Advertisement Banner

আপনি কার লোক?

আপনি কার লোক?
এআই দিয়ে তৈরি প্রতীকী ছবি

আজকাল সকালে চায়ের কাপ হাতে খবরের কাগজ খোলার চেয়ে ফেসবুকের কমেন্ট সেকশনে ঢোকা অনেক বেশি শিক্ষণীয়। খবরের কাগজে আপনি কেবল ঘটনাটা জানতে পারবেন, কিন্তু কমেন্টে ঢুকলেই জানতে পারবেন ঘটনার পেছনে কার হাত, কার শ্বশুরের হাত, কার বিদেশি এজেন্ডা, কার সুপ্ত ষড়যন্ত্র, কার গুপ্ত তহবিল, এমনকি কার পোষা টিয়াপাখি পর্যন্ত এর সঙ্গে জড়িত।

সাংবাদিকরা যেখানে তথ্য সংগ্রহ করেন, সেখানে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিশেষজ্ঞরা সরাসরি মহাবিশ্বের গোপন নথি থেকে তথ্য সংগ্রহ করেন। তাদের তথ্যের উৎস কেউ জানে না, কিন্তু আত্মবিশ্বাস দেখে মনে হয় জাতিসংঘ, সিআইএ, কেজিবি, মোসাদ এবং মহাকাশ গবেষণা সংস্থা, সবাই মিলে তাদের কাছে রিপোর্ট জমা দেয়।

একসময় মানুষ বিশ্ববিদ্যালয়ে চার-পাঁচ বছর পড়ে রাষ্ট্রবিজ্ঞান শিখত, অর্থনীতি শিখত, ইতিহাস শিখত। এখন একটি স্মার্টফোন, দুটি ফেসবুক আইডি এবং তিন কাপ চা থাকলেই রাষ্ট্র, সমাজ, অর্থনীতি, পররাষ্ট্রনীতি, সামরিক কৌশল, ধর্মতত্ত্ব, চিকিৎসাবিজ্ঞান এবং আবহাওয়াবিদ্যা সম্পর্কে চূড়ান্ত মতামত দেওয়া যায়। বাংলাদেশের গণতন্ত্রের সবচেয়ে বড় অর্জন সম্ভবত এটিই, এখানে সবাই বিশেষজ্ঞ, শুধু বিষয়বস্তুটাই অনুপস্থিত।

আগেকার দিনে যুদ্ধ হতো সীমান্তে। সৈন্যরা বন্দুক হাতে লড়ত, কামান গর্জে উঠত, পতাকা উড়ত। আজকের বাংলাদেশে যুদ্ধ হয় টাইমলাইনে। সৈন্যদের জায়গায় আছে ফেক আইডি, কামানের জায়গায় স্ক্রিনশট, আর গোলাবারুদের জায়গায় আছে তকমা। আপনি একটি বাক্য লিখলেন, সঙ্গে সঙ্গে দুই পক্ষের কেউ একজন আপনাকে ফ্যাসিবাদী বা ফ্যাসিবাদের দোসর ঘোষণা করবে, আর অন্য পক্ষ আপনাকে গুপ্ত বলে রায় দেবে। মাঝখানে দাঁড়িয়ে বলার সুযোগ নেই যে, “ভাই, আমি আসলে শুধু বাজারে আলুর দাম নিয়ে কথা বলছিলাম।”

আজকের রাজনীতিতে মতামতের চেয়ে পরিচয় বেশি গুরুত্বপূর্ণ। আপনি কী বললেন, সেটি গৌণ। আপনি কার লোক, সেটিই মুখ্য। পৃথিবীর ইতিহাসে এমন অনেক সভ্যতা ছিল, যেখানে মানুষের পরিচয় নির্ধারিত হতো ধর্ম, বর্ণ কিংবা ভাষা দিয়ে। আমরা আরও উন্নত হয়েছি। এখানে মানুষের পরিচয় নির্ধারিত হয় কমেন্ট সেকশনের মাধ্যমে।

ধরুন, আপনি লিখলেন, “আজকের আকাশটা বেশ সুন্দর।” সঙ্গে সঙ্গে একজন এসে বলবেন, “আকাশের প্রশংসা কেন? আপনি কি অতীতের কোনো শাসনামলের নীল আকাশকে বৈধতা দিতে চাইছেন?” আরেকজন লিখবেন, “বর্তমান সময়ে আকাশ আরও সুন্দর হয়েছে, আপনি সেই কৃতিত্ব অস্বীকার করছেন কেন?” তৃতীয়জন বলবেন, “আকাশ নিয়ে কথা বলছেন মানে জনগণের দৃষ্টি অন্যদিকে সরানোর চেষ্টা করছেন।” চতুর্থজন গবেষণাধর্মী ভঙ্গিতে লিখবেন, “আমি ২০১৪ সালের একটি পোস্টে দেখেছি, আপনি একবার মেঘলা আবহাওয়া পছন্দ করেছিলেন। সুতরাং আপনার অবস্থান সন্দেহজনক।” শেষ পর্যন্ত আপনি বুঝতে পারবেন, আকাশেরও রাজনৈতিক অবস্থান আছে, শুধু আপনি এতদিন জানতেন না!

