Advertisement Banner

ফিরে দেখা: মঞ্জুরের আত্মসমর্পণ ও হত্যাকাণ্ড

ফিরে দেখা: মঞ্জুরের আত্মসমর্পণ ও হত্যাকাণ্ড
মোহাম্মদ আবুল মঞ্জুর

১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে হত্যাকাণ্ডের শিকার হন রাষ্ট্রপতি ও বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান। তাকে হত্যার দুই দিনের মধ্যেই চট্টগ্রামে সামরিক অভ্যুত্থান ভেঙে পড়ে।

এর আগে ৩১ মে সকাল থেকে মেজর জেনারেল এম এ মঞ্জুর ব্যস্ত সময় কাটান। সকালে তিনি প্রথমে হালিশহরে আর্টিলারি সেন্টারে গিয়েছিলেন। সেখানে সেনাদের উদ্দেশে বক্তব্য দিয়ে তিনি আরও কয়েক স্থানে যান। তারপর সন্ধ্যার পর ডিভিশন হেডকোয়ার্টারে ফিরে এসে জানতে পারেন, চট্টগ্রাম সেনানিবাসের যে সেনাদলকে শুভপুরে ডিফেন্স নেওয়ার জন্য বলা হয়েছিল, তাদের বেশির ভাগ পক্ষত্যাগ করে কুমিল্লা সেনানিবাসে চলে গেছে। আরও কয়েক স্থানে এই ঘটনা ঘটে। এ অবস্থায় রাতে মঞ্জুর সভা ডাকেন।

মেজর রেজাউল করিম রেজার বয়ান ও পুলিশের কাছে দেওয়া সাক্ষ্য থেকে জানা যায়, সভা শেষ হওয়ার কিছু সময় পর মঞ্জুর তার অফিস থেকে বেরিয়ে মেজর রেজাকে সঙ্গে নিয়ে বাসায় যান। মঞ্জুর গাড়ি থেকে নেমে বাসায় যান। আর রেজা গাড়িতেই থাকেন। তিনি গাড়িতেই ঘুমিয়ে পড়েছিলেন। শব্দ বা ঝাঁকুনিতে ঘুম ভেঙে গেলে তিনি দেখেন মঞ্জুর গাড়িতে উঠছেন। রেজা দেখতে পান গাড়িচালক গাড়ি স্টার্ট দিয়ে চট্টগ্রাম সেনানিবাসের পূর্ব-দক্ষিণ পাশ; অর্থাৎ, ক্যান্টনমেন্ট এক্সিকিউটিভ অফিসারের যে অফিস, তার বরাবর যে গেট ছিল, সেই গেট দিয়ে বের হয়ে রওনা দিয়েছেন হাটহাজারীর দিকে। হাটহাজারীর কাছাকাছি গিয়ে মঞ্জুর চালককে বলেন, গাড়ি সাইডে রাখতে।

সেখানে অপেক্ষার সময় রেজা দেখতে পান, জিওসির স্টাফকার তাদের গাড়ি (জিপ) ক্রস করে চলে গেল। তখন মঞ্জুরের নির্দেশে জিপচালক স্টাফকার ফলো করে সেটি সামনে একস্থানে দাঁড় করায়। রেজা দেখতে পান, ওই গাড়িতে জেনারেল মঞ্জুর ও কর্নেল দেলাওয়ারের পরিবারের সদস্যরা রয়েছেন। ওখানে মঞ্জুর গাড়িচালককে বিদায় দিয়ে নিজেই চালকের আসনে বসেন।

এর মধ্যে রেজা জেনেছেন মেজর জেনারেল মঞ্জুর হিলট্র্যাক্টের দিকে নিরাপদ স্থানে যেতে চাচ্ছেন। সেখান থেকে তিনি তার পজিশন অনুযায়ী পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেবেন যে, কী করা যায়, না করা যায়।

মঞ্জুরের গাড়িতেই ছিলেন রেজা। মেজর গিয়াসও ছিলেন। তাদের বহরে লেফটেন্যান্ট কর্নেল মতিউর–মেহবুবের গাড়িও ছিল। সেই গাড়ি সামনে বেশ অনেক দূর; অর্থাৎ, তাদের দৃষ্টির সীমার বাইরে চলে গিয়েছিল। এমন সময় সামনে হঠাৎ গোলাগুলির আওয়াজ শুনে মঞ্জুর গাড়ি থামান। ৩১ মের রাত শেষ হয়ে ভোরের আলো সবে ফুটছে তখন। অর্থাৎ, ১ জুন। দূরে আবছা আবছা, কিছু বোঝা যায় না। রেজা গাড়ি থেকে নেমে একটু দূরে পাহাড়ের দিকে উঠে দেখেন দূরে লোকজন ছোটাছুটি করছে। সেটা দেখে নিচে নেমে এসে মঞ্জুরকে জানান। তখন মঞ্জুর গাড়ি ঘোরাতে বলেন। কিন্তু তার গাড়ি আর স্টার্ট নেয়নি। গাড়িতে মঞ্জুরের সুটকেস ছিল। সেই সুটকেস রেখে তারা চলে যান অন্য একটি গাড়িতে। সেই গাড়িতে কিছু দূর গিয়ে তারা আবার পেছনে আসেন। ওই গাড়ির সঙ্গে একটি পিকআপ ছিল। তাতে আহত লেফটেন্যান্ট কর্নেল ফজলে হোসেন, ক্যাপ্টেন জামিল ছাড়াও মেজর খালেদ ও মেজর ইয়াজদানী ছিলেন। গাড়ি চালাচ্ছিলেন খালেদ আর ইয়াজদানী পাশে বসেছিলেন। পেছনে শোয়া ছিলেন ফজলে হোসেন ও জামিল। গাড়ি দুটি পেছনে কিছু দূর গিয়ে একটা গ্রামে ঢোকে। ওখানে ফজলে হোসেন ও জামিলকে নিরাপদ স্থানে রেখে আসার জন্য খালেদ ও ইয়াজদানী গাড়ি নিয়ে পেছনে যান। মঞ্জুরসহ অন্যরা গাড়িতে বসে থাকেন।

মঞ্জুর ওখানে খালেদ ও রওশন ইয়াজদানীর জন্য অপেক্ষা করেন। কিন্তু তারা আর ফিরে আসেননি। অনেকক্ষণ অপেক্ষার পর মঞ্জুর ওখানে গাড়ি রেখে সঙ্গীদের নিয়ে হাঁটা শুরু করেন অজানার উদ্দেশে। পথে রাস্তায় তিনি দুবার গাইড বদল করেন। তৃতীয় গাইড নিয়ে যখন হাঁটছিলেন, তখন তার বাচ্চারা ক্ষুধায় কাতর হয়ে পড়ে। মঞ্জুর খাবার আনার জন্য গাইডদের টাকা দিয়ে একটা চাবাগানের পাশে বসেন। কিছুক্ষণ পর গাইড কিছু কলা, মুড়ি নিয়ে এসে বলতে থাকে, “তাড়াতাড়ি পালান।” রেজা তাদের জিজ্ঞেস করেন, “আরে কী হয়েছে?” গাইড বলে, “এখানে আর্মি এসেছে। আর্মি এসে আর্মির ড্রেস পরা দুজনকে চোখটোখ বেঁধে রেখেছে আর এখানে ঘোরাফেরা করছে। খোঁজ করছে লোকজন ধরার জন্য।”

না স্যার, আমি আপনার নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করছি, আপনি যদি না যান আমিও যাব না। আপনি যদি সারেন্ডার করেন, আমিও আপনার সঙ্গে সারেন্ডার করব।

এ সময় রেজা লক্ষ্য করেন, জেনারেল মঞ্জুরের পকেটের ওপরে ‘মঞ্জুর’ লেখা নেমপ্লেট লাগানো। নেমপ্লেটটি কিছুক্ষণ পরে খুলে মঞ্জুর পকেটে ঢোকান। তারপর তারা হাঁটতে হাঁটতে অন্য এলাকায় চলে যান। সেখানে গাইড তাদের এক বাড়িতে নিয়ে বলে, “আপনারা এখানে খাওয়া-দাওয়া করেন। এখন আর হাঁটা যাবে না। সন্ধ্যার পর আবার হাঁটতে হবে। এখন হাঁটতে গেলে অসুবিধা আছে।” গাইডের কথামতো মঞ্জুর ওখানে আশ্রয় নেন। সেখানে তিনি কিছু টাকা-পয়সা দেন। বাড়ির লোকজন তাদের জন্য খাওয়ার ব্যবস্থা করে। মঞ্জুরের স্ত্রী রানা মঞ্জুর, কর্নেল দেলাওয়ারের স্ত্রী ও বাচ্চারা খাওয়ার পর মঞ্জুর ও গিয়াস খেতে বসেন। রেজাকেও খাওয়ার জন্য বলা হয়। কিন্তু তিনি না খেয়ে বাইরে বসে থাকেন।

এমন সময় কুকুরের ডাক শুনে মঞ্জুরের নির্দেশে রেজা ঘরের ভেতরে ঢোকেন। ঘরটি ছিল একটি টিলার ওপরে। টিলার নিচে জমি। অদূরে আরেকটি টিলা। একটু পর ঘরের ভেতর থেকে রেজা উঁকি দেন। তখন তিনি দেখেন অদূরে সেই টিলার ওপরে পুলিশ ঘোরাফেরা করছে। মঞ্জুরও বুঝে ফেলেন পুলিশের উপস্থিতি। তিনি রেজাকে বলেন, “ঠিক আছে, মনে হয় পুলিশ আমাদের দিকে আসছে। আমি সারেন্ডার করব। তুমি আর গিয়াস স্কেপ কর। আমি সারেন্ডার করব।”

এ সময় রানা জেনারেল মঞ্জুরকে বলেন, “তুমি রেজা ভাই আর গিয়াস ভাইকে নিয়ে স্কেপ করো। আমরা ওদের ডিলে করিয়ে রাখি। যারা আসছে ওদের সঙ্গে কথা বলে ডিলে করাব। তোমরা স্কেপ করো।” জেনারেল মঞ্জুর তখন বলেন, “না, আমি স্কেপ করব না, আমি সারেন্ডার করব।” এরপর তিনি রেজা আর গিয়াসকে আবার বলেন, “তোমরা চলে যাও।” তখন রেজা বলেন, “না স্যার, আমি আপনার নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করছি, আপনি যদি না যান আমিও যাব না। আপনি যদি সারেন্ডার করেন, আমিও আপনার সঙ্গে সারেন্ডার করব।”

