বিশেষ সাক্ষাৎকার
বিএনপি সরকারের প্রথম বাজেট উপস্থাপন হলো ১১ জুন। এই বাজেটে জনগণ কী পেল, সরকারের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির প্রতিফলন কতটা ঘটল–এসব নিয়ে চরচা সংলাপ-এ কথা বলেছেন সাবেক অর্থসচিব ও বাংলাদেশের সাবেক অডিটর জেনারেল মোহাম্মদ মুসলিম চৌধুরী, যিনি সোনালী ব্যাংকেরও চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। এ ছাড়া দুইবার ছিলেন বাজেট প্রক্রিয়ার সাথে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন চরচা সম্পাদক সোহরাব হাসান
সোহরাব হাসান

বিএনপি সরকারের প্রথম বাজেট উপস্থাপন হলো ১১ জুন। এই বাজেটে জনগণ কী পেল, সরকারের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির প্রতিফলন কতটা ঘটল–এসব নিয়ে চরচা সংলাপ-এ কথা বলেছেন সাবেক অর্থসচিব ও বাংলাদেশের সাবেক অডিটর জেনারেল মোহাম্মদ মুসলিম চৌধুরী, যিনি সোনালী ব্যাংকেরও চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। এ ছাড়া দুইবার ছিলেন বাজেট প্রক্রিয়ার সাথে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন চরচা সম্পাদক সোহরাব হাসান
চরচা: বাজেট তো ঘোষিত হলো, আমরা ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়াও দেখলাম। একটা কঠিন সময়ে বাজেট হলো। বাজেট নিয়ে চরচা গোলটেবিল আলোচনায় আপনারা অনেক পরামর্শ দিয়েছিলেন, উদ্বেগের কথাও জানিয়েছিলেন। বাজেট ঘোষণার পর আপনার অনুভূতি জানতে চাই।
মুসলিম চৌধুরী: জনগণ কর্তৃক নির্বাচিত একটা ডেমোক্রেটিক সরকার ক্ষমতায় এসেছে। নির্বাচনী ইশতেহারে কিছু কমিটমেন্টও ওনাদের ছিল। নির্বাচনী ইশতেহারের সে কমিটমেন্ট বাস্তবায়নকে সামনে রেখেই সম্ভবত নির্বাচিত সরকার জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষা পূরণের উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে একটা বাজেট দিয়েছে। এক্সপেন্ডিচার (ব্যয়) হিসেবে যদি চিন্তা করেন, তাহলে বাজেট সাইজটা বেশ বড়। রেভিনিউ (রাজস্ব) টার্গেটও বড়। এই হিসেবে আমি মনে করি, ইশতেহারের যে সমস্ত অবজেকটিভ আছে, তা পূরণ করতে গিয়েই অনেক জায়গায় বাজেটের আকার ওনাদের বেশি দিতে হয়েছে। যেমন–শিক্ষার জন্য দেখা গেছে অতীতের সবচেয়ে বড় বাজেট সাইজেও জিডিপির ১ শতাংশের একটু বেশি ছিল, এবার ২ শতাংশ (বরাদ্দ) দিয়েছে। স্বাস্থ্য খাতেও কিছুটা বাড়ানো হয়েছে। আর সামাজিক নিরাপত্তাতে বেশ কিছু ওনাদের ফ্ল্যাগশিপ বা সিগনেচার প্রোগ্রাম আছে–যেমন ফ্যামিলি কার্ড, কৃষি কার্ড ইত্যাদি। এই কারণে সামাজিক নিরাপত্তা খাতেও বাজেটের আকার বেড়েছে। তো সবদিক মিলে জনগণের কল্যাণে ইশতেহারের টার্গেট পূরণে তারা বাজেট করেছে এবং এই বাজেট উচ্চাভিলাষী ও চ্যালেঞ্জিং হলেও আমি এটাকে ইলেকশন কমিটমেন্টের রিফ্লেকশন হিসেবে পজিটিভলি নিতে চাই।
চরচা: এখানে প্রত্যাশা এবং বাস্তবতার মধ্যে ফারাক কতটা?
মুসলিম চৌধুরী: ফারাকটা আপনি যদি এভাবে ভাগ করে দেখেন, এক্সপেন্ডিচারের সাইজের সাথে যদি রেভিনিউ কম্পেয়ার করেন–আমরা জানি যে, বাজেটের অর্থ সংস্থানটা মূলত দুই সোর্স থেকে হয়; একটা হলো রেভিনিউ, আরেকটা হলো বরোয়িং (ঋণ)। রেভিনিউয়ের ক্ষেত্রে আমাদের ট্যাক্স রেভিনিউটা প্রধান। আপনারা জানেন যে, আমাদের অতীত ইতিহাসে কোনো সময়েই এন্ড অব দ্য ইয়ারে গিয়ে নির্ধারিত করের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হয় না। ২০২৫-২৬ সালেও এর ব্যতিক্রম হওয়ার কথা নয়। অলরেডি আপনারা জানেন ১০ মাসে প্রায় ১ লাখ কোটি টাকার উপরে রেভিনিউ টার্গেট অর্জন করা যায়নি। এবং আগামী দুই মাসেও ডেফিনেটলি এটা টার্গেটে পৌঁছাবে না।
চরচা: দুই মাস তো না, মানে ৩০ জুনের মধ্যে?
মুসলিম চৌধুরী: হ্যাঁ। তো এখন ওইটাকে যদি আপনি কনটেক্সটে নিয়ে চিন্তা করেন, তাহলে এবারের যে বাজেটের রেভিনিউ টার্গেট এস্টিমেট করা হয়েছে, তা গত বছরের মূল লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে প্রায় ১৭ শতাংশ বেশি। আর যদি অ্যাকচুয়াল অ্যাচিভমেন্টের সাথে কম্পেয়ার করেন, তবে এটা প্রায় ৩০-৪০ শতাংশ বেশি হবে। কাজেই এই রেভিনিউ টার্গেট অ্যাচিভ করাটা সরকারের জন্য একটা বড় চ্যালেঞ্জ হবে।
চরচা: যদি রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা পূরণ না হয়, তবে সরকারের করণীয় হচ্ছে ঋণ করা?
