Advertisement Banner

বাংলাদেশ সরকার ১৯৭১ ও প্রাসঙ্গিক আলোচনা

বাংলাদেশ সরকার ১৯৭১ ও প্রাসঙ্গিক আলোচনা
বাংলাদেশের চূড়ান্ত বিজয়ে ‘কথিত’ মুজিবনগর সরকারের ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও বিশাল। ছবি: সংগৃহীত

১৯৭১ সালে বাংলাদেশের চূড়ান্ত বিজয়ে ‘কথিত’ মুজিবনগর সরকারের ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও বিশাল। এ কথা বলাবাহুল্য যে, এই সরকার দক্ষতা ও বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে কাজ না করলে আমাদের স্বাধীনতা অনেক বিলম্বিত হতো এবং এর পরিণতি কী হতো তা বলা কঠিন। মুজিবনগর সরকারের আগে ‘কথিত’ শব্দটি যুক্ত করছি এই কারণে যে, ওই সরকারকে ‘মুজিবনগর সরকার’ বলার কোনো অবকাশ নেই। এটি নির্বাচিত প্রতিনিধিদের দ্বারা গঠিত বাঙালি জাতির ইতিহাসে প্রথম জনগণের সরকার।

১৯৭১ সনের ১০ এপ্রিল পাকিস্তান সরকারের নির্বাচিত এমএলএ এবং এমপিরা নিজেদেরকে গণপরিষদের সদস্য হিসেবে রূপান্তর করে সরকার গঠন করেন। সেখানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে দেশের রাষ্ট্রপতি এবং সৈয়দ নজরুল ইসলামকে উপরাষ্ট্রপতি নিয়োগ দেওয়া হয়। এরপর ১৭ এপ্রিল পূর্ণাঙ্গ সরকার গঠন করা হয়। সেখানে তাজউদ্দিন আহমদ ছিলেন প্রধানমন্ত্রী। এ ছাড়া এম মনসুর আলী, এ এইচ এম কামরুজ্জামান এবং খন্দকার মোশতাককে যথাক্রমে অর্থ, ত্রাণ এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। জেনারেল আতাউল গনি ওসমানীকে (কর্নেল) প্রধান সেনাপতি হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়।

এক দল নিন্দুক বলে থাকেন এমএনএ, এমপিদের পাকিস্তান সরকারের আমলে নির্বাচিত করা হয়েছিল। তাদের সংবিধান প্রণয়নের ক্ষমতা দেওয়া হয়নি। কিন্তু তারা জানে না, অথবা জেনেও স্বীকার করে না যে, পাকিস্তান সরকারের লিগ্যাল ফ্রেমওয়ার্ক অর্ডারে বলা হয়েছিল যে, নির্বাচিত প্রতিনিধিরা সংবিধান প্রণয়ন করবেন। পাকিস্তানিরা যখন একতরফা যুদ্ধ ঘোষণা করে বাঙালি নিধনে নেমে পড়ল, তখন বাঙালিদের প্রতিরোধ গড়ে তুলে সরকার গঠন করা ছাড়া আর কোনো পথ খোলা ছিল না। আর সেই সরকার পরিচালনার জন্য যে যে ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন, তা-ই করা হয়েছে। পাকিস্তানি বাহিনীর দখলে তখন গোটা বাংলাদেশ। সেই অবস্থায় আমাদের কোনো সুনির্দিষ্ট জায়গায় রাজধানী স্থাপন করা কঠিন ছিল। এই অবস্থাতে মেহেরপুরের বৈদ্যনাথতলা আম্রকুঞ্জে উন্মুক্তভাবে শপথ নেওয়া হয় বিশ্বকে দেখাবার জন্য। সেই জায়গাটি ৪৮ ঘণ্টা ধরে রাখা যায়নি। পাকিস্তানি বাহিনী দখল করে নেয়। তাই মুজিবনগর ছিল প্রতীকী নাম। বাংলাদেশ সরকারের প্রধান কেন্দ্র ছিল কলকাতা ৮ নম্বর থিয়েটার রোডে।

