কাজী সাজিদুল হক

পয়লা বৈশাখের দিন পান্তা না খেলে অনেকেরই মনে হয় তিনি বোধহয় আর বাঙালি নন। বাজারে গিয়ে ইলিশ মাছটাও কিনতে হয়। তা সে যত দামই হোক। তবে ইলিশ তো মধ্যবিত্তের নাগালের বাইরে চলে গেছে। মধ্যবিত্ত এখন নানা রকম ভর্তা দিয়ে ইলিশ খায়। তেলাপিয়া, রুই মাছ ভাজা দিয়েও খায়। ফেসবুকে ইলিশ নিয়ে বেশ জ্ঞানী জ্ঞানী কথাও লেখে। ইলিশ সংরক্ষণ নিয়েও তার ওই সময় বেশ সচেতনতা তৈরি হয়। দাম কম হলে কী হতো, সেটা আপাতত থাক! তবে বৈশাখে পান্তা তার খেতেই হয়।
ঠিক কবে থেকে বাঙালির পাতে পান্তা পড়েছে, তার হদিশ পাওয়া যায় না। ধান হাজার হাজার বছর ধরে আমাদের এই উপমহাদেশে আছে। তার মানে ভাতও আছে। ভাত যেহেতু আছে, তাহলে পান্তাও আছে বহুকাল ধরে। তবে লিখিতভাবে পান্তার কথা মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যের মঙ্গলকাব্য ধারার অন্যতম প্রধান কাব্য চণ্ডীমঙ্গলে পাওয়া যায়। মুকুন্দরাম চক্রবর্তী চণ্ডীমঙ্গল কাব্যে ‘কালকেতুর ভোজন’-এ লিখেছেন, “মোচড়িয়া গোঁফ দুটা বান্ধিলেন ঘাড়ে/এক শ্বাসে সাত হাড়ি আমানি উজাড়ে/চারি হাড়ি মহাবীর খায় খুদ জাউ/ছয় হান্ডি মুসুরি সুপ মিশ্যা তথি লাউ।” এখানে যে ‘আমানি’-এর কথা বলা হলো, সেটা হলো পান্তার জল। চৈত্র সংক্রান্তির শেষ বেলায় হাঁড়িতে অপরিপক্ক আতপ চাল ছড়িয়ে কচি আমপাতার ডাল বসিয়ে দেওয়া হতো। নতুন বছরের প্রথম দিন সূর্য ওঠার আগে ঘর ঝাড়ু দিয়ে আমপাতা সহযোগে সেই পানি উঠোন ও ঘরে ছড়িয়ে দেন গৃহিনী। এরপর সেই ভেজানো চাল পরিবারের সবাইকে খেতে দেওয়া হয়। এই লোকাচার কৃষক সমাজে প্রচলিত ছিল। ষোড়শ শতাব্দীতে রচিত মনসামঙ্গল কাব্যের সর্বশ্রেষ্ঠ কবি বিজয়গুপ্ত লিখেছেন “আনিয়া মানের পাত বাড়ি দিল পান্তাভাত”। ‘মান’ বলতে এখানে মানকচুর কথা বলা হয়েছে। অর্থাৎ, মানকচুর পাতায় করে পান্তা ভাত বেড়ে দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।

নববর্ষের এখনকার যে উদ্যাপন সেটা মূলত নগরকেন্দ্রিক। নাগরিক মনে করেন একটা দিন আবহমান বাঙালি সংস্কৃতিতে স্নান করে সে আরো বাঙালি হয়ে উঠবে। পরদিন আবার আগের মতো হয়ে যাবে। বাসি খাবার যা থাকে, বাড়ির কাজের লোককে দিয়ে দেবে। বাংলা নববর্ষ উৎসবের দুটি দিক আছে। প্রথমটি বহু দিনের ধারাবাহিকভাবে চলে আসা সামাজিক বিভিন্ন রীতি। আরেকটি ছয়ের দশকে পাকিস্তানি শাসকের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ হিসেবে সাংস্কৃতিক আন্দোলন। রমনা বটমূলকে ঘিরে শুরু হলেও বর্তমানে যার বিকশিত রূপ সারা বাংলাদেশ শুধু নয়, সারা বিশ্বে। এই আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়েছে সাংস্কৃতিক সংগঠন ছায়ানট। পয়লা বৈশাখের নাগরিক