তারপর রেজা মঞ্জুরকে বলেন, “স্যার আপনি আগে দেখেন পুলিশের আচরণ কেমন। এটার জন্য আমরা একটু সেফ সাইডে যাই।”

বাড়ির পেছনে একটি ঝোপ ছিল। আর টিলার নিচে পেছনের দিকে একটি খালের মতো ছিল। ওই খাল দিয়ে পানি সেচ করা হতো। সেটা দেখিয়ে রেজা জেনারেল মঞ্জুরকে বলেন, “স্যার এক কাজ করি, আমরা ওই ঝোপটার ভেতরে লুকাই এবং ওখান থেকে অবজার্ভ করি। পুলিশ কী করে, আমরা ওদের জাস্ট আচরণ একটু দেখি। তারপরে আমরা সারেন্ডার করি।”

জেনারেল মঞ্জুর রেজার কথায় সম্মত হন। তারপর তিনি গিয়ে ঝোপের ভেতরে ঢোকেন। রেজা ঝোপের ভেতরে না ঢুকে টিলা থেকে নিচে পানিতে ঝাঁপ দেন। তারপর ডুবসাঁতার দিয়ে জঙ্গলের দিকে যান। রেজার দৃষ্টির আড়ালে ছিলেন জেনারেল মঞ্জুর। বেশ কিছুক্ষণ পর রেজা প্রথমে কিছু বাঁশির আওয়াজ, এরপর পাতার মচমচ শব্দ আর সবশেষে জেনারেল মঞ্জুরের কণ্ঠ শুনতে পান। মঞ্জুর উচ্চস্বরে কথা বলেছিলেন। তার কথা রেজা নিচ থেকে শুনতে পান। রেজা শুনতে পেলেন, পুলিশকে উদ্দেশ করে জেনারেল মঞ্জুর বলছেন, “তোমরা ওখানটায় দাঁড়াও, সামনে আসবে না। আমি আসছি। সামনে এলে তোমাদের অসুবিধা হবে।” এরপর পাতার মচমচ শব্দে রেজা অনুমান করেন মঞ্জুর জঙ্গল থেকে বেরিয়ে এসেছেন। একটু পর রেজাও জঙ্গলের ভেতর থেকে বের হন। বেরিয়ে আড়ালে দাঁড়িয়ে দেখেন, দুজন পুলিশ দুপাশে দাঁড়িয়ে চিৎকার করে বলছেন, “ভাই আপনারা কে কোথায় আছেন এসে পড়েন। আপনারা সারেন্ডার করেন। আপনাদের কমান্ডার সারেন্ডার করেছে।” তখন রেজা দেখতে পান, জেনারেল মঞ্জুর একটি গাছের নিচে বসে আছেন। তিনি আনমনে সিগারেট টানছেন আর তার পাশে বাচ্চারা বসে আছে। এরপর রেজাও পুলিশের কাছে আত্মসমর্পণের সিদ্ধান্ত নেন এবং আত্মসমর্পণ করেন। রেজা দেখতে পান ওখানে পুলিশের নেতৃত্বে আছেন একজন হাবিলদার।

একটু পর পুলিশ জেনারেল মঞ্জুর, রেজা এবং মঞ্জুরের সঙ্গীদের নিয়ে থানার উদ্দেশে রওনা হয়। বেশ কিছুদূর হেঁটে টিলা থেকে নিচে নেমে সমতল ভূমিতে গেলে সেখানে পথে তাদের দেখা হয় পুলিশ কর্মকর্তা কুদ্দুসের সঙ্গে। চাবাগানটি ছিল ফটিকছড়ি থানা এলাকায়। তাই পুলিশ তাদের প্রথমে ফটিকছড়ি থানায় নেওয়ার চেষ্টা করে। পরে সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করে হাটহাজারীর দিকে রওনা দেয়। হাটহাজারী পৌঁছাতে পৌঁছাতে সন্ধ্যা হয়ে যায়।

থানায় পৌঁছার পর জেনারেল মঞ্জুরসহ সবাইকে ওসির রুমে নেওয়া হয়। কিছুক্ষণ পর রেজা দেখতে পান চট্টগ্রামের তৎকালীন ডিআইজি শাহজাহান সেখানে এসেছেন। তাকে মঞ্জুর বলেন, “শাহজাহান সাহেব আমার অনেক কথা আছে। আপনি আমাকে কিছু সাংবাদিক দেন আমি কথা বলতে চাই।” শাহজাহান বলেন, “সরি স্যার, আপনাকে কোনো সাংবাদিকের সঙ্গে কথা বলতে দিতে নিষেধ আছে।” এরপর মঞ্জুরের সঙ্গে শাহজাহানের কথাকাটি হয়। শাহজাহান বলেন, “সরি স্যার, যতক্ষণ আপনি ছিলেন তখন আপনার কথা শুনেছি, এখন অন্যরা আপনার জায়গায় এসে গেছে, এখন তাদের কথা আমাদের শুনতে হচ্ছে।”

মঞ্জুর বলেন, “শাহজাহান সাহেব দেশের রাষ্ট্রপতি মারা গেল, The President of the country has been assassinated. I have been blamed. So I should get an opportunity to face the trail. আমাকে আপনি ইমিডিয়েটলি চট্টগ্রাম জেলে নেন। জেলখানায় নিয়ে যান। আমাকে সেফ কাস্টডিতে নিয়ে যান, যাতে আমি ট্রায়াল ফেস করতে পারি, আমাকে যেন সেই সুযোগ দেওয়া হয়।”

তুমি মিসেস মঞ্জুরকে জিওসির বাসায় নিয়ে যাও, আর মেজর সাহেবকে (রেজা) ব্রিগেডিয়ার আজিজের অফিসে নিয়ে যাও। আর আমি জেনারেলকে নিয়ে গেলাম।

এরপর জেনারেল মঞ্জুরসহ সবাইকে পুলিশের একটি পাঁচ টনি ট্রাকে ওঠানো হয়। ট্রাকের পেছনে বেঞ্চের মতো ছিল। সেখানে তারা সবাই বসেন। কিছুক্ষণ পরে রেজা দেখতে পান সেনাবাহিনীর কয়েকটি গাড়ি হাটহাজারী থানায় ঢুকছে। রেজা তখন মঞ্জুরকে বলেন, “স্যার আর্মির গাড়ি ঢুকেছে।” তখন মঞ্জুর ওখানে যারা পুলিশের কর্মকর্তা ছিলেন, তাদের বলেন, “শাহজাহান সাহেবকে খবর দাও।” কিন্তু তিনি আর আসেননি। রেজা দেখতে পেলেন তার বদলে এসেছেন ক্যাপ্টেন এমদাদ। তিনি এসে গাড়ির পেছনের দিকে নিচে দাঁড়িয়ে রানা মঞ্জুরকে বলেন, “ভাবি আমরা আপনাদের নিতে এসেছি। আপনি আসেন।” তখন রানা মঞ্জুর বলেন, “না, আমি কেন আপনাদের সঙ্গে যাব। আমরা পুলিশের কাছে সারেন্ডার করেছি, আমরা জেলে যাব। আপনাদের কাছে যাব না।” মঞ্জুর পেছনে ছিলেন। তিনি দাঁড়িয়ে ক্যাপ্টেন এমদাদের দিকে এগিয়ে গিয়ে বলেন, “Who is that officer? Who is that officer?” তখন এমদাদ একটু পেছনে সরে যান।

রেজা দেখতে পেলেন, এমদাদ পিছে সরে গিয়ে একজন সুবেদারের কাছে কী জানি কথা বলল। তারপর সুবেদার সামনে এসে বলেন, “আপনি আসেন, আপনি আসেন।” তখন জেনারেল মঞ্জুর বলেন, “না, যাও আমি তোমাদের সঙ্গে যাব না।” এ কথা বলে মঞ্জুর যখন হাত তুলেছেন, তখন সেই সুবেদার খপ করে তার ডান হাত ধরে এক হ্যাঁচকা টানে নিচে নামিয়ে নেয়। মঞ্জুরের হাত ধরে হ্যাঁচকা টান দিয়ে যখন সুবেদার নিচে নামাল, মঞ্জুর এরপর আর কোনো কথা বলেননি। তখন আরও দুজন সিপাই বা ল্যান্সনায়েক গাড়িতে ওঠে। তারা উঠে রানা মঞ্জুরকে টেনে হিঁচড়ে নামায়।

রেজা দেখতে পেলেন সেনারা মঞ্জুরকে নামিয়ে তার চোখ, হাত, পা বেঁধে তাদের গাড়িতে ওঠায়। তারপর রেজার চোখ, হাত বেঁধে তাকেও অন্য গাড়িতে ওঠাল। এরপর রেজা এমদাদের গলার আওয়াজ শুনতে পান। এমদাদ কাউকে উদ্দেশ করে বলেন, “তুমি মিসেস মঞ্জুরকে জিওসির বাসায় নিয়ে যাও, আর মেজর সাহেবকে (রেজা) ব্রিগেডিয়ার আজিজের অফিসে নিয়ে যাও। আর আমি জেনারেলকে নিয়ে গেলাম।”

তারপর সেনাবাহিনীর গাড়িগুলো চলতে শুরু করে। সেনারা রেজার চোখ তাড়াহুড়ো করে এমনভাবে বেঁধেছিল, তিনি নিচের ফাঁক দিয়ে একটু একটু দেখতে পাচ্ছিলেন। সেই ফাঁক দিয়ে তিনি বুঝতে চেষ্টা করেন গাড়ি কোনদিকে যাচ্ছে। তিনি টের পান তাকে ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টাল সেন্টারে নেওয়া হয়েছে। ওখানে তাকে গাড়ি থেকে নামানো হয়। সেখানে তিনি ব্রিগেডিয়ার আজিজের কণ্ঠস্বর শুনতে পান। তাকে দেখেই ব্রিগেডিয়ার আজিজ বলেন, “রেজা নাকি?” রেজা বলেন, “জি স্যার।”

