উৎসবের নির্বাচন নাকি যুদ্ধের প্রস্তুতি?

উৎসবের নির্বাচন নাকি যুদ্ধের প্রস্তুতি?
আগামীকাল শুক্রবার বিশেষ দোয়া ও প্রার্থনার অনুরোধ জানিয়েছে সংস্থাটি। ছবি: বাসস

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রায় ৯ লাখ সদস্য থাকছে নির্বাচনের মাঠে, সাথে আছে কেন্দ্রে কেন্দ্রে সিসিটিভি ক্যামেরা ও পুলিশের শরীরে লাগানো ক্যামেরার এক বিরাট সমন্বয়। বলা যায় একেবারে বজ্রআঁটুনি। তবু কারও মন থেকে শঙ্কা যাচ্ছে না। প্রশ্ন আসে–তাহলে ফসকা গেরোটি কোথায়?

নির্বাচনী প্রচার শুরু হয়েছে এরই মধ্যে। আর এর সঙ্গত হিসেবেই যেন সবার শঙ্কাকে সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে নানা স্থানে শুরু হয়েছে সহিংসতা। রাজধানী ঢাকার কেরানীগঞ্জে এক বিএনপি নেতাকে গুলি করে পালিয়েছে তথাকথিত ‘দুর্বৃত্তরা’। এই ‘দুর্বৃত্ত’ এক দারুণ অভিধা। এর আড়ালে অনায়াসে মুখ তো বটেই পুরো শরীর লুকিয়ে ফেলতে পারে আততায়ী।

এমন নয় যে, কেরানীগঞ্জেই প্রথম ঘটল এমন কিছু। আরেকটু পেছনে যাওয়া যাক। নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পরদিনই শরিফ ওসমান বিন হাদি গুলিবিদ্ধ হন এবং পরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় সিঙ্গাপুরে মারা যান। এবারের নির্বাচন এবং তা নিয়ে যে সহিংসতার শঙ্কা, তা চিহ্নিত হয়ে আছে এই একটি ঘটনা দিয়েই। এর বাইরেও একের পর এক বিভিন্ন দলের নেতা-কর্মীদের ওপর হামলা হয়েছে। নিহত হয়েছেন আরও অনেকে।

বাংলাদেশে নির্বাচন মানেই সহিংসতার একটা রেওয়াজ আছে। আর এই রেওয়াজই এবার ভেঙে দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু তা তো হয়ইনি, বরং এবার শঙ্কার পালে যেন আরও জোর হাওয়া লেগেছে। যদিও প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস আশ্বস্ত করেছিলেন–এবারের নির্বাচন হবে উৎসবমুখর। কিন্তু এ উৎসব ক্রমেই সহিংসতার হয়ে উঠছে কী?

নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের তরফ থেকে একের পর এক আশ্বাসবাণী দেওয়া হয়েছে। কিন্তু হায়, সকলই গরল ভেল। শরিফ ওসমান বিন হাদি হত্যাকাণ্ড, তার পরের তাণ্ডব–এসব নিয়ে তো কম কথা হলো না। কিন্তু ওই কথা পর্যন্তই। কাজের কাজ কিছু হয়েছে বলে দাবি করারও এমনকি উপায় থাকছে কী?

সাধারণ মানুষ তো বটেই নিরাপত্তা বিশ্লেষকেরাও বারবার করে উদ্বেগ জানাচ্ছেন। একটু কান পাতলেই শোনা যায় হাজার রকম সংশয় ও শঙ্কার কথা। শোনা যায় একটা বেশ রণসঙ্গীতের আওয়াজ, যা চাপা এবং যা প্রতিপক্ষকে চাপে রেখে তরণী পার হতে চাইছে। প্রার্থীদের অনেকেরই মুখের ভাষা থেকে দেহভঙ্গি যুদ্ধংদেহী বললে বাড়িয়ে বলা হয় না।