মুসলিম চৌধুরী: একটা হলো এক্সপেন্ডিচারের ক্ষেত্রে আমি আগেই বলেছি যে, অ্যাকচুয়াল এক্সপেন্ডিচার টার্গেটেড এক্সপেন্ডিচারের খুব একটা কাছাকাছি যায় না। কাজেই ওখানে একটা স্পেস তৈরি হবে যে, খরচ একটু কমবে। কিন্তু খরচ কমার পরও বরোয়িং (ঋণ করার) টার্গেট বাড়াতে হয়। এই বরোয়িং-এর ক্ষেত্রে আমরা এস্টিমেট করি ডোমেস্টিক বরোয়িং (অভ্যন্তরীণ ঋণ) আর ফরেন বরোয়িং (বৈদেশিক ঋণ)। ডোমেস্টিক বরোয়িংয়ের একটা বড় দিক হলো ম্যাক্রো-ইকোনমিতে এর দুটি খাতক আছে। একটি খাতক হলো প্রাইভেট সেক্টর, যারা সবচেয়ে বড় এমপ্লয়মেন্ট এরিয়া তৈরি করে, ঋণ নিয়ে ইনভেস্টমেন্ট করে। আর অন্য খাতক হলো সরকার। এখন ঝুঁকিটা হবে সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতা প্রেক্ষাপটে। সরকার তার বাজেট টার্গেট মিট করতে গিয়ে বাজেটের মধ্যে একটা বড় অংশ আছে পরিচলন ব্যয়। পরিচলন ব্যয় কিন্তু স্ট্যান্ডিং চার্জের মতো, এতে সেভিংস হয় না। সেভিংস যা হওয়ার, তা হয় উন্নয়ন ব্যয়ের ওপর। তো পরিচলন ব্যয় এবং উন্নয়ন ব্যয়–দুটোই মিট করতে হলে ব্যাংকিং সিস্টেম থেকে সরকারকে বেশি ঋণ নিতে হবে। সরকার যদি ঋণ বেশি করে, তবে প্রাইভেট সেক্টরের এক্সেস টু ফাইনান্স বা ঋণের সুযোগ কমবে, তাদের বরোয়িং কস্টও বাড়বে। আলটিমেটলি এটাকে টেকনিক্যালি ‘ক্রাউডিং আউট ইফেক্ট’ বলে–অর্থাৎ, বেসরকারি খাত তার প্রয়োজনীয় বিনিয়োগের জন্য টাকা পাবে না। যেহেতু সরকারের ফোর্স বেশি থাকে, সরকার চাইলে বড় অঙ্কের ঋণ নেবেই। এটা একটা সামষ্টিক ইমব্যালেন্স হওয়ার আশঙ্কা তৈরি করে।
চরচা: এক্ষেত্রে আরও একটা অপশন আছে–টাকা ছাপানো।
মুসলিম চৌধুরী: আর একটা অপশন আছে, যেটা বেশ ডেঞ্জারাস; এই মুহূর্তে এটা আরও বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। যেহেতু আমাদের ইনফ্লেশন (মুদ্রাস্ফীতি) অলরেডি গত মাসে ৯.৪২ শতাংশ ছিল, তাই এটি আরও ওপরের দিকে ওঠার আশঙ্কা আছে। এ রকম উচ্চ মূল্যস্ফীতির পরিস্থিতিতে টাকা সরবরাহ বাড়িয়ে বা টাকা ছাপিয়ে ঋণ করলে মুদ্রাস্ফীতি আরও বাড়বে।
সব দিক মিলিয়ে অর্থমন্ত্রী নিজেও বলছেন যে, এবারের বাজেটটা আসলে ‘রিকভারির’। কারণ, ম্যাক্রো ইকোনমিক ইন্ডিকেটরগুলা–যেমন এক্সপোর্ট, রেমিট্যান্স, ইনফ্লেশন, জিডিপি গ্রোথ, প্রাইভেট সেক্টর ক্রেডিট এবং ব্যাংকিং সেক্টরের এনপিএল–সবকিছুই এখন একটু নড়বড়ে অবস্থায় আছে। এই অবস্থায় অর্থমন্ত্রী বললেন যে, এবারের বাজেট ‘রিকভারি অ্যান্ড স্ট্যাবিলিটি’র জন্য, নট রিস্টোরেশন। তিনি পাঁচ বছরের একটা পরিকল্পনা দিয়েছেন যে, এবার ইকোনমি রিকভার হবে এবং সামষ্টিক অর্থনীতির চলকগুলোকে স্ট্যাবিলাইজ করার চেষ্টা করবেন। সামষ্টিক অর্থনীতির চ্যালেঞ্জ সত্ত্বেও সরকার একটা উচ্চাভিলাষী ও বড় বাজেট দেওয়ার চেষ্টা করেছে। এখন দেখা যাক বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে তা কী দাঁড়ায়।
চরচা: বেকারত্ব বাংলাদেশের একটি বড় সমস্যা। গত দু-বছরে বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ তেমন একটা হয়নি। এই অবস্থায় সরকার কিছু সৃজনশীল পরিকল্পনা নিয়েছে; যেমন–বন্ধ কলকারখানা চালু, তরুণ উদ্যোক্তাদের প্রণোদনা দেওয়া ইত্যাদি। আগামী এক বছরে কর্মসংস্থানের কতটা সম্ভাবনা আপনি দেখছেন এবং বিনিয়োগ বাড়ানোর এই চেষ্টা কতটা সফল হতে পারে?
মুসলিম চৌধুরী: বন্ধ কলকারখানা, কৃষি ও এসএমই খাতের জন্য সব মিলিয়ে প্রায় ৬০ হাজার কোটি টাকার একটি বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এর লক্ষ্য হলো–প্রায় ১ লাখ কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা। আমাদের দেশে প্রতি বছর প্রায় ২০ থেকে ৩০ লাখ মানুষ শ্রমবাজারে নতুন করে যুক্ত হচ্ছে। তাদের কর্মসংস্থানের বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ ছাড়া সরকার ব্যবসা সহজ করার জন্য (Ease of doing business) কিছু ট্যাক্স রিফান্ড, ই-ভ্যাট রিটার্ন এবং ট্যাক্স এক্সেমশন দেওয়ার মতো কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে। তবে বন্ধ কলকারখানা চালুর বিষয়ে আমি মনে করি, আগে দেখতে হবে সেগুলো বন্ধ হওয়ার কারণ কী ছিল। আমার মতে, যেসব ব্যবসা প্রতিষ্ঠান এখন সংকটে আছে, কিন্তু ভালো করার সম্ভাবনা আছে; অর্থাৎ, ‘মর্গে’ না গিয়ে যারা এখন ‘আইসিইউ’-তে আছে, তাদের চিহ্নিত করে পুঁজি বা ওয়ার্কিং ক্যাপিটাল দেওয়া উচিত। এতে কর্মসংস্থান দ্রুত বাড়বে। তবে বন্ধ কারখানা চালুর প্রক্রিয়াটি সময়সাপেক্ষ। সিএমএসএমই এবং কৃষি খাতে যে জোর দেওয়া হয়েছে, তা প্রশংসনীয়। কারণ, অপ্রাতিষ্ঠআনিক খাত এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগ পর্যায়ের সবচেয়ে বেশি কর্মসংস্থান হয়।
চরচা: প্রধানমন্ত্রী একটি ঘোষণা দিয়েছেন যে, যারা বাইরে থেকে বিনিয়োগ আনবেন, তাদের ১.৫ শতাংশ প্রণোদনা দেওয়া হবে। এটি বাস্তবায়নের সম্ভাবনা কেমন?
মুসলিম চৌধুরী: উদ্দেশ্যটি ভালো, তবে এটি বাস্তবায়নের জন্য একটি শক্ত রেগুলেটরি এনভায়রনমেন্ট এবং জবাবদিহির কাঠামো প্রয়োজন। ব্রোকারেজের মতো বিষয় হলেও যাদের পিয়ার রিলেশনশিপ ভালো এবং যারা দক্ষ, তারা এটাকে ভেঞ্চার হিসেবে নিতে পারেন। প্রবাসী বাংলাদেশি নাগরিকদের মধ্যেও অনেক প্রভাবশালী ব্যক্তি রয়েছেন, যারা বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে পারেন। সরকারি মেশিনারিজের চেয়ে ভালো নেটওয়ার্কিং আছে–এমন ব্যক্তিরা বিদেশি বিনিয়োগ আনার ক্ষেত্রে বেশি কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেন।
চরচা: আমাদের দেশে পরিচলন ব্যয় উন্নয়ন বাজেটের চেয়ে অনেক বেশি–প্রায় দ্বিগুণ। অন্যান্য দেশেও কি পরিস্থিতি এমন?
