Advertisement Banner

মার্কিন-ইরান আলোচনায় প্রধান বিরোধের বিষয়গুলো কী

চরচা ডেস্ক
চরচা ডেস্ক
মার্কিন-ইরান আলোচনায় প্রধান বিরোধের বিষয়গুলো কী
ইরান দাবি করেছে যুক্তরাষ্ট্র তার যুদ্ধে যে ক্ষতি করেছে তার ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। ছবি: সংগৃহীত

ইসলামাবাদে দ্বিতীয় দফা মার্কিন-ইরান আলোচনা নিয়ে অনিশ্চয়তা গত কয়েক দিন ধরে অব্যাহত রয়েছে। দুই দেশের মধ্যে ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি শেষ হওয়ার দ্বারপ্রান্তে এসে এই অনিশ্চয়তা আরও ঘনীভূত হয়েছে। যদিও নতুন করে ফের যুদ্ধবিরতি বাড়ানোর ঘোষণা দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি জানিয়েছেন, অবরোধ চলমান থাকবে।

ডনের প্রতিবেদন অনুযায়ী, মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের নেতৃত্বে একটি মার্কিন প্রতিনিধিদল ইসলামাবাদে আলোচনার জন্য যাওয়ার কথা থাকলেও ইরান এখনো তার অংশগ্রহণ নিশ্চিত করেনি। ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে হুমকির মাত্রা বাড়িয়েছেন, বলেছেন, ইরান আলোচনার টেবিলে না ফিরলে সমস্যার মুখোমুখি হবে। অন্যদিকে, ইরানের শীর্ষ নেতৃত্ব বলে চলেছে, হুমকির ছায়ায় কোনো আলোচনা হবে না।

সর্বশেষ হরমুজ প্রণালিতে মার্কিন বাহিনী একটি ইরানি পতাকাবাহী জাহাজ জব্দ করার পরিপ্রেক্ষিতে উত্তেজনা আরও বেড়েছে। ১৩ এপ্রিল থেকে ইরানি বন্দরগুলোতে মার্কিন অবরোধ কার্যকর রয়েছে। এর জবাবে ইরান শনিবার আবার প্রণালি বন্ধ করে দিয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে দুইপক্ষ যদি আবার আলোচনার টেবিলে বসে তাহলে কোন বিষয়গুলো কেন্দ্রীয় হবে তা স্পষ্ট করেছে ডনের বিশ্লেষণ।

সবচেয়ে মৌলিক ও দীর্ঘদিনের বিরোধের বিষয় হলো ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ। ইরানের পারমাণবিক কার্যক্রম ধ্বংস করার দাবি যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘ দিনের অবস্থান এবং তা এখন শূন্য সমৃদ্ধকরণের দিকে ঠেলছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের বিরুদ্ধে তাদের যুদ্ধকে ন্যায়সংগত করেছে এই দাবিতে যে, ইরান পারমাণবিক বোমা তৈরি করছে। তেহরান বরাবর বলে আসছে, তার পারমাণবিক কার্যক্রম সম্পূর্ণ বেসামরিক উদ্দেশ্যে এবং পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির কোনো ইচ্ছা তাদের নেই।

আলোচনায় কেন্দ্রবিন্দুতে আছে ইরানের প্রায় ৪৪০ কিলোগ্রাম ৬০ শতাংশ সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত, যা তেহরান আরও সমৃদ্ধ করলে বেশ কয়েকটি পারমাণবিক বোমা তৈরি করতে পারবে। ওয়াশিংটন পোস্টের তথ্য অনুযায়ী, শেষ দফার আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধ শেষের চুক্তির অংশ হিসেবে ইরানের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ ২০ বছরের জন্য স্থগিত রাখার প্রস্তাব করেছিল। এই ২০ বছরের বিরতির সাথে নিষেধাজ্ঞা শিথিলের কথাও ছিল। তবে ইরানি পক্ষ পাঁচ বছরের জন্য পারমাণবিক কার্যক্রম স্থগিত রাখার প্রস্তাব দিয়েছে বলে নিউইয়র্ক টাইমস জানিয়েছে। এই ব্যবধান এখনো অনেক বড়।

দ্বিতীয় প্রধান বিরোধের বিষয় হলো হরমুজ প্রণালি– বিশ্বের তেল চালানের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জলপথ। ওমান ও ইরানের মধ্যবর্তী এই প্রণালিটি প্রায় ১৬৭ কিলোমিটার দীর্ঘ এবং উত্তরের উপসাগরকে দক্ষিণে ওমান উপসাগর ও আরব সাগরের সাথে সংযুক্ত করে। বিশ্বের মোট তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস সরবরাহের প্রায় এক পঞ্চমাংশ এই প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয়। ২৮ ফেব্রুয়ারি মার্কিন-ইসরায়েলি হামলার প্রাথমিক দফার পর ইরান এই প্রণালির ওপর তার সুবিধা কাজে লাগিয়ে এর মধ্য দিয়ে চলাচল সীমিত করে দিয়েছে। এরই প্রতিক্রিয়ায় ইরানের বন্দরগুলোতে যুক্তরাষ্ট্র নৌ অবরোধ বজায় রেখেছে। যুক্তরাষ্ট্র কোনো পথকর ছাড়াই প্রণালি সম্পূর্ণ খোলার দাবি করছে। ইরান আগে প্রণালি দিয়ে পরিবহন করা মালপত্রের জন্য টোল আদায়ের কথা বলছিল। এখন তার দাবি হলো, ইরানি বন্দরগুলোতে মার্কিন নৌ অবরোধের অবসান এবং জলপথের ওপর তার নিয়ন্ত্রণ পুনরুদ্ধার।

