ব্রেন্ডন ম্যাকি

বেলেমে কপ৩০-এর আলোচনার শেষ পর্বে যখন জীবাশ্ম জ্বালানি পর্যায়ক্রমে বন্ধের রোডম্যাপ নিয়ে আশাবাদ জন্মাচ্ছে, তখনই স্পষ্ট হয়ে উঠছে একটি অস্বস্তিকর বাস্তবতা–বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ নির্গমনকারী খাত সামরিক বাহিনী এখনো জলবায়ু নীতির অন্ধকার গহ্বরে রয়ে গেছে। কথার ফুলঝুরি অনেক; কিন্তু আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাস্তব পদক্ষেপের যে জরুরি প্রয়োজন তা যেন বারবারই উপেক্ষিত হচ্ছে।
প্যারিস চুক্তির আওতায় দেশগুলো সামরিক নির্গমনের বিষয়টি জানাতে বাধ্য নয়। এটি দীর্ঘদিনের সবচেয়ে বড় ফাঁক। অধিকাংশ দেশের সামরিক খাত সম্পর্কে তথ্য অপ্রতুল, অসংলগ্ন বা পুরোপুরি অনুপস্থিত। এর ফলে ‘মিলিটারি এমিশনস গ্যাপ’–নির্গমন লুকোচুরির এক বিশাল পরিখা, যা জলবায়ু কর্মযজ্ঞকে দুর্বল করে দিচ্ছে। বেলেমের আলোচনায় সামরিক বাহিনী কার্যত অদৃশ্য। আর এই অদৃশ্যতাই ভবিষ্যতের জন্য বিপজ্জনক বার্তা বহন করছে।
কারণটি আরও বিব্রতকর। বিশ্বের মোট নির্গমনের প্রায় ৫.৫ শতাংশ আসে সামরিক প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে। সমাজের অন্যান্য খাত যতই সবুজ পথে হাঁটুক, প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়তে থাকার নির্গমনের পরিমান আরও বাড়বে। সামরিক বাহিনীকে যদি একটি দেশ হিসেবে ধরা হয়, তবে তারা হবে পৃথিবীর পঞ্চম বৃহৎ কার্বন দূষণকারী। তারা রাশিয়াকেও পিছনে ফেলে দিয়েছে। মাত্র পাঁচটি দেশ স্বেচ্ছায় সামরিক নির্গমন রিপোর্ট করে। সেটিও শুধু জ্বালানি ব্যবহারের হিসাব। গোলাবারুদ উৎপাদন, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, যুদ্ধক্ষেত্রের ক্ষতি বা আন্তর্জাতিক জলসীমায় পরিচালিত অভিযানের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো রয়েছে পুরোপুরি হিসাবের বাইরে।
আরও উদ্বেগজনক হলো যুদ্ধ, সংঘাতের সময়ে জলবায়ুর ক্ষতি হিসাবের বাইরে থেকে যাচ্ছে। যুদ্ধ মানুষের জীবন যেমন লণ্ডভণ্ড করে, তেমনি ধ্বংস করে প্রকৃতি, মাটি, নদী-খাল, বন–সবকিছু। যুদ্ধোত্তর পুনর্নির্মাণ নিজেই বিপুল কার্বন ডাই অক্সাইড নির্গমনের উৎস। কিন্তু সংঘাতজনিত নির্গমন পরিমাপের বৈশ্বিক কোনও কাঠামোই তৈরি হয়নি। ফলে যুদ্ধ জলবায়ুকে কতটা পিছিয়ে দিচ্ছে, সে হিসাব আমরা জানতেই পারছি না।
এর মধ্যেও কিছু আশার আলো দেখা যায়। কপ৩০-কে সামনে রেখে প্রায় ১০০টি সংস্থা সামরিক নির্গমন জবাবদিহির দাবি তুলেছে। বেলেমে নাগরিক সমাজের প্রতিবাদও জোরালো। ইউরোপীয় ইউনিয়ন প্রতিরক্ষা খাতে স্বচ্ছতা বাড়ানোর চেষ্টা করেছে। যদিও দ্রুত অস্ত্রায়নের প্রবণতা সেটিকে আবার হুমকির মুখে ফেলছে। এর সঙ্গে ন্যাটোর সদস্য দেশগুলোকে জিডিপির ৫ শতাংশ সামরিক খাতে ব্যয় বাড়ানোর যে চাপ তৈরি হয়েছে, সেটি আরও উদ্বেগজনক। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এসব সিদ্ধান্তের ফলে প্রতিবছর ২০০ মিলিয়ন টন কার্বন ডাই অক্সাইড নির্গমন বাড়তে পারে এবং জলবায়ু ক্ষতির পরিমাণ ৩০০ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত হতে পারে। ইউরোপের নিজস্ব জলবায়ু প্রতিশ্রুতির সঙ্গেই তা সাংঘর্ষিক।
