দুটি ঘটনার বর্ণনা দিয়ে শুরু করা যাক। বিবরণের শেষে হালকা একটা কুইজও আছে কিন্তু!
ঘটনা ১: দুই সহকর্মীকে নিয়ে থানার এক কনস্টেবল গিয়েছিলেন পার্শ্ববর্তী এক গ্রামে। উদ্দেশ্য ছিল এক অপরাধীকে গ্রেপ্তার করা। অপরাধীকে খুঁজে বেরও করা হয়। কিন্তু গ্রেপ্তার করতে গিয়েই বাধে বিপত্তি। কোত্থেকে একদল মানুষ এসে ঘিরে ধরে। পুলিশ সদস্যদেরই শুরু হয় মারধর। ওই একদল মানুষের হট্টগোল করার প্রধান মাজেজা ছিল, ওই অপরাধীকে গ্রেপ্তারের হাত থেকে বাঁচানো। তারা চেষ্টা করছিল পুলিশ সদস্যদের কাছ থেকে অস্ত্র কেড়ে নিতে। ঠিক সেই সময়, পুলিশ সদস্যরাও প্রতিরোধ করার চেষ্টা করে। ফলে হুড়োহুড়িতে গুলি বের হয়ে যায় বন্দুক থেকে। তাতে আবার পুলিশকে গ্রেপ্তারে বাধা দিতে আসা দলের একজনের প্রাণ যায়। এতে করে আরও ক্রুদ্ধ হয়ে ওঠে সেই মানুষগুলো। তাদের আক্রমণে মারা যান এক পুলিশ কনস্টেবল।
ঘটনা ২: একটি কারখানায় কাজ করতেন এক ব্যক্তি। হুট করেই একদিন তার বিরুদ্ধে ওঠে ধর্ম অবমাননার অভিযোগ। সাথে সাথে কারখানার ভেতরে, বাইরে শুরু হয় অস্থিরতা। ওই ব্যক্তি কিছু বুঝে ওঠার আগেই তার গায়ে লাগিয়ে দেওয়া হয় অপরাধীর তকমা। তাকে মারধর করা হয়। শেষে তুলে দেওয়া হয় কারখানার বাইরে জড়ো হওয়া একদল মানুষের হাতে। তারা ওই ব্যক্তিকে পিটিয়ে হত্যা করে মরদেহে আগুন ধরিয়ে দেয়। অথচ পরে জানা যায়, ওই নিহত ব্যক্তি ধর্ম অবমাননা করেননি এবং সেই কাজের কোনো চিহ্নও খুঁজে পাওয়া যায়নি।
কোন ঘটনাটি কোন দেশের বলে মনে হয়, বলুন দেখি।
হ্যাঁ, উত্তর বেশ সহজই। দেশের ন্যূনতম খোঁজ রাখা বা সোশ্যাল মিডিয়ায় সময় কাটানো যেকোনো মানুষই দ্বিতীয় ঘটনাটিকে বাংলাদেশের বলে চিহ্নিত করতে পারবেন। কিছুদিন আগেই ময়মনসিংহে এ ঘটনা ঘটেছে।
প্রথম ঘটনাটিও কি বাংলাদেশের? এই দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের দলবেঁধে আক্রমণের উদাহরণ কিন্তু রয়েছে। সেসব আক্রমণে জীবনহানিও হয়েছে। অস্ত্র কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা বা অস্ত্র লুট করার উদাহরণও আছে।
তবে ১ নম্বর ঘটনাটি বাংলাদেশের নয়। ঘটনাটি এমন একটি দেশের, যেটি আমাদের দেশে বেশ পরিচিত। সোশ্যাল মিডিয়ায় জনপ্রিয়ও বলা চলে। দেশটির নাম, উগান্ডা!