উল্লেখ্য, ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতেই শেখ মুজিবকে পাকিস্তানি বাহিনী গ্রেপ্তার করে নিয়ে যায়। ১০ এপ্রিল ১৯৭১, যে স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র পাঠ করা হয়, সেখানে উপরাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলামকে ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হিসেবে সকল দায়িত্ব দেওয়া হয়। সচিবালয়ের দায়িত্ব বাড়তে থাকায় কলকাতাসহ বিভিন্ন স্থানে আরও দপ্তর স্থাপন করা হয়। এরপর মুক্তিযুদ্ধের কার্যক্রম চলতে থাকে। পাকিস্তান সরকারের নির্যাতনের ফলে মানুষ দেশ ছেড়ে ভারতে চলে যায়। এই শরনার্থীর সংখ্যা এক কোটিতে দাঁড়িয়েছিল, যা ভারতের জন্য ছিল বড় বোঝা।

ভারতের তৎকালীন অর্থনৈতিক অবস্থা এখনকার মতো শক্তিশালী ছিল না। ফলে তাদের পক্ষে এই বোঝা বহন করা কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। এ ছাড়া রাজনৈতিক ও সামাজিক সমস্যা তো ছিলই। ফলে বিষয়টিকে বিশ্ববাসীর কাছে তুলে ধরা ছাড়া ভারতের আর কোনো রাস্তা ছিল না। আমরা তো প্রথম দিন থেকেই চেষ্টা করে যাচ্ছি, এই গণহত্যার চিত্র বিশ্ববাসীকে অবহিত করতে। এভাবেই বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ বৈশ্বিক ইতিহাসে রূপ নেয়।

বাংলাদেশ-বিরোধীরা বলে থাকেন–ভারত প্রথম থেকেই পাকিস্তানের শত্রু। অতএব তারা সুযোগ বুঝে এই যুদ্ধ শুরু করেছে। আসলে কাশ্মীর নিয়ে জন্মলগ্ন থেকে পাকিস্তান ও ভারতের মধ্যে শত্রুতা চলছিল। এ ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু ১৯৭০ সালে পাকিস্তান সরকার নির্বাচন অনুষ্ঠানের পর আওয়ামী লীগ বৃহত্তম দল হওয়া সত্ত্বেও এবং জাতীয় পরিষদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন সত্ত্বেও তাদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরের পরিবর্তে নানা টালবাহানা শুরু করে। সর্বশেষ ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ বাংলাদেশের নিরস্ত্র জনগণের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে তারা। ফলে হাজার হাজার মানুষ সীমান্ত অতিক্রম করে ভারতে প্রবেশ করে, যা শেষ পর্যন্ত সংখ্যায় কোটিতে পৌঁছায়। এ অবস্থায় ভারতের নিষ্ক্রিয় থাকার সুযোগ কোথায়?

‘মুজিবনগর সরকার’ নির্বাচিত প্রতিনিধিদের দ্বারা গঠিত বাঙালি জাতির ইতিহাসে প্রথম জনগণের সরকার। ছবি: চরচা
‘মুজিবনগর সরকার’ নির্বাচিত প্রতিনিধিদের দ্বারা গঠিত বাঙালি জাতির ইতিহাসে প্রথম জনগণের সরকার। ছবি: চরচা

অতএব, এ যুদ্ধ ভারত শুরু করেনি; বাংলাদেশও করেনি। পাকিস্তানের জেনারেলদের চক্রান্তের ফসল ছিল এই যুদ্ধ এবং এর প্রধান হোতা ছিলেন জুলফিকার আলী ভুট্টো। এখানে উল্লেখ্য যে, ৭০-এর নির্বাচনের পর পাকিস্তানের সামরিক সরকার এই মর্মে জানিয়ে দেয় যে, নির্বাচন অত্যন্ত সুষ্ঠু হয়েছে।