মুসলিম চৌধুরী: এক সময় প্রতিবেশী দেশগুলোতেও পরিচলন ব্যয় বেশি ছিল। কিন্তু কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা ফোর্থ ইন্ডাস্ট্রিয়াল রেভল্যুশনের প্রভাবে এখন এই ব্যয় কমানোর বড় সুযোগ আছে। আমাদের প্রশাসনিক কাঠামোতে ‘প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাস’ প্রয়োজন। ৩০-৪০ বছর আগে এনাম কমিটির মাধ্যমে যে প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাস হয়েছিল, এরপর আর তেমন কিছু হয়নি। বর্তমানে অটোমেশনের ফলে অনেক ক্ষেত্রে লোকবলের প্রয়োজনীয়তা কমেছে। যেমন–জিটুপি (G2P) পদ্ধতিতে ৯-১০ লাখ পেনশনভোগীকে সরাসরি ব্যাংক অ্যাকাউন্টে টাকা পাঠানো হচ্ছে। এই পুরো প্রক্রিয়াটি এখন ফেসলেস বা ডিজিটাল। এতে সোনালী ব্যাংক বা বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রায় ১০ হাজার কর্মীর কাজ এখন একটি ছোট অফিসের মাধ্যমে করা সম্ভব। অথচ এখনও আগের মতোই পদ এবং লোকবল নিয়োগ চলছে। বর্তমানে সরকারি চাকরিতে প্রায় ৫ লাখ শূন্য পদের কথা বলা হচ্ছে। অথচ লোকবল আছে ১২-১৫ লাখ। আসলে এই শূন্য পদগুলোর প্রয়োজনীয়তা কতটুকু, তা আগে যাচাই করা দরকার। ২০১৫ সালের পে-স্কেল অনুযায়ী ৫ শতাংশ ইনক্রিমেন্ট দিয়েও বর্তমানে টাকার মান অনুযায়ী তাদের প্রকৃত বেতন এক-তৃতীয়াংশও নেই।
চরচা: রাষ্ট্রায়ত্ত খাতের লোকসানি প্রতিষ্ঠানগুলো এখনও আমাদের বড় সমস্যা। এর দায়ভার আর কতদিন বহন করা উচিত?
মুসলিম চৌধুরী: ১৯৭১ সালের পর অনেক পাকিস্তানি মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান জাতীয়করণ করা হয়েছিল। কারণ, তখন বেসরকারি খাত শক্তিশালী ছিল না। কিন্তু ১৯৯১ সালের পর আমরা পুঁজিবাদী অর্থনীতির দিকে ঝুঁকেছি। বর্তমানে এই প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে লাভ করার কথা, লোকসান দেওয়ার কথা নয়। টেলিকম খাতে যেমন আগে শুধু বিটিসিএল ছিল, এখন বেসরকারি অনেক অপারেটর সফলভাবে কাজ করছে। যেসব খাতে বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ভালো করছে, সেখানে রাষ্ট্রায়ত্ত লোকসানি প্রতিষ্ঠানগুলো টিকিয়ে রাখার কোনো মানে হয় না। সরকারের এ ব্যাপারে সাহসী সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন।
চরচা: আমাদের রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর বর্তমান অবস্থা এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে আপনার মতামত কী?
মুসলিম চৌধুরী: আমাদের দেশে একসময় বিটিটিবি (বর্তমানে বিটিসিএল) একচেটিয়া ব্যবসা করত। কিন্তু মোবাইলের আগমনের পর গ্রামীণফোনসহ বেসরকারি খাতের সাথে প্রতিযোগিতায় তারা পিছিয়ে পড়ে। রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলোতে একটি বড় সমস্যা হলো ‘কনফ্লিক্ট অব ইন্টারেস্ট’। সরকার এখানে মালিক, কিন্তু সরকারের প্রতিনিধি হিসেবে যারা এই প্রতিষ্ঠানগুলো পরিচালনা করেন (সরকারি কর্মকর্তারা), তাদের মধ্যে সেই মালিকানাবোধ বা প্রফিট মেকিংয়ের তাগিদ থাকে না। তারা বড়জোর তিন বছর বা তারও কম সময়ের জন্য দায়িত্বে থাকেন এবং অনেক সময় সংশ্লিষ্ট ব্যবসা সম্পর্কে তাদের কোনো বিশেষ জ্ঞানও থাকে না। ফলে এই প্রতিষ্ঠানগুলো বছরের পর বছর লোকসান দিয়ে আসছে। অথচ এদের অনেক মূল্যবান জমি ও সম্পদ অলস পড়ে আছে। আমার পরামর্শ হলো, এই সম্পদগুলো লিজ দেওয়া অথবা পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপের মাধ্যমে বেসরকারি খাতকে ব্যবহার করে প্রোডাক্টিভ করে তোলা। পর্যায়ক্রমে সরকারকে এসব ব্যবসা থেকে নিজেদের সরিয়ে নিতে হবে।
চরচা: আপনি একটি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের চেয়ারম্যান ছিলেন। আমাদের কি আসলেই এতগুলো রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের প্রয়োজন আছে?
মুসলিম চৌধুরী: আমি মনে করি না এতগুলো ব্যাংকের প্রয়োজন আছে। সোনালী ব্যাংকের মতো বড় একটি ব্যাংক সরকারি নিয়ন্ত্রণে রেখে বাকিগুলোর মালিকানা ছেড়ে দেওয়া উচিত। এগুলো যখন কমার্শিয়াল বেসিসে বেসরকারি মালিকানায় চলবে, তখন তাদের জবাবদিহি বাড়বে। ভারতও এই কাজ করেছে। রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান ও ব্যাংকের শেয়ার ছেড়ে দিয়ে যে বিশাল তহবিল পাওয়া যাবে, তা দিয়ে বড় বাজেটের অর্থসংস্থান করা সম্ভব। এতে সরকারকে বাইরে থেকে চড়া সুদে ঋণ নিতে হবে না।
চরচা: শেয়ার বাজার থেকে সরকারের অর্থ সংগ্রহের সম্ভাবনা কতটা?
মুসলিম চৌধুরী: সরকার সরাসরি শেয়ার বাজার থেকে টাকা সংগ্রহ করতে পারে না। তবে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলোকে তালিকাভুক্ত করে শেয়ার বিক্রির মাধ্যমে বড় অঙ্কের তহবিল সংগ্রহ করতে পারে।
চরচা: মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সরকার কিছু নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যে কর কমিয়েছে, কিন্তু আবার সরকারি কর্মকর্তাদের বেতন বাড়ানো হয়েছে। এতে মুদ্রাস্ফীতি কি আরও বাড়বে না?
মুসলিম চৌধুরী: বেতন বৃদ্ধির বিষয়টি আমি একটু ভিন্নভাবে দেখি। ২০১৫ সালের পর গত ১০-১১ বছরে আর কোনো পে-স্কেল হয়নি, যদিও নিয়ম অনুযায়ী প্রতি ৫ বছর অন্তর হওয়ার কথা। মুদ্রাস্ফীতির কারণে সরকারি কর্মকর্তাদের বর্তমান বেতনের প্রকৃত মান আগের তুলনায় প্রায় এক-তৃতীয়াংশে নেমে এসেছে। তবে বেতন বৃদ্ধির পাশাপাশি ‘রাইট সাইজিং’ বা প্রশাসনিক সংস্কার জরুরি। ৫ লাখ নতুন পদ পূরণ না করে বরং অটোমেশন ও এআই ব্যবহার করে লোকবল কমানো উচিত। এতে খরচ কমবে এবং সেভিংস বাড়বে।
চরচা: বাজেট বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সুশাসনের অভাব নিয়ে সবসময় আলোচনা হয়। এর প্রতিকার কী?