ওদিকে মেজর জেনারেল মঞ্জুরের কী হলো, তখন তার পক্ষে জানা সম্ভব হয়নি। পরে জানতে পারেন মঞ্জুরকে হত্যা করা হয়েছে।

মঞ্জুর হত্যাকাণ্ড

এম এ মঞ্জুরকে হাটহাজারী থানা থেকে চট্টগ্রাম সেনানিবাসে আনার পর তার নিহত হওয়ার ঘটনা নিয়ে ১৯৮১ সালে প্রকাশিত সরকারি শ্বেতপত্রে বলা হয়েছিল, সেনাবাহিনীর একটি দল (এসকর্ট পার্টি) আটক মঞ্জুরকে হাটহাজারী থানা থেকে সেনানিবাসে নিয়ে আসছিল। ওই দল মঞ্জুর ও তার সঙ্গীদের নিয়ে সেনানিবাসে পৌঁছলে উচ্ছৃঙ্খল কিছু সেনা তাকে ছিনিয়ে নিয়ে হত্যা করে। জিয়া হত্যা নিয়ে তখন সরকারি যে শ্বেতপত্র প্রকাশিত হয়, তাতে এর স্বপক্ষে এসকর্ট অফিসারের একটি বিবৃতি ছিল। শ্বেতপত্রে প্রকাশিত সেই এসকর্ট অফিসারের বক্তব্য বা বিবৃতিটি আসলে ছিল ক্যাপ্টেন কাজী এমদাদুল হকের। শ্বেতপত্রে অবশ্য তার নাম ছিল না। বলা হয়েছিল এসকর্ট অফিসার। তার ওপরই দায়িত্ব ছিল ইবিআরসির কয়েকজন সেনাকে সঙ্গে নিয়ে আটক এম এ মঞ্জুর ও তার সঙ্গীদের হাটহাজারী থানা থেকে চট্টগ্রাম সেনানিবাসে নিয়ে আসার।

এদিকে ১৯৯৫ সালে মঞ্জুর হত্যা মামলায় আটক হওয়ার পর এমদাদ পুলিশের কাছে দেওয়া জবানবন্দীতে স্বীকার করেন, হাটহাজারী থানা থেকে মঞ্জুরকে সেনানিবাসে আনার পর ফায়ারিং রেঞ্জে তারাই তাকে হত্যা করেন। তার ওপরই নির্দেশ ছিল বা দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল মঞ্জুরকে হত্যা করার। তিনি সেই নির্দেশ পালন করেছেন মাত্র। মেজর খালেদকেও হত্যার নির্দেশ তার ওপর ছিল। কিন্তু হাটহাজারী থানায় তাকে তিনি পাননি। খালেদের পরিবর্তে তিনি পান মেজর রেজাউল করিম রেজাকে। তাকে হত্যা করা হয়নি। কারণ, রেজার ব্যাপারে তার ওপর কোনো নির্দেশ ছিল না।

এমদাদের নতুন জবানবন্দী থেকে জানা যায়, শ্বেতপত্রে প্রকাশিত বিবৃতিটি ছিল সম্পূর্ণ মিথ্যা। ওই বিবৃতিতে তখন জোরপূর্বক তার স্বাক্ষর নেওয়া হয়েছিল।

সিআইডি পুলিশ ও আদালতের কাছে দেওয়া এমদাদের জবানবন্দীতে মঞ্জুর হত্যার সত্য বেরিয়ে আসে। তিনি বলেন, “ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশেই তিনি মঞ্জুরকে হাটহাজারী থানা পুলিশের হেফাজত থেকে সেনাবাহিনীর হেফাজতে নেন। এর আগে ইষ্টবেঙ্গল রেজিমেন্টাল সেন্টারের (ইবিআরসি) কমান্ড্যান্ট ব্রিগেডিয়ার এ কে এম আজিজুল ইসলাম তার অফিস কক্ষে তাকে ডেকে নেন। সেখানে তখন সেনাবাহিনীর ২০৩ বিগ্রেডের অধিনায়ক ব্রিগেডিয়ার আবদুল লতিফ উপস্থিত ছিলেন। তারা দুজন এমদাদকে নির্দেশ দিয়েছিলেন হাটহাজারী থানায় আটক মঞ্জুরকে সেনানিবাসে নিয়ে আসা ও পথে হত্যা করার জন্য।

এমদাদ তার জবানবন্দীতে স্পষ্ট করেই বলেন, ব্রিগেডিয়ার লতিফ ব্রিগেডিয়ার আজিজের সামনে তাকে মেজর জেনারেল মঞ্জুরের ব্যাপারে ওই নির্দেশ দেন। তখন আজিজুল ইসলাম আবদুল লতিফকে বলেছিলেন, “আর একবার ভেবে দেখবেন স্যার?” কিন্তু আবদুল লতিফ বলেন, “সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়ে গেছে, এটা এখন পালন করতে হবে।” এরপর আবদুল লতিফ এমদাদকে বলেন, “তোমার সঙ্গে কেউ যাবে না। তোমাকে একাই এটা করতে হবে।”

অন্যদিকে শ্বেতপত্রে বলা হয়েছিল উচ্ছৃঙ্খল জওয়ানরা এসকর্ট অফিসারের কাছ থেকে জেনারেল মঞ্জুরকে ছিনিয়ে নিয়ে ক্যান্টিন স্টোরস ডিপার্টমেন্টের কাছে হত্যা করে। শ্বেতপত্রে মঞ্জুরের লাশের কোনো ময়নাতদন্ত হয়েছিল কি না, কিংবা রিপোর্ট ছিল কি না–সেসবের কোনো কিছুর উল্লেখ ছিল না।

১৯৯৫ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি এম এ মঞ্জুরের ভাই ব্যারিষ্টার আবুল মনসুর চট্টগ্রামের পাঁচলাইশ থানায় তার ভাইয়ের হত্যার ব্যাপারে যে মামলা করেন, সেখানে তিনি মূল ময়নাতদন্ত রিপোর্টের কপিও দেন। তাতে বলা হয়েছে, মাথায় বুলেটের আঘাতে ৪‌ ইঞ্চি বাই ২‌ ইঞ্চির একটি গভীর গর্তের সৃষ্টি হয়। এ ছাড়া শরীরে আর কোনো আঘাতের দাগ নেই। রিপোর্টে মঞ্জুরের হত্যার কারণ বলা হয়েছে মাথায় বুলেটের আঘাতের কারণে শক ও রক্তক্ষরণ। চট্টগ্রাম সেনানিবাসের সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালের প্যাথলজির বিভাগের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক লেফটেন্যান্ট কর্নেল (পরে কর্নেল) এ জেড তোফায়েল আহাম্মদ ডেথ সার্টিফিকেটে স্বাক্ষর করেন। তাতে বলা হয়েছে, মাথায় বুলেটের আঘাতের কারণে জেনারেল মঞ্জুরের মৃত্যু ঘটে। কর্নেল তোফায়েল মঞ্জুরের ময়নাতদন্ত করেছিলেন ও রিপোর্টে তার স্বাক্ষর ছিল।

মাথায় এ ধরনের আঘাত পয়েন্ট ব্লাঙ্ক রেঞ্জ ছাড়া আর কোনোভাবে হতে পারে না। উচ্ছৃঙ্খল সেনারা ছিনিয়ে নিয়ে হত্যা করলে শরীরে আরও আঘাতের দাগ থাকত। ময়নাতদন্ত রিপোর্টে এটা স্পষ্ট মঞ্জুরকে সুপরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছিল। এসব তথ্য শ্বেতপত্রে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে এড়িয়ে যাওয়া হয়েছিল।

এমদাদ তার জবানবন্দীতে বলেন, চট্টগ্রাম সেনানিবাসে নিয়ে আসার পর তিনি মঞ্জুরকে নিয়ে জিপ করে বেশ কিছুক্ষণ ঘোরাঘুরি করতে থাকলে লেফটেন্যান্ট কর্নেল শামস (শামসুর ইসলাম/রহমান) ‘এত দেরি হচ্ছে কেন’ জিজ্ঞেস করেন এবং শিগগিরই কাজ শেষ করার নির্দেশ দেন।

এ ছাড়া জেনারেল কোর্ট মার্শালে ক্যাপ্টেন এমদাদের যে জবানবন্দী লিপিবদ্ধ করা হয়েছিল, সে সম্পর্কেও এমদাদ ভিন্ন রকমের তথ্য দিয়েছেন। সেটি আসলে এমদাদের বিবৃতি ছিল না। লেফটেন্যান্ট কর্নেল শামসুর ইসলাম/রহমান এটা লিখে দিয়েছিলেন। তার লেখা বিবৃতি এমদাদের নামে চালানো হয়। এই বিবৃতি মেজর জেনারেল মোজাম্মেলের তদন্ত কমিশনে এবং বিচারপতি রুহুল ইসলামের কমিশনের কাছেও এমদাদের বলে দেখানো হয়, যা পরে শ্বেতপত্রে স্থান পায়। প্রকৃতপক্ষে দুই কমিশনের কাছে মঞ্জুরের হত্যা সম্পর্কে বিভ্রান্তিকর তথ্য দেওয়া হয়। 

মঞ্জুর হত্যা মামলায় রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষী হিসেবে আরও সাক্ষ্য দিয়েছেন এমদাদের সহযোগী সুবেদার আশরাফউদ্দিন, নায়েক মো. দেলোয়ার হোসেন, ল্যান্সনায়েক সদরউদ্দিন ও হাবিলদার মোজাফফর আহমেদ প্রমুখ। মঞ্জুরকে হাটহাজারী থেকে আনতে তারা এমদাদের সঙ্গে সেখানে গিয়েছিলেন এবং সেনানিবাসের ফায়ারিং রেঞ্জে মঞ্জুরকে হত্যার সময় তারা কাছাকাছি উপস্থিত ছিলেন। তখন চট্টগ্রামে পুলিশের কর্মকর্তা ছিলেন এইচ এম বি জামান ও আলী মোহাম্মদ ইকবাল। তারাও মঞ্জুর হত্যা মামলায় সাক্ষ্য দিয়েছেন। চট্টগ্রামের তখনকার জেলা প্রশাসক জিয়াউদ্দিন এম চৌধুরী তার ‘অ্যাসাসিনেশন অব জিয়াউর রহমান অ্যান্ড আফটারম্যাথ’ বইয়ে এ ব্যাপারে লিখেছেন। এ ছাড়া সাংবাদিক লরেন্স লিফশুলজও অনুসন্ধানমূলক প্রতিবেদন লিখেছেন।