কারণ, নানা দিক থেকেই ক্রমশ সরকারের এবং নির্বাচন কমিশনের (ইসি) আন্তরিকতা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। এমনকি নির্বাচন আদৌ হবে কি–এ প্রশ্নও উঠছে। এটা এতটাই যে, প্রধান উপদেষ্টা থেকে শুরু করে সরকারের অপরাপর গুরুত্বপূর্ণ পদধারীদের বারবার করে বলতে হচ্ছে যে–নির্বাচন ১২ ফেব্রুয়ারিতেই হবে। এটা অনেকটা আশ্বাসবাণীর মতো শোনায়। কারণ, এই মুহূর্তে সরকারের তরফ থেকে নির্বাচন কতটা সুষ্ঠু হবে, নির্বাচনী পরিবেশ যে যথাযথ আছে–এসব নিয়ে কথা বলবার কথা। নির্বাচনের হওয়া বা না হওয়া নিয়ে যাবতীয় আলোচনা বা আলোচনার প্রয়াস অবান্তর হিসেবে সাব্যস্ত হওয়ার কথা তফসিল ঘোষণার পর থেকেই। অথচ এ নিয়ে এখনো সরকারের কর্তাব্যক্তিদের কথা বলতে হচ্ছে। এই বলাটাও কোনো কোনো ক্ষেত্রে সংশয়কে বাড়িয়ে দিচ্ছে।

আলাপের শুরুর প্রসঙ্গে ফেরা যাক। এত এত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যকে মাঠে নামিয়ে, প্রযুক্তির নজিরবিহীন সহায়তা নিয়ে যে আয়োজন, তা নিয়ে তো আর যা হোক নিরাপত্তা নিয়ে সংশয় থাকার কথা নয়। কিন্তু আছে। বেশ ভালোভাবেই আছে। আর এই থাকার কারণেই আমরা দেখি–এবারের নির্বাচনে বহু প্রার্থী ব্যক্তিগত নিরাপত্তা নিশ্চিতে গানম্যানের আবেদন করেন। এই আবেদনের সংখ্যাটি বেশ গুরুত্বপূর্ণ।

এবারের নির্বাচনে ৩০০ আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা প্রায় আড়াই হাজার প্রার্থীর সিংহভাগই গানম্যানের আবেদন করেছেন বলে খবর বেরিয়েছে। অর্থাৎ, প্রার্থীদের অধিকাংশই নিরাপত্তা ইস্যুতে আর সরকারের ওপর নির্ভর করতে পারছে না। কেউ কেউ নিজেদের লাইসেন্স করা অস্ত্র নিয়ে ঘুরছেন। ব্যক্তিগত নিরাপত্তা বলয় তৈরি করেছেন। এটা শুধু এ আশঙ্কা থেকেই যে, সরকার বা রাষ্ট্রীয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তাদের নিরাপত্তা দিতে পারবে না। শুধু তাই নয়, প্রতিদ্বন্দ্বী পক্ষগুলো অভিযোগ তুলছে যে, সরকার তার বিপরীত পক্ষের প্রতি নতজানু। অর্থাৎ, আস্থা নেই। আর এই অনাস্থার বোধ এক ভয়াবহ পরিস্থিতি সৃষ্টি করছে।

ঢাকা-৮ আসনে এনসিপির প্রার্থী নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী যেমন সোজাসাপটা বলছেন, “রাষ্ট্রীয় বাহিনী যদি কোনো দলের বাহিনীর মতো আচরণ করে, তাহলে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত থাকে না। সে কারণেই আমরা জনগণকে সঙ্গে নিয়ে নিজেদের নিরাপত্তার প্রস্তুতি নিচ্ছি। রাষ্ট্র যদি আমাদের নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হয়, তাহলে জনগণ নিজেরাই নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বাধ্য হবে।”

