সম্প্রতি চীনের মূল ভূখণ্ডে সফরের সময় আমার সাথে দেখা হয় ওই দেশের অর্থনীতিবিদ, প্রযুক্তিবিদ ও ব্যবসায়িক নেতাদের। তাদের কাছে আমি বারবার একই প্রশ্ন করেছি। প্রশ্নটা ছিল এমন, “বাণিজ্য মানে বিনিময়। আপনি আমাকে কিছু দেবেন, আর তার বিনিময়ে আমাকেও আপনাকে কিছু দিতে হবে। তাই ভবিষ্যতে এমন কোন পণ্য আছে–যা চীন বাকি বিশ্বের কাছ থেকে কিনতে চাইবে?”
এ প্রশ্নে তাদের উত্তর ছিল অর্থবহ। কেউ কেউ বললেন ‘সয়াবিন আর লৌহ আকরিক’। পরে বুঝলেন, এটা ইউরোপিয়ানদের এ কথা বলে লাভ নেই। কেউ বললেন, লুই ভুঁতোঁর হ্যান্ডব্যাগ, যা চীনে জনপ্রিয়। এরপর তারা চলে গেলেন, দ্রুত বেড়ে ওঠা চীনা বিলাসবহুল ব্র্যান্ডগুলোর রপ্তানি সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনায়। তাদের আরেকটি সাধারণ উত্তর ছিল ‘উচ্চশিক্ষা’। তবে এ কথাও তারা যোগ করলেন যে, পিকিং ইউনিভার্সিটি ও সিংহুয়া-তে ভর্তি হওয়া পশ্চিমের যেকোনো প্রতিষ্ঠানের তুলনায় কতটা কঠিন ও একাডেমিকভাবে কঠোর।
বিষয়টি নিয়ে অনেক অর্থনীতিবিদ আগে থেকেই ভাবছিলেন। তারা একেবারে ভিন্ন দিকে চলে গেলেন। ‘এই কারণেই’, তারা বললেন, “আপনাদের উচিত চীনা কোম্পানিকে ইউরোপে কারখানা স্থাপনের অনুমতি দেওয়া।”
এই চিন্তাধারার মধ্যে আমার প্রশ্নের প্রকৃত উত্তর বের হয়ে আসে। আর সে উত্তর হলো: কিছুই না।
চীন এমন কিছুই আমদানি করতে চায় না, যা তারা মনে করে যে নিজেরাই আরও ভালো ও সস্তায় তৈরি করতে পারবে। কিংবা যেকোনো কিছুতে বিদেশের ওপর একদিনও বেশি নির্ভর করে থাকতে বাধ্য হবে। এ মুহূর্তে নিঃসন্দেহে সেমিকন্ডাক্টর, সফটওয়্যার, বাণিজ্যিক উড়োজাহাজ ও অত্যাধুনিক শিল্পযন্ত্রের ক্ষেত্রে চীন এখনো ক্রেতা। কিন্তু সেই ক্রেতা আবার অনেকটা হাসাপাতালের আবাসিক চিকিৎসকের মতো। একাধারে ডাক্তার আবার ছাত্র। চীন এসব সবকিছুই নিজে তৈরি করার পথে। অচিরেই তারা এসব তৈরি করবে। আর সেগুলো রপ্তানিও করবে।
স্বনির্ভরতার ব্যাপারে একমত হওয়ার পর কথোপকথন সাধারণত এমনভাবে চলত, “ঠিক আছে, তাহলে আমাদের দোষ দেন কীভাবে? যখন দেখছেন আমেরিকা কীভাবে রপ্তানি নিয়ন্ত্রণকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে আমাদের চাপে রাখে? চীনের গভীর নিরাপত্তাহীনতাটা আপনাদের বুঝতে হবে।”
এটা যুক্তিসঙ্গত। এতে দোষারোপের প্রশ্নই আসে না। কিন্তু এখানেই আসে মূল প্রশ্ন–যা আমি তাদেরও করেছি, আপনাকেও করছি: যদি চীন আমাদের কাছ থেকে কিছুই কিনতে না চায়, তাহলে চীনের সঙ্গে আমরা বাণিজ্য করব কীভাবে?
এটা কোনো হুমকি নয়, সাধারণ বাস্তবতা। ইউরোপ, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া ও আমেরিকার শ্রমিকদের কাজ দরকার। আমরা চাই না আমাদের অর্থনৈতিক অগ্রগতি উল্টে যাক। আর আমরা যতই না চাই, রপ্তানি ছাড়া এক সময় চীনের কাছ থেকে আমদানি করা জিনিসের দাম দেওয়ার উপায় আমাদের শেষ হয়ে যাবে। ভিন্ন প্রেক্ষাপটে বেইজিংয়ের নীতিনির্ধারকেরাও এটি বোঝেন। তারা উদ্বিগ্ন এই ভেবে, চীন জমে থাকা বিপুল ডলারের অবমূল্যায়ন বা খেলাপির ঝুঁকিতে আছে।
ছবি: রয়টার্সগোল্ডম্যান স্যাকস সম্প্রতি তাদের পূর্বভাসে ২০৩৫ সালে চীনের অর্থনীতির আকার বাড়ালে বিশ্বের বাকি অংশের ওপর চাপটা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। সাধারণত কোনো দেশের ক্রমবর্ধমান প্রবৃদ্ধি অন্যদেরও উপকৃত করে। চাহিদা বাড়ে, ভোগ বাড়ে, সুযোগ বাড়ে। কিন্তু এখানে অতিরিক্ত চীনা প্রবৃদ্ধি আসছে রপ্তানি থেকে। অন্য দেশের বাজার দখল করে।
গোল্ডম্যান স্যাকসের মতে এতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে জার্মানি। আগামী কয়েক বছরে তাদের প্রবৃদ্ধি প্রায় ০.৩ শতাংশ কমে যাবে।
তাহলে চীনের অংশীদাররা কীভাবে প্রতিক্রিয়া দেখাবে, যখন চীন প্রকাশ্যেই বলে দিচ্ছে, তারা সমানভাবে বাণিজ্য করতে চায় না? যখন চীনের বাণিজ্যনীতি হলো: বিক্রি করবে, কিন্তু কিনবে না?