উদ্যাপনে পান্তার প্রবেশ খুব বেশি দিন নয়। যতটুকু জানা যায়, আটের দশকে রমনাকে কেন্দ্র করে নববর্ষে কিছু খাবারের দোকান বসে। যারা ছায়ানটের অনুষ্ঠান দেখতে যেতেন, তারা সেখানে খেয়ে নিতেন। এমনই একবার অল্প কয়েকজন মিলে পান্তা ভাতের সঙ্গে ইলিশ মাছ ভাজা বিক্রি করলেন। সব বিক্রিও হয়ে যায়। সেই থেকে অনেকের মধ্যে এই পান্তা-ইলিশের ব্যাপারে ভাবনার শুরু হয়। তারপর ব্যবসা। লাভও হতে শুরু করল দেদার। যেখানে লাভ, সেখানে পুঁজি তার লকলকে জিভ নিয়ে ভোউ ভোউ করবে না–তা তো হয় না।
ছোট্ট জেলা শহরে আমাদের বাড়িতে পয়লা বৈশাখের দিন মাংস পোলাও রান্না হতো। আমার আম্মার যুক্তি ছিল–বছরের একটি উল্লেখযোগ্য দিন ‘ভালো কিছু’ খেতে হয়। এই ‘ভালো কিছু’ মানেই আমাদের বাড়িতে পোলাও-মাংস। পান্তা পয়লা বৈশাখে আমরা খাইনি কোনোদিন। বরং অন্য সময় মাঝে মাঝেই খাওয়া হতো। কখনো ডিম ভাজা দিয়ে কখনো বা শুধু পেঁয়াজ আর পোড়া মরিচ দিয়ে। পেঁয়াজ-মরিচ দিয়ে পান্তা যেদিন হতো, সেদিন চটকে চটকে আম্মা মেখে দিতেন। ডিমের জায়গায় পেঁয়াজ-মরিচ দেখে খুব যে একটা ভালো লাগত, এমন নয়। তবে সেই বিষাদের সঙ্গে স্বাদটাও কম ছিল না। উৎপলা সেনের গাওয়া ‘পথের ধারে মুক্তো আমি ছড়িয়ে দিলাম’ গানে মুখরায় প্রথম লাইন শেষ হওয়ার সাথে অ্যাকোর্ডিয়ানের যে ব্যবহার সুধীন দাশগুপ্ত করেছেন, সেটা যে রকম সুখ দেয়, ঠিক ও রকম একটা সুখ বোধহয় ও সময় পেতাম।
পয়লা বৈশাখের আজকালের যে আয়োজন, অর্থাৎ নাগরিক আয়োজন সেখানে পান্তা গুরুত্ব পেলেও পোলাও-মাংস, বিরিয়ানি কেন গুরুত্ব পায় না? এটাও তো বাঙালির খাবার। অবাক হওয়ার কিছু নেই। অনেকেই বলবেন, এসব খাবার কবে বাঙালির হলো! হয়েছে, অন্তত ৩০০ বছর ধরে বাঙালি পোলাও-মাংস খাচ্ছে। এই বাংলাদেশের রাজধানীতে পোলাও-বিরিয়ানি অন্তত ৩০০ বছর ধরে নাগরিক সংস্কৃতির অংশ। এখানে নাগরিক বলতে একসময়কার ধনীদের বোঝানো হচ্ছে। এখনো ইলিশ ধনীদের খাবার। যদি ধরেও নিই পোলাও, বিরিয়ানি মোগলদের থেকে আসা (সেটা নিয়ে বিস্তার আলোচনার দাবি রাখে) তবুও রাজধানী হিসেবে ঢাকার বয়স তো ৪০০ বছরের। আর মোগলরাই ঢাকাকে রাজধানী করেছিল। আমাদের এই উপমহাদেশে বিরিয়ানি সদৃশ খাবার খ্রিস্টপূর্ব ৩০০ অব্দেও পাওয়া যেত। নাম ছিল ‘উন সরু’। সেটাও যদি ধরি, তাহলে আর কথাই থাকে না। আমাদের তামাম উপমহাদেশের অনেক কিছুই বিভিন্নভাবে সংযুক্ত। থাক, ওদিকে আলোচনা না হোক আজ। বরং চলুন একটু দেখি, বিরিয়ানি-পোলাও কীভাবে বাঙালির খাবার হয়ে উঠল।

