Advertisement Banner

ব্যবসায়ীরা কেন ঝুঁকি নিতে চাইছেন না?

ব্যবসায়ীরা কেন ঝুঁকি নিতে চাইছেন না?
প্রতীকী ছবি। ছবি: এআই দিয়ে তৈরি

একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মী ইকরামুল হক প্রতি মাসে বাজারের সময় বাচ্চার জন্য খেলনা কেনেন। কিন্তু এই জুন মাসে কারওয়ান বাজারের কিচেন মার্কেটের দোতালায় শিশুখাদ্যসহ প্রয়োজনীয় কেনাকাটার পর খেলনার দোকানে গেলেও কিছু কেনেননি। এটা-ওটা দেখে, নাড়াচাড়া ও দরদাম করে রেখে দেন তিনি। জানতে চাইলে ইকরাম বলেন, “সময়টা কঠিন যাচ্ছে। যে খেলনা আছে, তা দিয়েই খেলুক বাচ্চারা।”

হতাশার সুরে বললেন, “সাধারণত মাসিক বাজার একবারেই করতাম। কিন্তু বছরখানেক যাবত মাসে একবারে এতগুলো টাকা খরচ করতে ভয় হয়, কখন কী জরুরি প্রয়োজন হয় বলা তো যায় না।”

পাশ থেকে দোকানি আজিজ সরকার বলেন, “নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর ভাবছিলাম বেচাবিক্রি আবার বাড়বে, ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে ব্যবসাটা চাঙা করব। সেইটা তো হচ্ছে না।” আজিজ সরকার আরও বলেন, “আগে যে পাইকারি ক্রেতা সপ্তাহে লাখ টাকার মাল নিত, সে এখন ৫০ হাজার টাকার অর্ডার দিতেও ১০ বার ভাবে। দোকান ভাড়া, কর্মচারীর বেতন আর বিদ্যুতের বাড়তি বিল। সব মিলায়া লাভ করা তো দূরের কথা, পুঁজি বাঁচানোই দায়।”

এমন পরিস্থিতি এখন শুধু আজিজ সরকারের না; এটি দেশের কোটি ক্ষুদ্র, মাঝারি ও বৃহৎ শিল্পোদ্যোক্তার বর্তমান সময়ের অবস্থা কমবেশি এমনই। ১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনের পর বিএনপি নেতৃত্বাধীন নতুন রাজনৈতিক সরকার দায়িত্ব নেয়। এরপর চার মাস পার হয়েছে। দৃশ্যত বড় কোনো রাজনৈতিক সংঘাত বা হরতাল-অবরোধ না থাকলেও দেশের অর্থনীতি ও ব্যবসার চাকা যেন এক অদৃশ্য চোরাবালিতে আটকে আছে।

এই চোরাবালিতে আটকে যাওয়ার একটি উদাহরণ আবাসন খাতের উদ্যোক্তা ব্যবসায়ী প্রকৌশলী আল্লামা আল রাজী। তিনি চেয়েছিলেন নির্মাণ শিল্পে সফল হতে। অল্প পুঁজি দিয়ে শুরু করে গত এক যুগেরও বেশি সময়ের ব্যবসায় যা জমিয়েছিলেন, তার সাথে ব্যংকঋণ মিলিয়ে রাজধানীর কাওলায় একটি বহুতল ভবন নির্মাণে বিনিয়োগ করেন। কিন্তু গত দেড় বছরে মাত্র তিনটি ফ্ল্যাট বিক্রি হয়েছে। এখনো অবিক্রিত পড়ে আছে ১৯টি ফ্ল্যাট।

চরচাকে আল রাজী বলেন, “মধ্যবিত্তকে টার্গেট করে ছোট ফ্ল্যাট তৈরি করেছি, যার দাম এক কোটির অনেক কম। কিন্তু লাভ হলো না। এখন তো পুঁজি আটকে আছে। ব্যাংকঋণের বোঝা তো আছেই।” তিনি জানান, সারাদেশে ৩০ থেকে ৪০ হাজার ফ্ল্যাট অবিক্রিত পড়ে আছে। মহল্লায় একটি মুদি দোকান দিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করছেন এই প্রকৌশলী।

আবাসন খাতের এই স্থবিরতা প্রভাব ফেলেছে ইট, বালি, রড, সিমেন্ট, স্যানিটারি, বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম এবং এমনকি নির্মাণ শ্রমিকের ওপরও। সাধারণ মানুষ কিংবা ভোক্তা অতি সাবধানী হয়ে কেনাকাটা কমিয়ে দেওয়ায় এ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। মোটা দাগে দুটি কারণে এমনটি হয়েছে। মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে গিয়েছে উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে, যা মে মাসে ছিল ৯.৪২%।

