সদ্য অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠ আসন পেয়ে সরকার গঠন করেছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। মঙ্গলবার সকালে নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের শপথের পর বিকেলে মন্ত্রিপরিষদ সদস্যদের শপথ অনুষ্ঠিত হয় এবং আনুষ্ঠানিকভাবে দেশের ১৩তম সরকার দায়িত্ব নেয়। প্রায় ১৭ বছর রাষ্ট্র পরিচালনার পর আওয়ামী লীগ সরকারের পতন, জুলাই গণঅভ্যুত্থান, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকা নিয়ে বিতর্ক এবং দীর্ঘ অন্তর্বর্তী শাসনকাল–এই ধারাবাহিক রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর নতুন সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে উঠে এসেছে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ ও জনআস্থা পুনর্গঠন।
বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক রাজনৈতিক অস্থিরতা ও সহিংসতার প্রেক্ষাপটে দেশের নিরাপত্তা কাঠামো দুর্বল হয়েছে। জুলাই আন্দোলনের সময় অতিরিক্ত বলপ্রয়োগের অভিযোগে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রতি জনগণের ক্ষোভ তৈরি হয়। পরবর্তী সময়ে কয়েকদিন কার্যত পুলিশবিহীন পরিস্থিতি এবং প্রশাসনিক শূন্যতা রাষ্ট্রের নিরাপত্তা ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতাকে স্পষ্ট করে। যদিও অন্তর্বর্তী সরকার প্রায় দেড় বছর দেশ পরিচালনা করে পরিস্থিতি আংশিক নিয়ন্ত্রণে আনে, তবুও অপরাধ প্রবণতা ও রাজনৈতিক সহিংসতার ঝুঁকি পুরোপুরি কমেনি।
ময়মনসিংহের ভালুকায় ধর্ম নিয়ে কটূক্তির অভিযোগে দিপু চন্দ্র দাস নামের এক গার্মেন্ট কর্মী যুবককে গাছে ঝুলিয়ে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। ফাইল ছবিমানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (এইচআরএসএস) জানিয়েছে, নির্বাচন ঘিরে গত সাড়ে চার মাসে সারা দেশে সাত শতাধিক সহিংস ঘটনায় অন্তত ১০ জন নিহত ও ২ হাজার ৫০৩ জন আহত হয়েছে। গুলিবিদ্ধ হয়েছে কমপক্ষে ৩৪ জন এবং পাঁচ শতাধিক বাড়িঘর, যানবাহন, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও নির্বাচনী স্থাপনায় ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাট হয়েছে। তফসিল ঘোষণার পর থেকে ১১ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ২৫৪টি ঘটনায় ৫ জন নিহত ও ১ হাজার ৬৫০ জন আহত হন। ভোটের দিন বড় ধরনের সংঘর্ষ না হলেও ৩৯৩টি অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া যায়। এর মধ্যে কেন্দ্রভিত্তিক বিশৃঙ্খলা, সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষ, ব্যালট স্টাফিং, পোলিং এজেন্ট অপসারণ এবং ভোটারদের বাধা দেওয়ার ঘটনা ছিল।
নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতায় মুন্সীগঞ্জ, বাগেরহাট ও ময়মনসিংহে ৩ জন নিহত এবং অন্তত ৩০ জেলায় সংঘর্ষে ৩০০ জনের বেশি আহত হয়। প্রতিবেদনে নারী নির্যাতনের ৩২ ঘটনায় ৪৫ নারী হেনস্তার শিকার হওয়ার তথ্য উঠে এসেছে। অভিযোগে জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশ, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ এবং অন্যান্য রাজনৈতিক পক্ষের সমর্থকদের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। সংস্থাটি এসব ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত ও দোষীদের শাস্তি নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছে।
পুলিশ সদর দপ্তরের পরিসংখ্যান বলছে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অপরাধের কিছু সূচকে বৃদ্ধি দেখা গেছে। ২০২৫ সালে সারা দেশে চুরির মামলা হয়েছে ৯ হাজার ৬৭২টি, ছিনতাই ১ হাজার ৯৩৫টি এবং ডাকাতি ৭০২টি–যা আগের বছরের তুলনায় বেশি। ২০২৪ সালে এ ধরনের মামলার সংখ্যা ছিল যথাক্রমে ছিল ৮ হাজার ৬৫৫টি, ১ হাজার ৪১২টি ও ৪৯০টি। হত্যা মামলার সংখ্যাও উদ্বেগজনক। গত পাঁচ বছরে মোট ১৬ হাজার ৬৩১টি হত্যা মামলা হয়েছে, যার মধ্যে সর্বোচ্চ ৩ হাজার ৮৩৬টি মামলা হয়েছে ২০২৫ সালে। নারী ও শিশু নির্যাতন ও ধর্ষণ-সংক্রান্ত মামলার সংখ্যাও পাঁচ বছরে ১ লাখ ২ হাজার ৮৪৫টি, যা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির গভীর সংকটের ইঙ্গিত দেয়। ২০২৫ সালে এ ধরনের মামলার সংখ্যা ছিল ২২ হাজার ৪৩১টি এবং ২০২৪ সালে ১৭ হাজার ৫৭১টি।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অপরাধের এ বাড়বাড়ন্ত কেবল আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সীমাবদ্ধতা নয়; বরং রাজনৈতিক মেরুকরণ, অর্থনৈতিক চাপ, বেকারত্ব এবং সামাজিক অস্থিরতার সঙ্গে সম্পর্কিত। ফলে নতুন সরকারের জন্য শুধু পুলিশি কঠোরতা নয়, বহুমাত্রিক নীতি দরকার।