১৯৪৭ সালে ভারত বিভক্তের সময় যারা দেশত্যাগ করেছিল, তারা তা করেছেন চিরকালের জন্য। কিন্তু ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় যারা শরণার্থী হয়েছিল, তারা জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর অত্যাচারে দেশ ছেড়েছিলেন। ওপারে তারা গেছেন বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবে। ফলে তারা সকলেই শরণার্থী এবং পৃথকভাবে শরণার্থী ক্যাম্পে অবস্থান করেছেন। এদের সবার পরিচয় ছিল ‘জয় বাংলা’র লোক হিসেবে। এখানে একটি হাস্যকর কথা মনে পড়ল। সে সময় ব্যাপকভাবে চোখ ওঠার রোগ হয়েছিল। ভারতীয়দের ধারণা যে, শরনার্থীরা এই রোগ নিয়ে এসেছে। এ কারণে নাম দেওয়া হয়েছিল–‘জয় বাংলা চোখ রোগ’। এই শরণার্থী দেখভালের দায়িত্ব পালন শুধু ভারত সরকারের পক্ষে এককভাবে সম্ভব হয়নি। বাংলাদেশ সরাকারকে পুরোপুরি এই কাজের দায়িত্ব পালন করতে হয়েছে। এ সময় ডায়রিয়া, কলেরাসহ বিভিন্ন রোগ দেখা যায় শরণার্থী ক্যাম্পে। বাংলাদেশ সরকার শরণার্থীদের ভেতর থেকে বেশ কিছু চিকিৎসক নিয়োগ দেন। এ ছাড়া খাদ্যদ্রব্যসহ অন্যান্য বিষয়াদি তো ছিলই। এ সবই ১০ এপ্রিল ১৯৭১ সালে গঠিত গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারকে করতে হয়েছিল। মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনার জন্য দেশকে ১১টি সেক্টরে বিভক্ত করা হয়। বাংলাদেশের সামরিক কর্মকর্তারা, যারা জীবন বাজি রেখে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেন, তারা বিভিন্ন সেক্টরের দায়িত্ব পালন করেন। চুড়ান্ত বিজয় অর্জন পর্যন্ত যুদ্ধ চালিয়ে যান। এরপর আরেকটি বিষয় উল্লেখ করতে হয়। বাংলাদেশের বহুসংখ্যক তরুণ ও যুবক মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের জন্য সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে গিয়েছিল। এদের প্রশিক্ষণে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য সীমান্ত এলাকায় ভারতীয় এলাকার ভেতরে বেশ কয়েকটি অভ্যর্থনা কেন্দ্র খোলা হয়। সেখানে এদের জন্য যথাযথ থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা করা হয়। এরপর প্রয়োজন অনুযায়ী বাংলাদেশ সরকারের বাহিনীতে নিয়োগ দেওয়া হতো। তাছাড়া কিছুসংখ্যক তরুণ-যুবক স্থায়ীভাবে প্রশিক্ষণ নিয়ে, হালকা যুদ্ধের সরঞ্জাম নিয়ে দেশের মাটিতে গেরিলা তৎপরতা চালাত। বেসামরিক শাসন পরিচালনার জন্য দেশটি নয়টি অঞ্চলে ভাগ করা হয়েছিল। একেকটি অঞ্চলে সর্বোচ্চ দায়িত্বে ছিলেন একজন গণপরিষদ সদস্য এবং তাকে সাহায্য করতেন একজন উচ্চপদস্থ সিভিল অফিসার।