বিরিয়ানির ইতিহাস ঢাকায় খুব বেশি দিনের নয়। ঢাকার এক সময়কার ধনী ঘরের বাসিন্দারা পোলাও খেতেন। নানারকম পোলাও। দুটো দোহাই দেওয়া যাক। প্রথমেই হেকিম হাবিবুর রহমান, যিনি সাতচল্লিশপূর্ব ঢাকার নাগরিক জীবনের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য তথ্যসূত্রদের একজন। স্বাধীন বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকার ইতিহাস নিয়ে প্রামাণ্য গ্রন্থ ‘ঢাকা পাচাস বারাস পেহলে’ তারই রচনা। হেকিম সাহেব তার ওই বইতে পোলাও নিয়ে বেশ বিস্তারিত আলোচনা করেছে। নানা রকম পোলাওয়ের কথা বলেছেন। যেমন, খাচ্ছা পোলাও (মোরগ পোলাও), বুন্দিয়া পোলাও, ইলিশ পোলাও, রুই পোলাও, তেহারি (এটাকেও হাকিম সাহেব পোলাও বলছেন এবং বলেছেন তেহারি রাস্তায় বিক্রি হতো)। ঘরোয়া খাবারে পরিবেশন হয় কিন্তু দাওয়াতে দেওয়া হয় না। আর ছিল শেবেত বা সোইয়া পোলাও, মজমুয়া পোলাও, মাগলুবা পোলাও (খাসির চর্বি ছাড়া মাংস দিয়ে রান্না হতো), নার্গিসি পোলাও। তিনি বায়দা পোলাও বা খাসি পোলাও বলে আরেক বস্তুর কথাও বলেছেন। হেকিম সাহেব ‘দোগোশা’ আর ‘কোরামা পোলাও’কে বিরিয়ানি বলেছেন এবং ‘জের বিরিয়ানি’ বলে এক বিলুপ্ত পদের নাম করেছেন।
এই যে নানারকম পোলাও, যা মাংস সহযোগে রান্না হতো–হেকিম সাহেবের লেখা পড়ে অনেকেই হয়তো বিভ্রান্ত হয়েছেন, হচ্ছেন। এবং নিজেরা পরে সেই পোলাওকে বিরিয়ানি হিসেবে বর্ণনা করেছেন। হেকিম সাহেব তার বইতে যে সময়ের বিবরণ দিয়েছেন, সেটা ১৯ শতকের শেষার্ধ এবং বিশ শতকের প্রথমার্ধ। পরের দিকের তথ্যও কিন্তু বলছে যে, দেশভাগের আগে ঢাকায় পোলাওয়ের চলই বেশি ছিল। শিল্প তত্ত্বজ্ঞ প্রফেসর শাহেদ সোহরাওয়ার্দির দোহাই দিই। পাকিস্তানের পঞ্চম প্রধানমন্ত্রী হোসেইন শহীদ সোহরাওয়ার্দির বড় ভাই। ত্রিশের দশকে তিনি রন্ধন শিল্প নিয়ে ইংরেজিতে একটি গ্রন্থ লিখেছিলেন। শাহেদ তার বইতে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের রান্নার প্রশংসা করেছেন। কিন্তু সবচেয়ে বেশি প্রশংসা করেছেন ঢাকার মোরগ-পোলাওয়ের। তিনি লিখেছেন–ঢাকার মোরগ-পোলাওয়ের স্বাদ লিখে তুলে ধরা যায় না। এটি একটি অভিজ্ঞতা, যা অর্জন করতে হয়। অর্থাৎ, পোলাও (বা বিরিয়ানি) ঢাকার অনুপম একটি খাবার।
এই পোলাও যে গরীব সাধারণ মানুষ খেত, তা হয়তো নয়। কিন্তু নানা উপলক্ষে মধ্যবিত্ত ও ধনীরা তো খেতই। আর মানুষ যেটা বেশি খায়, সেটা ইতিহাসের নানা বাঁকে দেখা দেবে সেটা স্বাভাবিক। সেই পোলাও বা বিরিয়ানি নানা উৎসবে মানুষ খাচ্ছে। ছুটির দিনে খাচ্ছে। যেকোনো আয়োজনে খাচ্ছে। মাছ সহযোগে পোলাও খাচ্ছে। এই ঢাকা শহরেই একসময় রইস ঘরে নিয়মিত ইলিশ-পোলাও, রুই-পোলাও রান্না হতো। হওয়াটাই স্বাভাবিক। নদীর পারে গড়ে ওঠা শহরে মাছ তো থাকবেই। আর মাছে-ভাতে বাঙালি প্রবাদ তো আছেই।