মঞ্জুর হত্যাকাণ্ডের ব্যাপারে এমদাদের নতুন জবানবন্দী ও তার সহযোগীদের (মঞ্জুর হত্যা মামলায় রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষী) সাক্ষ্যের সঙ্গে চট্টগ্রামের তখনকার জেলা প্রশাসক জিয়াউদ্দিন এম চৌধুরী ও সাংবাদিক লরেন্স লিফশুলজের তথ্যের বেশ অসংগতি লক্ষ্য করা যায়। জিয়াউদ্দিন চৌধুরী ও লিফশুলজের বক্তব্য প্রায়ই একই রকম। অন্যদিকে এমদাদের জবানবন্দী ও তার সহযোগীদের সাক্ষ্য থেকে ভিন্ন তথ্য পাওয়া যায়। লিফশুলজ যখন প্রতিবেদন লেখেন, তখন এমদাদসহ রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষিদের সাক্ষ্যের বিষয়টা তার জানা ছিল না। সেগুলো তিনি পরে হাতে পান। এর পর তিনি তা পর্যালোচনা এবং তার ভিত্তিতে আবার প্রতিবেদন লিখেছেন। সেই প্রতিবেদনের উপসংহারে তিনি তার আগের বক্তব্যেই স্থির থেকেছেন। একইভাবে জিয়াউদ্দিন চৌধুরীও হয়তো এ সাক্ষ্য সম্পর্কে জানতেন না।

পুলিশের কাছে দেওয়া এমদাদের জবানবন্দী অনুযায়ী, হাটহাজারী থানা থেকে সেনানিবাসের ফায়ারিং রেঞ্জে নেওয়ার পর তার নির্দেশে একজন হাবিলদার রাইফেল দিয়ে একটি গুলি করে মঞ্জুরের মৃত্যু নিশ্চিত করেন। এমদাদ ব্রিগেডিয়ার আজিজুল ইসলাম ও আবদুল লতিফের নির্দেশে মঞ্জুরকে হত্যার মিশন সম্পন্ন করেছেন বলে জানান। এমদাদকে তারা এই কাজ সমাধা করার নির্দেশ দেন ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশে। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের পক্ষে কে এই নির্দেশ তাদের দুজনকে দিয়েছিলেন, তা আমরা কিছুটা ধারণা করতে পারি তৎকালীন বিমানবাহিনী প্রধান এয়ার ভাইস মার্শাল সদরুদ্দীনের পুলিশের কাছে দেওয়া সাক্ষ্যে।

এয়ার ভাইস মার্শাল সদরুদ্দীন তার সাক্ষ্যে বলেন, “১ জুন বিকেল আনুমানিক সাড়ে ৫টার সময় আমি বঙ্গভবনে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতির অফিসে ছিলাম। তখন সেখানে লেফটেন্যান্ট জেনারেল এরশাদও ছিলেন। আমরা বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা করছিলাম। এই সময় টেলিফোন আসে। প্রেসিডেন্ট টেলিফোনে কথা বলেন। প্রেসিডেন্ট টেলিফোন রেখে জানান, আইজিপি কিবরিয়া জানিয়েছেন যে, মেজর জেনারেল মঞ্জুর ও অন্যরা পুলিশের হাতে ধরা পড়েছে। সংবাদটি বলার সঙ্গে সঙ্গে তাৎক্ষণিকভাবে জেনারেল এরশাদ উত্তেজিত অবস্থায় চেয়ার থেকে উঠে পড়েন। আর কিছু না বলে সরাসরি প্রেসিডেন্টের পাশে রেড টেলিফোনের কাছে যান এবং একটি নম্বরে ডায়াল করেন। টেলিফোনে তার যে কথাটি শুনতে পেলাম তা হলো: ‘Manzur has been captured by the Police, He should be immediately taken over and carry out that plan’, বলেই তিনি টেলিফোন রেখে দেন। তখন আমি বলি, ‘General Ershad, what is that plan....talking about, May we (are) know it.’ এতে তিনি আবার বেশ উত্তেজিত হয়ে বলেন, ‘এয়ার চিফ আপনি কিছুই বোঝেন না।’ আমি বলি, ‘আমি কি বুঝি না বুঝি, ও don't have to know from you.’ পরে আমি অস্থায়ী রাষ্ট্রপতির উদ্দেশে বলি, ‘Sir, please make sure that nothing happens to Manzur and that he is gives a trial. If any things happens to Manzur, will be answerable to the nation.’ এর উত্তরে সাত্তার সাহেব বিচার করা হবে বলে জানান।”

মঞ্জুরকে কে হত্যা করেছে, সেটা যতটা বিবেচ্য, তারচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ কার নির্দেশে তাকে হত্যা করা হয়েছে। এমদাদের জবানবন্দীতে আমরা মধ্যমস্তরের নির্দেশদাতার নাম পাই। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের পক্ষে নির্দিষ্ট কোনো ব্যক্তি ব্রিগেডিয়ার আজিজ ও লতিফকে এই নির্দেশ দিয়েছেন–এটা এমদাদের পক্ষে জানা সম্ভব ছিল না। এয়ার ভাইস মার্শাল সদরুদ্দীনের সাক্ষ্যে এ ব্যাপারে আমরা অনুমান করতে পারি মাত্র। ব্যাপক তদন্ত ও অনুসন্ধানে একদিন এই সত্য বেরিয়ে আসবে।

যা হোক, কাজী এমদাদুল হকের জবানবন্দী ও তার সহযোগী সবার সাক্ষ্যে বেশ মিল আছে। এমদাদের সহযোগীরা রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষী। তারা মঞ্জুর হত্যাকাণ্ড প্রত্যক্ষ করেছেন।

কাজী এমদাদুল হক মঞ্জুর হত্যা মামলায় ১৯৯৫ সালে আটক হওয়ার পর পুলিশের কাছে দেওয়া জবানবন্দীতে বলেন, “...১ জুন ১৯৮১ তারিখ সন্ধ্যার কিছু সময় পূর্বে আমাকে কমান্ড্যান্টের অফিসে ডাকা হয় এবং সেখানে প্রথম বারের মতো সাদা পোশাকে ২০৩ ব্রিগেড কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার লতিফকে দেখতে পাই। পরে শুনেছিলাম ব্রিগেডিয়ার লতিফ ৩০ মে তারিখ পর্যন্ত ছুটিতে এবং চিটাগাংয়ের বাইরে ছিলেন এবং প্রেসিডেন্টের নিহত হওয়ার সংবাদ পেয়ে ঢাকা থেকে কুমিল্লা আসেন এবং ১ জুন তারিখে চিটাগাংয়ের অনুকূল পরিস্থিতির খবর পেয়ে শুভপুর হয়ে চিটাগাং সেনানিবাসে আসেন।…

“ব্রিগেডিয়ার আজিজ (আজিজুল ইসলাম) তদানীন্তন ব্রিগেডিয়ার আবদুল লতিফের উপস্থিতিতে এমদাদকে বিশেষ দায়িত্ব পালনের নির্দেশ দেন। তিনি তার আদেশে বলেন, ‘মেজর জেনারেল এম এ মঞ্জুর পুলিশ কর্তৃক ধৃত হয়েছেন। সে এখন হাটহাজারী পুলিশ স্টেশনে আছে। তার সাথে তার স্ত্রী, দুই মেয়ে এবং এক ছেলে আছে। লে. কর্নেল দেলোয়ারের (দেলাওয়ার) স্ত্রী এবং তার দুই সন্তান সাথে আছে। মেজর খালেদও ধরা পড়েছে এবং সেও পুলিশের কাস্টডিতে আছে। ১টা জিপ এবং একটা পিকআপ নিয়ে ৫জন গার্ডসহ হাটহাজারী যেতে হবে। দুই অফিসারের স্ত্রী এবং সন্তানদের পিকআপে উঠাতে হবে এবং তিনজন গার্ড দিয়ে তাদেরকে সেনানিবাসে পাঠিয়ে দিতে হবে। দুই অফিসারের স্ত্রীদের নিজ নিজ বাসায় ড্রপ দিতে হবে। মেজর জেনারেল মঞ্জুর এবং মেজর খালেদকে জিপে উঠাতে হবে এবং আমার সাথে দুজন স্কট থাকবে। হাটাহাজারী থেকে আসবার পথে অথবা সেনানিবাসে প্রবেশের পর সুবিধামতো স্থানে দুজনকেই কিল করা।’ এতটুকু বলার পর ব্রিগেডিয়ার আজিজ ব্রিগেডিয়ার লফিতের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘এই তো স্যার।’…

“মেজর খালেদ খুব দুর্দান্ত এবং সে সর্বপ্রকার চেষ্টা করবে ভেগে যেতে। হাত পা বেঁধে পানিতে ফেলে দিলে সে বেঁচে যাওয়ার কৌশল জানে বলে আমাকে হুঁশিয়ার করে দিলেন। খালেদকে আগেই মেরে ফেলতে হবে বলে ব্রিগেডিয়ার লতিফ আমাকে নির্দেশ দিলেন।…

“আমি চুপ করে দাঁড়িয়ে ছিলাম। ব্রিগেডিয়ার আজিজ আমাকে আর কিছু জানার আছে কি না জিজ্ঞাসা করলেন। জবাবে আমি মেজর কামালকে আমার সাথে পাঠাবার অনুরোধ করলাম। জবাবে তিনি বললেন, মেজর কামাল তোমার নিকটেই থাকবে। ব্রিগেডিয়ার লতিফ মেজর কামালের কেন দরকার জানতে চাইলেন। জবাবে কাজটি খুবই কঠিন বলে আমি জানালাম। ব্রিগেডিয়ার লতিফ বললেন, ‘আমার থেকে অনেক জুনিয়র অফিসার এর থেকে দুরূহ কাজ করেছে, আমি পারব না কেন। এর ভেতর টেলিফোন আসে। ব্রিগেডিয়ার আজিজ টেলিফোন রিসিভ করেন এবং আমাকে একটু বাইরে যেতে বলেন। আমি বাইরে যাই এবং অফিসের সামনে অপেক্ষা করতে থাকি।’…

“আনুমানিক ১৫ মিনিট পরে তারা দুজনেই কথা বলতে বলতে বের হয়ে আসেন। এক পর্যায়ে ব্রিগেডিয়ার আজিজ ব্রিগেডিয়ার লতিফকে বলেন, আর একবার ভেবে দেখবেন স্যার। উত্তরে ব্রিগেডিয়ার লতিফ বললেন, ‘decision has been taken, it has to be done.’ তারপর আমাকে উদ্দেশ করে ব্রিগেডিয়ার লতিফ বললেন, ‘No one will go with you and you do it alone.’