আমাদের দেশে এখন তকমা একটি জাতীয় সম্পদ। আগে মানুষ নামের আগে ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, অধ্যাপক লিখত। এখন সবচেয়ে জনপ্রিয় উপাধি হলো: ফ্যাসিবাদী, আধা-ফ্যাসিবাদী, গুপ্ত ফ্যাসিবাদী, সুপ্ত ফ্যাসিবাদী, সম্ভাব্য ফ্যাসিবাদী, ভবিষ্যৎ ফ্যাসিবাদী এবং পরিস্থিতিভেদে মৌসুমি ফ্যাসিবাদী। জাতি হিসেবে আমরা এতটাই অগ্রসর হয়েছি যে, মানুষ জন্মের আগেই তার রাজনৈতিক তকমা নির্ধারণ করে ফেলার সক্ষমতা অর্জন করেছি।

এদিকে বাস্তব জীবন নামক বিরক্তিকর জিনিসটি মাঝে মাঝে সামনে চলে আসে। চালের দাম বাড়ে, ডালের দাম বাড়ে, গ্যাসের দাম বাড়ে, চাকরি কমে, হাসপাতালের বেড কমে, শিক্ষার খরচ বাড়ে। কিন্তু এসব নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা করা যায় না। কারণ তখন কেউ না কেউ জিজ্ঞেস করবে, “ঠিক আছে, কিন্তু আগে বলেন আপনি কোন পক্ষ?” যেন একজন মানুষের পেটের ক্ষুধারও দলীয় পরিচয় থাকা আবশ্যক। মনে হয় ক্ষুধাও দুই ধরনের: সরকারপন্থী ক্ষুধা আর বিরোধীপন্থী ক্ষুধা।

একসময় রাজনীতির বিতর্ক হতো উন্নয়ন নিয়ে, অর্থনীতি নিয়ে, শিক্ষা নিয়ে। এখন বিতর্কের বড় অংশ ব্যয় হয় কে কার সঙ্গে ছবি তুলেছে, কে কাকে লাইক দিয়েছে, কে কার পোস্টে হাসির ইমোজি দিয়েছে এবং কে কাকে আনফলো করেছে, এসব নিয়ে।

আমাদের উন্নয়ন মডেলও অনন্য। পৃথিবীর অন্যান্য দেশে প্রকল্পের পরিকল্পনা হয়, তারপর বাজেট হয়, তারপর কাজ শুরু হয়। আমরা একটু সৃজনশীল। প্রথমে উদ্বোধন করি, তারপর ব্যয় বাড়াই, তারপর সময় বাড়াই, তারপর তদন্ত কমিটি করি, তারপর ফাইল হারাই। শেষ পর্যন্ত প্রকল্প শেষ হলে জনগণকে অভিনন্দন জানানো হয়; কারণ তারাই পুরো নাটকটি ধৈর্য ধরে দেখেছেন।

একটি উন্নয়ন প্রকল্পের জীবনচক্র অনেকটা বাংলা সিনেমার মতো। শুরুতে নায়ক প্রবেশ করে, তারপর সমস্যা দেখা দেয়, তারপর বাজেট বাড়ে, এরপর আরও সমস্যা দেখা দেয়, আবার বাজেট বাড়ে, তারপর তদন্ত হয়, তারপর তদন্তের তদন্ত হয়, এবং শেষ দৃশ্যে সবাই ঘোষণা করে: এটি একটি ঐতিহাসিক সাফল্য। প্রকল্পটি কেন তিন গুণ ব্যয়বহুল হলো, কেন পাঁচ বছর দেরি হলো, এসব প্রশ্ন তখন জাতীয় স্বার্থবিরোধী বলে গণ্য হয়।

আমাদের রাষ্ট্রে আইনও খুব মানবিক। আইন সবার জন্য সমান, তবে কারও জন্য একটু বেশি সমান। ছোট মানুষ আইনকে ভয় পায়, বড় মানুষ আইনকে চেনে। ফলে আইনের শাসন অনেকটা মাকড়সার জালের মতো। ছোট মাছি আটকে যায়, বড় পাখিরা জাল ছিঁড়ে উড়ে যায়। পরে আমরা বিস্মিত হয়ে ভাবি, জালটা এত দুর্বল হলো কী করে!

