পর্ব-৪

ইরান কি উত্তর কোরীয় মডেলে যাবে?

করিম সাদজাদপোর
করিম সাদজাদপোর
ইরান কি উত্তর কোরীয় মডেলে যাবে?
খামেনির দীর্ঘদিনের পছন্দ হলো এমন একটি ব্যবস্থা বজায় রাখা যেখানে সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে একজন কঠোর ধর্মগুরু শাসন করবেন। ছবি: এআই দিয়ে তৈরি

ইরান যদি জাতীয় স্বার্থের উর্ধে আদর্শিক স্বার্থকে প্রাধান্য দেয় তাহলে ইরানের ভবিষ্যৎ হতে পারে বর্তমান উত্তর কোরিয়ার মতোই-যা বৈধতা নয় বরং নিজ দেশের জনগণের ওপর নিপীড়ন এবং আন্তর্জাতিকভাবে বিচ্ছিন্নতার ওপর ভিত্তি করে টিকে আছে।

খামেনির দীর্ঘদিনের পছন্দ হলো এমন একটি ব্যবস্থা বজায় রাখা যেখানে সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে একজন কঠোর ধর্মগুরু শাসন করবেন। যিনি যেকোনো মূল্যে আমেরিকা ও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে অটল থাকবেন এবং দেশের ভেতরে ইসলামি আদর্শ কঠোরভাবে রক্ষা করবেন। কিন্তু ১৯৭৯ সালের বিপ্লবের প্রায় পাঁচ দশক পর, অল্প কিছু ইরানি ছাড়া কেউই এমন এক ব্যবস্থার অধীনে আর থাকতে চায় না, যা তাদের অর্থনৈতিক মর্যাদা ও রাজনৈতিক-সামাজিক স্বাধীনতা থেকে বঞ্চিত করে। এমন একটি শাসনব্যবস্থা টিকিয়ে রাখতে হলে প্রয়োজন হবে পূর্ণমাত্রার একনায়কতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণ। সেইসাথে বিদেশি চাপ প্রতিরোধ করতে পারমাণবিক অস্ত্র।

সেক্ষেত্রে রাষ্ট্রক্ষমতা একটা ছোট গোষ্ঠী বা পরিবারের মধ্যেই কুক্ষিগত হয়ে থাকবে। খামেনি হয়তো এমন উত্তরসূরিকে সামনে আনার চেষ্টা করবেন, যিনি বিপ্লবী নীতির প্রতি অনুগত থাকবেন। কিন্তু সম্ভাব্য কট্টরপন্থী প্রার্থীদের মধ্যে খুব কমই আছেন, যাদের জনপ্রিয়তা বা বৈধতা আছে। একসময় সবচেয়ে সম্ভাবনাময় উত্তরসূরি হিসেবে বিবেচিত ইব্রাহিম রাইসি ২০২৪ সালের মে মাসে ইরানের প্রেসিডেন্ট থাকা অবস্থায় এক হেলিকপ্টার দুর্ঘটনায় মারা যান। ফলে এখন খামেনির ৫৬ বছর বয়সী পুত্র মুজতবা সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য প্রার্থী হিসেবে উঠে এসেছেন। তবে তা বিপ্লবের অন্যতম মূলনীতি যা বংশানুক্রমিক উত্তরাধিকারের বিরুদ্ধে ছিল সেটার সঙ্গে সাংঘর্ষিক হবে। তাছাড়া খোমেনির ‘রাজতন্ত্র ইসলামবিরোধী’ বলে দেওয়া ঘোষণাকেও প্রশ্নবিদ্ধ করবে।

ইরানের রাজনীতিতে মুজতবার একক কোনো ভূমিকা নেই। তাছাড়া তার চিন্তাতেও কোনো নতুনত্ব নেই। তার সমর্থকরা তাকে সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের সাথে তুলনা করার এক হাস্যকর প্রচেষ্টা চালায় সামাজিক মাধ্যমে।

