রিতু চক্রবর্ত্তী

কাজী নজরুল ইসলাম কি শুধুই একজন মুসলিম কবি? নজরুলের ধর্মবোধটি আসলে কেমন ছিল? আর যারা তাকে নিয়ে রাজনীতির ছকটি কষে, তাদের নিয়ে তার মনোভাবই বা কী ছিল?
নজরুলকে কেন্দ্র করে ’৪৭-এর রাজনীতির নবায়ন করার চেষ্টা কি হচ্ছে?
এই তো ক’দিন আগে গেল রোজার ঈদ। নজরুলের ‘ও মন রমজানের ওই রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ’ ছাড়া যেন ঈদ পরিপূর্ণ হয় না। এ ছাড়া নজরুল লিখেছেন অসংখ্য হামদ-নাত। গজল লিখেছেন, নিজে গেয়েছেনও। তার অনুবাদ করা ‘কাব্য আমপারা’ একসময় প্রায় প্রতি ঘরেই মিলত। এ বিষয়গুলোকে সামনে এনেই নজরুলকে মুসলিম হিসেবে হাজির করা হয়। অথচ চেপে যাওয়া হয়–নজরুলের লেখা অসংখ্য শ্যামা সংগীতের কথা। কমিউনিস্ট ইন্ট্যারন্যাশনালের প্রথম বাংলা অনুবাদও তার করা।
নজরুলের ধর্মচেতনা বা ধর্মীয় জাতিগোষ্ঠীর প্রতি তার মনোভাব কী ছিল? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজলেই জানা হয়ে যায় যে, নজরুলকে ক্রমাগত ঠেলে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে মুসলিম পরিচয়ের দিকে, যা কবির জীবৎকালে ভারতীয় উপমহাদেশে বাড়তে থাকা পরিচয়বাদী রাজনীতিরই অংশ, যা ১৯৪৭-এর প্রেক্ষাপট তৈরি করেছিল। অথচ নজরুল বরাবরই এই পরিচয়বাদী রাজনীতি ও এর মধ্যকার দ্বন্দ্বের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছেন।
মানবতার জয়গান গেয়েছেন বরাবরই। সাম্য ও মানবিক মর্যাদার পক্ষে দাঁড়ানো কবি সুস্পষ্ট বলেছেন–
“গাহি সাম্যের গান–
মানুষের চেয়ে বড় কিছু নাই, নহে কিছু মহীয়ান”
এমনকি ধর্ম মানুষের জন্য, মানুষ ধর্মের জন্য নয়–এমন বার্তাও দিয়েছেন তিনি তার অনেক লেখায়–
‘তব মসজিদে-মন্দিরে প্রভু নাই মানুষের দাবি
মোল্লা-পুরুত লাগায়েছে তার সকল দুয়ারে চাবি!’
এভাবে ধর্মকে পুঁজি করে, মানুষে মানুষে বিভেদ এবং মানুষকে গৌণ করার প্রতিবাদ তিনি করেছেন বারবার। নজরুলের লেখায় তার সাম্যবাদী দিকটাই ফুটে উঠেছে সবসময়।
আমরা দেখেছি ধর্মীয় রাজনীতি নানাভাবে মাথা চাড়া দিলে নজরুলকে কীভাবে ব্যবহার করা হয়। এই ধর্মীয় রাজনীতির অন্যতম ভিকটিম যখন নারী হয়ে উঠেছেন, তখন নজরুল সাহিত্যে দেখা গেছে নারীর অতি শক্তিশালী প্রভাব। নারীকে তিনি যে কেবলই দেবী হিসেবে পূজা করতে চেয়েছেন, এমন না। তিনি নারীকে দেখছেন মানুষ হিসেবে, দেখেছেন পাপে-পুণ্যে সমান অংশীদার সহ-নাগরিক হিসেবে। এসব নিয়ে আমরা আজকের দিনে অনেক কথাই বলি। কিন্তু সবচেয়ে শক্তিশালী কথাটা হয়তো নজরুলই বলে গেছেন–
“বিশ্বের যা কিছু মহান সৃষ্টি চির কল্যাণকর
অর্ধেক তার করিয়াছে নারী, অর্ধেক তার নর।
বিশ্বে যা কিছু এল পাপ তাপ বেদনা অশ্রুবারি,