“এরপর ট্রেনিং ব্যাটালিয়ন অফিসের সামনে এলাম এবং ট্রেনিং ব্যাটালিয়ন সুবেদার মেজরকে ডেকে এক সেকশন ভালো এনসিও আমার নিকট পাঠাতে বললাম। কিছু সময় পর দশজন এনসিও এল। এদের মধ্যে একজন জেসিও ছিল। সম্ভবত তার নাম ছিল নায়েব সুবেদার আশরাফ। আমি আরও চারজন এনসিওকে ডিটেল করতে বললাম এবং একই সাথে তিনজন ড্রাইভার পাঠাতে বললাম। তিনজন ড্রাইভার এবং ১৩ জনের একটি ডিটাচমেন্টকে (একজন নায়েব সুবেদার, হাবিলদার, নায়েক এবং ল্যান্সনায়েক সমন্বয়ে) নিয়ে ট্রেনিং গ্রাউন্ডের মাঝখানে পেলাম। তখন সন্ধ্যা নেমে এসেছে এবং আশপাশ থেকে আমাদের দেখা যাচ্ছিল না। আমি কোনো কিছু গোপন না করে আমি যা জেনেছি এবং আমাকে যা বলা হয়েছে বিস্তারিত তাদেরকে বললাম। আমাকে যে দুটি গাড়ি নেওয়ার কথা এবং সাথে অল্প লোক নেওয়ার কথা তাও তাদেরকে বললাম। ওরা আমাকে ভরসা দিল এবং আমাকে না ঘাবড়াতে অনুরোধ করল। সবকিছু ঠিক করে, আমি নির্দেশমতো বিগ্রেডিয়ার আজিজের অফিসে রিপোর্ট করলাম। তবে একটি অতিরিক্ত জিপ এবং অতিরিক্ত লোক নেওয়ার ব্যাপারটি চেপে যাই। দুজন ব্রিগেডিয়ার আমাকে success wish করল এবং আমি আনুমানিক ৮ ঘটিকার দিকে হাটহাজারীর দিকে রওনা দিলাম।

“হাইহাজারী পৌঁছে অধিকসংখ্যক সিভিলিয়ান (থানা কমপাউন্ডের বাইরে) এবং পুলিশ পার্সনাল থানা কমপাউন্ডের ভিতর দেখতে পেলাম। আমি সেখানে পুলিশের একজন ঊর্ধ্বতন অফিসার এআইজি (ডিআইজি) শাহজাহানের সাথে দেখা করলাম এবং আমার পরিচয় দিলাম। পুলিশ আমার বক্তব্যের সত্যতা যাচাইয়ের পর গ্রহণ সংক্রান্ত একখানা সার্টিফিকেট দিতে বলে। আমি সাদা কাগজে নিজ হস্তে একখানা গ্রহণ সার্টিফিকেট প্রস্তুত করি। এই সময় আমি জানতে পারি যে, আটককৃতদের মধ্যে মেজর খালেদ নাই। তার বদলে আছে মেজর রেজাউল করিম। যে ডিভিশন হেডকোয়ার্টারে কর্তব্যরত ছিল এবং এই মেজর রেজা আমার কোর্সমেট।…

“অনেক ঝামেলার মধ্যে মিসেস মঞ্জুরকে তার ছেলেমেয়ে এবং মিসেস দেলোয়ারকে (দেলাওয়ার) তার ছেলেমেয়েসহ পিকআপে উঠান হয় এবং এই গাড়ির সাথে চারজন স্কট দেওয়া হয়। মেজর রেজাকে একটি জিপে ওঠান হয় এবং এই গাড়ির সাথেও চারজন স্কট দেওয়া হয়। আমার জিপে জেনারেলকে তোলা হয় এবং আমার সাথে পাঁচজন স্কট গাড়িতে বসে। আমি সামনের সিটেই বসেছিলাম। আগে পিছে এবং মাঝখানে পুলিশ ভ্যান প্লেস করে ৭/৮টা গাড়ির একটি কনভয় ক্যান্টনমেন্টের উদ্দেশে রওনা দেয়। পুলিশের গাড়িগুলো সিগন্যাল ব্যাটালিয়নসংলগ্ন এমপি চেকপোস্ট পর্যন্ত আসে। পুলিশদের এখানে রেখে আমরা ক্যান্টনমেন্টের মধ্যে ঢুকে পড়ি। পূর্বনির্দেশ মোতাবেক মেজর রেজার গাড়ি ইবিআরসিতে চলে যায়। ব্রিগেডিয়ারদের তথ্য অনুসারে মেজর খালেদ নামে আমি কাউকে পাই নাই এবং এই কারণে তাদের নির্দেশ অনুসরণ করি নাই অর্থাৎ মেজর রেজাকে হত্যা করা হয় নাই।…

“আমি জেনারেলকে নিয়ে ক্যান্টনমেন্টের ভিতর ঘুরছিলাম। এমইএস-এর সন্নিকটে বিপরীত দিক থেকে আসা জিপ দেখে টের পেলাম সেটা ইবিআরসির জিপ। আমার জিপ থামিয়ে এগিয়ে গেলাম। ওই জিপে লেফটেন্যান্ট কর্নেল শামসুল ইসলাম, এ এ এন্ড কোয়ার্টার মাস্টার জেনারেল, ইবিআরসি রেকর্ডস-এর মেজর কামালউদ্দিন ভুঁইয়া বসেছিলেন। লে. ক. শামস (শামসুল ইসলাম) এত দেরি হওয়ার কারণ জিজ্ঞেস করলেন এবং যথাশিগগির কাজ শেষ করতে নির্দেশ দিলেন। বেশি লোক সাথে নেওয়ার ব্যাপারেও জিজ্ঞাসা করলেন।…

“তখন জিপ ঘুরিয়ে ফায়ারিং রেঞ্জের দিকে গেলাম। ড্রাইভারসহ গাড়ি রেঞ্জের নিকট রেখে জেনারেলকে নিয়ে আমরা উত্তর প্রান্তে গেলাম। আমরা সেখানে দাঁড়ালাম এবং জেনারেলকে আমাদের উদ্দেশ্য বললাম। জেনারেল মনে হলো কথাটা আগের থেকেই জানতেন। তিনি বললেন, ‘আমার ওয়াইফকে বলবেন আমাকে মাফ করে দিতে। তার জন্য আমার সন্তানদের জন্য কিছুই রেখে যেতে পারলাম না। যারা আমার উদ্দেশ্য জানে তাদেরকে বলবেন দয়া করে সকলকে জানাতে, আমার পকেটে একটি ছোট কোরান শরিফ আছে। একটি ফরমেশন সাইন আছে এটি রেখে দেন।’…

“আমরা সকলেই জেনারেলের নিকট ক্ষমা চাইলাম। আমরা দোয়া-দরুদ পড়লাম। সবশেষে জেনারেলকে গুলি করার মতো কাউকে পাওয়া যাচ্ছিল না। তখন আমি সকলের অস্ত্র নিয়ে এবং অস্ত্র খালি করে শুধুমাত্র একটি অস্ত্রে বুলেট ভরে এক এক করে সকলকে ফায়ার করার প্রস্তাব দিলাম।…

“এমতবস্থায় একজন হাবিলদার এবং আমার স্মৃতিতে মনে পড়ে তার নাম আবদুল মালেক ছিল, (সে) জেনারেলের মাথায় একটি শর্ট ফায়ার করে। এরপর কারো সাহস হয় নাই পুনরায় চেক করার। আমরা দ্রুত সেখান থেকে রেঞ্জের সর্বোচ্চ দূরত্বের ফায়ারিং পয়েন্টে চলে আসি। ওই সময় অন্ধকারে দুজন লোককে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখি। এরই মাঝে একজন এনসিও তার এসএমজি কাঁধ থেকে নামায়। একটু দূরের তারা জিজ্ঞাসা করল আমরা কারা। গলার স্বরে টের পেলাম সেখানে কামাল (মেজর কামালউদ্দিন ভুঁইয়া) আছে। আমি আমার পরিচয় দিলাম। কাছে আসার পর লে. ক. শামস (শামসুল ইসলাম) জিজ্ঞাসা করলেন এত লোক কেন। আমি কমপ্লিকেটেড কাজের জন্য এত লোকের দরকার ছিল বলে জানালাম। ওরা একটি বুলেট ফায়ারিংয়ের আওয়াজ পেয়েছিল তবু জিজ্ঞাসা করল কাজ ঠিকভাবে শেষ হয়েছে কি না? আমরা সকলেই বললাম হয়েছে।” (পুলিশের কাছে দেওয়া কাজী এমদাদের জবানবন্দী)