ঢাকায় তেহারি সবসময় সস্তা একটি খাবার বলে পরিচিত। এখন কতটা সস্তা, সেটা নিয়ে প্রশ্ন তোলাই যেতে পারে। একসময় রাস্তার পাশে তেহারির দোকানে অনেক রিকশা শ্রমিককে দেখা যেত। এখন তারা খুব একটা সেখানে বসেন না। বরং ভ্যানে বিক্রি হওয়া তেহারির দোকানে তাদের ভিড় বেশি। ওখানে দামটা যে কম! এই তেহারি যে আদতে পোলাও, সেটা হেকিম সাহেব বলেছেন। তার রন্ধনপ্রণালীও পোলাওয়ের মতো। যারা একে বিরিয়ানি বলে, তারা না জেনে বলেন। আগেই বলা হয়েছে, তেহারি রাস্তায় বিক্রি করা হতো। তার মানে হলো এর প্রচলন ভালোভাবেই ছিল।
এই যে বিরিয়ানি বা পোলাও মানুষ খাচ্ছে, সেই ঢাকাই বিরিয়ানি বা পোলাওয়ের সঙ্গে কী কলকাতা, হায়দ্রাবাদ, লখনৌ-এর মিল আছে? দক্ষিণ ভারতের নানা বিরিয়ানি-পোলাওয়ের সঙ্গে মিল আছে? সহজ উত্তর, ‘না’। ঢাকা শহরের পোলাও-বিরিয়ানি দিনে দিনে বাঙালি হয়ে উঠেছে। কলকাতার ক্ষেত্রেও তাই বলা যায়। বিশেষ করে ওখানকার ব্যারাকপুর স্টাইল বিরিয়ানি দেখে এটা মনে হয়েছে। এই বাঙালি হওয়াটা অনেক দিনের চর্চার ফল। ঠিক যেমন অন্য অনেক জায়গায় অনেক খাবার, আচার বাঙালির রীতি হয়েছে, তেমনই। ধরুন, কলকাতায় যদি কোনো বড় হোটেলে আপনি বিরিয়ানি খান, তবে মুখে খুব একটা ঝাল লাগবে না, যেটুকু পাওয়া যাবে সেটা গোলমরিচের একটা হালকা ঝাঁজ। দিল্লিতেও না। অথচ এই ঢাকা শহরে অনেক দোকান আছে, যেখানে বিরিয়ানিতে ঝালটা বেশ প্রাধান্য পায়। সেটা কতটা উচিত, সেই প্রশ্ন উহ্যই থাকুক। কিন্তু মানুষ খাচ্ছে বলেই ও রকম বানানো হচ্ছে। ঢাকাই কাচ্চি বিরিয়ানির আসল যে রেসিপি, সেখানে ঝাল দেওয়া হয় না। যে ঝাল ঝাল ঝাঁজ লাগে, সেটা গোলমরিচ আর লবঙ্গের। ওটাকে ঝাল বলা যাবে কি না, সেটাও একটা প্রশ্ন। যারা ঢাকাই কাচ্চিতে গুঁড়া মরিচ বা কাঁচা মরিচ দেয়, তারা আসল রেসিপি হয় জানে না কিংবা জনরুচির কাছে বশ্যতা স্বীকার করেছেন।
সেটাই হয়তো স্বাভাবিক। জনরুচি বড্ড গোলমেলে ব্যাপার। কথা হচ্ছে, মানুষ প্রতিদিন যেমন খাবার পছন্দ করে উৎসব বা বিশেষ আয়োজনের খাবারও তেমন করে নিয়েছে। তার নিজের স্বাদকোরক অনুযায়ী সে সবকিছু ‘কাস্টমাইজ’ করেছে। পয়লা বৈশাখের পান্তাও কিন্তু কাস্টমাইজড। কারণ, শহরের অনেক জায়গায় গরম পান্তা পাওয়া যায়। চিনিগুঁড়া বা কালোজিরা চালের পান্তা পাওয়া যায়। ‘কাস্টমাইজড’ পান্তা। তিন কোটিরও বেশি মানুষের শহরে বলতে গেলে মোড়ে মোড়ে পোলাও-বিরিয়ানি-তেহারির দোকান পাওয়া যায়। সব দোকানেই বিক্রি হয় নিশ্চয়। না হলে দোকান চলত না। অর্থাৎ, মানুষ তার দৈনন্দিন জীবনে এসব খাবার খাচ্ছে। যেটা দৈনন্দিনতায় ঢুকেছে, তার চরিত্র আর অন্য জাতের থাকে না। সেটা বাঙালিরই খাবার। তাই যারা পান্তা খাচ্ছে, খাক। সেইসাথে পয়লা বৈশাখের দিন পোলাও-বিরিয়ানিও খাওয়া চলুক। কারণ, ওটাও বাঙালির। অন্য জাতির তো বটেই।

