তত্ত্বাবধায়ক সরকার ফিরে আসায় কী প্রমাণ হলো

তত্ত্বাবধায়ক সরকার ফিরে আসায় কী প্রমাণ হলো
বাংলাদেশের সংসদ ভবন। ছবি: রয়টার্স

‘তত্ত্বাবধায়ক সরকার’—এই শব্দবন্ধ শুনলেই শৈশবের কিছু স্মৃতি মনে পড়ে যায়। এর মধ্যে একটি হলো নিজের অজ্ঞতাজনিত কারণে সৃষ্ট ভুলের সংশোধনের স্মৃতি। মজার ব্যাপার হলো, তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থাটির জন্মও আসলে জাতীয় পর্যায়ে ভুলের পুনরাবৃত্তি বন্ধ করার জন্যই। কাকতালীয় বটে!

আদতে একজন একজন ব্যক্তি মানুষকে যোগ করেই তো সমাজ, রাষ্ট্র, সরকার প্রভৃতির যূথবদ্ধ রূপ প্রকাশিত হয়। তারই রিয়েল লাইফ এক্সাম্পল হয়তো এই অভাজনের সেই উচ্চারণজনিত ভুল! গত শতকের নব্বইয়ের দশকে, শৈশবকালে, এই তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থাটি বুঝতে বেশ বেগ পেতে হয়েছিল। তবে গুরুজনেরা শেষে বুঝিয়ে দিয়েছিলেন এই বলে যে, খেলা সমানে সমান যেন হয়, সেই কারণেই নিরপেক্ষ রেফারির মতো সরকার হলো তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা। ওই অনেকটা স্কুলের বন্ধুবান্ধবদের সঙ্গে খেলার সময় ফুটবল বা ক্রিকেট খেলার সময় যেভাবে ‘নিরপেক্ষ’ রেফারি বা আম্পায়ার নিয়োগ করা হতো আর কি! এভাবেই বোঝা হয়েছিল শেষে।

এবার ভুল সংশোধনের বিষয়টি আনা যাক। ‘সরকার’ শব্দটির উচ্চারণ তো সহজ। এতে সমস্যা হয়নি শৈশবে। তবে ‘তত্ত্বাবধায়ক’ উচ্চারণ করতে গিয়ে ব–এর নিচে হস চিহ্ন দিয়ে ফেলত জিহ্বা। এরপর মা শুধরে দিতেন বারে বারে। কথায় তো আছেই, একবার না পারিলে দেখ শতবার। হাফ সেঞ্চুরি বা সেঞ্চুরি করতে হয়নি। তার আগেই শোধরাতে পেরেছিল জিহ্বা। এভাবেই তত্ত্বাবধায়ক শব্দের উচ্চারণ ঠিক হওয়া এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা সম্পর্কে বুঝতে শেখার শুরু।

২০০৭–০৮ সালের আগ পর্যন্ত এই তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থাটিকে আতস কাঁচের নিচে ফেলে খুঁটিয়ে দেখতে হয়নি খুব একটা। অভিযোগ, পাল্টা অভিযোগ ছিল। তবে সেসব মেনে নেওয়ার মানসিকতাও বিভিন্ন পক্ষে ছিল। ২০০৭–০৮ সালের পর এ নিয়ে ‘কিন্তু কিন্তু’ ভাবটা শুরু হয় জোরেশোরে। সামনে চলে আসে অরাজনৈতিক, অনির্বাচিত ও অস্থায়ী সরকারের ভেতরে থাকা স্থায়ী বা দীর্ঘস্থায়ী রূপ লাভের সুপ্ত বাসনা নিয়ে আলোচনা। প্রশ্ন উঠতে শুরু করে, তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থাটি কি তবে ত্রুটিযুক্ত? আর সেই ত্রুটি কি নিরাময়ের অযোগ্য?