মুসলিম চৌধুরী: বাজেট বাস্তবায়নের দক্ষতা বাড়ানো এবং সুশাসন নিশ্চিত করতে কাঠামোগত সংস্কারের কোনো বিকল্প নেই। আমাদের দেশে বাজেট বাস্তবায়ন–তা রাজস্ব আদায় হোক বা ব্যয়–প্রতি বছরই লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে ব্যর্থ হচ্ছে। এই ব্যর্থতার অন্যতম কারণ হলো কেন্দ্রীয়ভাবে সব সিদ্ধান্ত নেওয়া। কুড়িগ্রাম বা বান্দরবানের কোনো দুর্গম এলাকার খরচের সিদ্ধান্তও যখন ঢাকা থেকে নেওয়া হয়, তখন তা স্থানীয় চাহিদার সাথে মেলে না।
চরচা: তাহলে এর কার্যকর সমাধান কী হতে পারে?
মুসলিম চৌধুরী: সমাধান হলো ‘ডিভোলিউশন’ (Devolution) বা ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ। আমি এটাকে তিনটি ‘F’ দিয়ে ব্যাখ্যা করি: ফিন্যান্স (Finance), ফাংশন (Function) এবং ফাংশনারি (Functionary)।
১. ফিন্যান্স: কেন্দ্রীয় সরকার থেকে স্থানীয় সরকারকে গ্র্যান্ট বা বরাদ্দ দেওয়া হবে এবং স্থানীয় সরকার তাদের চাহিদা অনুযায়ী তা খরচ করবে।
২. ফাংশন: কোন খাতে কত টাকা বরাদ্দ হবে, সেই সিদ্ধান্ত স্থানীয়ভাবেই হবে, কেন্দ্র থেকে ডিক্টেট করা হবে না।
৩. ফাংশনারি: যারা কাজ করবেন বা কর্মকর্তা-কর্মচারী, তারা স্থানীয় সরকারের অধীনে থাকবেন।
এই তিনটি ‘F’ যখন একসাথে স্থানীয়ভাবে কাজ করবে, তখন একটি ‘বটম-আপ’ পদ্ধতি তৈরি হবে। স্থানীয় জনগণ তাদের প্রতিনিধিদের জবাবদিহির আওতায় আনতে পারবে এবং বাজেটের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত হবে। এটিই একমাত্র টেকসই কাঠামোগত সংস্কার হতে পারে।
চরচা: স্থানীয় সরকারের ক্ষমতায়ন এবং বাজেটের কার্যকারিতা নিয়ে আপনার আর কী বলার আছে?
মুসলিম চৌধুরী: স্থানীয় সরকারগুলো যদি ফিন্যান্স, ফাংশন এবং ফাংশনারি–এই তিনটি বিষয় একত্রে পায় এবং তাদের স্বায়ত্তশাসন নিশ্চিত হয়, তবে বাজেটের কার্যকারিতা বাড়বে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, এমনকি সামাজিক নিরাপত্তা ও অবকাঠামো উন্নয়নের (যেমন কোথায় ব্রিজ বা কালভার্ট হবে) সিদ্ধান্তগুলো স্থানীয় পর্যায়ে নেওয়া উচিত। এখন কেন্দ্রীয়ভাবে বাজেট থেকে ব্রিজের অবস্থান ঠিক হয়, যা অনেক সময় রাস্তার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয় না। তিনটি ‘এফ’ মডেল কার্যকর হলে বাজেট বাস্তবায়ন যেমন দক্ষ হবে, তেমনি স্থানীয় পর্যায়ে কর আদায়ের সম্ভাবনাও বাড়বে। এ ছাড়া স্থানীয় সরকারগুলোর পারফরম্যান্স মনিটরিংয়ের জন্য একটি কেন্দ্রীয় করপোরেট বডি (যেমন- স্থানীয় সরকার কমিশন) থাকা প্রয়োজন।
চরচা: বাজেট বরাদ্দ ও ব্যয়ের ক্ষেত্রে ক্ষমতাসীন দলের যে প্রভাব বা নিয়ন্ত্রণ থাকে, তা থেকে বেরিয়ে আসার উপায় কী?
মুসলিম চৌধুরী: এটি মূলত সুশাসন ও রাজনৈতিক সদিচ্ছার বিষয়। আমি আগেই বলেছি, তিনটি ‘এফ’ যদি স্থানীয় পর্যায়ে কার্যকর হয়, তবে কেন্দ্রীয় খবরদারি করার সুযোগ কমে আসবে। এটি একটি কাঠামোগত পরিবর্তন, যা রাজনৈতিক সদিচ্ছা ছাড়া সম্ভব নয়।
চরচা: উপজেলা ও জেলা পরিষদ নির্বাচনে দলীয় প্রতীক না থাকার সিদ্ধান্তকে আপনি কীভাবে দেখছেন?
মুসলিম চৌধুরী: এটি সরকারের একটি ইতিবাচক সদিচ্ছার বহিঃপ্রকাশ। প্রতীক না থাকা মানেই আপনি স্থানীয় পর্যায়কে কিছুটা আলাদা করতে চাইছেন। তবে এই সদিচ্ছাকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে একটি অনুকূল পরিবেশ তৈরি করা প্রয়োজন।
চরচা: নারী সংসদ সদস্যদের নির্দিষ্ট এলাকায় বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্যের সাথে কাজ করার যে সরকারি সিদ্ধান্তের কথা শোনা যাচ্ছে, সে বিষয়ে আপনার মতামত কী?
মুসলিম চৌধুরী: স্থানীয় সরকার কাঠামো যদি শক্তিশালী হয় এবং তিনটি ‘এফ’ কার্যকর থাকে, তবে এ ধরনের রাজনৈতিক সমীকরণের প্রয়োজন পড়বে না। কাঠামোগত পরিবর্তনই দীর্ঘমেয়াদী সমাধান।
চরচা: সবশেষে, ৩০ জুনের আগে বাজেট নিয়ে আপনার কোনো নির্দিষ্ট আপত্তি বা পরামর্শ আছে কী?
