Advertisement Banner

মার্কিন আকসা চুক্তি: লাভ বেশি, নাকি ক্ষতি?

চরচা ডেস্ক
চরচা ডেস্ক
মার্কিন আকসা চুক্তি: লাভ বেশি, নাকি ক্ষতি?
আমেরিকার স্বাধীনতার প্রতীক স্ট্যাচু অব লিবার্টি। ছবি: রয়টার্স

বাংলাদেশ ও আমেরিকার মধ্যে একটি কৌশলগত প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষর হওয়া নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক গুঞ্জন ও আলোচনা তৈরি হয়েছে। অনেকেই দাবি করছেন, দুই দেশ এমন একটি প্রতিরক্ষা চুক্তি নিয়ে অগ্রসর হচ্ছে, যার আওতায় বাংলাদেশের বিভিন্ন বন্দর ও বিমানঘাঁটির মতো কৌশলগত অবকাঠামোগুলো মার্কিন সামরিক বাহিনী ব্যবহারের সুযোগ পেতে পারে। তবে এই বিষয়ে ঢাকা কিংবা ওয়াশিংটন—কোনো পক্ষেরই এখন পর্যন্ত কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি, যদিও বিষয়টি নিয়ে আলোচনা থামেনি।

আমেরিকা ও বাংলাদেশের মধ্যে কৌশলগত প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষরের ক্ষেত্রে দুটি চুক্তি নিয়ে কথা হচ্ছে বেশ। একটি হলো-জেনারেল সিকিউরিটি অব মিলিটারি ইনফরমেশন এগ্রিমেন্ট ( GSOMIA), যা বাংলাদেশে জিসোমিয়া হিসেবে পরিচিত। আরেকটি হলো- অ্যাকুইজিশন অ্যান্ড ক্রস-সার্ভিসিং এগ্রিমেন্ট (ACSA)। এটি পরিচিত আকসা নামে।

এই লেখায় আমরা জানবো, এসিএসএ চুক্তি আসলে কী? কোন কোন দেশ আমেরিকার সঙ্গে এই চুক্তি করেছে? আর এই চুক্তির আওতায় আমেরিকা কি সুবিধা পায়?

অ্যাকুইজিশন অ্যান্ড ক্রস-সার্ভিসিং অ্যাগ্রিমেন্ট চুক্তির মাধ্যমে মার্কিন প্রতিরক্ষা বিভাগ এবং মিত্র দেশের সেনাবাহিনী একে অপরকে রসদ বা লজিস্টিকস দিয়ে সাহায্য করতে পারে। বিদেশে থাকা সৈন্যদের হঠাৎ কোনো কিছুর অভাব হলে বা জরুরি প্রয়োজনে এই সহায়তা দেওয়া হয়। যেমন- খাবার, থাকার জায়গা, পোশাক, যোগাযোগ, চিকিৎসা, যন্ত্রাংশ, ট্রেনিং এবং গোলাবারুদ। অফিস অব ইন্টারন্যাশনাল সিকিউরিটি অপারেশনস (আইএসও) এই সব অনুরোধের জন্য মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের অনুমতি নেওয়ার কাজটি করে থাকে।

এই চুক্তি মূল লক্ষ্য হলো কোনো অঞ্চলের স্থিতিশীলতা রক্ষা করা। আঞ্চলিক মিত্র বাহিনীর সঙ্গে ‘বাই, উইথ অ্যান্ড থ্রু’ (বিডব্লিউটি) কৌশলে কাজ করার মাধ্যমে মার্কিন সেনাবাহিনী সরাসরি যুদ্ধে না গিয়েও অন্য দেশগুলোকে নিজেদের প্রতিরক্ষা ও সরকারি প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে সহায়তা করতে পারে।

সহজ কথায়, সরাসরি যুদ্ধে না জড়িয়ে স্থানীয় ও বহুজাতিক অংশীদারদের সঙ্গে কাজ করে তাদের নিজস্ব প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়ানো এবং বৈশ্বিক স্থিতিশীলতা রক্ষা করাই এই সহজ ও কার্যকর চুক্তির মূল লক্ষ্য।

কিন্তু এই চুক্তিতে যুক্তরাষ্ট্র কি কি সুবিধা পায়?