অর্ধেক তার আনিয়াছে নর অর্ধেক তার নারী।”
অথচ এই নজরুলকে ভীষণভাবে ‘মুসলিম কবি’ হিসেবে উপস্থাপনের চেষ্টা দেখা যায়। যে নজরুলের জন্ম বর্তমান পশ্চিমবঙ্গের চুরুলিয়ায় আজ থেকে ১২৭ বছর আগে, সেই নজরুলকে রাজনৈতিকভাবে দুই বঙ্গেই ব্যবহার করা হয়েছে এবং হচ্ছে।
পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভায় আজ হিন্দুত্ববাদী দল বিজেপি, যাদের প্রধান উপজীব্য ধর্ম। এমনকি তারাও নজরুলকে ব্যবহার করেছে। ২০১৭ সালে আনন্দবাজার পত্রিকায় প্রকাশিত এক নিবন্ধে দেখা যায়, পশ্চিমবঙ্গের মুসলমান ভোটের জন্য কীভাবে নজরুলকে ব্যবহার করা হয়। আর বাংলাদেশ? এখানে বরাবরই নজরুলকে এই ধর্মীয় বর্গীকরণে ব্যবহার করা হয়। বিচিত্র সব গল্প এ ক্ষেত্রে প্রচার করা হয়।
আর এ গল্পগুলোর অন্যতম চরিত্র হিসেবে অবধারিতভাবেই হাজির থাকেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। এক কল্পিত বিরোধ দাঁড় করানো হয় রবীন্দ্রনাথ ও নজরুলের মধ্যে।
সেটা কেমন?
এমনকি কবি নজরুলের লেখা চুরি করে নোবেল পেয়েছেন রবীন্দ্রনাথ–এমন কথাও শোনা যায়। কিন্তু কাজী নজরুলের প্রাপ্য নোবেল কি আসলেও চুরি করেছিলেন রবীন্দ্রনাথ?
রবীন্দ্রনাথ যে নজরুলের নোবেল চুরি করেছিলেন, তা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তুমুল বাগ্বিতণ্ডা মাঝেমধ্যেই দেখা যায়। এই দাবির খণ্ডন অনেকেই করেছেন। এ ক্ষেত্রে একটি প্রশ্নই যথেষ্ট, রবীন্দ্রনাথ নোবেল পেয়েছেন কবে? উত্তর–১৯১৩ সালে। আর নজরুলের জন্ম ১৮৯৯ সালে। তাহলে?
বাদ দিন। আসুন দেখি রবীন্দ্রনাথ–নজরুল সম্পর্কটি কেমন ছিল?

২০২১-এ প্রকাশিত সংবাদমাধ্যম ডেইলি স্টারের এক নিবন্ধে তাদের সম্পর্ক নিয়ে বিস্তর আলোচনা করা হয়েছে। লেখক কয়েক ভাগে দুজনের হৃদ্যতার কথা বলেছেন।
১৯১৩ সালে রবীন্দ্রনাথের নোবেল জয়ের সময় চৌদ্দ বছরের কিশোর নজরুল তার দ্বারা গভীরভাবে প্রভাবিত হন। তিনি লেখেন, নজরুল রবীন্দ্রসংগীতের এতটাই অনুরাগী ছিলেন যে, বন্ধুরা তাকে রবীন্দ্রসংগীতের ‘হাফেজ’ বলে ডাকতেন। সেনাবাহিনীতে থাকার সময়ও তিনি ট্রাঙ্কে রবীন্দ্রনাথের বই রাখতেন। যুদ্ধ থেকে ফিরে রবীন্দ্রসংগীত শিল্পী হরিদাস চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে বন্ধুত্ব করে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে গান গাইতেন। নিজে বিখ্যাত হওয়ার আগে ছাত্রদের রবীন্দ্রসংগীত শেখাতেন, যার মধ্যে বিখ্যাত পরিসংখ্যানবিদ কাজী মোতাহার হোসেনও ছিলেন। এমনকি প্রখ্যাত ভাষাবিদ মুহম্মদ শহীদুল্লাহকে তিনি পুরো ‘গীতবিতান’ মুখস্থ শুনিয়েছিলেন।