মুসলিম চৌধুরী: অর্থমন্ত্রী যখন এটাকে ‘রিকভারি ইয়ার’ হিসেবে ঘোষণা করেন, তখন তা একটি ‘অনেস্ট কনফেশন’ বলে মনে হয়। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য, ইভি বা সেমিকন্ডাক্টরের ওপর গুরুত্ব দেওয়া একটি ইতিবাচক দিক। তবে আমার প্রধান গুরুত্ব থাকবে প্রশাসনিক কাঠামো সংস্কারে। বর্তমান পুরনো কাঠামো এই বড় বাজেটের ভার বহন করতে পারছে না। এনবিআর-এর নীতি ও বাস্তবায়ন বিভাগ আলাদা করার বিষয়টি তাড়াহুড়ো করে করা হয়েছে, যা পুনর্বিবেচনা করা উচিত। এনবিআর বোর্ডকে আরও ক্ষমতাবান করা দরকার। এ ছাড়া সংসদীয় স্থায়ী কমিটিগুলোর মাধ্যমে জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। এমপিদের ব্যক্তিগত স্তরে তদারকির চেয়ে করপোরেট লেভেলে স্থায়ী কমিটির মাধ্যমে জবাবদিহি প্রতিষ্ঠা করা গেলে সুশাসন ও স্বচ্ছতা বাড়বে।
চরচা: আপনাকে অনেক ধন্যবাদ আমাদের সময় দেওয়ার জন্য।
মুসলিম চৌধুরী: ধন্যবাদ আপনাকেও।

বিএনপি সরকারের প্রথম বাজেট উপস্থাপন হলো ১১ জুন। এই বাজেটে জনগণ কী পেল, সরকারের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির প্রতিফলন কতটা ঘটল–এসব নিয়ে চরচা সংলাপ-এ কথা বলেছেন সাবেক অর্থসচিব ও বাংলাদেশের সাবেক অডিটর জেনারেল মোহাম্মদ মুসলিম চৌধুরী, যিনি সোনালী ব্যাংকেরও চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। এ ছাড়া দুইবার ছিলেন বাজেট প্রক্রিয়ার সাথে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন চরচা সম্পাদক সোহরাব হাসান
চরচা: বাজেট তো ঘোষিত হলো, আমরা ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়াও দেখলাম। একটা কঠিন সময়ে বাজেট হলো। বাজেট নিয়ে চরচা গোলটেবিল আলোচনায় আপনারা অনেক পরামর্শ দিয়েছিলেন, উদ্বেগের কথাও জানিয়েছিলেন। বাজেট ঘোষণার পর আপনার অনুভূতি জানতে চাই।
মুসলিম চৌধুরী: জনগণ কর্তৃক নির্বাচিত একটা ডেমোক্রেটিক সরকার ক্ষমতায় এসেছে। নির্বাচনী ইশতেহারে কিছু কমিটমেন্টও ওনাদের ছিল। নির্বাচনী ইশতেহারের সে কমিটমেন্ট বাস্তবায়নকে সামনে রেখেই সম্ভবত নির্বাচিত সরকার জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষা পূরণের উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে একটা বাজেট দিয়েছে। এক্সপেন্ডিচার (ব্যয়) হিসেবে যদি চিন্তা করেন, তাহলে বাজেট সাইজটা বেশ বড়। রেভিনিউ (রাজস্ব) টার্গেটও বড়। এই হিসেবে আমি মনে করি, ইশতেহারের যে সমস্ত অবজেকটিভ আছে, তা পূরণ করতে গিয়েই অনেক জায়গায় বাজেটের আকার ওনাদের বেশি দিতে হয়েছে। যেমন–শিক্ষার জন্য দেখা গেছে অতীতের সবচেয়ে বড় বাজেট সাইজেও জিডিপির ১ শতাংশের একটু বেশি ছিল, এবার ২ শতাংশ (বরাদ্দ) দিয়েছে। স্বাস্থ্য খাতেও কিছুটা বাড়ানো হয়েছে। আর সামাজিক নিরাপত্তাতে বেশ কিছু ওনাদের ফ্ল্যাগশিপ বা সিগনেচার প্রোগ্রাম আছে–যেমন ফ্যামিলি কার্ড, কৃষি কার্ড ইত্যাদি। এই কারণে সামাজিক নিরাপত্তা খাতেও বাজেটের আকার বেড়েছে। তো সবদিক মিলে জনগণের কল্যাণে ইশতেহারের টার্গেট পূরণে তারা বাজেট করেছে এবং এই বাজেট উচ্চাভিলাষী ও চ্যালেঞ্জিং হলেও আমি এটাকে ইলেকশন কমিটমেন্টের রিফ্লেকশন হিসেবে পজিটিভলি নিতে চাই।
চরচা: এখানে প্রত্যাশা এবং বাস্তবতার মধ্যে ফারাক কতটা?
মুসলিম চৌধুরী: ফারাকটা আপনি যদি এভাবে ভাগ করে দেখেন, এক্সপেন্ডিচারের সাইজের সাথে যদি রেভিনিউ কম্পেয়ার করেন–আমরা জানি যে, বাজেটের অর্থ সংস্থানটা মূলত দুই সোর্স থেকে হয়; একটা হলো রেভিনিউ, আরেকটা হলো বরোয়িং (ঋণ)। রেভিনিউয়ের ক্ষেত্রে আমাদের ট্যাক্স রেভিনিউটা প্রধান। আপনারা জানেন যে, আমাদের অতীত ইতিহাসে কোনো সময়েই এন্ড অব দ্য ইয়ারে গিয়ে নির্ধারিত করের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হয় না। ২০২৫-২৬ সালেও এর ব্যতিক্রম হওয়ার কথা নয়। অলরেডি আপনারা জানেন ১০ মাসে প্রায় ১ লাখ কোটি টাকার উপরে রেভিনিউ টার্গেট অর্জন করা যায়নি। এবং আগামী দুই মাসেও ডেফিনেটলি এটা টার্গেটে পৌঁছাবে না।
চরচা: দুই মাস তো না, মানে ৩০ জুনের মধ্যে?
মুসলিম চৌধুরী: হ্যাঁ। তো এখন ওইটাকে যদি আপনি কনটেক্সটে নিয়ে চিন্তা করেন, তাহলে এবারের যে বাজেটের রেভিনিউ টার্গেট এস্টিমেট করা হয়েছে, তা গত বছরের মূল লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে প্রায় ১৭ শতাংশ বেশি। আর যদি অ্যাকচুয়াল অ্যাচিভমেন্টের সাথে কম্পেয়ার করেন, তবে এটা প্রায় ৩০-৪০ শতাংশ বেশি হবে। কাজেই এই রেভিনিউ টার্গেট অ্যাচিভ করাটা সরকারের জন্য একটা বড় চ্যালেঞ্জ হবে।
চরচা: যদি রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা পূরণ না হয়, তবে সরকারের করণীয় হচ্ছে ঋণ করা?
মুসলিম চৌধুরী: একটা হলো এক্সপেন্ডিচারের ক্ষেত্রে আমি আগেই বলেছি যে, অ্যাকচুয়াল এক্সপেন্ডিচার টার্গেটেড এক্সপেন্ডিচারের খুব একটা কাছাকাছি যায় না। কাজেই ওখানে একটা স্পেস তৈরি হবে যে, খরচ একটু কমবে। কিন্তু খরচ কমার পরও বরোয়িং (ঋণ করার) টার্গেট বাড়াতে হয়। এই বরোয়িং-এর ক্ষেত্রে আমরা এস্টিমেট করি ডোমেস্টিক বরোয়িং (অভ্যন্তরীণ ঋণ) আর ফরেন বরোয়িং (বৈদেশিক ঋণ)। ডোমেস্টিক বরোয়িংয়ের একটা বড় দিক হলো ম্যাক্রো-ইকোনমিতে এর দুটি খাতক আছে। একটি খাতক হলো প্রাইভেট সেক্টর, যারা সবচেয়ে বড় এমপ্লয়মেন্ট এরিয়া তৈরি করে, ঋণ নিয়ে ইনভেস্টমেন্ট করে। আর অন্য খাতক হলো সরকার। এখন ঝুঁকিটা হবে সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতা প্রেক্ষাপটে। সরকার তার বাজেট টার্গেট মিট করতে গিয়ে বাজেটের মধ্যে একটা বড় অংশ আছে পরিচলন ব্যয়। পরিচলন ব্যয় কিন্তু স্ট্যান্ডিং চার্জের মতো, এতে সেভিংস হয় না। সেভিংস যা হওয়ার, তা হয় উন্নয়ন ব্যয়ের ওপর। তো পরিচলন ব্যয় এবং উন্নয়ন ব্যয়–দুটোই মিট করতে হলে ব্যাংকিং সিস্টেম থেকে সরকারকে বেশি ঋণ নিতে হবে। সরকার যদি ঋণ বেশি করে, তবে প্রাইভেট সেক্টরের এক্সেস টু ফাইনান্স বা ঋণের সুযোগ কমবে, তাদের বরোয়িং কস্টও বাড়বে। আলটিমেটলি এটাকে টেকনিক্যালি ‘ক্রাউডিং আউট ইফেক্ট’ বলে–অর্থাৎ, বেসরকারি খাত তার প্রয়োজনীয় বিনিয়োগের জন্য টাকা পাবে না। যেহেতু সরকারের ফোর্স বেশি থাকে, সরকার চাইলে বড় অঙ্কের ঋণ নেবেই। এটা একটা সামষ্টিক ইমব্যালেন্স হওয়ার আশঙ্কা তৈরি করে।
