দেশে এখন পর্যন্ত কোনো নারীর ফাঁসি কার্যকর হয়নি কেন

তবে দীর্ঘদিনের গুঞ্জন রয়েছে, বাংলাদেশে বহু আগে একজন নারীর ফাঁসি কার্যকর হয়।

সামদানী হক নাজুম, ঢাকা
সামদানী হক নাজুম, ঢাকা
দেশে এখন পর্যন্ত কোনো নারীর ফাঁসি কার্যকর হয়নি কেন
ছবি: ফ্রিপিক

সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মৃত্যুদণ্ডের রায় ঘোষণার পর আলোচনায় আসছে তার ফাঁসি কার্যকরের বিষয়টি।

বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত শতাধিক নারীর বিরুদ্ধে ফাঁসির রায় হলেও কারোর রায়ই কার্যকর হয়নি। এমনকি গাজীপুরের কাশিমপুরে থাকা একমাত্র নারী কারাগারে নেই কোনো ফাঁসির মঞ্চও।

বাংলাদেশের ইতিহাসে বিভিন্ন অপরাধে অভিযুক্ত ৯৪ জন নারীকে মৃত্যুদণ্ডাদেশ দেয় আদালত। তবে দেশের সূচনালগ্ন থেকে এখন পর্যন্ত কোনো নারী বন্দির ফাঁসি কার্যকর করা সম্ভব হয়নি।

বাংলাদেশ কারা অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, লগবুকে নারী বন্দির ফাঁসি কার্যকরের কোনো ঘটনা লিপিবদ্ধ নেই।

কারা মহাপরিদর্শক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সৈয়দ মো. মোতাহের হোসেন চরচাকে এই তথ্য নিশ্চিত করে বলেন, “আমাদের রেকর্ডে কোনো নারীর ফাঁসি কার্যকরের ঘটনা নেই। মৃত্যুদণ্ডাদেশ প্রাপ্ত নারী বন্দি যারা আছেন, তাদের অধিকাংশের মামলা আপিল বিভাগে আছে। আদালত যাদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করতে বলবেন, আমরা তাদেরটাই কার্যকর করব।”

তবে দীর্ঘদিনের গুঞ্জন রয়েছে, বাংলাদেশে বহু আগে একজন নারীর ফাঁসি কার্যকর হয়। তবে তথ্যটি খতিয়ে দেখে, এর স্বপক্ষে কোনো তথ্য-প্রমাণ পায়নি কারা কর্তৃপক্ষ।

গত ৮০-এর দশকে এক নারীর ফাঁসি কার্যকরের প্রস্তুতি নেওয়া হলে নির্ধারিত সময়ের আগেই তার স্বাভাবিক মৃত্যু হয়। সেই ঘটনাটি লোকমুখে ফাঁসির ঘটনা হিসেবেই রটে যায়। তবে অনেক আগের ঘটনা হওয়ায় এ সংক্রান্ত নথি উদ্ধার করতে পারেনি কারা কর্তৃপক্ষ।

যেসব কারণে কার্যকর হয়নি নারী বন্দিদের ফাঁসি

দেশে ৯৪ জন নারীর ফাঁসির আদেশ থাকলেও কার্যকর না হওয়ার বড় কারণ হলো আপিলের সুযোগ। বিচারিক আদালত তাদের ফাঁসির সাজা দিলেও, বেশিরভাগ মামলায় আপিল করেন দণ্ডপ্রাপ্তরা।

কারা মহাপরিদর্শক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সৈয়দ মো. মোতাহের হোসেন বলেন, “বিচারিক আদালত সর্বোচ্চ সাজা দিলেই তা কার্যকর হয়ে যাবে বিষয়টি তেমন নয়। এরপরও অনেকগুলো ধাপ পেরিয়ে ওই দণ্ডাদেশটি আমাদের কাছে আসে কার্যকরের জন্য। ক্ষেত্রবিশেষে এই জার্নিটা অনেক সময়সাপেক্ষ হয়ে থাকে। আবার এমনও হয় যে, আপিল বিভাগে গিয়ে সেই রায় পরিবর্তন হয়ে সাজা কমে যায়, ফাঁসির আদেশ হয়ে যায় যাবজ্জীবন। তাছাড়া বিচার চলাকালীন স্বাভাবিক মৃত্যু, রাষ্ট্রপতির বিশেষ ক্ষমাও নারী বন্দিদের ফাঁসি কার্যকর না হওয়ার কারণ।”

নারী কারাগারে ফাঁসির মঞ্চ নেই কেন?

২০০৭ সালে বাংলাদেশের প্রথম আলাদা নারী কারাগার উদ্বোধন করা হয় কাশিমপুরে। সেই কারাগারে কোনো ফাঁসির মঞ্চ রাখা হয়নি। তখন থেকে একটি ধারণার প্রচলন হয় যে, নারীদের ফাঁসি হয় না। এমনকি সম্প্রতি সংবাদমাধ্যমেও নারী কারাগারে ফাঁসির মঞ্চ না থাকার বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

কাশিমপুর নারী কারাগারে ফাঁসির মঞ্চ না থাকার কারণ হিসেবে ‘প্রয়োজনীয়তার অভাবকেই’ ব্যাখ্যা করেন অতিরিক্ত কারা মহাপরিদর্শক কর্নেল মোহাম্মদ মোস্তফা কামাল। তিনি চরচাকে বলেন, “নারীদের ফাঁসি দেওয়া হবে না। তাই কাশিমপুরে ফাঁসির মঞ্চ রাখা হয়নি–এটি একেবারেই ভুল ধারণা। আদালত থেকে পূর্ণাঙ্গ ডেথ রেফারেন্স পেলে আমার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করি। এখানে নারী পুরুষের কোনো আলাদা বিষয় নেই। কাশিমপুরে নারী কারাগারে ফাঁসির মঞ্চের প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়নি, তাই করা হয়নি। কিন্তু নারীদের যে ফাঁসির মঞ্চ নেই–এই তথ্যও ঠিক নয়। পুরাতন কেন্দ্রীয় কারাগারে পুরুষ এবং নারীদের জন্য মঞ্চ রয়েছে।”

অতিরিক্ত কারা মহাপরিদর্শক মোস্তাফা কামাল আরও বলেন, “একসময়ের এই কেন্দ্রীয় কারাগার এখন বিশেষ কারাগার হিসেবে ব্যবহৃত হয়। আমাদের নিয়ম রয়েছে, গুরুত্বপূর্ণ কোনো ব্যক্তির মৃত্যুদণ্ড এখান থেকেই কার্যকর করা হয়। এখন যদি কোনো নারী বন্দির ডেথ রেফারেন্স আসে, তাহলে তার ফাঁসি এই পুরাতন কারাগারের ফাঁসির মঞ্চেই কার্যকর হবে, এখানে তো কোনো সমস্যা নেই।”

সম্পর্কিত