একই ধরনের অনাস্থার কথা ফুটে উঠেছে এবি পার্টির সভাপতির কণ্ঠে। তিনি বলছেন, “বর্তমানে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি খুবই ভঙ্গুর ও নাজুক।” চট্টগ্রাম-৮ আসনে ১০ দলীয় জোটের প্রার্থী ও এনসিপির নেতা জোবাইরুল হাসান আরিফও নির্বাচনে পেশিশক্তির ব্যবহার ও সহিংসতার আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন।

২০২৫ সালেই সারা দেশে ৯১৪টি রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনা ঘটে। এতে অন্তত ১৩৩ জন নিহত ও আহত হয়েছে সাড়ে সাত হাজার মানুষ। চলতি বছরের জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহেই নানা ধরনের সংঘাতে ২০ খুন হয়েছে।

এ তো গেল প্রার্থীদের তরফ থেকে কিছু ভাষ্য। আর ভোটার? ভোটারদের সরাসরি প্রশ্ন–ভোটের দিন কেন্দ্র পর্যন্ত নিরাপদে যাওয়া যাবে তো? এমনকি চায়ের আড্ডা থেকে শুরু করে নানা জায়গায় নির্বাচনকেন্দ্রিক আলোচনা যতটা ভোট নিয়ে হচ্ছে–তার চেয়ে বেশি সম্ভাব্য সহিংসতা নিয়ে হচ্ছে।

এই শঙ্কার বীজ বাতাসে ছড়িয়ে পড়ছে ভীষণভাবে। যেনবা তুলট, হালকা বাতাসেই সে ডানা পেয়ে যাচ্ছে এদিক ওদিক, ছড়িয়ে পড়ছে চারদিকে। আর এই ছড়িয়ে পড়াকে সমর্থন দিতেই যেন আনুষ্ঠানিকভাবে নির্বাচনী প্রচার শুরুর প্রথম দিনেই দেশের বিভিন্ন স্থানে সহিংসতায় ২০ জনের বেশি আহত হয়েছে। চট্টগ্রাম, লক্ষ্মীপুর, সিরাজগঞ্জ, ঝিনাইদহসহ দেশের নানা এলাকা তো বটেই খোদ রাজধানীতেই বিভিন্ন পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ হয়েছে। এর মধ্যে রাজধানীতে দুই বড় দল জামায়াত ও বিএনপির সংঘর্ষ সবাইকে প্রমাদ গুনতে বাধ্য করেছে।

এবার নজর দেওয়া যাক হিউম্যান রাইট সাপোর্ট সোসাইটি বা এইচআরএসএস–এর প্রতিবেদনের দিকে। সংস্থাটি বলছে, গত বছর; অর্থাৎ, ২০২৫ সালেই সারা দেশে ৯১৪টি রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনা ঘটে। এতে অন্তত ১৩৩ জন নিহত ও আহত হয়েছে সাড়ে সাত হাজার মানুষ।

এদিকে চলতি বছরের জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহেই নানা ধরনের সংঘাতে ২০ খুন হয়েছে। এর মধ্যে বেশ কয়েকটি রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড রয়েছে। এর সঙ্গে যখন যুক্ত হয় জুলাই আন্দোলন ও তার পরবর্তী সময়ে কারাগার থেকে পালিয়ে যাওয়া আসামিদের একটি বড় অংশের নিখোঁজ হওয়ার খবর, যখন লুট হওয়া অস্ত্রের অধিকাংশ আর ফিরে আসে না রাষ্ট্রের জিম্মায়, যখন সাবেক শীর্ষ সন্ত্রাসীদের অনেকের নড়াচড়া নানা ঘটনা সূত্রে সামনে আসতে শুরু করে এবং ব্যক্তিগত নিরাপত্তায় আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্স করানো বা রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনায় আত্মরক্ষায় প্রশিক্ষণের নামে আগ্নেয়াস্ত্রের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয় এবং প্রশিক্ষিতদের কোনো খোঁজ আর পাওয়া যায় না–তখন জনমনে শঙ্কা তৈরি হওয়াটা স্বাভাবিক যে–এত সব কি তবে আমাকে লুট করতেই। তখন সাধারণ মানুষের কাছে তার বহুল আকাঙ্ক্ষিত ভোটকেন্দ্রে যাওয়ার পথটি দীর্ঘ মনে হওয়াটা দোষের কিছু কি?