পয়লা বৈশাখের দিন পান্তা না খেলে অনেকেরই মনে হয় তিনি বোধহয় আর বাঙালি নন। বাজারে গিয়ে ইলিশ মাছটাও কিনতে হয়। তা সে যত দামই হোক। তবে ইলিশ তো মধ্যবিত্তের নাগালের বাইরে চলে গেছে। মধ্যবিত্ত এখন নানা রকম ভর্তা দিয়ে ইলিশ খায়। তেলাপিয়া, রুই মাছ ভাজা দিয়েও খায়। ফেসবুকে ইলিশ নিয়ে বেশ জ্ঞানী জ্ঞানী কথাও লেখে। ইলিশ সংরক্ষণ নিয়েও তার ওই সময় বেশ সচেতনতা তৈরি হয়। দাম কম হলে কী হতো, সেটা আপাতত থাক! তবে বৈশাখে পান্তা তার খেতেই হয়।
ঠিক কবে থেকে বাঙালির পাতে পান্তা পড়েছে, তার হদিশ পাওয়া যায় না। ধান হাজার হাজার বছর ধরে আমাদের এই উপমহাদেশে আছে। তার মানে ভাতও আছে। ভাত যেহেতু আছে, তাহলে পান্তাও আছে বহুকাল ধরে। তবে লিখিতভাবে পান্তার কথা মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যের মঙ্গলকাব্য ধারার অন্যতম প্রধান কাব্য চণ্ডীমঙ্গলে পাওয়া যায়। মুকুন্দরাম চক্রবর্তী চণ্ডীমঙ্গল কাব্যে ‘কালকেতুর ভোজন’-এ লিখেছেন, “মোচড়িয়া গোঁফ দুটা বান্ধিলেন ঘাড়ে/এক শ্বাসে সাত হাড়ি আমানি উজাড়ে/চারি হাড়ি মহাবীর খায় খুদ জাউ/ছয় হান্ডি মুসুরি সুপ মিশ্যা তথি লাউ।” এখানে যে ‘আমানি’-এর কথা বলা হলো, সেটা হলো পান্তার জল। চৈত্র সংক্রান্তির শেষ বেলায় হাঁড়িতে অপরিপক্ক আতপ চাল ছড়িয়ে কচি আমপাতার ডাল বসিয়ে দেওয়া হতো। নতুন বছরের প্রথম দিন সূর্য ওঠার আগে ঘর ঝাড়ু দিয়ে আমপাতা সহযোগে সেই পানি উঠোন ও ঘরে ছড়িয়ে দেন গৃহিনী। এরপর সেই ভেজানো চাল পরিবারের সবাইকে খেতে দেওয়া হয়। এই লোকাচার কৃষক সমাজে প্রচলিত ছিল। ষোড়শ শতাব্দীতে রচিত মনসামঙ্গল কাব্যের সর্বশ্রেষ্ঠ কবি বিজয়গুপ্ত লিখেছেন “আনিয়া মানের পাত বাড়ি দিল পান্তাভাত”। ‘মান’ বলতে এখানে মানকচুর কথা বলা হয়েছে। অর্থাৎ, মানকচুর পাতায় করে পান্তা ভাত বেড়ে দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।

নববর্ষের এখনকার যে উদ্যাপন সেটা মূলত নগরকেন্দ্রিক। নাগরিক মনে করেন একটা দিন আবহমান বাঙালি সংস্কৃতিতে স্নান করে সে আরো বাঙালি হয়ে উঠবে। পরদিন আবার আগের মতো হয়ে যাবে। বাসি খাবার যা থাকে, বাড়ির কাজের লোককে দিয়ে দেবে। বাংলা নববর্ষ উৎসবের দুটি দিক আছে। প্রথমটি বহু দিনের ধারাবাহিকভাবে চলে আসা সামাজিক বিভিন্ন রীতি। আরেকটি ছয়ের দশকে পাকিস্তানি শাসকের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ হিসেবে সাংস্কৃতিক আন্দোলন। রমনা বটমূলকে ঘিরে শুরু হলেও বর্তমানে যার বিকশিত রূপ সারা বাংলাদেশ শুধু নয়, সারা বিশ্বে। এই আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়েছে সাংস্কৃতিক সংগঠন ছায়ানট। পয়লা বৈশাখের নাগরিক উদ্যাপনে