এই পুরো সময়ে দেশের মানুষের মনোবল অটুট রাখা এবং চলমান যুদ্ধের অবস্থা সম্পর্কে অবহিত করার জন্য অনন্য ভূমিকা পালন করেছে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র। প্রতিদিন সন্ধ্যা ৬টায় অনুষ্ঠান চালু হতো এবং প্রায় ১০টা পর্যন্ত চালু থাকত। এতে বিভিন্ন ধরনের অনুষ্ঠান যেমন–দেশপ্রেম গান, নাটক, ব্যঙ্গরসাত্মক আলোচনা নিখুঁতভাবে প্রচার করা হতো। প্রতিদিনের অনুষ্ঠানে বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণের অংশবিশেষ বাজানো হতো। ‘চরমপত্র’ নামে যে ব্যঙ্গরসপূর্ণ অনুষ্ঠান প্রচার করা হতো, তা তো সবার কাছে অত্যন্ত প্রিয় ছিল। বাংলাদেশ সরকারের কৃতিত্ব হলো–বেতারের সকল অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের কলাকুশলী এবং শিল্পীরা অংশগ্রহণ করেছে। একজন ভিনদেশী ব্যক্তিও অংশগ্রহণ করেন নাই। এদিকে মুক্তিযুদ্ধের বিষয়টি বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়ে বিভিন্ন দেশের দৃষ্টিভঙ্গি অনুযায়ী বিভিন্ন কৌতূহল ও প্রশ্ন। এক্ষেত্রে সঙ্গত কারণেই বিভিন্ন দেশ ভারত সরকারের সাথে যোগাযোগ করে। এর প্রকৃত অবস্থা জানার জন্য বাংলাদেশ সরকার উপযুক্ত বলেই ভারত সরকারকে অব্যাহতভাবে বাংলাদেশ সরকারের সাথে যোগাযোগ করতে হয়েছে। তাজউদ্দিন আহমদ বিচক্ষণ ও ধীর চিন্তার ব্যক্তি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শাসনকার্য পরিচালনা করেছেন বলেই ভারতের পক্ষে যথাযথ তথ্য সংগ্রহ করা সম্ভব হয়েছিল। বেশ কয়েকজন প্রভাবশালী যুব নেতার বক্তব্য ছিল যে, কোনো সরকার গঠনের প্রয়োজন নেই, এমনিতেই যুদ্ধ পরিচালিত হবে। সে সময় বিশ্বব্যাপী বিপ্লবের কথা উচ্চারিত হতো। তরুণেরা বিপ্লব দিয়েই সব করা যাবে–এ রকম একটা ধারণা পোষণ করত। কিন্তু সেই বিপ্লবটি কীভাবে সংগঠিত হবে, সে সম্পর্কে কারো কোনো ধারণা নেই। যেকোনো বিষয়কে বিপ্লব বলে চালিয়ে দেওয়া হতো।

পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ফিল্ড মার্শাল আইয়ুব খান ১৯৫৮ সালের ২৭ অক্টোবর রাতের আঁধারে তৎকালীন পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ইসকান্দার মির্জাকে হটিয়ে ক্ষমতা দখল করেন এবং ১০ বছর ক্ষমতায় থাকাকালে ২৭ অক্টোবর বিপ্লব দিবস হিসেবে পালন করতেন। ভারতের প্রখ্যাত রাজনীতিক এবং প্রাক্তন সংসদ সদস্য মিনু মাসানি এক বক্তব্যে বলেছিলেন, কোনো যুবক যদি ১৮ বছর বয়সে সমাজতন্ত্রের প্রতি আকৃষ্ট না হয়, তাহলে বুঝতে হবে যে তার হৃদয় নেই। আবার সে যদি ৪০ বছর বয়সে সেখান থেকে সরে না আসে, তাহলে বুঝতে হবে তার মস্তিষ্ক নেই। এ কথাটা তৎকালীন রাজনৈতিক পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে তিনি বলেছিলেন। আমরা ’৭১ সালে যে অবস্থায় পড়েছিলাম, তা মোকাবিলার জন্য বাংলাদেশ সরকার গঠনটাই ছিল সঠিক সিদ্ধান্ত, যা তাজউদ্দিন আহমদের গভীর প্রজ্ঞার পরিচয় দেয়। বাংলাদেশকে বলা হতো বারো ভূঁইয়ার দেশ। কিছু ভূ-সম্পত্তির মালিক হয়ে ভূঁইয়া হওয়া যায়। কিন্তু রাষ্ট্র পরিচালনা করা যায় না। বিশ্বের পরিস্থিতি সম্পূর্ণ পরিবর্তন হয়েছে। প্রতিটি রাষ্ট্রকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন রাষ্ট্রে বিভিন্ন স্বার্থ জড়িয়ে থাকে। পাকিস্তানি বাহিনী বাংলাদেশের মানুষের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ার পর তৎকালীন মার্কিন দূতাবাস প্রধান মি. আচার্ড ব্লাড যে প্রতিবেদন পাঠিয়েছিলেন, তাতে মার্কিন সরকারের বাংলাদেশের প্রতি সহানুভূতিশীল হওয়ার কথা। কিন্তু তা হয়নি। কেননা তখনকার মার্কিন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন সোভিয়েতের প্রতি ভারতের ক্রমবর্ধমান ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক দেখে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন। সে সময় চীনের সাথে পাকিস্তানের সম্পর্ক ছিল অনেক গভীর। তখন নিক্সন ঠিক করলেন যে, তিনি পাকিস্তানের সাহায্যে চীনের সাথে মৈত্রী স্থাপন করবেন, যা মূলত ভারত সরকারকে কোণঠাসা করবে। ফলে নিক্সন পাকিস্তানের শাসক ইয়াহিয়াকে সমর্থন দেন। এভাবেই গোটা বিশ্বে আমাদের মুক্তিযুদ্ধের বিষয়টি আলোচনায় চলে আসে।

