Advertisement Banner

ঢাকার সড়কে এআই ক্যামেরা, ৪ দিনে ৩০০ মামলা

চরচা প্রতিবেদক
চরচা প্রতিবেদক
ঢাকার সড়কে এআই ক্যামেরা, ৪ দিনে ৩০০ মামলা
ছবি: এআই দিয়ে তৈরি

রাজধানীতে যান চলাচলে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে এবার কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) সহায়তা নেওয়ার পর থেকে প্রায় ৩০০টি যানবাহনের বিরুদ্ধে মামলা প্রস্তুত করা হয়েছে।

মহানগরীর গুরুত্বপূর্ণ সিগনাল ও ক্রসিংয়ে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) স্থাপন করা এআই-নির্ভর ক্যামেরার মাধ্যমে গত ৪-৭ মে চার দিনে এই মামলা প্রস্তুত করা হয়েছে বলে ডিএমপির ট্রাফিক বিভাগ সূত্রে জানা গেছে। নতুন এই পদ্ধতির মাধ্যমে এখন থেকে ট্রাফিক আইন ভঙ্গের ঘটনা স্বয়ংক্রিয়ভাবে শনাক্ত হচ্ছে এবং সেই অনুযায়ী সরাসরি মামলা তৈরি করা হচ্ছে। এরপর মামলার নোটিশ পাঠানো হচ্ছে সংশ্লিষ্ট যানবাহনের মালিকের ঠিকানায় এবং মোবাইল ফোনেও পাঠানো হচ্ছে এসএমএস।

এসব মামলা যাচাই-বাছাই শেষে ধাপে ধাপে সংশ্লিষ্ট মালিকদের কাছে মামলার কপি পাঠানো হবে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে মালিক বা চালকদের ডিএমপি ট্রাফিক বিভাগে হাজির হয়ে সড়ক পরিবহন আইন-২০১৮ অনুযায়ী জরিমানা পরিশোধ করে মামলা নিষ্পত্তি করতে হবে। সেটি না করলে ম্যাজিস্ট্রেটের মাধ্যমে সমন বা গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হতে পারে।

ডিএমপি ট্রাফিক বিভাগ জানিয়েছে, রাজধানীর বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে নতুন এই প্রযুক্তি বসানো হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টাল মোড়, বাংলামোটর, কারওয়ান বাজার, বিজয় সরণি ও জাহাঙ্গীর গেট সিগনাল। এছাড়া ফার্মগেট মোড়ে এআই ক্যামেরা স্থাপনের কাজ চলছে। পর্যায়ক্রমে এই প্রযুক্তি আরও বিস্তৃত করে রাজধানীর বড় অংশে প্রয়োগের পরিকল্পনা রয়েছে।

এই প্রযুক্তি চালুর আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া শুরু হয় গত ২৯ এপ্রিল, যখন ডিএমপি সদর দপ্তরে ‘এআই বেজড রোড ট্রান্সপোর্ট অ্যাক্ট ভায়োলেশন ডিটেকশন সিস্টেম’সহ মোট ৯টি অ্যাপ উদ্বোধন করা হয়। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) আলী হোসেন ফকির বলেন, এই সিস্টেম কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মাধ্যমে ট্রাফিক আইন ভঙ্গকারীদের দ্রুত শনাক্ত করতে সক্ষম হবে, যা সড়কে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা, দুর্ঘটনা কমানো এবং ট্রাফিক ব্যবস্থাপনাকে আরও কার্যকর করবে।

এরপর ৩ মে ডিএমপির ভারপ্রাপ্ত কমিশনার মো. সরওয়ার স্বাক্ষরিত গণবিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে চালক ও মালিকদের সতর্ক করা হয়। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, এআই ক্যামেরার মাধ্যমে আইন ভঙ্গের বিষয়ে স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পর দিন থেকেই আনুষ্ঠানিকভাবে এআই সিস্টেমের মাধ্যমে মামলা প্রস্তুতের কার্যক্রম শুরু হয়।

ট্রাফিক বিভাগ সূত্রে জানা যায়, এই ক্যামেরাগুলো শুধু সাধারণ ট্রাফিক পর্যবেক্ষণই করছে না, বরং সরাসরি আইন ভঙ্গ শনাক্ত করে স্বয়ংক্রিয়ভাবে মামলা তৈরি করছে। সিস্টেমটি একাধিক ধরনের অপরাধ শনাক্ত করতে সক্ষম, যার মধ্যে রয়েছে রেড সিগনাল অমান্য করা, জেব্রা ক্রসিং দখল করা, উল্টো পথে গাড়ি চালানো, হেলমেট ছাড়া মোটরসাইকেল চালানো, সিটবেল্ট না পরা, অতিরিক্ত যাত্রী বহন, মোবাইল ফোন ব্যবহার করে গাড়ি চালানো, বাম লেন ব্লক করা, যত্রতত্র যাত্রী ওঠানামা করানো এবং অনুমতি ছাড়া ভিআইপি লাইট ব্যবহার করা।