অন্যদিকে মঞ্জুর হত্যাকাণ্ড নিয়ে জিয়াউদ্দিন এম চৌধুরী তার ‘অ্যাসাসিনেশন অব জিয়াউর রহমান অ্যান্ড আফটারম্যাথ’ বইয়ে লিখেছেন, “পরদিন (২ জুন, ১৯৮১) সকালে আমার বাংলোতে পুলিশ সুপার মারুফুল হক এলেন। অত্যন্ত মলিন, ক্লান্ত অবস্থায়। তিনি আমার কাছে বর্ণনা করলেন কেমন করে পুলিশ ফটিকছড়িতে জেনারেল এম এ মঞ্জুরকে বন্দী করে এবং পরে সেনাবাহিনীর একটি প্লাটুন হাটহাজারী থানা থেকে কমান্ডো কায়দায় তাঁকে নিয়ে যায়। …পরদিন সংবাদপত্রে মঞ্জুরের মৃত্যুর খবর প্রকাশিত হয়। ঢাকা থেকে পাঠানো সরকারি এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তির বরাত দিয়ে প্রতিবেদনগুলোতে বলা হয়, ‘হাটহাজারী পুলিশ স্টেশন থেকে মঞ্জুরকে সেনানিবাসে নিয়ে যাওয়ার পথে বিক্ষুব্ধ সেনাদের গুলিতে তিনি মারা যান।’ এই গল্প আগাগোড়া বানানো। সেনানিবাসে নেওয়ার পথে মঞ্জুরকে হত্যা করা হয়নি। ১৯৮১ সালের ২ জুন সকালে সেনানিবাসের অভ্যন্তরে তাঁকে হত্যা করা হয়েছিল, ডিআইজিকে এমনটাই বলেছিলেন ব্রিগেডিয়ার আজিজ। অবশ্য ব্রিগেডিয়ার আজিজ বলেননি যে কিছু বিক্ষুব্ধ সেনার হাতে মঞ্জুরের মৃত্যু হয়। সত্যিকারে কেমনভাবে তিনি মারা পড়েন সেটাও তিনি তাকে বলেননি।…

“কিছুদিন পর মঞ্জুর হত্যার আগের পরিস্থিতি আমার কাছে আরও স্পষ্ট করেন সেনাবাহিনীর এক চিকিৎসক। মাত্র কয়েক দিন আগে তিনি জিয়ার মৃতদেহ প্রস্তুত করেছিলেন। এবারও মঞ্জুরকে সমাধিস্থ করার আগে তাকেই মৃতদেহ প্রস্তুত (আঘাতের জায়গাগুলোতে ব্যান্ডেজ বাঁধার কাজ) করতে হয়েছিল। (সমাধিস্থল চিকিৎসকের অজানা, অন্তত আমাকে তিনি বলেননি কোথায় মঞ্জুরকে কবর দেওয়া হয়।)…

“মঞ্জুরকে সেনানিবাসে আনার পর একজন জ্যেষ্ঠ সেনা কর্মকর্তা (একজন ব্রিগেডিয়ার) তাঁর কুঠুরিতে তাঁকে দেখতে যান (চিকিৎসক সেনা কর্মকর্তাটির নাম বলেননি)। জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাটির উদ্দেশ্য ছিল একটাই–মঞ্জুরকে শেষ করে দেওয়া। বলা হয়, তিনি ঢাকা থেকে এসেছিলেন এবং সেখানকার সেনা কর্মকর্তাকে বলেছিলেন, তিনি মঞ্জুরকে জিজ্ঞাসাবাদ করতে এসেছেন। তিনি ভেতরে ঢোকেন, পিস্তল বের করে মঞ্জুরকে গুলি করেন এবং বেরিয়ে যান–পুরো ঘটনাটি ঘটে পরিকল্পনামাফিক। চিকিৎসককে যখন আঘাতের স্থানে ব্যান্ডেজ বাঁধতে বলা হয় ততক্ষণে মঞ্জুর মারা গেছেন, একটি মাত্র গুলি তাঁর মাথা ভেদ করে চলে গেছে, অনেক বুলেটের চিহ্ন তাঁর গায়ে ছিল না।” ( প্রথম আলো, ৩০ মে ২০১০, বিশেষ সংখ্যা, জিয়া–মঞ্জুর হত্যা, ফিরে দেখা)

মঞ্জুর হত্যাকাণ্ড নিয়ে জিয়াউদ্দিন এম চৌধুরীর বইয়ের তথ্যের সঙ্গে মিল আছে সাংবাদিক লরেন্স লিফশুলজের প্রতিবেদনেও। তিনিও লিখেছেন, “...তাঁকে (মঞ্জুর) সেখানে নিয়ে আসার পরপরই এক ঊর্ধ্বতন সামরিক কর্মকর্তার হেফাজতে নেওয়া হয়। সেই কর্মকর্তা আসেন ঢাকা থেকে। সবাই বুঝে নেন, তিনি এসেছেন সেনাসদরের নির্দেশে, মঞ্জুরকে ব্যাপকভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করতে।…

“সেই ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার পরিচয় আমার সোর্সের কাছে অজানা নয়। তিনি তাঁকে চিনতে পেরেছিলেন। ক্যান্টনমেন্টের সেই বিশেষ জায়গায় যাঁরা ছিলেন, তাঁদের অনেকেই তাঁকে ব্যক্তিগতভাবে চিনতেন।…

“মঞ্জুরকে যে কক্ষে আটক করে রাখা হয়, সেই ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে আমার সোর্স সেখানে প্রবেশ করতে দেখেন। কিছুক্ষণ পরই তিনি সেখান থেকে বেরিয়ে ক্যান্টনমেন্ট ত্যাগ করে সোজা ঢাকায় চলে যান বলে শোনা যায়। আমার সোর্স সেই কক্ষে প্রবেশ করার সুযোগ পান। সেখানে গিয়ে তিনি দেখেন, মাথায় একটিমাত্র গুলির আঘাতে মঞ্জুর নিহত হয়েছেন। তাঁকে হত্যা করা হয়েছে।…

“আমার মতে, এর মাধ্যমে আমি একটি নতুন বস্তুসম্মত তথ্য আদালত ও প্রসিকিউশনের কাছে পেশ করলাম। আমার সোর্স হন্তারক হিসেবে যাঁকে চিহ্নিত করেছেন, সেই ঊর্ধ্বতন সামরিক কর্মকর্তার নামটি আমার জানা থাকলেও আমি এখন তা প্রকাশ করছি না।…

“আমার মত হচ্ছে, এই তথ্য আমার সোর্স প্রসিকিউশন ও আদালতের কাছে পেশ করুক, যদি তাঁকে বিপদে না ফেলে তাঁর সাক্ষ্য নেওয়ার কোনো ব্যবস্থা করা যায়। সরকারের জন্য এটি একটি চ্যালেঞ্জ বটে। এই ব্যক্তি দেশের বাইরে থাকলেও তিনি বিপদমুক্ত নন।” (প্রথম আলো, ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৪, ‘তিনি আসেন ঢাকা থেকে...মাথায় একটিমাত্র গুলি’)

লরেন্স লিফশুলজ আরও লিখেছেন, “জেনারেল আবুল মঞ্জুরকে কে বা কারা কেন হত্যা করেছে, আলাদা আলাদাভাবে কাজ করলেও চারজন ব্যক্তি সে প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পেয়েছেন বলে আমি মনে করি। যদিও শেষ পর্যায়ের কাজে এসে তাঁদের মধ্যে যোগ ঘটেছে। এই চার ব্যক্তি হচ্ছেন মেজর জেনারেল মইনুল হোসেন চৌধুরী, মঞ্জুর হত্যাকাণ্ডের সময় যিনি বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর অ্যাডজুটেন্ট জেনারেল ছিলেন; চট্টগ্রামের তৎকালীন জেলা প্রশাসক জিয়াউদ্দীন চৌধুরী; আমার সেই বিশ্বস্ত সোর্স যিনি দাবি করেন, ঢাকা থেকে তাঁর পরিচিত এক ঊর্ধ্বতন সেনা কর্মকর্তা চট্টগ্রাম ক্যান্টনমেন্টে এসে মঞ্জুরের কক্ষে প্রবেশ করেন এবং তার কিছুক্ষণ পরই মঞ্জুরের মৃত্যু হয়; আর ১৯৮১ সালে মঞ্জুর হত্যাকাণ্ডের খবর সংগ্রহ করা একমাত্র বিদেশি সাংবাদিক, আমি।…

“চাক্ষুষ সাক্ষীদের জবানবন্দি গ্রহণের পরও এখন পর্যন্ত আমরা এই হত্যাকাণ্ডের সুরাহা করতে পারিনি কিংবা এ কর্মকাণ্ডের পেছনে কোনো প্রতিষ্ঠান কলকাঠি নেড়েছে কি না, তাও স্পষ্ট করে জানা সম্ভব হয়নি। এবার আমরা অন্তত এমন একটি শক্ত ভিত্তি প্রস্তুত করতে পেরেছি, যার ওপর এই মামলার একটি তাৎপর্যপূর্ণ ফৌজদারি তদন্ত সম্পন্ন হতে পারে। গত ৩০ বছরে তো এই মামলার জন্য এ রকম কোনো তদন্তও হয়নি।” (প্রথম আলো ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৪, ‘আপনারা জেনারেল মঞ্জুরকে মেরে ফেললেন’)

লরেন্স লিফশুলজ তার উপরোক্ত তথ্য উপস্থাপনের কিছুদিন পর আরেকটি প্রতিবেদন লেখেন। এই প্রতিবেদনে তিনি লিখেছেন, “ফেব্রুয়ারি ২০১৪-এর শেষ দিকে প্রথম আলো ও ডেইলি স্টার-এ আমার চার খণ্ডের একটি রচনা প্রকাশিত হয়। ফেব্রুয়ারির ২২ থেকে ২৫ তারিখ পর্যন্ত পর পর চার দিন সেটি এ দুই পত্রিকায় যথাক্রমে বাংলা অনুবাদ ও মূল ইংরেজিতে বের হয়। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে থাকা অবস্থায় ১ জুন ১৯৮১ রাতে চট্টগ্রাম সেনানিবাসে মঞ্জুর হত্যাকাণ্ডের শিকার হন, রচনাটি ছিল সে হত্যাকাণ্ড নিয়ে লেখা।…

“রচনাটি প্রকাশের ঠিক আগে আগে প্রথম আলো কতৃর্পক্ষের হাতে কিছু নথিপত্র এসে পৌঁছায়। এসব নথি মঞ্জুর হত্যাকাণ্ড সম্পর্কে কিছু নতুন ও সমস্যাপূর্ণ প্রশ্নের জন্ম দেয়।…