বিশ্বের বিরূপ পরিস্থিতিতে এবং পাকিস্তানের মতো একটি ভয়ংকর আগ্রাসি শক্তিকে মোকাবিলার জন্য যতটা দক্ষতার প্রয়োজন, ততটা দক্ষতাই দেখিয়েছিল বাংলাদেশ সরকার। ছবি: সংগৃহীত
বিশ্বের বিরূপ পরিস্থিতিতে এবং পাকিস্তানের মতো একটি ভয়ংকর আগ্রাসি শক্তিকে মোকাবিলার জন্য যতটা দক্ষতার প্রয়োজন, ততটা দক্ষতাই দেখিয়েছিল বাংলাদেশ সরকার। ছবি: সংগৃহীত

এ অবস্থায় বাংলাদেশ সরকার সুষ্ঠুভাবে রাষ্ট্রের বিষয়গুলো যদি পালন না করত, তাহলে স্বাধীনতা অর্জন হতো না। এই নিয়ে আমরা পরে আলোচনা করব। একদিকে ভারতে অব্যাহতভাবে শরণার্থী বাড়তে থাকে, অন্যদিকে পাকিস্তান মূল সমস্যা এড়িয়ে বিষয়টাকে ভারত-পাকিস্তানের সমস্যা হিসেবে প্রচার করতে থাকে এবং বলে যে, এটি ভারতের সৃষ্ট। অথচ লাখো বাঙালির প্রাণ যাচ্ছে।

এখানে একটি কথা বলা প্রয়োজন। ভুট্টোর নেতৃত্বে পাকিস্তানি জেনারেলরা স্থির করেন–অস্ত্র দিয়ে বাঙালিদের দমন করবেন। ভুট্টো বলেছিলেন–২০ হাজার বাঙালি মেরে ফেললেই সব ঠিক হয়ে যাবে। আদতে হাজার তো দূর, লাখেও নিয়ন্ত্রণ করা যায়নি। এ অবস্থায় পাকিস্তান ভারতকে জড়িয়ে চক্রান্ত শুরু করে। অথচ বাংলাদেশ-বিরোধী মানুষ বলে থাকে–ভারত জন্মলগ্ন থেকেই পাকিস্তান-বিদ্বেষী। হ্যাঁ, তা ঠিক; একইভাবে পাকিস্তানও ভারত-বিদ্বেষী। আর মুক্তিযুদ্ধের শুরু থেকেই প্রতিরোধ করেছে বাঙালিরাই। যদিও তারা বরাবরই এই যুদ্ধকে ভারতের ষড়যন্ত্র হিসেবে আখ্যা দেওয়ার চেষ্টা করেছে।

জেনারেল নিয়াজি তার বইয়ে এই আশঙ্কার কথা লিখেছেন। এই প্রচার ও বাঙালি নিধনের উদ্দেশ্যেই পাকিস্তানি সেনারা গোটা দেশে গুম, হত্যা, ধর্ষণ, অগ্নিসংযোগ চালিয়েছে। তবে বিশ্বের কাছে ভিন্ন চিত্র তুলে ধরতে শহরাঞ্চলে কম জুলুম করেছে। ফলে আদালত, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান–সব স্বাভাবিক দেখাতে পেরেছে। কোনো অবস্থাতেই চুড়ান্ত যুদ্ধের আগে বাঙালি মুক্তিযোদ্ধারা কোনো জেলা, মহকুমা তাদের নিয়ন্ত্রণে নিতে পারেনি–এই কথাগুলো খুবই তাৎপর্যপূর্ণ।