তাই সত্যিকার ভালো সমাধান কেবল বেইজিংয়ের হাতেই। চীন চাইলে নিজের অর্থনীতির মুদ্রাস্ফীতি-হ্রাস (ডিফ্লেশন) কাটাতে পারে। অভ্যন্তরীণ ভোগের কাঠামোগত বাধা দূর করতে পারে, মুদ্রার মান বাড়তে দিতে পারে, আর শিল্পে দেওয়া বিলিয়ন ডলারের ভর্তুকি ও ঋণ বন্ধ করতে পারে। এটা চীনা জনগণের জন্যও ভালো হবে। দেশকে আরও প্রতিযোগিতামূলক করতে গিয়ে এই মানুষগুলোর জীবনমান উন্নত করার আশা ত্যাগ করতে হয়।
অন্য দেশগুলো বহু দশক ধরে চীনকে এমন অনুরোধ করছে। এ বিষয়ে যত কথাই বলা হোক, চীনের পরবর্তী পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনার জন্য কেন্দ্রীয় কমিটির সুপারিশগুলো পরিবর্তনের আশা কমিয়ে দেয়। ভোগ তালিকায় আছে, কিন্তু অগ্রাধিকারে তা তৃতীয় স্থানে। প্রথম ও দ্বিতীয় স্থানে আছে: উৎপাদন ও প্রযুক্তি।
ফলে ইউরোপের সামনে পড়ে থাকে একটি কঠিন সমাধান এবং একটি খারাপ সমাধান। কঠিন সমাধান হলো, আরও প্রতিযোগিতামূলক হওয়া এবং নতুন উৎস খোঁজা। যেমনটা আমেরিকা তার প্রযুক্তি খাতের মাধ্যমে করে। এর মানে আরও সংস্কার, কম কল্যাণ ব্যয়, কম নিয়ন্ত্রণ। কারণ কল্যাণনীতি বা নিয়ন্ত্রণ খারাপ বলে নয়, বরং প্রতিযোগিতার পরিপ্রেক্ষিতে এগুলো বহন করা কঠিন বলে।
তবুও সেটাও যথেষ্ট নয়– যে বিশ্বে চীন সবকিছুই সস্তায় রপ্তানি করে, কিন্তু নিজেরা কিছুই আমদানি করতে চায় না। অভ্যন্তরীণ চাহিদার ওপর নির্ভর করা ছাড়া বিকল্প কিছু থাকবে না। যা নিয়ে যায় খারাপ সমাধানের দিকে: সুরক্ষানীতিতে (প্রোটেকশনিজম)। ইউরোপের পক্ষে এখন বুঝে ওঠা কঠিন যে, বড় ধরনের সুরক্ষানীতি ছাড়া তারা আদৌ কোনো শিল্প টিকিয়ে রাখতে পারবে কি না।
এই পথ এত ক্ষতিকর ও ঝুঁকিপূর্ণ যে এটা সুপারিশ করাও কঠিন। চীন আমেরিকার শুল্ক-অস্ত্রের মোকাবিলা করেছিল। আমেরিকাই একমাত্র দেশ যাকে চীন সমকক্ষ বলে মানে। অন্য কারও বিরুদ্ধে শুল্ক-বাধা দাঁড়ালে বেইজিংয়ের আক্রমণাত্মক প্রতিক্রিয়া দেখানোর সম্ভাবনা প্রবল। এটা বৈশ্বিক বাণিজ্যব্যবস্থাকে আরও ভেঙে ফেলবে।
তবুও ভালো বিকল্প যখন শেষ, তখন খারাপ বিকল্পই একমাত্র ভরসা। চীন বাণিজ্যকে অসম্ভব করে তুলছে। যদি চীন পণ্য, পণ্যদ্রব্য আর ভোগ্যপণ্য ছাড়া অন্য কিছু না কিনতে চায় তাহলে অন্যদেরও একই প্রস্তুতি নিতে হবে।
রবিন হার্ডিং: লন্ডনের ফিন্সাসিয়াল টাইমসের এশিয়া-বিষয়ক সম্পাদক
** লেখাটি ফিনান্সিয়াল টাইমসের সৌজন্যে প্রকাশিত**