ওই লেখায় আরও বলা হয়, ১৯২১ সালে উদীয়মান কবি নজরুলের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের প্রথম সশরীরে সাক্ষাৎ হয়। রবীন্দ্রনাথ তাকে শান্তিনিকেতনে শিক্ষার্থীদের গান শেখানোর এবং বিনিময়ে দিনেন্দ্রনাথ ঠাকুরের কাছ থেকে সংগীতের তালিম নেওয়ার প্রস্তাব দেন। রবীন্দ্রনাথ নজরুলের প্রতিভা চিনলেও নিয়তি তাদের ভিন্ন দুটি ধারা তৈরির পথে নিয়ে যায়।
নজরুলের সাহিত্য ও রাজনৈতিক সুরের পত্রিকাগুলোকে রবীন্দ্রনাথ সবসময় আন্তরিকভাবে স্বাগত জানান। ১৯২২ সালে নজরুলের সম্পাদিত ব্রিটিশবিরোধী পাক্ষিক পত্রিকা ‘ধূমকেতু’র জন্য রবীন্দ্রনাথ আট লাইনের একটি আশীর্বাণী পাঠান, যা পত্রিকার শেষ সংখ্যা পর্যন্ত মুদ্রিত হতো। এরপর ১৯২৫ সালে নজরুল ‘লাঙল’ পত্রিকা শুরু করলে এবারও রবীন্দ্রনাথ চার লাইনের একটি বাণী দিয়ে তাকে স্বাগত জানান।
নজরুলের রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি তাকে একাধিকবার তৎকালীন শাসকগোষ্ঠীর রোষাণলে ফেলেছিল। ১৯২২ সালের ২৩ নভেম্বর ব্রিটিশরাজ কুমিল্লা থেকে নজরুলকে গ্রেপ্তার করে। তার ‘আনন্দময়ীর আগমনে’ কবিতা (৮ সেপ্টেম্বর, ১৯২২) এবং ‘যুগবাণী’ প্রবন্ধের (২৩ নভেম্বর, ১৯২৩) জন্যই এই গ্রেপ্তার। আদালত তাকে এক বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেন।

নজরুল জেলে গিয়ে আমরণ অনশন শুরু করেছেন–এই খবর যখন রবীন্দ্রনাথের কাছে পৌঁছায়, তখন তিনি ভীষণ চিন্তিত হয়ে পড়েন। তিনি জানতেন নজরুল নিজের সিদ্ধান্তে কতটা অটল। তিনি নজরুলকে উদ্দেশ্য করে আট শব্দের একটি টেলিগ্রাম পাঠান:
“GIVE UP HUNGER STRIKE OUR LITERATURE CLAIMS YOU.” (অনশন ভাঙো, সাহিত্যের তোমাকে প্রয়োজন)
টেলিগ্রামটি অবশ্য কখনোই নজরুলের হাত পর্যন্ত পৌঁছায়নি।
নজরুল যখন কারাগারে, ঠিক সেই সময়েই রবীন্দ্রনাথ তার ‘বসন্ত’ গীতিনাট্যটি রচনা শেষ করেন। তিনি এটি উৎসর্গ করেন “শ্রীমান কবি কাজী নজরুল ইসলাম”-এর উদ্দেশ্যে।
নজরুলও রবীন্দ্রনাথের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে লিখেছিলেন ‘তীর্থপথিক’ কবিতাটি। আবার রবীন্দ্রনাথের প্রয়াণের পর তিনি রচনা করেন ‘রবিহারা’। অজস্র কবিতা, প্রবন্ধ ও গানে রবীন্দ্রনাথের রেফারেন্সও রয়েছে।
মানুষের বর্গীকরণের চেষ্টা যারা করে, তাদের ‘ন্যাজবিশিষ্ট’ বলে মন্তব্য করেছিলেন রবীন্দ্রনাথ। আর রবীন্দ্র কথিত এই ‘ন্যাজ’ নিয়ে আস্ত একটা প্রবন্ধ লিখেছিলেন নজরুল। আগ্রহীরা একটু যুগবাণী উল্টে দেখুন। ফলে রবীন্দ্রনাথ ও নজরুলকে যারা মুখোমুখি দাঁড় করায়, তাদের উদ্দেশ্য অন্যত্র।

কাজী নজরুল ইসলাম কি শুধুই একজন মুসলিম কবি? নজরুলের ধর্মবোধটি আসলে কেমন ছিল? আর যারা তাকে নিয়ে রাজনীতির ছকটি কষে, তাদের নিয়ে তার মনোভাবই বা কী ছিল?
নজরুলকে কেন্দ্র করে ’৪৭-এর রাজনীতির নবায়ন করার চেষ্টা কি হচ্ছে?