আন্তর্জাতিক বিচার আদালত (আইসিজে) সম্প্রতি যে স্পষ্ট ব্যাখ্যা দিয়েছে, তাতে রাষ্ট্রগুলো যুদ্ধ বা সামরিক কার্যক্রম থেকেও সৃষ্ট কার্বন ক্ষতি মূল্যায়ন ও রিপোর্ট করতে বাধ্য। এটা জলবায়ু জবাবদিহির দাবি আরও জোরালো করে। সামরিক নির্গমন উপেক্ষা করা মানে শুধু বৈশ্বিক উষ্ণায়নকে ভুল হিসাব করা নয়; বরং সংকটের প্রকৃত মাত্রাকে আড়াল করা। আর সংকটকে আড়াল করে সমাধানের পথ বের করা যায় না।
১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস সীমা রক্ষার কথা যতবার বলা হয়, ততবার প্রশ্নটি ফিরে আসছে। আর সেটা হলো–সামরিক নির্গমনকে অন্ধকারে রেখে কি সত্যিই আমরা সেই লক্ষ্য অর্জন করতে পারব? উত্তর স্পষ্ট: না, পারব না। জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর বৈশ্বিক নির্ভরতা কমানোর রোডম্যাপ অর্থবহ হবে তখনই, যখন তা সব খাতকে অন্তর্ভুক্ত করবে–বিশেষ করে এমন এক খাতকে, যার নির্গমন যুদ্ধ ও শান্তি দুই সময়েই ব্যাপক ক্ষতির উৎস।
এখন জরুরি হলো সামরিক বাহিনীর সব ধরনের নির্গমন–যুদ্ধ, প্রশিক্ষণ, গোলাবারুদ, সরঞ্জাম, এমনকি যুদ্ধোত্তর পুনর্গঠন নিয়ে UNFCCC–তে বাধ্যতামূলকভাবে রিপোর্ট করা। সেগুলোকে জাতীয় জলবায়ু পরিকল্পনার কেন্দ্রে রাখতে হবে এবং বিজ্ঞানসম্মত হারে দ্রুত কমাতে হবে।
অবশেষে, আমাদের মনে রাখতে হবে–নিরাপত্তা অর্জনের নামে পৃথিবীর নিরাপত্তা বিসর্জন দেওয়া চলে না। জলবায়ু পরিবর্তন রোধ করা আজ মানবজাতির যৌথ নিরাপত্তার প্রশ্ন, অস্তিত্বের প্রশ্ন। সামরিক নির্গমন আড়ালে রেখে সেই লড়াই সফল হবে না–কোনওভাবেই না।
(লেখাটি আলজাজিরার ওয়েব সাইটের সৌজন্যে প্রকাশিত)

বেলেমে কপ৩০-এর আলোচনার শেষ পর্বে যখন জীবাশ্ম জ্বালানি পর্যায়ক্রমে বন্ধের রোডম্যাপ নিয়ে আশাবাদ জন্মাচ্ছে, তখনই স্পষ্ট হয়ে উঠছে একটি অস্বস্তিকর বাস্তবতা–বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ নির্গমনকারী খাত সামরিক বাহিনী এখনো জলবায়ু নীতির অন্ধকার গহ্বরে রয়ে গেছে। কথার ফুলঝুরি অনেক; কিন্তু আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাস্তব পদক্ষেপের যে জরুরি প্রয়োজন তা যেন বারবারই উপেক্ষিত হচ্ছে।
প্যারিস চুক্তির আওতায় দেশগুলো সামরিক নির্গমনের বিষয়টি জানাতে বাধ্য নয়। এটি দীর্ঘদিনের সবচেয়ে বড় ফাঁক। অধিকাংশ দেশের সামরিক খাত সম্পর্কে তথ্য অপ্রতুল, অসংলগ্ন বা পুরোপুরি অনুপস্থিত। এর ফলে ‘মিলিটারি এমিশনস গ্যাপ’–নির্গমন লুকোচুরির এক বিশাল পরিখা, যা জলবায়ু কর্মযজ্ঞকে দুর্বল করে দিচ্ছে। বেলেমের আলোচনায় সামরিক বাহিনী কার্যত অদৃশ্য। আর এই অদৃশ্যতাই ভবিষ্যতের জন্য বিপজ্জনক বার্তা বহন করছে।
কারণটি আরও বিব্রতকর। বিশ্বের মোট নির্গমনের প্রায় ৫.৫ শতাংশ আসে সামরিক প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে। সমাজের অন্যান্য খাত যতই সবুজ পথে হাঁটুক, প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়তে থাকার নির্গমনের পরিমান আরও বাড়বে। সামরিক বাহিনীকে যদি একটি দেশ হিসেবে ধরা হয়, তবে তারা হবে পৃথিবীর পঞ্চম বৃহৎ কার্বন দূষণকারী। তারা রাশিয়াকেও পিছনে ফেলে দিয়েছে। মাত্র পাঁচটি দেশ স্বেচ্ছায় সামরিক নির্গমন রিপোর্ট করে। সেটিও শুধু জ্বালানি ব্যবহারের হিসাব। গোলাবারুদ উৎপাদন, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, যুদ্ধক্ষেত্রের ক্ষতি বা আন্তর্জাতিক জলসীমায় পরিচালিত অভিযানের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো রয়েছে পুরোপুরি হিসাবের বাইরে।