অবশেষে পূর্ণ যুদ্ধ শুরু হয়। যতদূর প্রমাণ পাওয়া যায়, তাতে ভারতের পরিকল্পনা ছিল ৪ ডিসেম্বর সরাসরি পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করবে। কিন্তু তার আগেই পাকিস্তান ভারতে আক্রমণ করে বসে। সবচেয়ে বিষ্ময়ের ব্যাপার হলো–৯ মাস ধরে পাকিস্তানের করা অত্যাচারকে নিক্সন প্রশাসন পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ বিষয় বলে মন্তব্য করছিল। ৬ ডিসেম্বর ভারত বাংলাদেশকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দিলে এবং উভয়ে মিলিতভাবে যৌথবাহিনী গড়ে যুদ্ধ শুরু করলে রিচার্ড নিক্সন জাতিসংঘের শরণ নেয়। বিষয়টিকে ভারত ও পাকিস্তানের লড়াই বলে আখ্যা দেওয়া হয়। বাংলাদেশের কোনো নাম নেই। জাতিসংঘের আলোচনার পর যে ভোটাভুটি হয়, তার চিত্র খুবই করুন। যুদ্ধবিরতির পক্ষে; অর্থাৎ, পাকিস্তানিদের পক্ষে ১০৪ রাষ্ট্র ভোট দেয়। আর বিপক্ষে মাত্র ১১টি ভোট। এমনকি ভারতের প্রধামন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর বাবা জওহরলাল নেহেরু যেসব নেতাকে নিয়ে জোট নিরপেক্ষ আন্দোলন গড়েছিলেন, সেই যুগোস্লাভিয়া, মিসর, ঘানা–এরাও ভারতের পক্ষে ভোট দেয়নি। এরপর বিষয়টি নিরাপত্তা পরিষদে ওঠে। সেখানেও সেই ভয়াবহ চিত্র। পাকিস্তানের পক্ষে ভোট পড়ে ১১টি এবং ভারতের পক্ষে ২টি। সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেটো দিয়ে নিরাপত্তা পরিষদের সিদ্ধান্তকে দমিয়ে দেয়। এভাবে তিনবার ভেটো ক্ষমতা প্রয়োগ করে। এখন সে বিষয়গুলো ভাবা প্রয়োজন যে, যদি ভারত ও পাকিস্তানের ভেতর যুদ্ধবিরতি হতো, তাহলে বাংলাদেশের অবস্থা কী হতো। পাকিস্তান বেছে বেছে শরণার্থী গ্রহণ করত; আর একতরফা যুদ্ধবিরতি মানেই হলো–বাংলাদেশের ভেতর আরো নৃশংসতা চালানোর পূর্ণ লাইসেন্স। বাঙালিদের অবস্থা বোধহয় তামিলদের মতো হতো। তামিলদের আত্মত্যাগও কম ছিল না। কিন্তু পূর্ণ সমর্থন পায়নি তারা। যেটা বাংলাদেশ সরকার পেয়েছিল ভারত ও সোভিয়েত ইউনিয়নের কাছে থেকে। কিছু ছাত্র ও যুব নেতা বাংলাদেশ সরকার গঠনে বাধা প্রদান করেছিলেন। এমনকি পরবর্তী কার্যক্রমে সমস্যা তৈরি করেছিলেন। একজন যুবনেতা তো তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিন আহমদকে হত্যার নির্দেশ দিয়েছিলেন। মুক্তিযুদ্ধ শুরুর লগ্নে আমরা সাধারণ লোক মনে করতাম যে, ভারত বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিচ্ছে না কেন। কিন্তু বিষয়টা কত কঠিন ছিল, তা অনুধাবন করা গেল যখন তা জাতিসংঘে উপস্থাপিত হলো।