“নথিপত্রগুলোর সত্যাসত্য নির্ণয়ে আমার বন্ধু ও আমাদের বেশ কিছু সময়ের প্রয়োজন হয়। নথিগুলোর বিষয়বস্তু খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পড়তে হয়। পাশাপাশি, যে পরিস্থিতিতে এসব নথি আমাদের হাতে আসে, তা-ও আমাদের বুঝতে হয়। এসব নথির সবটাই মঞ্জুর হত্যাকাণ্ড-সম্পর্কিত। কিন্তু এগুলো প্রস্তুত করা হয়েছে সে হত্যাকাণ্ডের ১৪ বছর পরে। আর আমাদের হাতে এসেছে ২০১৪ সালে, মঞ্জুরের খুনের ৩৩ বছর পর।…

“এসব নথিতে ১ জুন ১৯৮১ রাতে চট্টগ্রাম সেনানিবাসে মঞ্জুরের জীবনের শেষ মুহূর্তের কিছু ঘটনার উল্লেখ রয়েছে। নথিগুলোর ভাষ্যমতেও, মঞ্জুরকে সেনা হেফাজতে হত্যা করা হয়েছিল। এ বিবরণের সঙ্গে ফেব্রুয়ারি মাসে প্রকাশিত বিবরণের মিল আছে, তবে কিছু পার্থক্যও আছে।…

“যে নথি আমাদের হাতে এসেছে, সেগুলোর মধ্যে আটজন সাধারণ সৈনিকেরও সাক্ষ্য আছে। তার মধ্য থেকে আমরা ওই পাঁচজন সৈনিকের সাক্ষ্যের ওপর গুরুত্ব বেশি দিয়েছি, যাঁরা মঞ্জুর হত্যার চাক্ষুষ বর্ণনা দিয়েছেন। এ সাক্ষ্যের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, এ পাঁচ সৈনিক যৌথভাবে মঞ্জুর হত্যাকাণ্ডে একদল ঊর্ধ্বতন সেনা কর্মকর্তার জড়িত থাকার অভিযোগ করেছেন। উপরন্তু তাঁরা এ অভিযোগও করেছেন যে ঊর্ধ্বতন এই সেনা কর্মকর্তারা একটি ‘গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব’-এর অংশ হিসেবে পরিচিত ‘ওপরের নির্দেশ’ অনুসরণ করছিলেন। এই ‘ওপরের নির্দেশ’-দাতাদের মধ্যে একদল জ্যেষ্ঠ সেনা কর্মকর্তা অন্তভুর্ক্ত ছিলেন, নায়েক ও সুবেদাররা বাংলাদেশ পুলিশের সিআইডির কাছে সাক্ষ্য দেওয়ার সময় তাঁদের নাম বলেছেন। ...” (প্রথম আলো ১৯ এপ্রিল ২০১৪, ‘মেজর জেনারেল আবুল মঞ্জুর হত্যাকাণ্ড: নেপথ্য কাহিনির দ্বিতীয় পর্ব, পাঁচ সৈনিকের চাক্ষুষ বর্ণনা’)

এরপর লরেন্স লিফশুলত্জ লিখেছেন, “যেসব নায়েক ও সুবেদারের সাক্ষ্য নেওয়া হয়েছে, ক্যাপ্টেন এমদাদ ১ জুন ১৯৮১ তাঁদের জড়ো করেছিলেন। তাঁদের বলা হয়, তাঁরা একটি ‘বিশেষ অভিযান’-এ অংশ নিতে যাচ্ছেন। সংবাদপত্রের তথ্য অনুসারে, ক্যাপ্টেন এমদাদ চট্টগ্রামে এসব ঘটনাপ্রবাহের সময় একজন কর্তব্যরত সক্রিয় কর্মকর্তা ছিলেন। সিআইডির কাছে দেওয়া পাঁচজন সাধারণ সৈনিকের সাক্ষ্য ও হলফনামা থেকে তাঁর ভূমিকা সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যাচ্ছে।…

“...সুবেদার-১ তাঁর সাক্ষ্যে বলেছেন, ‘ক্যাপ্টেন (বর্তমানে মেজর) এমদাদ সাহেব আমাদের সর্ট আউট করেন এবং বলেন, বিশেষ একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজের নির্দেশ ওপর থেকে এসেছে যে মেজর জেনারেল মঞ্জুর হাটহাজারী থানা পুলিশের হেফাজতে আছেন। সেখান থেকে তাঁকে আনতে হবে। আনার পথে রাস্তায় অথবা ক্যান্টনমেন্টের ভেতরে কোথাও সুবিধামতো জায়গায় তাঁকে শেষ করে ফেলতে হবে।’…

“হাবিলদার-১ সিআইডিকে বলেছেন, ‘ক্যাপ্টেন এমদাদ আমাদের বলেন, মেজর জেনারেল মঞ্জুর ও তাঁর সঙ্গীয় অন্যান্যরা হাটহাজারী থানায় পুলিশের নিকট আছেন। তাঁদের আনতে হবে এবং আনার পথে মেজর জেনারেল মঞ্জুরকে সুবিধামতো জায়গায় মেরে ফেলতে হবে। এটা ওপরের নির্দেশ। আমাদের কিছু করার নাই।’…

“সুবেদার-২ তাঁর সাক্ষ্যে বলেছেন, ‘ক্যাপ্টেন এমদাদ (হামিদ কোম্পানির কোম্পানি কমান্ডার) আমাদের উদ্দেশে ব্রিফিং দেন। তিনি বলেন যে মেজর জেনারেল মঞ্জুর, তাঁর পরিবারবর্গ, অন্যরাসহ পুলিশের কাছে ধরা পড়েছেন, তাঁরা হাটহাজারী থানায় আছেন। সেখান থেকে তাঁদের নিয়ে আসতে হবে। ওপরের নির্দেশ, আনার পথে জেনারেল মঞ্জুরকে সুবিধামতো জায়গায় হত্যা করতে হবে।’…

“‘সুবিধামতো জায়গায়’ শব্দবন্ধটি প্রায় সব সাক্ষ্যেই পাওয়া যায়। নায়েক-১ বলেন, ‘ক্যাপ্টেন এমদাদের ব্রিফিং অনুসারে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নির্দেশ অনুযায়ী, থানা থেকে সেনানিবাসে নিয়ে আসার সময় কোনো সুবিধামতো জায়গায় ও সময়ে মঞ্জুর সাহেবকে খুন করতে হবে।’…

“হাবিলদার-১-এর ভাষ্যমতে, যে জায়গাটা শেষ পর্যন্ত সবচেয়ে সুবিধাজনক বলে মনে হলো, সেটি হচ্ছে ক্যান্টনমেন্টের ভেতরে, ফায়ারিং রেঞ্জের কাছাকাছি একটি স্থান: ‘সেখানে গাড়ি থেকে মঞ্জুর সাহেবকে নামিয়ে হাঁটিয়ে উত্তর দিকে আনুমানিক ৩০০ গজ দূরে এবং পরে সেখানে বাঁ দিকে কিছু দূরে পাহাড়ের কাছে আমরা নিয়ে যাই। সেখানে যাওয়ার পর এমদাদ সাহেব জেনারেলের সঙ্গে আস্তে আস্তে কথা বলেন। পরে তিনি আমাকে জেনারেলকে গুলি করতে পারব কি না, জিজ্ঞাসা করেন। আমি বলি, আমার দ্বারা সম্ভব হবে না। পরে নায়েক-২-কে জিজ্ঞাসা করেন। তিনিও রাজি হননি। পরে হাবিলদার মালেককে জিজ্ঞাসা করলে তিনি গুলি করতে রাজি হন। ক্যাপ্টেন এমদাদ সাহেবের নির্দেশে হাবিলদার মালেক জেনারেল মঞ্জুরের মাথায় চায়নিজ রাইফেল দিয়ে গুলি করেন। জেনারেল মঞ্জুর মাটিতে পড়ে যান।’...

“সুবেদার-২ ও তাঁর অন্য সহকর্মীরা যে সাক্ষ্য দিয়েছেন, তা সত্য হলে কাজটা খুব সন্তর্পণে ঘটেছে; আর কোনো উত্তেজনাও সেখানে ছিল না। তাঁরা ‘ক্ষুব্ধ’ বা ‘অনিয়ন্ত্রিত’ কোনোটাই ছিলেন না। তাঁদের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় বিষয়টি হচ্ছে তাঁরা ‘ওপরের নির্দেশ’ অনুযায়ী কাজ করছিলেন। নায়েক-১-এর ভাষ্য অনুযায়ী, তাঁদের আর ‘কিছু করার’ ছিল না।…

“যে বিষয়টির দিকে নজর দেওয়া দরকার সেটি হচ্ছে, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা তাঁদের অধীনের সৈনিকদের সঙ্গে বেশ সতর্কভাবে যোগাযোগ করছিলেন। হাবিলদার-১ স্পষ্টভাবেই বলেছেন, ক্যাপ্টেন এমদাদ তাঁদের এই ‘বিশেষ অভিযান’-এর অন্তিম পর্যায়টুকু যখন তাঁকে ও নায়েক-২-কে সম্পন্ন করতে বলেন, তখন তাঁরা মঞ্জুরকে হত্যা করতে অস্বীকৃতি জানান। হাবিলদার-১ বলেন, নায়েক মালেক নামে এক সৈনিক ক্যাপ্টেন এমদাদের নির্দেশ পালন করেন, অর্থাৎ কি না, মঞ্জুরকে গুলি করে হত্যা করেন।…

“সাংগঠনিকতার দিক থেকে এই ‘বিশেষ অভিযান’টি ডিজিএফআই-ই সব পর্যায়ে নেতৃত্ব দিয়েছে বলে মনে হয়। সুবেদার-২-এর সাক্ষ্যে দেখা যায়, পরদিন ২ জুন সকালে তিনি শুনতে পান ‘উচ্ছৃঙ্খল সৈনিকেরা’ মঞ্জুরকে হত্যা করেছে। এতে তিনি বিস্মিত হন। কারণ, তাঁর সাক্ষ্য অনুসারে, ‘ক্যান্টনমেন্ট ঢুকে ইবিআরসি পর্যন্ত আসার পথে রাস্তায় বা আশপাশে কোনো উচ্ছৃঙ্খল বা উত্তেজিত সৈনিক’ তিনি দেখেননি। এই খবরটি রেডিও পেল কোত্থেকে? ২ জুন ১৯৮১ তারিখে রেডিও, টেলিভিশন ও সব পত্রিকায় এ খবরটি প্রচারিত হয়।…