চরচা: এক্ষেত্রে আরও একটা অপশন আছে–টাকা ছাপানো।
মুসলিম চৌধুরী: আর একটা অপশন আছে, যেটা বেশ ডেঞ্জারাস; এই মুহূর্তে এটা আরও বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। যেহেতু আমাদের ইনফ্লেশন (মুদ্রাস্ফীতি) অলরেডি গত মাসে ৯.৪২ শতাংশ ছিল, তাই এটি আরও ওপরের দিকে ওঠার আশঙ্কা আছে। এ রকম উচ্চ মূল্যস্ফীতির পরিস্থিতিতে টাকা সরবরাহ বাড়িয়ে বা টাকা ছাপিয়ে ঋণ করলে মুদ্রাস্ফীতি আরও বাড়বে।
সব দিক মিলিয়ে অর্থমন্ত্রী নিজেও বলছেন যে, এবারের বাজেটটা আসলে ‘রিকভারির’। কারণ, ম্যাক্রো ইকোনমিক ইন্ডিকেটরগুলা–যেমন এক্সপোর্ট, রেমিট্যান্স, ইনফ্লেশন, জিডিপি গ্রোথ, প্রাইভেট সেক্টর ক্রেডিট এবং ব্যাংকিং সেক্টরের এনপিএল–সবকিছুই এখন একটু নড়বড়ে অবস্থায় আছে। এই অবস্থায় অর্থমন্ত্রী বললেন যে, এবারের বাজেট ‘রিকভারি অ্যান্ড স্ট্যাবিলিটি’র জন্য, নট রিস্টোরেশন। তিনি পাঁচ বছরের একটা পরিকল্পনা দিয়েছেন যে, এবার ইকোনমি রিকভার হবে এবং সামষ্টিক অর্থনীতির চলকগুলোকে স্ট্যাবিলাইজ করার চেষ্টা করবেন। সামষ্টিক অর্থনীতির চ্যালেঞ্জ সত্ত্বেও সরকার একটা উচ্চাভিলাষী ও বড় বাজেট দেওয়ার চেষ্টা করেছে। এখন দেখা যাক বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে তা কী দাঁড়ায়।
চরচা: বেকারত্ব বাংলাদেশের একটি বড় সমস্যা। গত দু-বছরে বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ তেমন একটা হয়নি। এই অবস্থায় সরকার কিছু সৃজনশীল পরিকল্পনা নিয়েছে; যেমন–বন্ধ কলকারখানা চালু, তরুণ উদ্যোক্তাদের প্রণোদনা দেওয়া ইত্যাদি। আগামী এক বছরে কর্মসংস্থানের কতটা সম্ভাবনা আপনি দেখছেন এবং বিনিয়োগ বাড়ানোর এই চেষ্টা কতটা সফল হতে পারে?
মুসলিম চৌধুরী: বন্ধ কলকারখানা, কৃষি ও এসএমই খাতের জন্য সব মিলিয়ে প্রায় ৬০ হাজার কোটি টাকার একটি বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এর লক্ষ্য হলো–প্রায় ১ লাখ কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা। আমাদের দেশে প্রতি বছর প্রায় ২০ থেকে ৩০ লাখ মানুষ শ্রমবাজারে নতুন করে যুক্ত হচ্ছে। তাদের কর্মসংস্থানের বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ ছাড়া সরকার ব্যবসা সহজ করার জন্য (Ease of doing business) কিছু ট্যাক্স রিফান্ড, ই-ভ্যাট রিটার্ন এবং ট্যাক্স এক্সেমশন দেওয়ার মতো কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে। তবে বন্ধ কলকারখানা চালুর বিষয়ে আমি মনে করি, আগে দেখতে হবে সেগুলো বন্ধ হওয়ার কারণ কী ছিল। আমার মতে, যেসব ব্যবসা প্রতিষ্ঠান এখন সংকটে আছে, কিন্তু ভালো করার সম্ভাবনা আছে; অর্থাৎ, ‘মর্গে’ না গিয়ে যারা এখন ‘আইসিইউ’-তে আছে, তাদের চিহ্নিত করে পুঁজি বা ওয়ার্কিং ক্যাপিটাল দেওয়া উচিত। এতে কর্মসংস্থান দ্রুত বাড়বে। তবে বন্ধ কারখানা চালুর প্রক্রিয়াটি সময়সাপেক্ষ। সিএমএসএমই এবং কৃষি খাতে যে জোর দেওয়া হয়েছে, তা প্রশংসনীয়। কারণ, অপ্রাতিষ্ঠআনিক খাত এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগ পর্যায়ের সবচেয়ে বেশি কর্মসংস্থান হয়।
চরচা: প্রধানমন্ত্রী একটি ঘোষণা দিয়েছেন যে, যারা বাইরে থেকে বিনিয়োগ আনবেন, তাদের ১.৫ শতাংশ প্রণোদনা দেওয়া হবে। এটি বাস্তবায়নের সম্ভাবনা কেমন?
মুসলিম চৌধুরী: উদ্দেশ্যটি ভালো, তবে এটি বাস্তবায়নের জন্য একটি শক্ত রেগুলেটরি এনভায়রনমেন্ট এবং জবাবদিহির কাঠামো প্রয়োজন। ব্রোকারেজের মতো বিষয় হলেও যাদের পিয়ার রিলেশনশিপ ভালো এবং যারা দক্ষ, তারা এটাকে ভেঞ্চার হিসেবে নিতে পারেন। প্রবাসী বাংলাদেশি নাগরিকদের মধ্যেও অনেক প্রভাবশালী ব্যক্তি রয়েছেন, যারা বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে পারেন। সরকারি মেশিনারিজের চেয়ে ভালো নেটওয়ার্কিং আছে–এমন ব্যক্তিরা বিদেশি বিনিয়োগ আনার ক্ষেত্রে বেশি কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেন।
চরচা: আমাদের দেশে পরিচলন ব্যয় উন্নয়ন বাজেটের চেয়ে অনেক বেশি–প্রায় দ্বিগুণ। অন্যান্য দেশেও কি পরিস্থিতি এমন?
মুসলিম চৌধুরী: এক সময় প্রতিবেশী দেশগুলোতেও পরিচলন ব্যয় বেশি ছিল। কিন্তু কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা ফোর্থ ইন্ডাস্ট্রিয়াল রেভল্যুশনের প্রভাবে এখন এই ব্যয় কমানোর বড় সুযোগ আছে। আমাদের প্রশাসনিক কাঠামোতে ‘প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাস’ প্রয়োজন। ৩০-৪০ বছর আগে এনাম কমিটির মাধ্যমে যে প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাস হয়েছিল, এরপর আর তেমন কিছু হয়নি। বর্তমানে অটোমেশনের ফলে অনেক ক্ষেত্রে লোকবলের প্রয়োজনীয়তা কমেছে। যেমন–জিটুপি (G2P) পদ্ধতিতে ৯-১০ লাখ পেনশনভোগীকে সরাসরি ব্যাংক অ্যাকাউন্টে টাকা পাঠানো হচ্ছে। এই পুরো প্রক্রিয়াটি এখন ফেসলেস বা ডিজিটাল। এতে সোনালী ব্যাংক বা বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রায় ১০ হাজার কর্মীর কাজ এখন একটি ছোট অফিসের মাধ্যমে করা সম্ভব। অথচ এখনও আগের মতোই পদ এবং লোকবল নিয়োগ চলছে। বর্তমানে সরকারি চাকরিতে প্রায় ৫ লাখ শূন্য পদের কথা বলা হচ্ছে। অথচ লোকবল আছে ১২-১৫ লাখ। আসলে এই শূন্য পদগুলোর প্রয়োজনীয়তা কতটুকু, তা আগে যাচাই করা দরকার। ২০১৫ সালের পে-স্কেল অনুযায়ী ৫ শতাংশ ইনক্রিমেন্ট দিয়েও বর্তমানে টাকার মান অনুযায়ী তাদের প্রকৃত বেতন এক-তৃতীয়াংশও নেই।
চরচা: রাষ্ট্রায়ত্ত খাতের লোকসানি প্রতিষ্ঠানগুলো এখনও আমাদের বড় সমস্যা। এর দায়ভার আর কতদিন বহন করা উচিত?
