Advertisement Banner

মানুষ মরলে উল্লাসে হা হা দেওয়ার দেশে!

মানুষ মরলে উল্লাসে হা হা দেওয়ার দেশে!
প্রতীকী ছবি

বাংলাদেশের মাটি উর্বর। এ কারণেই এই দেশকে ঐতিহাসিকভাবেই সুজলা, সুফলা, শস্য–শ্যামলা বলে থাকেন কবি, সাহিত্যিকেরা। তবে উর্বর এই দেশে গত কয়েক বছর ধরেই ধানের চেয়ে বেশি চাষ হচ্ছে ঘৃণার। ফলনও অনেক। এতটাই যে, আমাদের বাংলাদেশ এখন পরিণত হয়েছে মানুষ মরলে উল্লাসে হা হা দেওয়া দেশে!

এমন কথা বলতেই হচ্ছে এবং বিশ্বাসও করতে হচ্ছে, কারণ এমন প্রামাণ্য ঘটনার সংখ্যা দিনকে দিন বাড়ছেই। একটা পূর্বশর্ত আছে কেবল। সেটি হলো—মরে যাওয়া মানুষটিকে বিপরীত চিন্তার বা মতাদর্শের হতে হবে! অর্থাৎ, যদি কেউ ডানে থাকে, তাহলে মরে যাওয়া মানুষটি বামে থাকলেই ডানের লোকটি গালাগাল দেওয়ার লাইসেন্স পেয়ে যায়। আবার উল্টোটাও হয়। বামের মানুষ লাইসেন্স পায় ডানের মৃত মানুষটির ক্ষেত্রে। এমনকি এই দেশটার মানুষগুলোর অবস্থা এখন এতটাই সঙিন যে, খুবই তুচ্ছাতিতুচ্ছ বিষয় নিয়েও পক্ষ–বিপক্ষ তৈরি করে এক মানুষ আরেক মানুষের বিপদে তাকে খাদের কিনারে ঠেলে দিচ্ছে। তার জীবনটাকে অসহনীয় করে তুলছে।

এমন প্রসঙ্গ উঠছে সাম্প্রতিক এক মৃত্যুর ঘটনাতেই। কনটেন্ট ক্রিয়েটর ও অভিনেত্রী কারিনা কায়সার মারা গেছেন। গতকাল শুক্রবার দিবাগত মধ্যরাতে ভারতের চেন্নাইয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ৩১ বছর বয়সী কারিনা মারা যান। কারিনা কায়সারের বাবা ও জাতীয় ফুটবল দলের সাবেক খেলোয়াড় কায়সার হামিদ তার মৃত্যুর তথ্য নিশ্চিত করেছেন। কায়সার হামিদ সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, কারিনার ফুসফুসে অ্যান্টিবায়োটিক দেওয়ার সময় হঠাৎ তার প্রেশার অনেক নিচে নেমে যায়। এরপর ডাক্তাররা সর্বোচ্চ চেষ্টা করলেও শেষ পর্যন্ত কারিনাকে আর বাঁচানো যায়নি।

সোশ্যাল মিডিয়ায় মজার মজার কন্টেন্ট তৈরি করে বেশ পরিচিতি পেয়েছিলেন কারিনা কায়সার। একইসঙ্গে অভিনয়ের সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন। কাজ করেছেন চিত্রনাট্যেও।

কনটেন্ট ক্রিয়েটর ও অভিনেত্রী কারিনা কায়সার। ছবি: ফেসবুক থেকে নেওয়া
কনটেন্ট ক্রিয়েটর ও অভিনেত্রী কারিনা কায়সার। ছবি: ফেসবুক থেকে নেওয়া

লিভার জটিলতায় হঠাৎ করেই অসুস্থ হয়ে পড়েন কারিনা। প্রথমে তাকে রাজধানীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে তাকে লাইফ সাপোর্টে রাখা হয়। পরে গত সোমবার রাতে উন্নত চিকিৎসার জন্য এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে ভারতের চেন্নাই নেওয়া হয় তাকে। সেখানে ভেলোরের খ্রিষ্টান মেডিক্যাল কলেজ (সিএমসি) হাসপাতালে তার চিকিৎসা চলছিল। চিকিৎসকেরা প্রথমে তার ফুসফুসের চিকিৎসা শুরু করেছিলেন। এরপর লিভার ট্রান্সপ্ল্যান্টের প্রস্তুতিও চলছিল।

এই অসুস্থতা, লাইফ সাপোর্টে চলে যাওয়ার শুরু থেকেই সোশ্যাল মিডিয়ায় এক সংঘবদ্ধ ঘৃণার মুখে পড়তে হয় কারিনা কায়সারকে। তিনি অসুস্থ, পুরোপুরি শয্যাশায়ী, কিন্তু তাতে ঘৃণাচাষীদের কিচ্ছু যায় আসে না। তারা পারেই শুধু ঘৃণা ছড়াতেই। তাই সোশ্যাল মিডিয়ায় কারিনার অসুস্থতার খবরের পোস্টে পড়তে থাকে ‘হা হা’। সাথে গালিগালাজ তো আছেই। অসুস্থতার খবরে ছড়িয়ে দেওয়া ঘৃণা আরও প্রবল হয়ে ওঠে কারিনার মৃত্যুর পর। একটি নির্দিষ্ট পক্ষ গণহারে উল্লাস প্রকাশ করতে থাকে, হা হা দেয়, আরও বলে ‘বেশ হয়েছে, মরেছে’ ঘরানার বক্তব্য।