তৃতীয় বিষয়টি হলো নিরাপত্তা গ্যারান্টি। দুই দেশই নিরাপত্তা গ্যারান্টি চেয়েছে। ইরান চায় অপরপক্ষ শাসন ব্যবস্থা পরিবর্তনের পরিকল্পনা, ইরানের বিরুদ্ধে অযৌক্তিক সামরিক আগ্রাসন ছেড়ে দিক এবং স্থায়ী যুদ্ধবিরতির নিশ্চয়তা দিক। যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে দাবি হলো ইরান ইসরায়েল ও উপসাগরীয় রাষ্ট্রে মার্কিন ঘাঁটিগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করা বন্ধ করুক এবং হিজবুল্লাহসহ আঞ্চলিক গোষ্ঠীগুলোতে সমর্থন দেওয়া বন্ধ করুক।

লেবানন প্রশ্নটিও একটি বড় বাধা হয়ে আছে। যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে ইসরায়েল লেবাননে ব্যাপক হামলা চালিয়েছে এবং দাবি করেছে এগুলো হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে পরিচালিত। ইসরায়েল থেকে লঙ্ঘনসহ ১০ দিনের একটি যুদ্ধবিরতি ২৬ এপ্রিল শেষ হওয়ার কথা। ইরানের অবস্থান হলো, যুক্তরাষ্ট্রের সাথে যেকোনো চূড়ান্ত চুক্তিতে অবশ্যই লেবাননের জন্য নিরাপত্তা গ্যারান্টি থাকতে হবে যাতে ভবিষ্যতে ইসরায়েলি হামলা প্রতিরোধ করা যায়। যুক্তরাষ্ট্র জোর দিচ্ছে যে, এই বিষয়টি মার্কিন-ইরান আলোচনা থেকে আলাদা। লেবাননের প্রেসিডেন্ট জোসেফ আউনও সম্প্রতি একই অবস্থান নিয়েছেন। বলেছেন, ইসরায়েল-লেবানন আলোচনা অন্য যেকোনো আলোচনা থেকে আলাদা।

একটি সম্পূর্ণ নতুন ও অভূতপূর্ব দাবি হিসেবে আলোচনায় উঠে এসেছে যুদ্ধের ক্ষতিপূরণের প্রশ্ন। ইরান দাবি করেছে যুক্তরাষ্ট্র তার যুদ্ধে যে ক্ষতি করেছে তার ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। আল জাজিরার তথ্য অনুযায়ী, ২৮ ফেব্রুয়ারি মার্কিন-ইসরায়েলি যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে একটি প্রাথমিক অনুমান ইঙ্গিত দেয় যে ইরান প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ক্ষতি প্রায় ২৭ হাজার কোটি ডলার। এই দাবি যুক্তরাষ্ট্রের কাছে গ্রহণযোগ্য হওয়ার সম্ভাবনা কম। কিন্তু এটি আলোচনার টেবিলে ইরানের দর কষাকষির একটি গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার।

পঞ্চম বিষয় হলো নিষেধাজ্ঞা শিথিল ও জব্দ সম্পদ মুক্ত করা। ইরানের দাবিগুলোর মধ্যে আরেকটি হলো যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক ইরানের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং বিদেশে জব্দ সম্পদ ছাড়। যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান হলো ইরান তার পারমাণবিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা ছেড়ে দেওয়ার পরেই কেবল নিষেধাজ্ঞা শিথিলের বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে।

সামগ্রিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এই ছয়টি বিষয়ের প্রতিটিতেই দুই পক্ষের মধ্যে বিশাল ব্যবধান রয়েছে। পারমাণবিক প্রশ্নে ২০ বনাম ৫ বছরের প্রস্তাবের ব্যবধান থেকে শুরু করে হরমুজের নিয়ন্ত্রণ, লেবাননের ভবিষ্যৎ, ক্ষতিপূরণের অকল্পনীয় অঙ্ক এবং নিষেধাজ্ঞা শিথিলের শর্তাবলি– সবকিছুতেই দুই পক্ষ এখনো অনেক দূরে। ট্রাম্পের ক্রমবর্ধমান হুমকি ও ইরানের হুমকির মুখে আলোচনা না করার ঘোষণার মধ্যে দ্বিতীয় দফা আলোচনা আদৌ হবে কি না তা নিশ্চিত নয়।

সম্পর্কিত