এই তো ক’দিন আগে গেল রোজার ঈদ। নজরুলের ‘ও মন রমজানের ওই রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ’ ছাড়া যেন ঈদ পরিপূর্ণ হয় না। এ ছাড়া নজরুল লিখেছেন অসংখ্য হামদ-নাত। গজল লিখেছেন, নিজে গেয়েছেনও। তার অনুবাদ করা ‘কাব্য আমপারা’ একসময় প্রায় প্রতি ঘরেই মিলত। এ বিষয়গুলোকে সামনে এনেই নজরুলকে মুসলিম হিসেবে হাজির করা হয়। অথচ চেপে যাওয়া হয়–নজরুলের লেখা অসংখ্য শ্যামা সংগীতের কথা। কমিউনিস্ট ইন্ট্যারন্যাশনালের প্রথম বাংলা অনুবাদও তার করা।
নজরুলের ধর্মচেতনা বা ধর্মীয় জাতিগোষ্ঠীর প্রতি তার মনোভাব কী ছিল? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজলেই জানা হয়ে যায় যে, নজরুলকে ক্রমাগত ঠেলে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে মুসলিম পরিচয়ের দিকে, যা কবির জীবৎকালে ভারতীয় উপমহাদেশে বাড়তে থাকা পরিচয়বাদী রাজনীতিরই অংশ, যা ১৯৪৭-এর প্রেক্ষাপট তৈরি করেছিল। অথচ নজরুল বরাবরই এই পরিচয়বাদী রাজনীতি ও এর মধ্যকার দ্বন্দ্বের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছেন।
মানবতার জয়গান গেয়েছেন বরাবরই। সাম্য ও মানবিক মর্যাদার পক্ষে দাঁড়ানো কবি সুস্পষ্ট বলেছেন–
“গাহি সাম্যের গান–
মানুষের চেয়ে বড় কিছু নাই, নহে কিছু মহীয়ান”
এমনকি ধর্ম মানুষের জন্য, মানুষ ধর্মের জন্য নয়–এমন বার্তাও দিয়েছেন তিনি তার অনেক লেখায়–
‘তব মসজিদে-মন্দিরে প্রভু নাই মানুষের দাবি
মোল্লা-পুরুত লাগায়েছে তার সকল দুয়ারে চাবি!’
এভাবে ধর্মকে পুঁজি করে, মানুষে মানুষে বিভেদ এবং মানুষকে গৌণ করার প্রতিবাদ তিনি করেছেন বারবার। নজরুলের লেখায় তার সাম্যবাদী দিকটাই ফুটে উঠেছে সবসময়।
আমরা দেখেছি ধর্মীয় রাজনীতি নানাভাবে মাথা চাড়া দিলে নজরুলকে কীভাবে ব্যবহার করা হয়। এই ধর্মীয় রাজনীতির অন্যতম ভিকটিম যখন নারী হয়ে উঠেছেন, তখন নজরুল সাহিত্যে দেখা গেছে নারীর অতি শক্তিশালী প্রভাব। নারীকে তিনি যে কেবলই দেবী হিসেবে পূজা করতে চেয়েছেন, এমন না। তিনি নারীকে দেখছেন মানুষ হিসেবে, দেখেছেন পাপে-পুণ্যে সমান অংশীদার সহ-নাগরিক হিসেবে। এসব নিয়ে আমরা আজকের দিনে অনেক কথাই বলি। কিন্তু সবচেয়ে শক্তিশালী কথাটা হয়তো নজরুলই বলে গেছেন–
“বিশ্বের যা কিছু মহান সৃষ্টি চির কল্যাণকর
অর্ধেক তার করিয়াছে নারী, অর্ধেক তার নর।
বিশ্বে যা কিছু এল পাপ তাপ বেদনা অশ্রুবারি,
অর্ধেক তার আনিয়াছে নর অর্ধেক তার নারী।”
অথচ এই নজরুলকে ভীষণভাবে ‘মুসলিম কবি’ হিসেবে উপস্থাপনের চেষ্টা দেখা যায়। যে নজরুলের জন্ম বর্তমান পশ্চিমবঙ্গের চুরুলিয়ায় আজ থেকে ১২৭ বছর আগে, সেই নজরুলকে রাজনৈতিকভাবে দুই বঙ্গেই ব্যবহার করা হয়েছে এবং হচ্ছে।
পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভায় আজ হিন্দুত্ববাদী দল বিজেপি, যাদের প্রধান উপজীব্য ধর্ম। এমনকি তারাও নজরুলকে ব্যবহার করেছে। ২০১৭ সালে আনন্দবাজার পত্রিকায় প্রকাশিত এক নিবন্ধে দেখা যায়, পশ্চিমবঙ্গের মুসলমান ভোটের জন্য কীভাবে নজরুলকে ব্যবহার করা হয়। আর বাংলাদেশ? এখানে বরাবরই নজরুলকে এই ধর্মীয় বর্গীকরণে ব্যবহার করা হয়। বিচিত্র সব গল্প এ ক্ষেত্রে প্রচার করা হয়।
আর এ গল্পগুলোর অন্যতম চরিত্র হিসেবে অবধারিতভাবেই হাজির থাকেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। এক কল্পিত বিরোধ দাঁড় করানো হয় রবীন্দ্রনাথ ও নজরুলের মধ্যে।
সেটা কেমন?