নির্বাচনের পরদিন থেকেই দলীয় শৃঙ্খলাভঙ্গ ও অপরাধে জড়িত থাকার অভিযোগে বিভিন্ন জেলায় নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নিয়েছে বিএনপি। দলটির পক্ষ থেকে মাঠপর্যায়ের কর্মীদের সতর্ক করে বলা হয়েছে–চাঁদাবাজি, সন্ত্রাস বা অপরাধে জড়িত কাউকে দলে রাখা হবে না। দলটির ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদু চরচায় এক সাক্ষৎকারে বলেছেন, “আমাদের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো অপরাধ নিয়ন্ত্রণ করে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক করা। জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আমরা কঠোর অবস্থানে থাকব।”
প্রতীকী ছবিনিরাপত্তা বিশ্লেষক মেজর জেনারেল (অব.) নাঈম আশফাক চৌধুরী বলেন, “দেশ বর্তমানে নানা চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে এবং এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সবার আগে প্রয়োজন অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা।” তার মতে, “অর্থনীতি বলতে শুধু আয়-ব্যয় নয়; কর্মসংস্থান, বাণিজ্য, উৎপাদনসহ সংশ্লিষ্ট সব খাতের উন্নয়ন জরুরি। পাশাপাশি নির্বাচনকালীন আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় যে সক্রিয়তা দেখা গেছে, তা অব্যাহত রাখা দরকার এবং জনগণ একটি কার্যকর ও সক্রিয় পুলিশ বাহিনী দেখতে চায়।”
নাঈম আশফাক চৌধুরী বলেন, “স্বস্তির বিষয় হলো রাজনৈতিক সহনশীলতা ও পারস্পরিক সম্মানবোধের একটি সংস্কৃতি এখন দৃশ্যমান, যা ইতিবাচক দিক। এই রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ধরে রেখে চলমান সংস্কার কার্যক্রম আরও জোরদার করা উচিত। একই সঙ্গে প্রশাসনিক কার্যক্রম দক্ষভাবে পরিচালনা নিশ্চিত করতে হবে, যাতে রাষ্ট্রযন্ত্র কার্যকর থাকে এবং ধীরে ধীরে সাধারণ মানুষের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সব সেবামূলক কাজে বাস্তব অগ্রগতি আনা সম্ভব হয়।”
অপরাধ বিশ্লেষক ড. তৌহিদুল হক বলেন, “আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি উন্নয়নের জন্য শুধু পুলিশ বাড়ানো বা অভিযান চালানো যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন গোটা বিচারব্যবস্থার সমন্বিত সংস্কার। তদন্তের মান উন্নত করা, মামলার দ্রুত নিষ্পত্তি এবং অপরাধীর দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত না হলে অপরাধপ্রবণতা কমবে না।”
কমিউনিটি পুলিশিংয়ের ওপর জোর দিয়ে তিনি বলেন, “পুলিশের প্রতি জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনতে কমিউনিটি পুলিশিং জোরদার করা এবং রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত পেশাদার বাহিনী গড়ে তোলা অত্যন্ত জরুরি।”
বিশ্লেষক থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষ–সবাই বলছেন নতুন সরকারের জন্য আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি জনআস্থা পুনর্গঠন করাই হবে সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।
বিশ্লেষকদের মতে, দ্রুত সংস্কার, অপরাধ দমনে দৃশ্যমান সাফল্য, নিরপেক্ষ প্রশাসন ও রাজনৈতিক সহিংসতা কমাতে কার্যকর উদ্যোগ–এই চারটি বিষয় নিশ্চিত করতে পারলে পরিস্থিতি বদলানো সম্ভব। অন্যথায় রাজনৈতিক পালাবদলের পরও যদি নিরাপত্তা সংকট ও অপরাধ প্রবণতা অব্যাহত থাকে, তবে তা সরকারের জনপ্রিয়তা ও স্থিতিশীলতার ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলতে পারে।
সামগ্রিকভাবে পরিস্থিতি ইঙ্গিত দিচ্ছে, ক্ষমতার পালাবদলের চেয়েও বড় চ্যালেঞ্জ হলো রাষ্ট্রযন্ত্রকে কার্যকর, নিরপেক্ষ ও পেশাদার কাঠামোয় ফিরিয়ে আনা। নতুন সরকারের সফলতা অনেকাংশে নির্ভর করবে তারা কত দ্রুত এবং কতটা কার্যকরভাবে এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে পারে, তার ওপর।