মুসলিম চৌধুরী: ১৯৭১ সালের পর অনেক পাকিস্তানি মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান জাতীয়করণ করা হয়েছিল। কারণ, তখন বেসরকারি খাত শক্তিশালী ছিল না। কিন্তু ১৯৯১ সালের পর আমরা পুঁজিবাদী অর্থনীতির দিকে ঝুঁকেছি। বর্তমানে এই প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে লাভ করার কথা, লোকসান দেওয়ার কথা নয়। টেলিকম খাতে যেমন আগে শুধু বিটিসিএল ছিল, এখন বেসরকারি অনেক অপারেটর সফলভাবে কাজ করছে। যেসব খাতে বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ভালো করছে, সেখানে রাষ্ট্রায়ত্ত লোকসানি প্রতিষ্ঠানগুলো টিকিয়ে রাখার কোনো মানে হয় না। সরকারের এ ব্যাপারে সাহসী সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন।
চরচা: আমাদের রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর বর্তমান অবস্থা এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে আপনার মতামত কী?
মুসলিম চৌধুরী: আমাদের দেশে একসময় বিটিটিবি (বর্তমানে বিটিসিএল) একচেটিয়া ব্যবসা করত। কিন্তু মোবাইলের আগমনের পর গ্রামীণফোনসহ বেসরকারি খাতের সাথে প্রতিযোগিতায় তারা পিছিয়ে পড়ে। রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলোতে একটি বড় সমস্যা হলো ‘কনফ্লিক্ট অব ইন্টারেস্ট’। সরকার এখানে মালিক, কিন্তু সরকারের প্রতিনিধি হিসেবে যারা এই প্রতিষ্ঠানগুলো পরিচালনা করেন (সরকারি কর্মকর্তারা), তাদের মধ্যে সেই মালিকানাবোধ বা প্রফিট মেকিংয়ের তাগিদ থাকে না। তারা বড়জোর তিন বছর বা তারও কম সময়ের জন্য দায়িত্বে থাকেন এবং অনেক সময় সংশ্লিষ্ট ব্যবসা সম্পর্কে তাদের কোনো বিশেষ জ্ঞানও থাকে না। ফলে এই প্রতিষ্ঠানগুলো বছরের পর বছর লোকসান দিয়ে আসছে। অথচ এদের অনেক মূল্যবান জমি ও সম্পদ অলস পড়ে আছে। আমার পরামর্শ হলো, এই সম্পদগুলো লিজ দেওয়া অথবা পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপের মাধ্যমে বেসরকারি খাতকে ব্যবহার করে প্রোডাক্টিভ করে তোলা। পর্যায়ক্রমে সরকারকে এসব ব্যবসা থেকে নিজেদের সরিয়ে নিতে হবে।
চরচা: আপনি একটি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের চেয়ারম্যান ছিলেন। আমাদের কি আসলেই এতগুলো রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের প্রয়োজন আছে?
মুসলিম চৌধুরী: আমি মনে করি না এতগুলো ব্যাংকের প্রয়োজন আছে। সোনালী ব্যাংকের মতো বড় একটি ব্যাংক সরকারি নিয়ন্ত্রণে রেখে বাকিগুলোর মালিকানা ছেড়ে দেওয়া উচিত। এগুলো যখন কমার্শিয়াল বেসিসে বেসরকারি মালিকানায় চলবে, তখন তাদের জবাবদিহি বাড়বে। ভারতও এই কাজ করেছে। রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান ও ব্যাংকের শেয়ার ছেড়ে দিয়ে যে বিশাল তহবিল পাওয়া যাবে, তা দিয়ে বড় বাজেটের অর্থসংস্থান করা সম্ভব। এতে সরকারকে বাইরে থেকে চড়া সুদে ঋণ নিতে হবে না।
চরচা: শেয়ার বাজার থেকে সরকারের অর্থ সংগ্রহের সম্ভাবনা কতটা?
মুসলিম চৌধুরী: সরকার সরাসরি শেয়ার বাজার থেকে টাকা সংগ্রহ করতে পারে না। তবে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলোকে তালিকাভুক্ত করে শেয়ার বিক্রির মাধ্যমে বড় অঙ্কের তহবিল সংগ্রহ করতে পারে।
চরচা: মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সরকার কিছু নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যে কর কমিয়েছে, কিন্তু আবার সরকারি কর্মকর্তাদের বেতন বাড়ানো হয়েছে। এতে মুদ্রাস্ফীতি কি আরও বাড়বে না?
মুসলিম চৌধুরী: বেতন বৃদ্ধির বিষয়টি আমি একটু ভিন্নভাবে দেখি। ২০১৫ সালের পর গত ১০-১১ বছরে আর কোনো পে-স্কেল হয়নি, যদিও নিয়ম অনুযায়ী প্রতি ৫ বছর অন্তর হওয়ার কথা। মুদ্রাস্ফীতির কারণে সরকারি কর্মকর্তাদের বর্তমান বেতনের প্রকৃত মান আগের তুলনায় প্রায় এক-তৃতীয়াংশে নেমে এসেছে। তবে বেতন বৃদ্ধির পাশাপাশি ‘রাইট সাইজিং’ বা প্রশাসনিক সংস্কার জরুরি। ৫ লাখ নতুন পদ পূরণ না করে বরং অটোমেশন ও এআই ব্যবহার করে লোকবল কমানো উচিত। এতে খরচ কমবে এবং সেভিংস বাড়বে।
চরচা: বাজেট বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সুশাসনের অভাব নিয়ে সবসময় আলোচনা হয়। এর প্রতিকার কী?
মুসলিম চৌধুরী: বাজেট বাস্তবায়নের দক্ষতা বাড়ানো এবং সুশাসন নিশ্চিত করতে কাঠামোগত সংস্কারের কোনো বিকল্প নেই। আমাদের দেশে বাজেট বাস্তবায়ন–তা রাজস্ব আদায় হোক বা ব্যয়–প্রতি বছরই লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে ব্যর্থ হচ্ছে। এই ব্যর্থতার অন্যতম কারণ হলো কেন্দ্রীয়ভাবে সব সিদ্ধান্ত নেওয়া। কুড়িগ্রাম বা বান্দরবানের কোনো দুর্গম এলাকার খরচের সিদ্ধান্তও যখন ঢাকা থেকে নেওয়া হয়, তখন তা স্থানীয় চাহিদার সাথে মেলে না।
চরচা: তাহলে এর কার্যকর সমাধান কী হতে পারে?
