রাষ্ট্রীয় নৈশভোজে সৌদি আরবের যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানকে উদ্দেশে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বললেন, “আজ তুমি আরেকটা পয়েন্ট জিতলে।” সেই রাতেই তিনি সৌদি আরবকে যুক্তরাষ্ট্রের ‘প্রধান ন্যাটো-বহির্ভূত মিত্র’ (এমএনএনএ) মর্যাদা দেওয়ার ঘোষণা দেন।
ওয়াশিংটনে দুই দিনের সফরে এমবিএস ও ট্রাম্প একগুচ্ছ নতুন মার্কিন–সৌদি চুক্তির কথা জানান। এর মধ্যে ছিল মার্কিন প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর সঙ্গে নতুন এআই অংশীদারিত্ব, সৌদি এআই কোম্পানির জন্য এনভিডিয়ার সর্বাধুনিক চিপ ছাড়, সৌদির কাছে এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান বিক্রি, আমেরিকায় সৌদির প্রায় ১ ট্রিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি, সুদানের গৃহযুদ্ধ সমাধানে মার্কিন সহায়তার অঙ্গীকার।
এরমধ্যে অনেকগুলো এখনও প্রাথমিক বা শুধু শিরোনাম-কেন্দ্রিক ঘোষণা। তবুও এমবিএস-এর জন্য হোয়াইট হাউসে পুনরায় প্রবেশ এবং আমেরিকায় ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়া বিশাল প্রতীকী সাফল্য। সাংবাদিক জামাল খাশোগি হত্যার পর প্রায় সাড়ে সাত বছর আন্তর্জাতিক অস্বস্তির মধ্যে থাকার পর এবার তিনি পেলেন অভূতপূর্ব অভ্যর্থনা। সৌদি যুবরাজ ব্ল্যাক-টাই নৈশভোজে অংশ নেন, সিলিকন ভ্যালির বড় বড় বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণে সম্মেলনও অনুষ্ঠিত হয়।
সংবাদ সম্মেলনে ট্রাম্প এমবিএস-কে ‘অসাধারণ বন্ধু’ এবং মানবাধিকারসহ সব ক্ষেত্রে চমৎকার কাজ করা নেতা হিসেবে বর্ণনা করেন। খাশোগি হত্যা ও ৯/১১ ইস্যুতে সাংবাদিকদের প্রশ্ন ট্রাম্প সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেন। এমনকি এক সাংবাদিকের বিরুদ্ধে ‘বিতর্কিত’ খাশোগির প্রসঙ্গ তুলে ‘অতিথিকে বিব্রত করার’ অভিযোগও তোলেন। ট্রাম্প এবিসি টেলিভিশনের লাইসেন্স বাতিলের হুমকিও দেন।
সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ফার্স্ট লেডি মেলানিয়া ট্রাম্প। ছবি: রয়টার্সতবে এই উষ্ণ অভ্যর্থনা সত্ত্বেও মার্কিন রাজনীতির মূলধারায় এমবিএস এখনও বিতর্কিত। কংগ্রেসের অনেক রিপাবলিকান ও ডেমোক্র্যাট তার সঙ্গে ছবি তোলেননি। প্রায় সব গণমাধ্যমই সফরের খবর করতে গিয়ে খাশোগি হত্যা, মানবাধিকার লঙ্ঘন ও সৌদিতে সাম্প্রতিক মৃত্যুদণ্ড বৃদ্ধির ঘটনা উল্লেখ করেছে।