সাধারণ মানুষ তো বটেই নিরাপত্তা বিশ্লেষকেরাও বারবার করে উদ্বেগ জানাচ্ছেন। একটু কান পাতলেই শোনা যায় হাজার রকম সংশয় ও শঙ্কার কথা। শোনা যায় একটা বেশ রণসঙ্গীতের আওয়াজ, যা চাপা এবং যা প্রতিপক্ষকে চাপে রেখে তরণী পার হতে চাইছে। প্রার্থীদের অনেকেরই মুখের ভাষা থেকে দেহভঙ্গি যুদ্ধংদেহী বললে বাড়িয়ে বলা হয় না। শুধু ভাষা বা ভঙ্গি কেন–বাস্তবেও তো অস্ত্রের ঝনঝনানি পাওয়া যাচ্ছে ভোটের প্রচারের সঙ্গত হিসেবে। নানা স্থানে হওয়া সংঘাত, সংঘাতের প্রবণতা এবং রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার প্রতি অনাস্থা জানিয়ে রেখে নিজের নিরাপত্তা নিজে আয়োজন করার ঘোষণা–বা প্রকারান্তরে হুঁশিয়ারি দিয়ে রাখাটা প্রধান উপদেষ্টার আশ্বস্ত করা ‘উৎসবমুখর নির্বাচনের’ বদলে একটা কেমন যেন যুদ্ধ যুদ্ধ ভাব তৈরি করছে। এই ভাব কাটলেই ভালো।

তবে মনে রাখা জরুরি যে, কোনো নির্বাচন শুধু আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বহর, রাষ্ট্রের তরফে অতন্দ্র প্রহরী নিযুক্ত করে বা সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন করে সুষ্ঠু, অবাধ ও নিরপেক্ষ করা যায় না। নির্বাচন হলো প্রার্থীর সঙ্গে ভোটারের সংলাপের মাধ্যম। এই মাধ্যম তখনই নিরুপদ্রব হয়, যখন ভোটার তথা সাধারণ মানুষ আশ্বস্ত বোধ করে, যখন সে মনে করে ভোটটা তাদের। যেকোনো নির্বাচনের সবচেয়ে বড় প্রহরী আসলে সাধারণ মানুষ। তাকে এড়িয়ে পুলিশ, র‍্যাব, সেনা-নৌ-বিমানবাহিনী মোতায়েন করে কিংবা বাইরে থেকে শান্তিবাহিনী এনেও কোনো নির্বাচন সফল বা উৎসবমুখর করা সম্ভব নয়। কারণ, আর যাই হোক কঠোর চোখ ও বন্দুকের নলের সামনে দাঁড়িয়ে কারও পক্ষে নিজের মতটি ঠিকঠাক প্রকাশ করা সম্ভব নয়। আর ভোট তো জনতার রায়ই। কিন্তু এ রায়কে নিজের দিকে পেতে মরিয়া প্রার্থী ও দলগুলোর মধ্যে যে যুদ্ধংদেহী মনোভাব এবং প্রচার শুরুর পর থেকেই নানা জায়গায় সংঘাত ও সহিংসতার খবর আসছে, দলীয় নেতাদের হত্যায় যে বলপ্রয়োগের নিদর্শন পাওয়া যাচ্ছে–তাতে প্রার্থী ও ভোটারের মেলবন্ধনের উৎসব নয়, বরং প্রার্থী সঙ্গে প্রার্থীর যুদ্ধের প্রস্তুতিই বড় বেশি দৃষ্টিগ্রাহ্য হচ্ছে।

লেখক: বার্তা সম্পাদক, চরচা

সম্পর্কিত