পান্তার প্রবেশ খুব বেশি দিন নয়। যতটুকু জানা যায়, আটের দশকে রমনাকে কেন্দ্র করে নববর্ষে কিছু খাবারের দোকান বসে। যারা ছায়ানটের অনুষ্ঠান দেখতে যেতেন, তারা সেখানে খেয়ে নিতেন। এমনই একবার অল্প কয়েকজন মিলে পান্তা ভাতের সঙ্গে ইলিশ মাছ ভাজা বিক্রি করলেন। সব বিক্রিও হয়ে যায়। সেই থেকে অনেকের মধ্যে এই পান্তা-ইলিশের ব্যাপারে ভাবনার শুরু হয়। তারপর ব্যবসা। লাভও হতে শুরু করল দেদার। যেখানে লাভ, সেখানে পুঁজি তার লকলকে জিভ নিয়ে ভোউ ভোউ করবে না–তা তো হয় না।
ছোট্ট জেলা শহরে আমাদের বাড়িতে পয়লা বৈশাখের দিন মাংস পোলাও রান্না হতো। আমার আম্মার যুক্তি ছিল–বছরের একটি উল্লেখযোগ্য দিন ‘ভালো কিছু’ খেতে হয়। এই ‘ভালো কিছু’ মানেই আমাদের বাড়িতে পোলাও-মাংস। পান্তা পয়লা বৈশাখে আমরা খাইনি কোনোদিন। বরং অন্য সময় মাঝে মাঝেই খাওয়া হতো। কখনো ডিম ভাজা দিয়ে কখনো বা শুধু পেঁয়াজ আর পোড়া মরিচ দিয়ে। পেঁয়াজ-মরিচ দিয়ে পান্তা যেদিন হতো, সেদিন চটকে চটকে আম্মা মেখে দিতেন। ডিমের জায়গায় পেঁয়াজ-মরিচ দেখে খুব যে একটা ভালো লাগত, এমন নয়। তবে সেই বিষাদের সঙ্গে স্বাদটাও কম ছিল না। উৎপলা সেনের গাওয়া ‘পথের ধারে মুক্তো আমি ছড়িয়ে দিলাম’ গানে মুখরায় প্রথম লাইন শেষ হওয়ার সাথে অ্যাকোর্ডিয়ানের যে ব্যবহার সুধীন দাশগুপ্ত করেছেন, সেটা যে রকম সুখ দেয়, ঠিক ও রকম একটা সুখ বোধহয় ও সময় পেতাম।
পয়লা বৈশাখের আজকালের যে আয়োজন, অর্থাৎ নাগরিক আয়োজন সেখানে পান্তা গুরুত্ব পেলেও পোলাও-মাংস, বিরিয়ানি কেন গুরুত্ব পায় না? এটাও তো বাঙালির খাবার। অবাক হওয়ার কিছু নেই। অনেকেই বলবেন, এসব খাবার কবে বাঙালির হলো! হয়েছে, অন্তত ৩০০ বছর ধরে বাঙালি পোলাও-মাংস খাচ্ছে। এই বাংলাদেশের রাজধানীতে পোলাও-বিরিয়ানি অন্তত ৩০০ বছর ধরে নাগরিক সংস্কৃতির অংশ। এখানে নাগরিক বলতে একসময়কার ধনীদের বোঝানো হচ্ছে। এখনো ইলিশ ধনীদের খাবার। যদি ধরেও নিই পোলাও, বিরিয়ানি মোগলদের থেকে আসা (সেটা নিয়ে বিস্তার আলোচনার দাবি রাখে) তবুও রাজধানী হিসেবে ঢাকার বয়স তো ৪০০ বছরের। আর মোগলরাই ঢাকাকে রাজধানী করেছিল। আমাদের এই উপমহাদেশে বিরিয়ানি সদৃশ খাবার খ্রিস্টপূর্ব ৩০০ অব্দেও পাওয়া যেত। নাম ছিল ‘উন সরু’। সেটাও যদি ধরি, তাহলে আর কথাই থাকে না। আমাদের তামাম উপমহাদেশের অনেক কিছুই বিভিন্নভাবে সংযুক্ত। থাক, ওদিকে আলোচনা না হোক আজ। বরং চলুন একটু দেখি, বিরিয়ানি-পোলাও কীভাবে বাঙালির খাবার হয়ে উঠল।