অবিশ্বাস এদেশের রাজনৈতিক পরম্পরা। কট্টরপন্থী নেতারাও কখনো তেমন চেষ্টা করেনি এই পরম্পরা ভাঙার। ৬৯ বছরের প্রধান বিচারপতি গোলাম হোসেইন মোহসেনি এজেই আসলে একজন ‘হ্যাঙ্গিং জাজ’ ছাড়া কিছুই নন। ডজন ডজন মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার সঙ্গে জড়িত তিনি। সেন্সরশিপ নিয়ে প্রশ্ন তোলায় তিনি একবার এক সাংবাদিককে জনসম্মুখে কামড়ে দিয়ে বেশ আলোচিত হয়েছিলেন। এ ধরনের কারো নেতৃত্বে যে উত্তরাধিকার প্রক্রিয়া গড়ে উঠবে, তা জনগণের সম্মতির ওপর নয়, বরং আইআরজিসির আনুগত্যের উপর নির্ভর করবে। তবে প্রশ্ন রয়ে গেছে, রিপাবলিকান গার্ডরা কি এখনো প্রবীণ আলেমদের নিয়ে গঠিত বিশেষজ্ঞ পরিষদের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকবে, যারা পরবর্তী সর্বোচ্চ নেতাকে নিয়োগের দায়িত্বে, নাকি সময় এলে তারাই নিজেরাই দেশের পরবর্তী সর্বাধিনায়ক বেছে নেবে?

যদি ইরানের আগামী যুগে আরেকজন শক্তিশালী শাসকের উত্থান ঘটে, তবে তিনি সম্ভবত পাগড়ি পরবেন না। ছবি: এআই দিয়ে তৈরি
যদি ইরানের আগামী যুগে আরেকজন শক্তিশালী শাসকের উত্থান ঘটে, তবে তিনি সম্ভবত পাগড়ি পরবেন না। ছবি: এআই দিয়ে তৈরি

ইরান যদি উত্তর কোরিয়ার মডেলেও আগায়, সেক্ষেত্রেও মানুষের মধ্যে দক্ষিণ কোরিয়ার মতো সমৃদ্ধির আকাঙ্ক্ষা থেকেই যাবে। খুব কম ইরানিই এমন একটি শাসনব্যবস্থা মেনে নেবে, যা অর্থনৈতিক কল্যাণ ও ব্যক্তিগত নিরাপত্তার চেয়ে মতাদর্শকে বেশি প্রাধান্য দেয়। এমন সর্বাধিপতি শাসন টিকিয়ে রাখতে হলে দেশে ব্যাপক বন্দিশিবির গড়ে তোলা, দক্ষ পেশাজীবীদের দেশত্যাগ, এবং বিদেশি চাপ মোকাবিলায় একটি পারমাণবিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ার প্রয়োজন হবে। কিন্তু উত্তর কোরিয়ার মতো নিজেকে সম্পূর্ণভাবে বিশ্বের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন করা ইরানের পক্ষে সম্ভব নয়। কারণ ইসরায়েল আকাশপথে আধিপত্য বিস্তার করে রেখেছে এবং বারবার প্রমাণ করেছে যে তারা ইরানের পারমাণবিক স্থাপনা, ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটি ও শীর্ষ কমান্ডারদের ওপর আঘাত হানতে সক্ষম।

যদি ইরানের পরবর্তী সর্বোচ্চ নেতা আবারও কোনো কট্টরপন্থী হন, তবে তিনি সম্ভবত হবেন এক অন্তর্বর্তী শাসক, যিনি কিছুদিনের জন্য বর্তমান ব্যবস্থা টিকিয়ে রাখবেন, কিন্তু নতুন কোনো স্থিতিশীল কাঠামো গড়তে পারবেন না। ধর্মনিরপেক্ষ চিন্তাবিদ আহমদ কাসরাভি, যাকে ১৯৪৬ সালে ইসলামপন্থীরা হত্যা করেছিল, একবার লিখেছিলেন, ইরান আলেমদের একবার শাসনের সুযোগ দিয়েছিল, যাতে তাদের সীমাবদ্ধতা সবাই বুঝতে পারে। প্রায় অর্ধশতকের ধর্মতান্ত্রিক ব্যর্থতার পর সেই অধ্যায় এখন শেষ হয়েছে। যদি ইরানের আগামী যুগে আরেকজন শক্তিশালী শাসকের উত্থান ঘটে, তবে তিনি সম্ভবত পাগড়ি পরবেন না।

**ফরেন অ্যাফেয়ার্স ডটকমে প্রকাশিত লেখাটি অনুবাদ করে প্রকাশিত**

করিম সাদজাদপোর কার্নেগি এনডাউমেন্ট ফর ইন্টারন্যাশনাল পিস-এর সিনিয়র ফেলো। ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের সাবেক ‘চিফ ইরান অ্যানালিস্ট’ সাদজাদপোরের কাজের প্রধান ক্ষেত্র ইরান এবং মধ্যপ্রাচ্য সংক্রান্ত যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র নীতি।

অনুবাদ করেছেন: রিতু চক্রবর্ত্তী

সম্পর্কিত