অথনীতিবিদরা বলছেন, ছোট ব্যবসায়ীরা একদিকে পুঁজি বাঁচাতে হিমশিম খান, অন্যদিকে দেশের বৃহৎ শিল্প গ্রুপগুলোও খুব একটা ‘স্বস্তিতে নেই’। গ্যাস ও বিদ্যুতের তীব্র সংকটের কারণে অনেক কারখানা তাদের পূর্ণ সক্ষমতা ব্যবহার করতে পারছে না। সাভার, গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জের বেশ কিছু তৈরি পোশাক কারখানা এখন তাদের মোট ক্ষমতার মাত্র ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ উৎপাদন চালু রাখতে পারছে বলে দাবি করছেন ব্যবসায়ীরা।

বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজের সভাপতি আনোয়ার-উল আলম চৌধুরী চরচাকে বলেন, “বাস্তবতা হচ্ছে–আমরা এখন আমদানিনির্ভর জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল। ডলারের দাম ১২২ টাকার ওপরে থাকায় জ্বালানি আমদানির খরচ অনেক বেড়ে গেছে। যতক্ষণ না সরকার স্থানীয় পর্যায়ে গ্যাসের অনুসন্ধান বাড়ানো এবং কলকারখানায় নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস দিচ্ছে, ততক্ষণ বড় শিল্পের উৎপাদন খরচ কমানো যাবে না।”

সংকট ‍দৃশ্যমান হয় মুহাম্মদ ইউনূস আমলে

২০২৪ সালের আগস্টে অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর দেশের ক্ষমতায় বসে মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার। অর্থনৈতিক সুশাসন ফেরানো এবং পুঞ্জীভূত অনিয়মগুলো জনসমক্ষে এসে তা সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়ার কথা ছিল ওই সরকারের। প্রত্যাশা ছিল–অর্থনীতিতে গতি আসবে। কিন্তু তা না হয়ে দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে স্থবিরতা নেমে আসে।

আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি, বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে শ্রমিক অসন্তোষ এবং রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে ব্যবসায়ীদের মাঝে আস্থার সংকট তৈরি হয়। দেশের ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণ এক লাফে ৫.৫ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যায়। ফলে তারল্য সংকটে ভুগতে থাকা ব্যাংকগুলো নতুন করে ব্যবসায়ীদের ঋণ দেওয়া প্রায় বন্ধ করে দেয়। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহের প্রবৃদ্ধি ৫ দশমিক ৫ শতাংশে নেমে আসে, যা ব্যবসা খাতে তীব্র ‘রক্তশূন্যতা’ তৈরি করে।

মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কেন্দ্রীয় ব্যাংক নীতি সুদহার বাড়াতে বাড়াতে ১০ শতাংশে নিয়ে যায়। ফলে ব্যাংকগুলোতে ঋণের সুদহার ১৩ থেকে ১৫.৫ শতাংশে গিয়ে ঠেকে। এত চড়া সুদে ঋণ নিয়ে ছোট ও মাঝারি ব্যবসায়ীদের পক্ষে টিকে থাকা অসম্ভব হয়ে পড়ে। স্পট মার্কেট থেকে গ্যাস ও জ্বালানি আমদানি কমে যাওয়ায় কলকারখানায় উৎপাদন নেমে আসে অর্ধেকের নিচে।

রাজনৈতিক সরকারের চার মাস

গত ১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনে নিরঙ্কুশ জয় পেয়ে দেশের দায়িত্বে আসে বিএনপি। দীর্ঘদিন পর একটি রাজনৈতিক সরকার ক্ষমতায় আসায় ব্যবসায়ীদের মধ্যে এক ধরনের স্বস্তি ও বিশাল প্রত্যাশা তৈরি হয়। ব্যবসায়ীরা আশা করেছিলেন, নতুন সরকার এসে ব্যাংকঋণ সহজ করবে এবং গ্যাস-বিদ্যুতের সমস্যা সমাধান করবে।

কিন্তু চার মাস পেরিয়ে সরকারি তথ্যে যে চিত্র উঠে এসেছে, তা স্বস্তিদায়ক নয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, গত মার্চ ও এপ্রিল মাসে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহের প্রবৃদ্ধি নেমে এসেছে যথাক্রমে মাত্র ৪.৭২% এবং ৪.৭৫%-এ। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গত ২৪ বছরের ইতিহাসে এটি সর্বনিম্ন পতনের রেকর্ড। মে মাসে এটি সামান্য বেড়ে ৪.৯৮% হলেও তা নামমাত্র।

এই চার মাসে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরলেও ব্যাংকগুলোর আর্থিক স্বাস্থ্যের এতটাই অবনতি হয়েছে যে, তারা ব্যবসায়ীদের নতুন বিনিয়োগের জন্য টাকা দিতে পারছে না। ফলে উদ্যোক্তারা নতুন কোনো কারখানা করা বা ব্যবসা বড় করার সাহস পাচ্ছেন না।