মুসলিম চৌধুরী: সমাধান হলো ‘ডিভোলিউশন’ (Devolution) বা ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ। আমি এটাকে তিনটি ‘F’ দিয়ে ব্যাখ্যা করি: ফিন্যান্স (Finance), ফাংশন (Function) এবং ফাংশনারি (Functionary)।
১. ফিন্যান্স: কেন্দ্রীয় সরকার থেকে স্থানীয় সরকারকে গ্র্যান্ট বা বরাদ্দ দেওয়া হবে এবং স্থানীয় সরকার তাদের চাহিদা অনুযায়ী তা খরচ করবে।
২. ফাংশন: কোন খাতে কত টাকা বরাদ্দ হবে, সেই সিদ্ধান্ত স্থানীয়ভাবেই হবে, কেন্দ্র থেকে ডিক্টেট করা হবে না।
৩. ফাংশনারি: যারা কাজ করবেন বা কর্মকর্তা-কর্মচারী, তারা স্থানীয় সরকারের অধীনে থাকবেন।
এই তিনটি ‘F’ যখন একসাথে স্থানীয়ভাবে কাজ করবে, তখন একটি ‘বটম-আপ’ পদ্ধতি তৈরি হবে। স্থানীয় জনগণ তাদের প্রতিনিধিদের জবাবদিহির আওতায় আনতে পারবে এবং বাজেটের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত হবে। এটিই একমাত্র টেকসই কাঠামোগত সংস্কার হতে পারে।
চরচা: স্থানীয় সরকারের ক্ষমতায়ন এবং বাজেটের কার্যকারিতা নিয়ে আপনার আর কী বলার আছে?
মুসলিম চৌধুরী: স্থানীয় সরকারগুলো যদি ফিন্যান্স, ফাংশন এবং ফাংশনারি–এই তিনটি বিষয় একত্রে পায় এবং তাদের স্বায়ত্তশাসন নিশ্চিত হয়, তবে বাজেটের কার্যকারিতা বাড়বে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, এমনকি সামাজিক নিরাপত্তা ও অবকাঠামো উন্নয়নের (যেমন কোথায় ব্রিজ বা কালভার্ট হবে) সিদ্ধান্তগুলো স্থানীয় পর্যায়ে নেওয়া উচিত। এখন কেন্দ্রীয়ভাবে বাজেট থেকে ব্রিজের অবস্থান ঠিক হয়, যা অনেক সময় রাস্তার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয় না। তিনটি ‘এফ’ মডেল কার্যকর হলে বাজেট বাস্তবায়ন যেমন দক্ষ হবে, তেমনি স্থানীয় পর্যায়ে কর আদায়ের সম্ভাবনাও বাড়বে। এ ছাড়া স্থানীয় সরকারগুলোর পারফরম্যান্স মনিটরিংয়ের জন্য একটি কেন্দ্রীয় করপোরেট বডি (যেমন- স্থানীয় সরকার কমিশন) থাকা প্রয়োজন।
চরচা: বাজেট বরাদ্দ ও ব্যয়ের ক্ষেত্রে ক্ষমতাসীন দলের যে প্রভাব বা নিয়ন্ত্রণ থাকে, তা থেকে বেরিয়ে আসার উপায় কী?
মুসলিম চৌধুরী: এটি মূলত সুশাসন ও রাজনৈতিক সদিচ্ছার বিষয়। আমি আগেই বলেছি, তিনটি ‘এফ’ যদি স্থানীয় পর্যায়ে কার্যকর হয়, তবে কেন্দ্রীয় খবরদারি করার সুযোগ কমে আসবে। এটি একটি কাঠামোগত পরিবর্তন, যা রাজনৈতিক সদিচ্ছা ছাড়া সম্ভব নয়।
চরচা: উপজেলা ও জেলা পরিষদ নির্বাচনে দলীয় প্রতীক না থাকার সিদ্ধান্তকে আপনি কীভাবে দেখছেন?
মুসলিম চৌধুরী: এটি সরকারের একটি ইতিবাচক সদিচ্ছার বহিঃপ্রকাশ। প্রতীক না থাকা মানেই আপনি স্থানীয় পর্যায়কে কিছুটা আলাদা করতে চাইছেন। তবে এই সদিচ্ছাকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে একটি অনুকূল পরিবেশ তৈরি করা প্রয়োজন।
চরচা: নারী সংসদ সদস্যদের নির্দিষ্ট এলাকায় বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্যের সাথে কাজ করার যে সরকারি সিদ্ধান্তের কথা শোনা যাচ্ছে, সে বিষয়ে আপনার মতামত কী?
মুসলিম চৌধুরী: স্থানীয় সরকার কাঠামো যদি শক্তিশালী হয় এবং তিনটি ‘এফ’ কার্যকর থাকে, তবে এ ধরনের রাজনৈতিক সমীকরণের প্রয়োজন পড়বে না। কাঠামোগত পরিবর্তনই দীর্ঘমেয়াদী সমাধান।
চরচা: সবশেষে, ৩০ জুনের আগে বাজেট নিয়ে আপনার কোনো নির্দিষ্ট আপত্তি বা পরামর্শ আছে কী?
মুসলিম চৌধুরী: অর্থমন্ত্রী যখন এটাকে ‘রিকভারি ইয়ার’ হিসেবে ঘোষণা করেন, তখন তা একটি ‘অনেস্ট কনফেশন’ বলে মনে হয়। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য, ইভি বা সেমিকন্ডাক্টরের ওপর গুরুত্ব দেওয়া একটি ইতিবাচক দিক। তবে আমার প্রধান গুরুত্ব থাকবে প্রশাসনিক কাঠামো সংস্কারে। বর্তমান পুরনো কাঠামো এই বড় বাজেটের ভার বহন করতে পারছে না। এনবিআর-এর নীতি ও বাস্তবায়ন বিভাগ আলাদা করার বিষয়টি তাড়াহুড়ো করে করা হয়েছে, যা পুনর্বিবেচনা করা উচিত। এনবিআর বোর্ডকে আরও ক্ষমতাবান করা দরকার। এ ছাড়া সংসদীয় স্থায়ী কমিটিগুলোর মাধ্যমে জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। এমপিদের ব্যক্তিগত স্তরে তদারকির চেয়ে করপোরেট লেভেলে স্থায়ী কমিটির মাধ্যমে জবাবদিহি প্রতিষ্ঠা করা গেলে সুশাসন ও স্বচ্ছতা বাড়বে।
চরচা: আপনাকে অনেক ধন্যবাদ আমাদের সময় দেওয়ার জন্য।
মুসলিম চৌধুরী: ধন্যবাদ আপনাকেও।

অর্থমন্ত্রী যখন এটাকে ‘রিকভারি ইয়ার’ হিসেবে ঘোষণা করেন, তখন তা একটি ‘অনেস্ট কনফেশন’ বলে মনে হয়। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য, ইভি বা সেমিকন্ডাক্টরের ওপর গুরুত্ব দেওয়া একটি ইতিবাচক দিক। তবে আমার প্রধান গুরুত্ব থাকবে প্রশাসনিক কাঠামো সংস্কারে। বর্তমান পুরনো কাঠামো এই বড় বাজেটের ভার বহন করতে পারছে না

২০০৮ সনে বাংলাদেশ সরকার এই প্রযুক্তিটিকে জাতীয় কার্যক্রমে অর্ন্তভূক্ত করে উত্তরাঞ্চলের ৪০ হাজার হেক্টর জমিতে ছড়িয়ে দিতে সহায়তা করে। এর পাশাপাশি আরডিআরএস রংপুরের পাঁচটি মঙ্গাপীড়িত জেলার প্রত্যন্ত অঞ্চলে ২৮টি এনজিওর মাধ্যমে ৭ হাজার কৃষকের মাঝে এই প্রযুক্তি সম্প্রসারণ করে।