এমনকি কবি নজরুলের লেখা চুরি করে নোবেল পেয়েছেন রবীন্দ্রনাথ–এমন কথাও শোনা যায়। কিন্তু কাজী নজরুলের প্রাপ্য নোবেল কি আসলেও চুরি করেছিলেন রবীন্দ্রনাথ?
রবীন্দ্রনাথ যে নজরুলের নোবেল চুরি করেছিলেন, তা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তুমুল বাগ্বিতণ্ডা মাঝেমধ্যেই দেখা যায়। এই দাবির খণ্ডন অনেকেই করেছেন। এ ক্ষেত্রে একটি প্রশ্নই যথেষ্ট, রবীন্দ্রনাথ নোবেল পেয়েছেন কবে? উত্তর–১৯১৩ সালে। আর নজরুলের জন্ম ১৮৯৯ সালে। তাহলে?
বাদ দিন। আসুন দেখি রবীন্দ্রনাথ–নজরুল সম্পর্কটি কেমন ছিল?

২০২১-এ প্রকাশিত সংবাদমাধ্যম ডেইলি স্টারের এক নিবন্ধে তাদের সম্পর্ক নিয়ে বিস্তর আলোচনা করা হয়েছে। লেখক কয়েক ভাগে দুজনের হৃদ্যতার কথা বলেছেন।
১৯১৩ সালে রবীন্দ্রনাথের নোবেল জয়ের সময় চৌদ্দ বছরের কিশোর নজরুল তার দ্বারা গভীরভাবে প্রভাবিত হন। তিনি লেখেন, নজরুল রবীন্দ্রসংগীতের এতটাই অনুরাগী ছিলেন যে, বন্ধুরা তাকে রবীন্দ্রসংগীতের ‘হাফেজ’ বলে ডাকতেন। সেনাবাহিনীতে থাকার সময়ও তিনি ট্রাঙ্কে রবীন্দ্রনাথের বই রাখতেন। যুদ্ধ থেকে ফিরে রবীন্দ্রসংগীত শিল্পী হরিদাস চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে বন্ধুত্ব করে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে গান গাইতেন। নিজে বিখ্যাত হওয়ার আগে ছাত্রদের রবীন্দ্রসংগীত শেখাতেন, যার মধ্যে বিখ্যাত পরিসংখ্যানবিদ কাজী মোতাহার হোসেনও ছিলেন। এমনকি প্রখ্যাত ভাষাবিদ মুহম্মদ শহীদুল্লাহকে তিনি পুরো ‘গীতবিতান’ মুখস্থ শুনিয়েছিলেন।
ওই লেখায় আরও বলা হয়, ১৯২১ সালে উদীয়মান কবি নজরুলের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের প্রথম সশরীরে সাক্ষাৎ হয়। রবীন্দ্রনাথ তাকে শান্তিনিকেতনে শিক্ষার্থীদের গান শেখানোর এবং বিনিময়ে দিনেন্দ্রনাথ ঠাকুরের কাছ থেকে সংগীতের তালিম নেওয়ার প্রস্তাব দেন। রবীন্দ্রনাথ নজরুলের প্রতিভা চিনলেও নিয়তি তাদের ভিন্ন দুটি ধারা তৈরির পথে নিয়ে যায়।
নজরুলের সাহিত্য ও রাজনৈতিক সুরের পত্রিকাগুলোকে রবীন্দ্রনাথ সবসময় আন্তরিকভাবে স্বাগত জানান। ১৯২২ সালে নজরুলের সম্পাদিত ব্রিটিশবিরোধী পাক্ষিক পত্রিকা ‘ধূমকেতু’র জন্য রবীন্দ্রনাথ আট লাইনের একটি আশীর্বাণী পাঠান, যা পত্রিকার শেষ সংখ্যা পর্যন্ত মুদ্রিত হতো। এরপর ১৯২৫ সালে নজরুল ‘লাঙল’ পত্রিকা শুরু করলে এবারও রবীন্দ্রনাথ চার লাইনের একটি বাণী দিয়ে তাকে স্বাগত জানান।