চাকরির বাজারের অবস্থাও কম মজার নয়। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বের হওয়া তরুণকে বলা হয়, “তোমার অভিজ্ঞতা নেই।” আর অভিজ্ঞতা অর্জন করতে গেলে চাকরি লাগে। ফলে সে এমন এক গোলকধাঁধায় আটকে যায়, যেখানে চাকরি পেতে অভিজ্ঞতা লাগে, আর অভিজ্ঞতা পেতে চাকরি লাগে। বহু তরুণ শেষ পর্যন্ত বুঝতে পারে, ডিগ্রি অর্জনের চেয়ে ধৈর্য অর্জন অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

মধ্যবিত্ত শ্রেণি এখন বাংলাদেশের সবচেয়ে দক্ষ জাদুকর। তারা একই বেতনে বাড়িভাড়া দেয়, বাজার করে, সন্তানের স্কুলের ফি দেয়, বৃদ্ধ বাবা-মায়ের ওষুধ কেনে, বিদ্যুৎ বিল দেয়, গ্যাস বিল দেয়, আবার সামাজিক অনুষ্ঠানে হাসিমুখে উপস্থিতও থাকে। অর্থনীতির নোবেল পুরস্কার কমিটি যদি বিষয়টি বুঝত, তাহলে হয়তো ‘একই আয়ে বেঁচে থাকার অলৌকিক কৌশল’ আবিষ্কারের জন্য বাংলাদেশের মধ্যবিত্তদের বিশেষ পুরস্কার দিত।

আর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম আমাদের এমন এক পর্যায়ে নিয়ে গেছে, যেখানে তথ্যের চেয়ে প্রতিক্রিয়ার মূল্য বেশি। কেউ একটি খবর পড়ার আগে সেটি শেয়ার করে। কেউ একটি বক্তব্য শোনার আগে তার প্রতিবাদ করে। কেউ একটি বই না পড়েই তার সমালোচনা লিখে ফেলে। আমরা এমন এক যুগে বাস করছি, যেখানে মতামতের গতি আলোর চেয়েও দ্রুত, কিন্তু সঠিক তথ্যের গতি অনেক ধীর।

সবচেয়ে ভয়ংকর বিষয় হলো, আমরা ধীরে ধীরে প্রশ্ন করাকে সন্দেহ করতে শিখেছি। কেউ প্রশ্ন করলে উত্তর দেওয়ার আগে তার রাজনৈতিক পরিচয় জানতে চাই। যেন প্রশ্নের সত্যতা নয়, প্রশ্নকারীর রাজনৈতিক পরিচয়ই আসল বিষয়। ফলে সমাজে চিন্তাশীল মানুষের সংখ্যা কমছে, আর চিৎকারকারীর সংখ্যা বাড়ছে। যিনি সবচেয়ে জোরে কথা বলেন, অনেক সময় তাকেই সবচেয়ে বেশি জ্ঞানী বলে ধরে নেওয়া হয়।

আর হয়ত এটাই আমাদের সময়ের সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি। আমরা সত্য খুঁজছি না, তকমা খুঁজছি। আমরা সমাধান খুঁজছি না, শত্রু খুঁজছি। আমরা যুক্তি শুনতে চাই না, নিজের পক্ষের প্রতিধ্বনি শুনতে চাই। ফলে দেশটা ধীরে ধীরে এমন এক জায়গায় পৌঁছাচ্ছে, যেখানে মানুষকে আর মানুষ হিসেবে দেখা হয় না; দেখা হয় একটি তকমা হিসেবে।

তবুও আশার জায়গা পুরোপুরি শেষ হয়ে যায়নি। কারণ এই দেশের মানুষ এখনো হাসতে পারে, ব্যঙ্গ করতে পারে, ভুল ধরতে পারে, ক্ষমতাকে প্রশ্ন করতে পারে, আবার নিজেদের নিয়েও মজা করতে পারে। যে সমাজ নিজেকে নিয়ে হাসতে জানে, সে সমাজ পুরোপুরি মরে যায় না।

কিন্তু তার জন্য একটা জিনিস খুব দরকার। তকমার বদলে চিন্তা, শত্রু খোঁজার বদলে সমাধান খোঁজা, আর প্রতিধ্বনির বদলে সংলাপ। এটা যদি না হয়, তাহলে হয়ত কেউ আর জিজ্ঞেসই করবে না, “দেশটা কেমন আছে?”

সব প্রশ্নকে হার মানিয়ে একটাই প্রশ্ন বেঁচে থাকবে, “আপনি কার লোক?”

সম্পর্কিত