আফ্রিকার দেশ উগান্ডা। ছবি: রয়টার্সউগান্ডার মানবাধিকার কমিশন চলতি বছরের মে মাসের একদম শেষে পুলিশ সদস্যদের মবের শিকার হওয়ার ওই ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ দিয়েছে নিজেদের ওয়েবসাইটে। তাতে একপর্যায়ে লেখা হয়েছে যে, “আমরা স্পষ্ট করে বলতে চাই যে, মব জাস্টিস কোনো বিচার নয়, এটি অপরাধ।” এও মন্তব্য করা হয়, এমন আইনহীনতা শুধু অনৈতিকই নয়, একই সঙ্গে অসাংবিধানিকও। উগান্ডার মানবাধিকার কমিশন মনে করে, ওই পুলিশ সদস্যরা আইনি দায়িত্বই পালন করতে গিয়েছিলেন কেবল।
উগান্ডায় এ ধরনের হত্যাকাণ্ড নতুন কিছু নয়। বিষয়টি এমন নয় যে, বিশেষ কোনো ঘটনা হিসেবে গণ্য করে দেশটির মানবাধিকার কমিশন এমন বিবৃতি আসলে দিয়েছে। এ ধরনের ঘটনা উগান্ডায় বেশ নিয়মিতই ঘটে। সেই হিসাবে মানবাধিকার কমিশনের এ ধরনের বিবৃতিও বেশ নিয়মিত ঘটনাই।
পূর্ব আফ্রিকার একটি ভূমিবেষ্টিত দেশ উগান্ডা। যুক্তরাজ্যের সাবেক প্রধানমন্ত্রী স্যার উইনস্টন চার্চিল এই দেশটিকে অভিহিত করেছিলেন ‘দ্য পার্ল অব আফ্রিকা’ নামে। কুখ্যাত স্বৈরশাসক ইদি আমিনের দেশ হিসেবেও উগান্ডা পরিচিতি পেয়েছিল একসময়। সেসব অবশ্য বেশ আগের কথা। চলতি শতাব্দীর শুরুর দশকে বরং মবের দেশ বা মবের মারে মানুষের মরে যাওয়ার দেশ হিসেবে কুখ্যাতি অর্জন করে উগান্ডা।
‘MOB JUSTICE: A qualitative research regarding vigilante justice in modern Uganda’। এর লেখক ছিলেন রবিন গ্লাড, আসা স্টর্মবার্গ ও অ্যান্টন ওয়েস্টারলান্ড। সেই গবেষণপত্রে বলা হয়েছে যে, ২০০৭ সালে উগান্ডায় মব ভায়োলেন্সে নিহত হয় ১৮৪ জন। কিন্তু ২০০৮ সালে, মাত্র ১ বছরের ব্যবধানে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৩৬৮ জনে। অর্থাৎ, মব ভায়োলেন্সে নিহতের পরিমাণ বেড়ে গিয়েছিল প্রায় ১০০ শতাংশ। ২০০৮ সালে প্রতি মাসে গড়ে ৩০ জন মানুষ মরে মবের কারণে। উগান্ডার পুলিশের দেওয়া সরকারি হিসাব এটি। এর বাইরে আরও কতজন নিহত হয়েছে, তা অজানাই রয়ে গেছে। কারণ, উগান্ডার মতো অর্থনৈতিক ও সামাজিকভাবে দুর্বল রাষ্ট্রে স্বাভাবিকভাবেই এমন অনেক ঘটনা অজানা রয়ে যাওয়ার আশঙ্কা প্রবল।
২০১০ সালের এই গবেষণার ১০ বছর পরের ঘটনাবলীর দিকে চোখ দেওয়া যাক। ২০২০ সালের নভেম্বরে প্যান আফ্রিকান রিসার্চ নেটওয়ার্ক অ্যাফ্রোব্যারোমিটার একটি গবেষণাপত্র প্রকাশ করে। অ্যাফ্রোব্যারোমিটার মূলত আফ্রিকা অঞ্চল নিয়ে কাজ করা একটি নিরপেক্ষ গবেষণা প্রতিষ্ঠান। এর ৭০ নম্বর পেপারের শিরোনাম ছিল, ‘Willing to kill: Factors contributing to mob justice in Uganda’। লিখেছিলেন রোনাল্ড মাকাংগা কাকুমবা। উগান্ডার পুলিশ ফোর্সের অ্যানুয়াল ক্রাইম রিপোর্ট বিশ্লেষণ করে তিনি