নজরুলের রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি তাকে একাধিকবার তৎকালীন শাসকগোষ্ঠীর রোষাণলে ফেলেছিল। ১৯২২ সালের ২৩ নভেম্বর ব্রিটিশরাজ কুমিল্লা থেকে নজরুলকে গ্রেপ্তার করে। তার ‘আনন্দময়ীর আগমনে’ কবিতা (৮ সেপ্টেম্বর, ১৯২২) এবং ‘যুগবাণী’ প্রবন্ধের (২৩ নভেম্বর, ১৯২৩) জন্যই এই গ্রেপ্তার। আদালত তাকে এক বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেন।

নজরুল জেলে গিয়ে আমরণ অনশন শুরু করেছেন–এই খবর যখন রবীন্দ্রনাথের কাছে পৌঁছায়, তখন তিনি ভীষণ চিন্তিত হয়ে পড়েন। তিনি জানতেন নজরুল নিজের সিদ্ধান্তে কতটা অটল। তিনি নজরুলকে উদ্দেশ্য করে আট শব্দের একটি টেলিগ্রাম পাঠান:
“GIVE UP HUNGER STRIKE OUR LITERATURE CLAIMS YOU.” (অনশন ভাঙো, সাহিত্যের তোমাকে প্রয়োজন)
টেলিগ্রামটি অবশ্য কখনোই নজরুলের হাত পর্যন্ত পৌঁছায়নি।
নজরুল যখন কারাগারে, ঠিক সেই সময়েই রবীন্দ্রনাথ তার ‘বসন্ত’ গীতিনাট্যটি রচনা শেষ করেন। তিনি এটি উৎসর্গ করেন “শ্রীমান কবি কাজী নজরুল ইসলাম”-এর উদ্দেশ্যে।
নজরুলও রবীন্দ্রনাথের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে লিখেছিলেন ‘তীর্থপথিক’ কবিতাটি। আবার রবীন্দ্রনাথের প্রয়াণের পর তিনি রচনা করেন ‘রবিহারা’। অজস্র কবিতা, প্রবন্ধ ও গানে রবীন্দ্রনাথের রেফারেন্সও রয়েছে।
মানুষের বর্গীকরণের চেষ্টা যারা করে, তাদের ‘ন্যাজবিশিষ্ট’ বলে মন্তব্য করেছিলেন রবীন্দ্রনাথ। আর রবীন্দ্র কথিত এই ‘ন্যাজ’ নিয়ে আস্ত একটা প্রবন্ধ লিখেছিলেন নজরুল। আগ্রহীরা একটু যুগবাণী উল্টে দেখুন। ফলে রবীন্দ্রনাথ ও নজরুলকে যারা মুখোমুখি দাঁড় করায়, তাদের উদ্দেশ্য অন্যত্র।

১৯৭৪ সালের ৯ ডিসেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এক বিশেষ সমাবর্তনে বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে কাজী নজরুল ইসলামের অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তাকে সম্মানসূচক ডি.লিট উপাধিতে ভূষিত করে। ১৯৭৬ সালের জানুয়ারি মাসে বাংলাদেশ সরকার নজরুলকে বাংলাদেশের নাগরিকত্ব প্রদান এবং ২১ ফেব্রুয়ারি ‘একুশে পদকে’ ভূষিত করে।

ঠিক কী কী কারণে নারীর প্রতি সহিংসতা বাড়ছে? এমন প্রশ্ন তুললে সঙ্গে সঙ্গেই একগাদা উত্তর ছুটে আসবে। এর মধ্যে থাকবে–বিচারহীনতার সংস্কৃতি বা দীর্ঘসূত্রি বিচার, পুরুষ বাদে অন্য লৈঙ্গিক পরিচয়কে দ্বিতীয় বা তৃতীয় শ্রণির নাগরিক হিসেবে বিবেচনা, সমাজ ও রাষ্ট্রের পৌরষিক সত্তাসহ আরও অনেক কিছু