এই চুক্তি অনুযায়ী দীর্ঘমেয়াদি রসদ অবকাঠামো তৈরি না করেই মার্কিন সামরিক বাহিনী যেকোনো বিদেশি অঞ্চলে দ্রুত মোতায়েন হতে পারে। দূর থেকে মালামাল পরিবহনের খরচ বাঁচিয়ে স্থানীয়ভাবে মিত্র দেশের কাছ থেকে রসদ সংগ্রহ করা যায়। মাঠে থাকা মার্কিন কমান্ডাররা দ্রুত আবাসন, গাড়ি বা চিকিৎসা সুবিধাও পেয়ে যান এই চুক্তির আওতায়। ন্যাটো ও অন্যান্য জোটের অংশীদারদের সাথে দ্বিপক্ষীয় প্রতিরক্ষা সম্পর্ক গভীর হয়।

এবারে জেনে নেওয়া যাক আমেরিকার সাথে এই চুক্তি থাকলে অন্য দেশের কি সুবিধা?

এসিএসএ চুক্তি যৌথ অভিযানের সময় মিত্র বাহিনীগুলোর মধ্যে কোনো নগদ অর্থ ছাড়াই জ্বালানি, খাদ্য, যন্ত্রাংশ ও গোলাবারুদ নির্বিঘ্নে বিনিময়ের সুযোগ দেয়, যা প্রশাসনিক জটিলতা ও খরচ কমায়। এর ফলে আমেরিকার সাথে বড় আকারের সামরিক মহড়া সহজ হয় এবং মার্কিন লজিস্টিক নেটওয়ার্ক ও আধুনিক হার্ডওয়্যারের সাথে মিত্র বাহিনীর কাজের সমন্বয় বাড়ে।

একই সাথে, এটি প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় মার্কিন পরিবহন সম্পদ ও চিকিৎসা সামগ্রী দ্রুত ব্যবহারের সুবিধা দিয়ে মানবিক সহায়তাকে বেগবান করে। ভূ-রাজনৈতিকভাবে, আমেরিকার বৈশ্বিক লজিস্টিক চেইনে এই প্রবেশাধিকার মিত্র দেশের সামরিক পরিধি বাড়ায় এবং ওয়াশিংটনের সাথে আনুষ্ঠানিক সম্পর্ক প্রকাশ করে আঞ্চলিক নিরাপত্তা হুমকি প্রতিহত করে। এছাড়া, এর মাধ্যমে নিজস্ব বিমানঘাঁটি ও নৌবন্দরের সক্ষমতা বৃদ্ধির পাশাপাশি বিশেষ আইনি সুরক্ষা এবং মার্কিন সরকারের কাছ থেকে অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্য ও সামরিক সহায়তা পাওয়ার পথ সহজ হয়।

কোন কোন দেশের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের এসিএসএ চুক্তি আছে?

বিশ্বের প্রায় ১০০ এরও বেশি দেশের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের এই চুক্তি আছে। এই তালিকায় আছে অস্ট্রেলিয়া, ডেনমার্ক, ব্রাজিল, সৌদি আরব, ভারত এবং শ্রীলংকা।

এবার ফিরে যাই শুরুতে। বাংলাদেশের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের আকসা চুক্তির কোনো প্রমাণ নেই। তবে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে এই আশা বেশ আগে থেকেই আছে। ২০১৯ সালে ডেইলি স্টারে প্রকাশিত এক নিবন্ধে বলা হয়-

২০৩০ সালের মধ্যে সামরিক বাহিনীকে আধুনিকীকরণের লক্ষ্যমাত্রার অংশ হিসেবে বাংলাদেশ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে উন্নত সরঞ্জাম কিনতে চাচ্ছে। এরই পরিপ্রেক্ষিতে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে বাংলাদেশের সাথে দুটি প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষরের আগ্রহ প্রকাশ করা হয়েছে।

তথ্যসূত্র: ন্যাশনাল ডিফেন্স ইউনিভার্সিটি প্রেস, ইউএস ডিপার্টমেন্ট অব স্টেট, ইউএস লিগ্যাল ফরমস, গ্লোবাল সিকিউরিটি ডট ওআরজি, দ্য ডেইলি স্টার

সম্পর্কিত