পাশাপাশি বিআরটিএ ডাটাবেসের সঙ্গে সংযোগের মাধ্যমে গাড়ির মেয়াদোত্তীর্ণ কাগজপত্রও শনাক্ত করা হচ্ছে।

এআই ক্যামেরা কোনো আইন ভঙ্গ শনাক্ত করার পর স্বয়ংক্রিয়ভাবে ছবি ও তথ্য সংগ্রহ করে একটি ডিজিটাল মামলা তৈরি করে। এরপর তা ট্রাফিক বিভাগ যাচাই করে নোটিশ হিসেবে ডাকযোগে গাড়ির মালিকের ঠিকানায় পাঠায়। একই সঙ্গে মোবাইল ফোনেও বার্তা পাঠানো হয়, যাতে দ্রুত অবহিত হওয়া যায়।

ডিএমপি ট্রাফিক বিভাগের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, রাজধানীতে যানবাহনের সংখ্যা এত বেশি যে হাতে হাতে মামলা করা বা কাগজপত্র যাচাই করা অত্যন্ত সময়সাপেক্ষ ও কঠিন হয়ে পড়েছিল। জনবল সংকট এবং বিভিন্ন ধরনের চাপের কারণে অনেক সময় কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া কঠিন হতো। এখন এআই প্রযুক্তি সরাসরি মামলা তৈরি করায় সার্জেন্টদের ওপর চাপ কমবে এবং প্রক্রিয়াটি আরও স্বচ্ছ হবে।

তিনি আরও জানান, অনেক ক্ষেত্রে প্রভাবশালী মহলের চাপ বা অনুরোধের কারণে আইন প্রয়োগে জটিলতা তৈরি হতো। এখন যেহেতু স্বয়ংক্রিয়ভাবে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে, তাই ব্যক্তিগত প্রভাবের সুযোগ অনেক কমে যাবে।

এদিকে প্রযুক্তিটির প্রভাব ইতোমধ্যে সড়কে দৃশ্যমান হতে শুরু করেছে বলে জানিয়েছেন চালকরা। রাইড শেয়ারিং মোটরসাইকেল চালক ওমর ফারুক চরচাকে বলেন, আগে অনেকেই সিগনাল ভাঙলেও তেমন ভয় ছিল না, কারণ জরিমানার মুখোমুখি হওয়ার সম্ভাবনা কম ছিল। কিন্তু এখন এআই ক্যামেরার কারণে অনেকে সতর্ক হচ্ছে এবং নিয়ম মানার প্রবণতা বেড়েছে।

ডিএমপির ট্রাফিক বিভাগ জানায়, নোটিশ পাওয়ার পর মালিক বা চালকদের নির্ধারিত সময়ে হাজির হয়ে জরিমানা পরিশোধ করতে হবে। সময়মতো হাজির না হলে আইন অনুযায়ী কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এর মধ্যে ম্যাজিস্ট্রেটের মাধ্যমে আইনি প্রক্রিয়ায় সমন বা গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির ব্যবস্থাও রয়েছে।

ডিএমপির ট্রাফিক বিভাগের অতিরিক্ত কমিশনার মো. আনিছুর রহমান জানান, বর্তমানে পাঁচটি সিগনালে এই প্রযুক্তি চালু রয়েছে। ফার্মগেটে ক্যামেরা স্থাপনের কাজ শেষ হলে আরও সিগনাল যুক্ত করা হবে। আগামী ছয় মাসের মধ্যে রাজধানীর অন্তত ৫০০টি গুরুত্বপূর্ণ সিগনাল ও ক্রসিংয়ে এআই ক্যামেরা বসানোর পরিকল্পনা রয়েছে।

আনিছুর রহমান চরচাকে বলেন, ইতোমধ্যে কয়েকশ মামলা প্রস্তুত হয়েছে, যা যাচাই শেষে পাঠানো হবে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এআই প্রযুক্তির মাধ্যমে ট্রাফিক আইন বাস্তবায়ন করা হয় এবং সেখানে শৃঙ্খলা তুলনামূলকভাবে বেশি থাকে। বাংলাদেশেও এই প্রযুক্তি কার্যকর হলে সড়কে শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা আরও বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে।

সম্পর্কিত