বিরিয়ানির ইতিহাস ঢাকায় খুব বেশি দিনের নয়। ঢাকার এক সময়কার ধনী ঘরের বাসিন্দারা পোলাও খেতেন। নানারকম পোলাও। দুটো দোহাই দেওয়া যাক। প্রথমেই হেকিম হাবিবুর রহমান, যিনি সাতচল্লিশপূর্ব ঢাকার নাগরিক জীবনের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য তথ্যসূত্রদের একজন। স্বাধীন বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকার ইতিহাস নিয়ে প্রামাণ্য গ্রন্থ ‘ঢাকা পাচাস বারাস পেহলে’ তারই রচনা। হেকিম সাহেব তার ওই বইতে পোলাও নিয়ে বেশ বিস্তারিত আলোচনা করেছে। নানা রকম পোলাওয়ের কথা বলেছেন। যেমন, খাচ্ছা পোলাও (মোরগ পোলাও), বুন্দিয়া পোলাও, ইলিশ পোলাও, রুই পোলাও, তেহারি (এটাকেও হাকিম সাহেব পোলাও বলছেন এবং বলেছেন তেহারি রাস্তায় বিক্রি হতো)। ঘরোয়া খাবারে পরিবেশন হয় কিন্তু দাওয়াতে দেওয়া হয় না। আর ছিল শেবেত বা সোইয়া পোলাও, মজমুয়া পোলাও, মাগলুবা পোলাও (খাসির চর্বি ছাড়া মাংস দিয়ে রান্না হতো), নার্গিসি পোলাও। তিনি বায়দা পোলাও বা খাসি পোলাও বলে আরেক বস্তুর কথাও বলেছেন। হেকিম সাহেব ‘দোগোশা’ আর ‘কোরামা পোলাও’কে বিরিয়ানি বলেছেন এবং ‘জের বিরিয়ানি’ বলে এক বিলুপ্ত পদের নাম করেছেন।
এই যে নানারকম পোলাও, যা মাংস সহযোগে রান্না হতো–হেকিম সাহেবের লেখা পড়ে অনেকেই হয়তো বিভ্রান্ত হয়েছেন, হচ্ছেন। এবং নিজেরা পরে সেই পোলাওকে বিরিয়ানি হিসেবে বর্ণনা করেছেন। হেকিম সাহেব তার বইতে যে সময়ের বিবরণ দিয়েছেন, সেটা ১৯ শতকের শেষার্ধ এবং বিশ শতকের প্রথমার্ধ। পরের দিকের তথ্যও কিন্তু বলছে যে, দেশভাগের আগে ঢাকায় পোলাওয়ের চলই বেশি ছিল। শিল্প তত্ত্বজ্ঞ প্রফেসর শাহেদ সোহরাওয়ার্দির দোহাই দিই। পাকিস্তানের পঞ্চম প্রধানমন্ত্রী হোসেইন শহীদ সোহরাওয়ার্দির বড় ভাই। ত্রিশের দশকে তিনি রন্ধন শিল্প নিয়ে ইংরেজিতে একটি গ্রন্থ লিখেছিলেন। শাহেদ তার বইতে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের রান্নার প্রশংসা করেছেন। কিন্তু সবচেয়ে বেশি প্রশংসা করেছেন ঢাকার মোরগ-পোলাওয়ের। তিনি লিখেছেন–ঢাকার মোরগ-পোলাওয়ের স্বাদ লিখে তুলে ধরা যায় না। এটি একটি অভিজ্ঞতা, যা অর্জন করতে হয়। অর্থাৎ, পোলাও (বা বিরিয়ানি) ঢাকার অনুপম একটি খাবার।
এই পোলাও যে গরীব সাধারণ মানুষ খেত, তা হয়তো নয়। কিন্তু নানা উপলক্ষে মধ্যবিত্ত ও ধনীরা তো খেতই। আর মানুষ যেটা বেশি খায়, সেটা ইতিহাসের নানা বাঁকে দেখা দেবে সেটা স্বাভাবিক। সেই পোলাও বা বিরিয়ানি নানা উৎসবে মানুষ খাচ্ছে। ছুটির দিনে খাচ্ছে। যেকোনো আয়োজনে খাচ্ছে। মাছ সহযোগে পোলাও খাচ্ছে। এই ঢাকা শহরেই একসময় রইস ঘরে নিয়মিত ইলিশ-পোলাও, রুই-পোলাও রান্না হতো। হওয়াটাই স্বাভাবিক। নদীর পারে গড়ে ওঠা শহরে মাছ তো থাকবেই। আর মাছে-ভাতে বাঙালি প্রবাদ তো আছেই।