দেখিয়েছিলেন যে, ২০১৩ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত মব ভায়োলেন্সে দেশটিতে মৃত্যুর পরিমাণ বেড়ে যায় ৭৫ শতাংশ পর্যন্ত। এই ৭ বছরে সরকারি হিসাবেই দেশটিতে মবের মারে নিহত হয়েছিল ৪ হাজার ৪৭ জন মানুষ। বছরপ্রতি মৃত্যু ছিল প্রায় ৫৮০ জন। মাসপ্রতি যা দাঁড়ায় প্রায় ৪৮ জনে। অর্থাৎ, কমা তো দূরের কথা দিনকে দিন উগান্ডায় মবের মারে মানুষ মরার সংখ্যা শুধু বেড়েছেই।
২০২০ সালের পর থেকে উগান্ডায় মবের মারের পরিমাণ একটু একটু করে কমতে শুরু করেছিল। দেশটির পুলিশ বিভাগের ওয়েবসাইটে দেওয়া ২০২২ সালের বার্ষিক অপরাধ প্রতিবেদন অনুযায়ী, ওই বছর মবের মারে মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছিল ৫৪০টি। ২০২০ সালে এই সংখ্যাটি ছিল ৭৪৬।
অবশ্য সাম্প্রতিক সময়ে আবারও উগান্ডায় বেড়েছে মবের মার, বেড়েছে মৃত্যুও। উগান্ডার পুলিশ বিভাগের ২০২৪ সালের অপরাধ বিষয়ক প্রতিবেদন জানিয়েছে, ২০২৩ সালে দেশটিতে মবের মারে ১০৯৮ জন মানুষ মরে গেছে। ২০২৫ সালেও যে কাছাকাছি পরিস্থিতি বিরাজমান, সেটি তো এই লেখার শুরুতে দেওয়া ১ নম্বর ঘটনাটি পড়লেই বোঝা যায়।
অর্থাৎ, মব ভায়োলেন্স ক্যান্সারের মতো আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরেছে পুরো উগান্ডাকে। মব থেকে মুক্তি মিলছে না কোনোভাবেই। উগান্ডা নিয়ে গবেষণা করা বিভিন্ন বিশ্লেষক এই মবের বাড়াবাড়ির শুরু হিসেবে কম-বেশি ২০০৭ সালকেই চিহ্নিত করে থাকেন। ওই বছর মবে উগান্ডায় মারা গিয়েছিল ১৮৪ জন মানুষ। আর এই ক্ষেত্রে দুর্ভাগ্যজনকভাবে বাংলাদেশের সাথে মিলে যায় উগান্ডা!
মব ভায়োলেন্স ইস্যুতে শুরুর দিক থেকে অন্তত উগান্ডার সঙ্গে বাংলাদেশের এক অতীব শঙ্কাজনক মিল দেখতে পাওয়া যাচ্ছে। ছবি: চরচাআইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে নভেম্বর পর্যন্ত ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় মব সহিংসতায় অন্তত ১৮৪ জন নিহত হয়েছেন। ডিসেম্বর মাসে নিহতের তালিকায় যোগ হয়েছে আরও ১৩ জন। সব মিলিয়ে নিহতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৯৭-এ। এর মধ্যে ঢাকায় নিহত সবচেয়ে বেশি, এরপর রয়েছে চট্টগ্রাম বিভাগ।
আসকের তথ্য বলছে, ২০২৪ সালে ঢাকায় ৫৭ জনসহ সারা দেশে ১২৮ জন মব সহিংসতায় নিহত হন। আর ২০২০ থেকে ২০২৩–এই চার বছরে মবের হাতে প্রাণ হারিয়েছেন অন্তত ১৫০ জন। ২০২৩ সাল থেকে আমাদের দেশে মবে মৃত্যুর হার বাড়তে থাকে। ২০২৪ সালে তাতে ১৫০ শতাংশের বেশি বৃদ্ধি দেখতে পাওয়া যায়। আর ২০২৫ সালের ১১ মাসেই সেই ১২৮ মৃত্যুকে ছাড়িয়ে গেছে বাংলাদেশ, পৌঁছে গেছে ১৯৭ মৃত্যুতে।
মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশন (এমএসএফ)-এর পরিসংখ্যান অনুযায়ী ২০২৫ সালে অন্তত ৪২৮টি গণপিটুনির ঘটনা ঘটেছে, যা গত বছরের তুলনায় তিনগুণ। এ বিষয়ে সংস্থাটির মন্তব্য হলো, “২০২৫ সালে গণপিটুনি/ মব সন্ত্রাস আশংকাজনক বেড়ে যাওয়ায় জনমনে নিরাপত্তাহীনতার বিষয়টি প্রশ্নাতীতভাবে এগিয়ে রেখেছে। বলাবাহুল্য, প্রচলিত আইন অবজ্ঞা করে গণপিটুনি/মব সন্ত্রাস ঘটনাগুলোকে বিচারবর্হিভূত হত্যাকাণ্ড বলে মনে করা হয়। নাগরিকের ভয় ও নিরাপত্তাহীনতার মূল উৎস একশ্রেণির স্বার্থনেষী গোষ্ঠীর মব সহিংসতা। অনলাইন, অফলাইনে যে কেউ যে কারও বিরুদ্ধে সহিংসতা উসকে দিতে পারছে।”
অর্থাৎ, মব ভায়োলেন্স ইস্যুতে শুরুর দিক থেকে অন্তত উগান্ডার সঙ্গে বাংলাদেশের এক অতীব শঙ্কাজনক মিল দেখতে পাওয়া যাচ্ছে। এই শঙ্কাটি হলো, উগান্ডার মতো বাংলাদেশেও মব মহামারি আকার নিয়ে নিচ্ছে কিনা বা নেওয়ার শুরুটা হয়ে গেল কিনা। উগান্ডার মানবাধিকার কমিশন যেখানে মব ইস্যুতে মোটামুটি সরব, সেখানে বাংলাদেশে আমরা দেখতে পাই হিরণ্ময় নীরবতা। এই দেশে অবশ্য প্রায় দেড় বছর ধরেই জাতীয় মানবাধিকার কমিশন অনুপস্থিত। কারণ ১ বছরের বেশি সময় ধরে এই দেশে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনই আদতে নেই। সরকার এই কমিশন ভেঙে দেওয়ার পর পুনর্গঠন করার প্রয়োজনীয়তাই এখনো অনুভব করেনি!
অবশ্য, সরকার সক্রিয় থাকলে সেই নীরবতা সাধারণ মানুষকে অতটা আতঙ্কিত করত না। কিন্তু এ দেশের বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই মব ভায়োলেন্সের যেকোনো ঘটনা ঘটার পরপরই বিবৃতি দেওয়াতে যতটা ব্যস্ত হয়ে পড়ে, বিপরীতে দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেওয়ায় বা মব ঘটার আগেই ঠেকাতে ততটা ব্যগ্র হয় না। ফলে এই দেশটায় এখন মব হচ্ছে সরবে, বাধাহীন পরিবেশে, প্রবল উৎসাহে! কারণ এই দেশের মব জানে, বিবৃতি ছাড়া সরকারের তরফে তাদের বিপরীতে আর কোনো পদক্ষেপ না নেওয়াও হতে পারে।
এমন পরিস্থিতিতে, নতুন বছরের শুরুতে, ‘অতি আশাবাদী নাগরিক’ হিসেবে একটি আশা আমরা করতেই পারি। সেটি হলো, নতুন বছরে সরকার হয়তো বিবৃতিতে দেখানো ‘কঠোরতা’ একদিন মবের বিরুদ্ধে বা মব ঠেকানোতেও প্রয়োগ করবে। হয়তো সরকার তখন মবের মারামারি দেখে ‘লজ্জিত’ হবে না শুধু, লজ্জায় মাটি খুঁড়ে পাতালযাত্রাও করতে চাইবে না, বরং লজ্জা কাটানোর চেষ্টাটাও জোরেশোরে করবে। অবশ্য সেটি চর্মচক্ষুতে অবলোকন না করা পর্যন্ত শান্তি নেই।
তা না হওয়া পর্যন্ত, শান্তিপ্রিয় নাগরিক হিসেবে আফসোস ও আতঙ্ক অনুভব ছাড়া গত্যন্তর আসলে নেই। শঙ্কা-স্পন্দিত বুকে, কবি ফররুখ আহমেদ রচিত কবিতার লাইন অবলম্বনে তাই ক্ষণে ক্ষণে প্রশ্ন জাগে–উগান্ডা হতে কত দেরী পাঞ্জেরী?
লেখক: বার্তা সম্পাদক, চরচা