৯ মাস ধরে যুদ্ধ চলল। বাঙালিরা স্থায়ীভাবে কোনো কিছু দখল করতে না পারলেও গেরিলা যুদ্ধ চালিয়ে গেছে। দেশের অভ্যন্তরে বেশ কিছু বাহিনী তৈরি হয়েছিল এবং তারা যথেষ্ট তৎপরতা দেখিয়েছে। সর্বশেষে ভারত যখন বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়, তখন তারা এই বার্তাই দিল যে, বাংলাদেশের ভূখণ্ডে তাদের আগ্রহ নেই। তারপরও ভোটাভোটিতে কী করুণ অবস্থা বাংলাদেশের জন্য। প্রথমেই যদি ভারত বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিত, তাহলে বিশ্বের সবাই তাৎক্ষণিক ভারতকে সন্ত্রাসী হিসেবে চিহ্নিত করত। আর উদ্ধারের জন্য সোভিয়েত ভেটো পাওয়া যেত না। ভারত বাংলাদেশকে সাহায্য-সহযোগিতা করতে পেরেছিল, যেহেতু বাংলাদেশের প্রতিনিধিরা একটি অত্যন্ত যোগ্য, নিষ্ঠাবান সরকার গঠন করেছিল। একটি জাতীয় সংগ্রামে সরকারকে যেরকম দায়িত্ব পালন করতে হয়, তা তারা করতে পেরেছিল। আর এর সুযোগ্য নেতৃত্ব দিয়েছিলেন তাজউদ্দিন আহমদ। সরকার লাগবে না, বিপ্লব করলে হবে–এসব রোমান্টিক কথাবার্তায় স্বাধীন ও সার্বভৌম গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র গঠন করা যেত না। হয়তো বলা যেতে পারে, একটি জাতি স্বাধীনতা চাইলে তা অর্জিত হবেই তাকে ঠেকানো যায় না। কিন্তু এর জন্য প্রয়োজন অনুঘটক।

বাংলাদেশ সরকার স্বীকৃতি পেয়েছিল ৬ ডিসেম্বর এবং কলকাতা থেকে ঢাকায় এসেছে ২২ ডিসেম্বর। এই লম্বা সময় থাকাকালেও বাংলাদেশ সরকার তার স্বাতন্ত্র্য বজায় রেখেছিল। ভারত সরকারের ধারণা হয়েছিল যে, বাংলাদেশ সৃষ্টির পর উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তার সংকট দেখা যাবে। তাই তারা প্রস্তাব রেখেছিল–কিছু সরকারি কর্মকর্তাকে বাংলাদেশের সরকারকে সাহায্য করার জন্য পাঠিয়ে দেবে। কিন্তু বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিন আহমদ কলকাতায় বসেই সে প্রস্তাব প্রত্যাখান করেন এবং তিনি বাংলাদেশে এসে অতি দ্রুত প্রশাসনকে স্বাভাবিক অবস্থায় নিয়ে আসেন। বাংলাদেশের অফিস-আদালত কোথাও ১ ঘণ্টার জন্যও ভারতীয় কোনো কর্মকর্তা বসেননি।

এ কথাই বলতে হয় যে, বিশ্বের বিরূপ পরিস্থিতিতে এবং পাকিস্তানের মতো একটি ভয়ংকর আগ্রাসি শক্তিকে মোকাবিলার জন্য যতটা দক্ষতার প্রয়োজন, ততটা দক্ষতাই দেখিয়েছিল বাংলাদেশ সরকার। সেজন্য শুরুতেই বলেছি যে, বাংলাদেশ সরকার গঠন করে তৎকালীন নেতারা সঠিক কাজ করেছিলেন। পাকিস্তানের পূর্ব ফ্রন্টে পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পণের পর ১৬ ডিসেম্বর প্রায় মধ্যরাতে ভারতীয় সংসদে ইন্দিরা ঘোষণা দিয়ে বলেন যে, আজ মুক্ত ঢাকা একটি মুক্ত দেশের রাজধানী। তিনি বাংলাদেশ মুক্তিবাহিনীর নাম উল্লেখ করে তাদের সহাসিকতা ও বীরত্বের প্রশংসা করেন। তিনি ভারতীয় বাহিনীকে কোনো প্রতিহিংসার ঘটনা না ঘটানোর ব্যাপারে সতর্ক করেন। সেই সঙ্গে ইন্দিরা গান্ধী জানিয়ে দেন, মুক্তিবাহিনীর কমান্ডাররাও অনুরূপ নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি আরো বলেন, এসব দেখার দায়িত্ব বাংলাদেশ সরকাররের, যার অধীনে রয়েছে মুক্তিবাহিনী ও ভারতীয় সেনাবাহিনী।

লেখক: বীর মুক্তিযোদ্ধা ও লেখক

সম্পর্কিত