ঢাকায় তেহারি সবসময় সস্তা একটি খাবার বলে পরিচিত। এখন কতটা সস্তা, সেটা নিয়ে প্রশ্ন তোলাই যেতে পারে। একসময় রাস্তার পাশে তেহারির দোকানে অনেক রিকশা শ্রমিককে দেখা যেত। এখন তারা খুব একটা সেখানে বসেন না। বরং ভ্যানে বিক্রি হওয়া তেহারির দোকানে তাদের ভিড় বেশি। ওখানে দামটা যে কম! এই তেহারি যে আদতে পোলাও, সেটা হেকিম সাহেব বলেছেন। তার রন্ধনপ্রণালীও পোলাওয়ের মতো। যারা একে বিরিয়ানি বলে, তারা না জেনে বলেন। আগেই বলা হয়েছে, তেহারি রাস্তায় বিক্রি করা হতো। তার মানে হলো এর প্রচলন ভালোভাবেই ছিল।
এই যে বিরিয়ানি বা পোলাও মানুষ খাচ্ছে, সেই ঢাকাই বিরিয়ানি বা পোলাওয়ের সঙ্গে কী কলকাতা, হায়দ্রাবাদ, লখনৌ-এর মিল আছে? দক্ষিণ ভারতের নানা বিরিয়ানি-পোলাওয়ের সঙ্গে মিল আছে? সহজ উত্তর, ‘না’। ঢাকা শহরের পোলাও-বিরিয়ানি দিনে দিনে বাঙালি হয়ে উঠেছে। কলকাতার ক্ষেত্রেও তাই বলা যায়। বিশেষ করে ওখানকার ব্যারাকপুর স্টাইল বিরিয়ানি দেখে এটা মনে হয়েছে। এই বাঙালি হওয়াটা অনেক দিনের চর্চার ফল। ঠিক যেমন অন্য অনেক জায়গায় অনেক খাবার, আচার বাঙালির রীতি হয়েছে, তেমনই। ধরুন, কলকাতায় যদি কোনো বড় হোটেলে আপনি বিরিয়ানি খান, তবে মুখে খুব একটা ঝাল লাগবে না, যেটুকু পাওয়া যাবে সেটা গোলমরিচের একটা হালকা ঝাঁজ। দিল্লিতেও না। অথচ এই ঢাকা শহরে অনেক দোকান আছে, যেখানে বিরিয়ানিতে ঝালটা বেশ প্রাধান্য পায়। সেটা কতটা উচিত, সেই প্রশ্ন উহ্যই থাকুক। কিন্তু মানুষ খাচ্ছে বলেই ও রকম বানানো হচ্ছে। ঢাকাই কাচ্চি বিরিয়ানির আসল যে রেসিপি, সেখানে ঝাল দেওয়া হয় না। যে ঝাল ঝাল ঝাঁজ লাগে, সেটা গোলমরিচ আর লবঙ্গের। ওটাকে ঝাল বলা যাবে কি না, সেটাও একটা প্রশ্ন। যারা ঢাকাই কাচ্চিতে গুঁড়া মরিচ বা কাঁচা মরিচ দেয়, তারা আসল রেসিপি হয় জানে না কিংবা জনরুচির কাছে বশ্যতা স্বীকার করেছেন।
সেটাই হয়তো স্বাভাবিক। জনরুচি বড্ড গোলমেলে ব্যাপার। কথা হচ্ছে, মানুষ প্রতিদিন যেমন খাবার পছন্দ করে উৎসব বা বিশেষ আয়োজনের খাবারও তেমন করে নিয়েছে। তার নিজের স্বাদকোরক অনুযায়ী সে সবকিছু ‘কাস্টমাইজ’ করেছে। পয়লা বৈশাখের পান্তাও কিন্তু কাস্টমাইজড। কারণ, শহরের অনেক জায়গায় গরম পান্তা পাওয়া যায়। চিনিগুঁড়া বা কালোজিরা চালের পান্তা পাওয়া যায়। ‘কাস্টমাইজড’ পান্তা। তিন কোটিরও বেশি মানুষের শহরে বলতে গেলে মোড়ে মোড়ে পোলাও-বিরিয়ানি-তেহারির দোকান পাওয়া যায়। সব দোকানেই বিক্রি হয় নিশ্চয়। না হলে দোকান চলত না। অর্থাৎ, মানুষ তার দৈনন্দিন জীবনে এসব খাবার খাচ্ছে। যেটা দৈনন্দিনতায় ঢুকেছে, তার চরিত্র আর অন্য জাতের থাকে না। সেটা বাঙালিরই খাবার। তাই যারা পান্তা খাচ্ছে, খাক। সেইসাথে পয়লা বৈশাখের দিন পোলাও-বিরিয়ানিও খাওয়া চলুক। কারণ, ওটাও বাঙালির। অন্য জাতির তো বটেই।