তবুও এমবিএস সম্ভবত ভালোবাসার চেয়ে গ্রহণযোগ্যতা প্রয়োজন; এই অবস্থান নিয়ে সন্তুষ্ট। তিনি রিপাবলিকান ও ডেমোক্র্যাট নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন, মার্কিন ব্যবসায়ীরাও সৌদি বিনিয়োগের সুযোগ নিতে ছুটেছেন। নিউ ইয়র্ক টাইমস ও ওয়াশিংটন পোস্ট ট্রাম্পের আচরণের সমালোচনা করেছে বটে, কিন্তু এমবিএস-সম্পর্কিত সমালোচনা অনেকটাই সতর্ক ভাষায় হয়েছে।
সফরটি শুধু এমবিএস-এর ভাবমূর্তি নয়, সৌদি আরবের আন্তর্জাতিক মর্যাদাও বাড়িয়েছে। সৌদি গণমাধ্যম সফরটিকে দেশের বিশাল শক্তি ও মর্যাদার প্রমাণ হিসেবে তুলে ধরেছে। কেউ কেউ বাড়াবাড়িও করেছেন। যেমন একজন সাংবাদিক বলেছেন, সৌদি নাকি যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম এমএনএনএ মর্যাদা পাওয়া দেশ, যদিও বাস্তবে এটি ২১তম।
কিছু বিশ্লেষক এমবিএসকে এমন নেতা হিসেবে দেখাচ্ছেন, যিনি আমেরিকার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ থেকেও নিজেদের জাতীয় স্বার্থ ও স্বাধীনতা জোরালোভাবে তুলে ধরছেন।
এক কলামিস্ট লিখেছেন, “হোয়াইট হাউসে দাঁড়িয়ে কোনো নেতাকে কি কখনো বলতে শুনেছেন ‘আমি আমেরিকাকে খুশি করতে আসিনি; আমাদের পারস্পরিক দরকার মেটাতে এসেছি’?”
গণমাধ্যম ফিলিস্তিনি রাষ্ট্রের পথে এমবিএস-এর সমর্থনকেও জোর দিয়ে দেখিয়েছে। কিন্তু এড়িয়ে গেছে তার আব্রাহাম অ্যাকর্ডসে যোগ দেওয়ার ইচ্ছার কথা।
কিন্তু মর্যাদা সবসময় আপেক্ষিক। সফরের কিছু ফলাফল সৌদি আরবকে মধ্যপ্রাচ্যের অন্য শক্তিগুলোর তুলনায় এগিয়ে দিয়েছে, আবার কিছু ক্ষেত্রে প্রত্যাশার চেয়ে পিছিয়ে রেখেছে।
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। ছবি: রয়টার্সসবচেয়ে বড় আলোচ্য বিষয় হলো এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান। ট্রাম্প মৌখিকভাবে সৌদি আরবকে এই অত্যাধুনিক যুদ্ধবিমান বিক্রির অনুমতি দিয়েছেন। মধ্যপ্রাচ্যে এফ-৩৫ এখন রয়েছে ইসরায়েলের হাতে। সৌদি আরব তা পেলে ইসরায়েলের একচেটিয়া অবস্থানে ধাক্কা দিতে পারে। ট্রাম্পের যুক্তি, “সৌদি দারুণ মিত্র, ইসরায়েলও দারুণ মিত্র… দুজনেরই সেরা অস্ত্র পাওয়া উচিত।”
যুক্তরাজ্যভিত্তিক আশারক আল-আওসাত পত্রিকার কার্টুনে দেখা গেছে, সৌদি-মার্কিন সম্পর্কের সূচক শেয়ার বাজারের মতো ঊর্ধ্বমুখী। এর চূড়ায় একটা সবুজ এফ-৩৫। কিন্তু ইসরায়েলি পত্রিকা হারেৎজ-এর কার্টুনে দেখা যায়, ট্রাম্প আর এমবিএস নেতানিয়াহুর পিঠের ওপর দিয়ে হেঁটে ‘ফিলিস্তিনি রাষ্ট্রের পথে’ যাচ্ছেন। ইসরায়েলের অনেকে মনে করছেন, সৌদির লাভ মানে তাদের ক্ষতি।
তবে প্রতিবেশী উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে তুলনা করলে ছবিটা মিশ্র। আমেরিকা কাতারকে পূর্ণাঙ্গ নিরাপত্তা গ্যারান্টি দেয়। এই তুলনায় সৌদির এমএনএনএ মর্যাদা অনেকটাই পিছিয়ে । সৌদি এখনও আমিরাতের মতো আমেরিকার কাছ পারমাণবিক শক্তি চুক্তি পায়নি। এআই চিপের ক্ষেত্রেও সৌদির হিউমেইন ও আমিরাতের জি৪২ ঠিক একই সংখ্যক ও একই সময়ে পেয়েছে। কোনো বিশেষ সুবিধা নেই।