এসব প্রশ্ন নিয়ে আলোচনার আগে একটু ইতিহাসের ঘটনাপঞ্জী জেনে আসা যাক। সম্প্রতি সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনী বাতিলের রায় অবৈধ ঘোষণা করে নির্বাচনকালীন নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা পুনর্বহালের আদেশ দিয়েছেন আপিল বিভাগ। এর ফলে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা পুনর্বহাল হয়েছে, যা গত তিন নির্বাচনে ছিল না।

সম্প্রতি সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনী বাতিলের রায় অবৈধ ঘোষণা করে নির্বাচনকালীন নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা পুনর্বহালের আদেশ দিয়েছেন আপিল বিভাগ। ছবি: বাসস
সম্প্রতি সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনী বাতিলের রায় অবৈধ ঘোষণা করে নির্বাচনকালীন নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা পুনর্বহালের আদেশ দিয়েছেন আপিল বিভাগ। ছবি: বাসস

তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার শুরু হয়েছিল তিন দশকেরও বেশি আগে। এক সংকটময় সময়েই এমন রেফারির আবির্ভাব হয়েছিল দেশে। সেনা শাসক এইচ এম এরশাদের পতনের পর পঞ্চম জাতীয় নির্বাচন আয়োজনে তৎকালীন প্রধান বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদের নেতৃত্বে গঠন করা হয়েছিল ‘অন্তর্বর্তীকালীন সরকার’। দীর্ঘদিন এরশাদবিরোধী আন্দোলনে থাকা রাজনৈতিক দলগুলো একমত হয়ে প্রধান বিচারপতিকে ওই সরকারের সরকারের প্রধান করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল।

এরশাদ সরকার ছিল রাষ্ট্রপতিশাসিত ব্যবস্থা। ওই সময়ে প্রথমে উপরাষ্ট্রপতি মওদুদ আহমদ (পরে বিএনপি নেতা) পদত্যাগ করলে সাহাবুদ্দীন আহমদ উপরাষ্ট্রপতি হন। এরপর রাষ্ট্রপতি এরশাদ পদত্যাগ করলে ওই পদে বসেন বিচারপতি সাহাবুদ্দীন। তার অধীনে ১৯৯১ সালে নির্বাচন হয়। ক্ষমতায় আসে বিএনপি।

বিএনপির মেয়াদ শেষে দলগুলোর বর্জনের মধ্যে দলীয় সরকারের অধীনে ষষ্ঠ জাতীয় সংসদ নির্বাচন আয়োজন হয়। এরপর আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে বিরোধী দলগুলোর আন্দোলনের মুখে ওই বছরই তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিধান এনে সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনী সংসদে পাস করে বিএনপি। সংবিধানের ওই বিধান অনুসারে ১৯৯৬ সালের ১২ জুন, ২০০১ এবং ২০০৮ সালের নির্বাচন হয় নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে।

কিন্তু ২০০৭–০৮ সালের তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার অভিজ্ঞতার পর দৃশ্যপট অনেকটা পাল্টে যায়। রাজনীতির বিপরীত শক্তি হিসেবে বিরাজনীতির রাজনীতি বাস্তব হয়ে ওঠে।

এক পর্যায়ে আওয়ামী লীগের আমলে ২০১১ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করে সর্বোচ্চ আদালত। পরে ওই বছরের ৩০ জুন তত্ত্বাবধায়ক সরকার বা দিয়ে সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী পাস করে নবম সংসদ। তবে তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাতিলের পর এ নিয়ে বিএনপিসহ অন্যান্য রাজনৈতিক দলগুলো তীব্র বিরোধিতা করে। সেই সময় আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, অনির্বাচিত কোনো সরকার ব্যবস্থা ‘গণতান্ত্রিক’ নয়।

কিন্তু বৃক্ষের নাম তো ফল দেখেই আন্দাজ করা যায়। তাই ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের নির্বাচন স্পষ্টভাবে বুঝিয়ে দেয় যে, রেফারি রাজনৈতিক হলেও নিরপেক্ষ নয়। বিশেষ করে ২০১৮ সালের নির্বাচন জনপরিসরে ‘রাতের ভোট’ হিসেবে কুখ্যাতি পেয়ে যায়। অনেকটা একলা খেলে, একলাই গোল দেয়–এর মতো। এবং ওই নির্বাচন জনপরিসরে এই অনাস্থা পাকাপোক্ত করে ফেলে যে, দলীয় সরকার নির্দলীয় ভূমিকা পালন করতে পারেই না! আদৌ চায় কি না, সেটিও একটা বড় প্রশ্ন হিসেবে দেখা দেয় বটে।