কারণ কী? প্রধান কারণটি হলো—গণঅভ্যুত্থান। চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানকে কেন্দ্র করে এক অদ্ভুত বিভক্তি তৈরি হয়েছে আমাদের দেশে, সমাজে। কেউ বলে, গণঅভ্যুত্থানের যেকোনো ধরনের সমালোচনা করলেই তা অপরাধ। আবার উল্টো পক্ষে, গণঅভ্যুত্থানকে স্বীকার করলেই, তা হয়ে পড়ছে শাস্তিযোগ্য। অথচ, বাংলাদেশে ২০২৪ সালের জুলাই–আগস্টে সাধারণ মানুষ যে ক্ষোভে–দুঃখে রাস্তায় নামেনি, তা কেউই প্রমাণ করতে পারবেন না। আবার, ইতিহাসের যে কোনো ঘটনার নির্মোহ বিশ্লেষণেও এর ইতিবাচক ও নেতিবাচক—দুটি দিকই আলোচিত হয়। যেকোনো কিছুর যৌক্তিক সমালোচনা যে কেউ করতে পারে। মানুষে মানুষে চিন্তা ও মতের পার্থক্য থাকাটাই স্বাভাবিক। এই বৈচিত্র্যই সুন্দর, স্বাভাবিক। এর সহাবস্থান জরুরি। যে কেউ যেকোনো বিষয়ের পক্ষে–বিপক্ষে যুক্তির ভিত্তিতে মত দিতেই পারেন। এসবের পাল্টা বক্তব্যও হতে হয় যুক্তিনির্ভর। এসব ক্ষেত্রে ঘৃণা ছড়িয়ে কাউকে কোণঠাসা করে দিতে পারলেই, সেই মতকে মুছে ফেলা যায় না।

আর আমরা ঠিক সেই কাজটিই করছি। যে কোনো কিছুর পক্ষে, বিপক্ষের সবাই, নিজের সাথে দ্বিমত বা ভিন্ন মতের সবাইকে কেন জানি নিজের পক্ষে ধরে, বেঁধে আনতে বদ্ধ পরিকর হয়ে পড়ছি। এবং তা করতে গিয়ে প্রথম কাজটিই হচ্ছে ট্যাগ দেওয়ার। কেউ দোসর হয়ে যাচ্ছে, কেউ হয়ে যাচ্ছে দালাল। আর এসবের সাথে সাথেই শুরু হয়ে যাচ্ছে ঘৃণা ছড়ানোর মল্লযুদ্ধ। সেক্ষেত্রে কেউই যেন সংবেদনশীল হতে চাইছে না। বরং কাকে কতটা তীব্র কটু বাক্যে আহত করা যাবে বা মানসিকভাবে নিহত করা যাবে, সেটিই হয়ে উঠছে একমাত্র লক্ষ্য। গালি এখানে খুবই সাধারণ একটি অস্ত্র। সেসব গালিকে আরও কতটা নিচে নামিয়ে মারণাস্ত্রে পরিণত করা যাবে, সেটিই উদ্দেশ্য কেবল।

তাতে কী হচ্ছে আসলে? হচ্ছে যেটা, সেটা হলো আমরা নিজেদের অমানুষ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার প্রতিযোগিতায় নেমেছি। একজন মরণাপন্ন ব্যক্তিরও মৃত্যু কামনা করছি অবলীলায়। মরে যাওয়ার পরও রক্ষা নেই। আরও কতটা চরিত্র হনন করা যায়, আরও কতটা অমানুষ হয়ে ওঠা যায়—সেই প্রতিযোগিতা চলমান থাকে। একবারও আমরা ভাবি না, যে আঙুলগুলো দিয়ে ফেসবুকে গালি টাইপ করি বা মৃত্যু কামনা করি কারও, সেই আঙুল আমাদের মা–বাবা, ভাই–বোনকেও স্পর্শ করে। সেই পারিবারিক অপত্য স্নেহময় সময়ে কি আমাদের নিজেদের দেওয়া গালি বা চরম অবমাননাকর শব্দগুলো মনে পড়ে?

ছবি: সংগৃহীত
ছবি: সংগৃহীত

ড়ছে যে না, তা তো স্পষ্টই। পড়লে তো কারিনা কায়সারকে মৃত্যুর পর এত এত কটু কথার তোড়ে পড়তে হতো না। বিখ্যাত ফুটবলার কায়সার হামিদকে সেসব সহ্য করতে হতো না। এমন ঘটনা যখন এ দেশে ঘটে, তখনই আমরা বুঝে যাই শিক্ষার নামে এদেশে হয়তো অশিক্ষা বা কুশিক্ষাই ছড়িয়েছে বেশি। মানবিকতা কেউ শেখেনি আদতে, বরং অমানবিকতাই হয়ে উঠেছে অনেকের ‘প্যাশন’।

ঘৃণার চাষ বাংলাদেশে তাই ছড়াচ্ছে সংক্রামক রোগের মহামারির চেয়েও দ্রুতগতিতে। এ ভাইরাস যাকে একবার ধরে, তাকে একেবারে জোম্বি না বানিয়ে ছাড়ে না। বিপদে বা বেকায়দায় বা মৃত্যুপথযাত্রী কাউকে নিয়ে যারা অবলীলায় উল্লাস করতে পারে, তারা জোম্বি না তো কি? সোশ্যাল মিডিয়ায় আরেক মানুষকে কামড়ে খেয়ে ফেলাই তো তাদের একমাত্র বিনোদন!

এমন জোম্বিদের মানুষ বানানো যাবে কোন ভ্যাকসিনে? জাতিসংঘ সাহায্য করবে নাকি? তা না হলে একদিন আমাদের এই দেশই হয়তো হয়ে উঠবে ভবিষ্যতের জোম্বিল্যান্ড!

লেখক: বার্তা সম্পাদক, চরচা

সম্পর্কিত