“‘ফল্স ফ্ল্যাগ’ অপারেশনের কথা বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছিল। আবার মঞ্জুরের খুনের চাক্ষুষ সাক্ষী হিসেবে দাবিদার সৈনিকদের সাক্ষ্য অনুযায়ী সে রাতে ফায়ারিং রেঞ্জে কোনো ‘উচ্ছৃঙ্খল সৈনিক’ ছিলেন না। সেখানে উপস্থিত ছিলেন কেবল আদেশ পালনকারী সৈনিকেরাই। তাঁরা হাটহাজারী থানা থেকে মঞ্জুরকে নিয়ে এসে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের চোখের সামনে ‘সুবিধামতো জায়গায়’ তাঁকে হত্যা করেন। (সামরিক ও বেসামরিক গোয়েন্দা তত্পরতায় কীভাবে ‘ফল্স ফ্ল্যাগ’ অভিযান ব্যবহৃত হয়, তা বোঝার জন্য দেখুন, ‘মেজর জেনারেল মঞ্জুর হত্যাকাণ্ড’,  প্রথম আলো  ও ডেইলি স্টার, ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৪।…

“দাবার এই ছকে ঘোড়া (ব্রিগেডিয়ার ও লেফটেন্যান্ট কর্নেল) ও হাতিরা (মেজর ও ক্যাপ্টেন) তাদের বড়েগুলো (সুবেদার ও নায়েক) অঙ্গুলিহেলনে চালনা করেছেন। বেশ। কিন্তু আরও বড় একটি দাবার ছকে আবার এই ঘোড়া ও হাতিরা যাঁদের অঙ্গুলিহেলনে কাজ করেছেন, তাঁরা সেনাবাহিনীর ‘ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা’ (মেজর জেনারেল) এবং সিআইডির অভিযোগপত্র অনুযায়ী এরশাদ নামক একজন ‘লেফটেন্যান্ট জেনারেল’। এই ‘ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ’ প্রথম দিন থেকেই এক অবিশ্বাস্য গল্প ফেঁদে বসে, ‘ক্ষুব্ধ সৈনিকেরা’ নাকি উত্তেজিত হয়ে মঞ্জুরকে হত্যা করেছেন।” (প্রথম আলো ২০ এপ্রিল ২০১৪, জেনারেল আবুল মঞ্জুর হত্যাকাণ্ড: নেপথ্য কাহিনির দ্বিতীয় পর্ব, ‘ওপরের নির্দেশ’-এ মঞ্জুর খুন)

তিনি আরও লিখেছেন, “...প্রশ্ন হলো, জেনারেল মঞ্জুরের শেষ মুহূর্তের কোন বিবরণটি সঠিক? এর বাইরেও কি এমন আর কোনো বিবরণ আছে, যা আমরা জানি না?...

“সৈনিকদের হলফনামায় কী কোনো পরিবর্তন ঘটেছে? তাঁদের কি অনেকগুলো খসড়ার ভেতর দিয়ে যেতে হয়েছে? প্রাথমিকভাবে কি সৈন্যদের নিজেদের নাম জড়াতে এবং তাঁদের মধ্যে কারও ওপর ‘দায়িত্ব’ সম্পন্ন করার দায় চাপাতে চাপ দেওয়া হয়েছে? তাঁরা একজন ব্যক্তির নাম বলেছেন, কিন্তু তিনি কোথাও নেই।” (প্রথম আলো, ২২ এপ্রিল ২০১৪, জেনারেল আবুল মঞ্জুর হত্যাকাণ্ড: নেপথ্য কাহিনির দ্বিতীয় পর্ব, খুনিরা নেমেছিল এরশাদের নেতৃত্বে)

জিয়াউদ্দিন এম চৌধুরী মঞ্জুরের নিহত হওয়ার বিষয়ে দুটি তথ্য উল্লেখ করেছেন। দুই তথ্যই তার শোনা।

এক. মঞ্জুর নিহত হওয়ার পরদিন; অর্থাৎ, ২ জুন তিনি চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়ে কমিশনার সাইফউদ্দিন ও ডিআইজি এ এস এম শাহজাহানসহ আরও কয়েকজন পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করছিলেন। এমন সময় এ এস এম শাহজাহানের কাছে ইস্টবেঙ্গল রেজিমেন্টাল সেন্টারের কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার আজিজ ফোন করেন। ফোন ছেড়ে দিয়ে এ এস এম শাহজাহান তাকে ও উপস্থিত অন্যদের জানান, ব্রিগেডিয়ার আজিজ ফোন করে শান্ত কণ্ঠে তাকে বলেছেন, ‘গুলিবিদ্ধ হয়ে’ জেনারেল মঞ্জুরের মৃত্যু হয়েছে।

দুই. একজন চিকিৎসক সেনা কর্মকর্তা তাকে বলেছেন, মঞ্জুরকে সেনানিবাসে আনার পর একজন জ্যেষ্ঠ সেনা কর্মকর্তা (একজন ব্রিগেডিয়ার) তার কুঠুরিতে তাকে দেখতে যান (চিকিৎসক সেনা কর্মকর্তা তাকে ব্রিগেডিয়ারের নাম বলেননি)। জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাটির উদ্দেশ্য ছিল একটাই, মঞ্জুরকে শেষ করে দেওয়া এবং বলা হয়, তিনি সেখানকার সেনা কর্মকর্তাকে বলেছিলেন, তিনি মঞ্জুরকে জিজ্ঞাসাবাদ করতে এসেছেন। তিনি ভেতরে ঢোকেন, পিস্তল বের করে মঞ্জুরকে গুলি করেন এবং বেরিয়ে যান, পুরো ঘটনাটি ঘটে পরিকল্পনামাফিক।

অন্যদিকে পুলিশ কর্মকর্তা আলী মোহাম্মদ ইকবাল তার সাক্ষ্যে বলেছেন, “২ জুন সকালে শুনিতে পাই, মেজর জেনারেল এম এ মঞ্জুরকে উত্তেজিত সৈনিকেরা ক্যান্টনমেন্টে হত্যা করিয়া ফেলিয়াছে।” তার এ বক্তব্য অনেকটা তখনকার সরকারি ভাষ্যের মতোই। অপর পুলিশ কর্মকর্তা এ এইচ এম বি জামান তার সাক্ষ্যে মঞ্জুর হত্যাকাণ্ড সম্পর্কে কিছুই বলেননি।

জিয়াউদ্দিন এম চৌধুরী উল্লে করেছেন, “একটি মাত্র গুলি তাঁর (মঞ্জুর) মাথা ভেদ করে চলে গেছে, অনেক বুলেটের চিহ্ন তাঁর গায়ে ছিল না।” তার এ কথাটা ঠিক। মঞ্জুরকে হত্যার ঘটনা যারা প্রত্যক্ষ করেছেন, তারা সবাই জবানবন্দীতে বলেছেন একটি মাত্র গুলির কথা। সিএমএইচের চিকিৎসক লেফটেন্যান্ট কর্নেল এ জেড তোফায়েল আহাম্মদ ও লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. কামাল উদ্দিন মঞ্জুরের পোস্টমোর্টেম করেন। মঞ্জুর হত্যা মামালায় তারা রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষী। তারাও তাদের সাক্ষ্যে একটি গুলির আঘাতের কথা বলেছেন এবং সে গুলি পেছন করা হয়েছে। অন্যদিকে হাসপাতাল থেকে মঞ্জুরের মরদেহ সমাহিত করার জন্য কবরস্থানে নিয়ে যান ক্যাপ্টেন (পরে লেফটেন্যান্ট কর্নেল) ফেরদৌস হাসান। তিনিও তার সাক্ষ্যে বলেছেন একটি গুলির আঘাতের কথা।

পুলিশের কাছে দেওয়া সাক্ষ্যে এ জেড তোফায়েল আহাম্মদ বলেন, “২ জুন ভোরে আনুমানিক সাড়ে চারটার দিকে সিএমএইচ থেকে বাসায় টেলিফোন আসে যে, আমাকে সিএমএইচএ গিয়ে পোস্টমর্টেম করতে হবে। কার পোস্টমর্টেম করতে হবে, বলে নাই। ডিউটি মেডিকেল অফিসার টেলিফোন করেছে। সকাল অনুমান ৭টার দিকে সিএমএইচ পৌঁছাই এবং জানতে চাই কার লাশ পোস্টমর্টেম করতে হবে। তখন আমাকে বলা হয় যে, মর্গে মেজর জেনারেল মঞ্জুরের লাশ আছে তার পোস্টমর্টেম করতে হবে। মর্গে সকাল ৭টা ৩০ মিনিটে গিয়ে আমি মেজর জেনারেল মঞ্জুরের লাশ একটি কামরায় ফ্লোরে চিত, র‍্যাংকবিহীন সামরিক বাহিনীর ইউনিফর্ম পরিহিতি আছে দেখি। আমি মর্গের লোকের সহায়তায় লাশ পোস্টমর্টেম টেবিলে উঠিয়ে লাশের সমস্ত কাপড় খুলে শরীরের বাহ্যিক দিক পর্যবেক্ষণ করে কোথাও জখম বা আঘাতের চিহ্ন আছে কিনা দেখি। কেবলমাত্র মাথার ডানদিকে পেছনে অক্সিবিটাল রেজিয়নে ৪ ইঞ্চি বাই ২ ইঞ্চি একটি বুলেটজনিত ক্ষত দেখতে পাই। ইহা ছাড়া শরীরে আর কোনোরকম আঘাত বা জখমের চিহ্ন ছিল না।” (এ এ জেড তোফায়েল আহাম্মদ, মো. কামাল উদ্দিন ও ফেরদৌস হাসানের জবানবন্দী)

লেখক: মুক্তিযুদ্ধ গবেষক ও সাংবাদিক

সম্পর্কিত