একটি বিষয় লক্ষ্যণীয় যে, বিএনপি ও আওয়ামী লীগ, এই দুই রাজনৈতিক দলই ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন করেছিল। অর্থাৎ, অনির্বাচিত ও অরাজনৈতিক সরকারের আসাটা ঠেকাতে চেয়েছিল, অথবা নিজেরা নির্বাচন আয়োজন করে ‘সুবিধা’ নিতে চেয়েছিল। যেহেতু পক্ষে, বিপক্ষে দুই ধরনের মতই আছে, তাই দুটিরই উল্লেখ করা হলো। মূল কথা হলো, আওয়ামী লীগ ও বিএনপি, দুই দলেরই এই তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার প্রতি মোহ সৃষ্টি ও মোহভঙ্গের উদাহরণ আছে। কিছু ক্ষেত্রে এটি অনেকক্ষেত্রে ছিল উপায়ন্তর না দেখে বেছে নেওয়ার মতোই।

সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. ফখরুদ্দীন আহমদ। ছবি: জাতিসংঘের ওয়েবসাইট থেকে নেওয়া
সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. ফখরুদ্দীন আহমদ। ছবি: জাতিসংঘের ওয়েবসাইট থেকে নেওয়া

তো, এবার ফিরে এল তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা। ওই উপায়ন্তর না দেখেই। কারণ আমাদের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক পরিসর জাতীয়ভাবে এমন হয়ে গেছে যে, দলীয় কারও নির্দলীয় হওয়ার সম্ভাবনাকে আকাশ–কুসুম কল্পনা মনে হচ্ছে। আমরা দলীয় সরকারের নির্বাচনের ক্ষেত্রে যথেচ্ছাচার করা দেখে ফেলেছি। যথেচ্ছাচার করার চেষ্টা করতে গিয়ে ভেঙে পড়তেও দেখেছি। এবং তা দেশের সরকারে থাকা দুই রাজনৈতিক দলের ক্ষেত্রেই ঘটেছে।

হ্যাঁ, তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থাও অব্যর্থ নয়। এতেও ত্রুটি আছে। এর পক্ষে, বিপক্ষে যুক্তি আছে। কিন্তু মাথা ব্যথা হলে মাথা কেটে ফেলাই যে একমাত্র সমাধান নয়, সেটি বোঝাতেই হয়তো তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার ফিরে আসা। এই ফিরে আসা সাফল্যমণ্ডিত হবে কি না, তা অবশ্যই ভবিষ্যৎ বলবে।

তবে এই ফিরে আসা একটি বিষয় স্পষ্টভাবে বুঝিয়ে দেয়। সেটি হলো, আমাদের মধ্যে পারস্পরিক অনাস্থা ও অবিশ্বাস ব্যাপক। এবং সেই অনাস্থা ও অবিশ্বাস কাটানোর মতো কোনো কাজও আমাদের রাজনৈতিক পরিসরে হয়নি আদতে। স্বাধীনতার ৫০ বছর পরও আমরা জোর গলায় বলতে পারছি না যে, কিছুদিনের (নির্বাচনের) জন্য হলেও দল–মতের ঊর্ধ্বে আমরা উঠতে পারি! এক অর্থে, একটি প্রবল ‘দলকানা’ জাতি হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে নিজেদের মেনে নিতেই হবে আমাদের। কারণ আমরা সবাই আসলে সামগ্রিকভাবে এই পরিস্থিতির জন্য দায়ী।

তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার ফিরে আসা তাই বাংলাদেশের জন্য একটি শিক্ষা। সেই সঙ্গে নিজেদের সংশোধনের সুযোগও। আমাদের দেশের এই তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থাটি বিশ্বের অনেক দেশের কাছেই অভিনব পদ্ধতি। কারণ নির্বাচনের সময় আমরা লজ্জা ভুলে যতটা দলকানা হয়ে যেতে চাই, ঠিক এতটা কোথাও দেখা হয়তো যায় না! স্বাধীনতার এত বছর পর এতটুকু নৈতিক কাণ্ডজ্ঞান আমাদের অর্জন করা উচিত ছিল। কিন্তু হয়নি। আর সেটিই চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল এই সময়। এক্ষণে সুমতি ফিরলেই হয়!

লেখক: বার্তা সম্পাদক, চরচা

সম্পর্কিত