মর্যাদা পেলেই বাস্তব লাভ হবেই, এমন নয়। ইসরায়েল নিশ্চিত যে তারা তাদের ‘গুণগত সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব’ বজায় রাখবে। হয় এফ-৩৫ বিক্রি আটকে দিয়ে, নয়তো যুদ্ধবিমানটির ফিচার কমিয়ে। চীনের কাছে প্রযুক্তি ফাঁস হয়ে যেতে পারে এ শঙ্কায় আরব আমিরাতকে এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান দেয়নি আমেরিকা।
তবে এমবিএস যদি যুদ্ধ ও সংঘাত বাদ দিয়ে অর্থনীতি ও কূটনীতির পথে মর্যাদা খোঁজেন, তাহলে তা মধ্যপ্রাচ্যের জন্য অনেক ভালো হবে। বিনিয়োগ সম্মেলন আর জাতিসংঘে প্রস্তাব অনেক বেশি ভালো ইয়েমেনে ব্যর্থ অভিযান বা লেবাননের প্রধানমন্ত্রীকে অপহরণের মতো কাণ্ডের চেয়ে। এমনকি আমিরাতের সঙ্গে অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতাও এখনো “বন্ধু-প্রতিদ্বন্দ্বী” পর্যায়েই আছে।
সৌদি নেতৃত্বের জন্য বড় প্রশ্ন এই মর্যাদার খেলা কতদিন অর্থের জোরে চালিয়ে যাওয়া যাবে? ট্রাম্প সৌদিকে পছন্দ করেন মূলত বিশাল বিনিয়োগ ও ক্রয়ক্ষমতার লোভে। সিলিকন ভ্যালি-ওয়াল স্ট্রিটও যুবরাজকে খাতির করে কারণ তারা মনে করে এমবিএস অফুরন্ত অর্থের উৎস। কিন্তু মেগা-প্রকল্প আর নাগরিকদের চাকরি দেওয়ার চাপ ক্রমশ বাড়ছে তার ওপর। সেই চাপ বাড়ছে সৌদির অর্থনীতির ওপরও।
নিরাপত্তা সহযোগীদের ওপর আমেরিকা যে মর্যাদা-নির্ভর প্রভাব ধরে রেখেছে, সেটিকে নিজের হাতেই নষ্ট করে ফেলার ঝুঁকিতে রয়েছে দেশটির।
ট্রাম্পের দেওয়া নীতিগত ছাড়গুলো কোনো সুস্পষ্ট কূটনৈতিক লক্ষ্য থেকে নয়। এটি ওয়াশিংটনের দীর্ঘদিনের স্বভাব মিত্রদের সন্তুষ্ট রাখা আর বিশাল অঙ্কের অর্থের দিকে আগ্রহ, এই দু’য়ের সমন্বয়েই এসেছে বলে মনে হয়।
এমবিএসের ‘রাষ্ট্রনায়কোচিত’ ভাবমূর্তি গড়ে তোলার চেষ্টা, আর সৌদি আরবে ভ্রমণ-নিষিদ্ধ মার্কিন নাগরিক সাদ আলমাদির হঠাৎ দেশে ফেরত আসা, দু’টোই দেখায় যে মার্কিন সমালোচনার প্রতি রিয়াদ এখনও বেশ সংবেদনশীল।
কিন্তু ট্রাম্প যে নতুন নিয়ম তৈরি করেছেন, তাতে মর্যাদা অর্জনের খেলায় সবচেয়ে বেশি পয়েন্ট দেয় প্রশংসা আর বড় বড় চুক্তির প্রদর্শন। নাগরিক স্বাধীনতা বা মানবাধিকারের প্রতি শ্রদ্ধা সেখানে অনেকটাই গৌণ হয়ে গেছে।
লেখক: কার্নেগি মিডল ইস্ট প্রোগ্রামের ননরেসিডেন্ট স্কলার
(লেখাটি কার্নেগি এনডাউমেন্ট ফর ইন্টারন্যাশনালের ওয়েবসাইট থেকে অনুবাদ করেছেন ইয়াসিন আরাফাত)