আরও উদ্বেগজনক হলো যুদ্ধ, সংঘাতের সময়ে জলবায়ুর ক্ষতি হিসাবের বাইরে থেকে যাচ্ছে। যুদ্ধ মানুষের জীবন যেমন লণ্ডভণ্ড করে, তেমনি ধ্বংস করে প্রকৃতি, মাটি, নদী-খাল, বন–সবকিছু। যুদ্ধোত্তর পুনর্নির্মাণ নিজেই বিপুল কার্বন ডাই অক্সাইড নির্গমনের উৎস। কিন্তু সংঘাতজনিত নির্গমন পরিমাপের বৈশ্বিক কোনও কাঠামোই তৈরি হয়নি। ফলে যুদ্ধ জলবায়ুকে কতটা পিছিয়ে দিচ্ছে, সে হিসাব আমরা জানতেই পারছি না।
এর মধ্যেও কিছু আশার আলো দেখা যায়। কপ৩০-কে সামনে রেখে প্রায় ১০০টি সংস্থা সামরিক নির্গমন জবাবদিহির দাবি তুলেছে। বেলেমে নাগরিক সমাজের প্রতিবাদও জোরালো। ইউরোপীয় ইউনিয়ন প্রতিরক্ষা খাতে স্বচ্ছতা বাড়ানোর চেষ্টা করেছে। যদিও দ্রুত অস্ত্রায়নের প্রবণতা সেটিকে আবার হুমকির মুখে ফেলছে। এর সঙ্গে ন্যাটোর সদস্য দেশগুলোকে জিডিপির ৫ শতাংশ সামরিক খাতে ব্যয় বাড়ানোর যে চাপ তৈরি হয়েছে, সেটি আরও উদ্বেগজনক। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এসব সিদ্ধান্তের ফলে প্রতিবছর ২০০ মিলিয়ন টন কার্বন ডাই অক্সাইড নির্গমন বাড়তে পারে এবং জলবায়ু ক্ষতির পরিমাণ ৩০০ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত হতে পারে। ইউরোপের নিজস্ব জলবায়ু প্রতিশ্রুতির সঙ্গেই তা সাংঘর্ষিক।
আন্তর্জাতিক বিচার আদালত (আইসিজে) সম্প্রতি যে স্পষ্ট ব্যাখ্যা দিয়েছে, তাতে রাষ্ট্রগুলো যুদ্ধ বা সামরিক কার্যক্রম থেকেও সৃষ্ট কার্বন ক্ষতি মূল্যায়ন ও রিপোর্ট করতে বাধ্য। এটা জলবায়ু জবাবদিহির দাবি আরও জোরালো করে। সামরিক নির্গমন উপেক্ষা করা মানে শুধু বৈশ্বিক উষ্ণায়নকে ভুল হিসাব করা নয়; বরং সংকটের প্রকৃত মাত্রাকে আড়াল করা। আর সংকটকে আড়াল করে সমাধানের পথ বের করা যায় না।
১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস সীমা রক্ষার কথা যতবার বলা হয়, ততবার প্রশ্নটি ফিরে আসছে। আর সেটা হলো–সামরিক নির্গমনকে অন্ধকারে রেখে কি সত্যিই আমরা সেই লক্ষ্য অর্জন করতে পারব? উত্তর স্পষ্ট: না, পারব না। জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর বৈশ্বিক নির্ভরতা কমানোর রোডম্যাপ অর্থবহ হবে তখনই, যখন তা সব খাতকে অন্তর্ভুক্ত করবে–বিশেষ করে এমন এক খাতকে, যার নির্গমন যুদ্ধ ও শান্তি দুই সময়েই ব্যাপক ক্ষতির উৎস।
এখন জরুরি হলো সামরিক বাহিনীর সব ধরনের নির্গমন–যুদ্ধ, প্রশিক্ষণ, গোলাবারুদ, সরঞ্জাম, এমনকি যুদ্ধোত্তর পুনর্গঠন নিয়ে UNFCCC–তে বাধ্যতামূলকভাবে রিপোর্ট করা। সেগুলোকে জাতীয় জলবায়ু পরিকল্পনার কেন্দ্রে রাখতে হবে এবং বিজ্ঞানসম্মত হারে দ্রুত কমাতে হবে।
অবশেষে, আমাদের মনে রাখতে হবে–নিরাপত্তা অর্জনের নামে পৃথিবীর নিরাপত্তা বিসর্জন দেওয়া চলে না। জলবায়ু পরিবর্তন রোধ করা আজ মানবজাতির যৌথ নিরাপত্তার প্রশ্ন, অস্তিত্বের প্রশ্ন। সামরিক নির্গমন আড়ালে রেখে সেই লড়াই সফল হবে না–কোনওভাবেই না।
(লেখাটি আলজাজিরার ওয়েব সাইটের সৌজন্যে প্রকাশিত)