টাকার বাজারে উত্তেজনা: ঋণের সুদ ১৫%

কেবল স্থিতিশীল রাজনৈতিক পরিস্থিতি ব্যবসায়ীদের আস্থা অর্জন করতে পারছে না। এর প্রমাণ ঋণপ্রবাহে স্থবিরতা। আবার ব্যাংকের চড়া সুদহারের কারণেও ব্যবসায়ীরা ঋণ নিচ্ছে না। বাজারে মূল্যস্ফীতি বা সাধারণ পণ্যের দামের লাগাম টানতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ‘সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি’ বজায় রেখেছে। ফলে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর ঋণের সুদহার এখন ১২ থেকে ১৫ শতাংশ পর্যন্ত উঠে গেছে।

এর সাথে যুক্ত হয়েছে ব্যাংকিং খাতের তারল্য বা নগদ টাকার তীব্র সংকট। দেশের ব্যাংকগুলোতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ এখন প্রায় ৫.৮৮ লাখ কোটি টাকা, যা মোট বিতরিত ঋণের এক-তৃতীয়াংশেরও বেশি। বিশাল অঙ্কের টাকা খেলাপিদের পকেটে আটকে থাকায় ভালো ও নিয়মিত ব্যবসায়ীরা ঋণ পাচ্ছে না।

অথনীতিবিদ মাহফুজ কবির চরচাকে বলেন, “রাজনৈতিক সরকার আসায় বাজারে এক ধরনের মনস্তাত্ত্বিক স্বস্তি এসেছে ঠিকই, কিন্তু ব্যাংকিং খাতের যে কাঠামোগত ক্ষতি হয়েছে, তা চার মাসে নিরাময় সম্ভব নয়। তারল্য সংকটের কারণে ব্যাংকগুলো এখন বেছে বেছে শুধু অতি প্রয়োজনীয় এলসি এবং চলতি মূলধনের ঋণ দিচ্ছে। নতুন দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের জন্য ব্যাংকগুলোর হাতে পর্যাপ্ত তহবিল নেই।”

পরিস্থিতি উত্তরণে বিএনপি সরকারের যত উদ্যোগ

নতুন সরকারের অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য যে বাজেট পেশ করেছেন, তাতে ব্যবসায়ীদের ক্ষোভ প্রশমন ও অর্থনীতিকে সচল করার কিছু সুনির্দিষ্ট উদ্যোগের কথা বলা হয়েছে।

ব্যাংকিং খাতে সুশাসন ফেরাতে এবং বড় খেলাপিদের চিহ্নিত করতে সরকার একটি স্বাধীন ব্যাংকিং কমিশন গঠন করেছে এবং বড় বড় ব্যবসায়ী গ্রুপের আর্থিক অনিয়ম খতিয়ে দেখতে আন্তর্জাতিক আইনি ও অডিট প্রতিষ্ঠানের সহায়তা নিচ্ছে। অর্থনৈতিক ধাক্কা সামলাতে সরকার রিলিফ, রিকভারি এবং রিফর্ম–এই তিন স্তরের নীতিকৌশল গ্রহণ করেছে।

ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ীদের ভ্যাট আদায়ের প্রক্রিয়া সহজ করতে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কর হয়রানি কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। উদ্যোগ নেওয়া হয়ছে করজাল সম্প্রসারণের।

সম্প্রতি বেসরকারি সংস্থা সিপিডির এক অনুষ্ঠানে সংস্থাটির সম্মানীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান বর্তমান পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে বলেন, “নতুন রাজনৈতিক সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর বড় কোনো রাজনৈতিক অস্থিরতা না থাকাটা অর্থনীতির জন্য একটি বড় স্বস্তি। সরকার কিছু প্রশাসনিক সংস্কারে হাত দিয়েছে, যা প্রশংসনীয়। কিন্তু মনে রাখতে হবে, সামষ্টিক অর্থনীতির সূচকগুলো–যেমন ৯.৪২% মূল্যস্ফীতি এবং ৫.৮৮ লাখ কোটি টাকার খেলাপি ঋণ–এগুলো রাতারাতি জাদুর কাঠির ছোঁয়ায় কমে যাবে না। সরকারকে রাজকোষের অপচয় কমাতে হবে এবং প্রকৃত ব্যবসায়ীদের কম সুদে অর্থায়নের ব্যবস্থা করতে হবে।”

চার মাসের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা দেশের ব্যবসায়ীদের মনে যে আশার আলো জ্বালিয়েছিল, তা এখনো নিভে যায়নি। দেশের ব্যবসায়ীরা মনে করছেন, শুধু সরকারের পরিবর্তনই ব্যবসার ভাগ্য বদলানোর জন্য যথেষ্ট নয়, প্রয়োজন নীতিমালার ধারাবাহিকতা ও প্রাতিষ্ঠানিক সততা। কারওয়ান বাজারের আজিজ সরকার কিংবা তৈরি পোশাক খাতের বড় শিল্পপতি–সবাই অপেক্ষায় আছে সুদিনের। তারা এখন প্রতিশ্রুতির পরিবর্তে ব্যবসার খরচ কমিয়ে আনার কার্যকর, দৃশ্যমান ও বাস্তবমুখী সরকারি পদক্ষেপ আশা করেন, যাতে অর্থনীতির চাকা আবার পূর্ণ শক্তিতে ঘুরতে পারে।

সম্পর্কিত