ও দুর্নীতিবিরোধী পদক্ষেপের প্রত্যাশা করছে। এতে ব্যর্থ হলে জনসমর্থন দ্রুত কমতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা

সংসদে জামায়াতে ইসলামীর শক্তিশালী উপস্থিতি আইনসভাকে উত্তপ্ত করে তুলতে পারে। বিএনপিকে অভ্যন্তরীণ উপদল সামলাতে হবে এবং সংসদীয় অচলাবস্থা এড়াতে হবে। পাশাপাশি ছোট দল ও স্বতন্ত্র সদস্যদের ইস্যুভিত্তিক জোট নীতিনির্ধারণকে আরও জটিল করতে পারে।

গণভোট থেকে আসা সংস্কার বিলগুলো পাস করাও সহজ হবে না। জনপ্রিয়তা থাকা সত্ত্বেও এগুলোর জন্য সূক্ষ্ম আইনি কাজ, দক্ষ আইন প্রণয়ন এবং নাগরিক সমাজের সঙ্গে আন্তরিক সংলাপ প্রয়োজন।

সবশেষে, ধর্মনিরপেক্ষ ও ধর্মীয় রক্ষণশীল—উভয় ধারায় বিভক্ত সমাজে অন্তর্ভুক্তিমূলক শাসনব্যবস্থা গড়ে তোলাও বড় চ্যালেঞ্জ।

সবচেয়ে বড় পরীক্ষাটি অবশ্যই অর্থনীতি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও সানেম-এর নির্বাহী পরিচালক ড. সেলিম রায়হানের মতে, নতুন সরকার একটি চরম চ্যালেঞ্জিং অর্থনৈতিক পরিস্থিতির মুখোমুখি। প্রবৃদ্ধি, কর্মসংস্থান ও বেসরকারি বিনিয়োগ ক্ষতিগ্রস্ত; মুদ্রাস্ফীতি উচ্চ এবং বিনিয়োগ দীর্ঘদিন ধরে স্থবির।

এই বিশ্লেষক মনে করেন, জুলাই–আগস্ট ২০২৪ সালের ছাত্র আন্দোলনের পেছনে কর্মসংস্থানের সংকট ও স্থবির বিনিয়োগ বড় ভূমিকা রেখেছে। তার মতে, অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় অর্থ, বাণিজ্য, পরিকল্পনা, শিল্প ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। ব্যাংকিং খাত, কেন্দ্রীয় ব্যাংক, করব্যবস্থা, বাণিজ্য নীতি ও দুর্নীতি দমন—সব ক্ষেত্রেই সংস্কার জরুরি।

ড. রায়হান সতর্ক করেন, রাজনৈতিক উত্তেজনা বাড়লে অর্থনৈতিক সংস্কারের গতি ব্যাহত হতে পারে। নির্বাচন শেষ হলেও রাজনৈতিক মতভেদ রাতারাতি পরিবর্তন হয় না।

সামগ্রিকভাবে ড. রায়হান মনে করেন, সাধারণ মানুষ জীবনযাত্রার মান উন্নয়নের জন্য খুব বেশি দিন ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করবে না। তিনি বলেন, “মানুষ গভীরভাবে লক্ষ্য করবে মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আসে কি না, আইন-শৃঙ্খলার উন্নতি হয় কি না, বিনিয়োগ বাড়ে কি না এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয় কি না। সাধারণত একটি নতুন সরকার দুই বছরের ‘হানিমুন পিরিয়ড’ পায় কিন্তু এই সরকারকে সম্ভবত ছয় মাসের মধ্যেই ফলাফল দেখানোর জন্য জনগণের চাপের মুখে পড়তে হবে।’’

ড. মির্জা এম. হাসান জানান, বিএনপির জন্য ‘সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ’ হবে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা। তিনি বলেন, “বাংলাদেশে প্রকৃত অর্থে কখনোই আইনের শাসন ছিল না। বিচার বিভাগ এবং পুলিশ কখনোই স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারেনি। বিএনপি যদি সত্যিই আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে চায়, তবে সেটিই হবে তাদের (তারেক রহমানের) সবচেয়ে বড় কাজ। কিন্তু তারা তা করতে পারবে কি না সেটি এখনও অনিশ্চিত।”

মির্জা এম. হাসান আরও বলেন, “বাক-স্বাধীনতার বিষয়েও আমি সন্দিহান। সাংবাদিকরা দুর্নীতির অনুসন্ধান করতে পারবেন কি না তার ওপরই নির্ভর করবে আসলে কতটা বাক-স্বাধীনতা আছে।”

সম্পর্কিত