Advertisement Banner

পাটেই সব সমস্যার সমাধান, এরপরও আমদানি কেন?

চরচা ডেস্ক
চরচা ডেস্ক
পাটেই সব সমস্যার সমাধান, এরপরও আমদানি কেন?
বাংলাদেশ বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম পাট উৎপাদনকারী এবং শীর্ষ পাট রপ্তানিকারক দেশ। ছবি: পিক্সাবে

‘সোনালী আঁশ’ হিসেবে পাটের নাম কে না শুনেছে! সেই ছেলেবেলায় পাটের রচনা লেখার সময় থেকে শুরু করে প্রতি বছর বর্ষা মৌসুমে আলোচনাটা সামনে আসে। সেই পাটের নতুন এক উপকারী দিকের খোঁজ দিলেন বাংলাদেশি গবেষকেরা। আর তাতেই দেশের আমদানি-নির্ভরতা বহুলাংশে কমানো সম্ভব। বিশেষ করে কালি আমদানির ক্ষেত্রে। আর পুরো ব্যাপারটিই পরিবেশবান্ধব।

কীভাবে?  

গত কয়েক বছর ধরে পুরো বিশ্বে ‘জিরো ওয়েস্ট’ শব্দদ্বয় বেশ পরিচিতি পেয়েছে। বিশেষ করে পরিবেশবাদী বা পরিবেশ নিয়ে যারা বেশি সচেতন, তাদের মধ্যে এর জনপ্রিয়তা অনেক। এটি টেকসই ও পরিবেশবান্ধব জীবনযাপনের একটি অংশ। আধুনিক বিশ্বে জলবায়ু পরিবর্তন ও সম্পদ সংকটের মোকাবিলায় এই পরিবেশবান্ধব ধারণার গুরুত্ব অপরিসীম।

‘জিরো ওয়েস্ট’ জীবনধারা কেবল একটি সাময়িক ট্রেন্ড বা ফ্যাশন নয়—এটি দৈনন্দিন জীবনে বর্জ্যের পরিমাণ সর্বনিম্ন পর্যায়ে নামিয়ে এনে পরিবেশের ওপর ক্ষতিকর প্রভাব কমানোর একটি বাস্তবসম্মত পদ্ধতি। পরিবেশ রক্ষায় বর্তমানে প্রায় সব শিল্পেই এ পদ্ধতি অবলম্বন করছে। এর মধ্যে কৃষিখাতও রয়েছে। পশ্চিমা বিশ্বের মতো আমাদের কৃষিপ্রধান দেশেও ধীরে ধীরে ‘জিরো ওয়েস্ট’ ধারার চর্চা শুরু হয়েছে।

‘জিরো ওয়েস্ট অ্যাগ্রিকালচার’ হলো এমন এক টেকসই পদ্ধতি, যেখানে খামারের কোনো উপজাত বা অবশিষ্টাংশকে ফেলে না দিয়ে অন্য কোনো প্রক্রিয়ার কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহার করা হয়। এটি রাসায়নিক ইনপুটের খরচ কমায়, গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন হ্রাস করে পরিবেশের স্বাস্থ্য রক্ষা করে এবং কৃষকদের আয়ের নতুন উৎস তৈরি করে। বাংলাদেশে ‘সোনালী আঁশ’ পাটের উৎপাদন বিপুল। গ্রামীণ অঞ্চলে সাধারণত রান্নার জ্বালানি বা স্বল্পমূল্যের বেড়া হিসেবে ব্যবহৃত পরিত্যক্ত পাটখড়িকে উচ্চমূল্যের শিল্প সামগ্রীতে রূপান্তর করার এক অবিশ্বাস্য উপায় খুঁজে পেয়েছেন বিজ্ঞানীরা, যা ‘জিরো ওয়েস্ট’ কৃষির এক চমৎকার বৈজ্ঞানিক দৃষ্টান্ত।

কৃষিজাত বর্জ্য যখন আমদানির বিকল্প

বাংলাদেশ বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম পাট উৎপাদনকারী এবং শীর্ষ পাট রপ্তানিকারক দেশ। দেশের কাঁচা পাট উৎপাদন বার্ষিক প্রায় ৯০ লাখ বেলে (পাট পরিমাপের একক) বা ১.৬ মিলিয়ন টন পৌঁছায়। ফলে প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ পাটখড়ি উৎপাদিত হয়।

পাটের অবশিষ্টাংশ দিয়ে এখন তৈরি করা যাবে কালি। ছবি: বাসস
পাটের অবশিষ্টাংশ দিয়ে এখন তৈরি করা যাবে কালি। ছবি: বাসস

২০২২ সালে ‘কেমিস্ট্রি: অ্যান এশিয়ান জার্নাল’-এ প্রকাশিত এক গবেষণায় সৌদি আরবের কিং ফাহদ ইউনিভার্সিটি অব পেট্রোলিয়াম অ্যান্ড মিনারেলস (কেএফইউপিএম)-এর বাংলাদেশি বিজ্ঞানী মো. আবদুল আজিজের নেতৃত্বাধীন একটি গবেষণা দল পরিত্যক্ত পাটখড়ি থেকে তৈরি ‘সাবমাইক্রন’ (১ মাইক্রোমিটারের চেয়েও ছোট) কার্বন কণা ব্যবহার করে পরিবেশবান্ধব কালি তৈরি করেছেন। এটি আমদানিকৃত বাণিজ্যিক কালো কালির একটি সম্ভাব্য স্বল্পমূল্যের বিকল্প, যা আমদানি খরচ প্রায় ১০ গুণ কমিয়ে দিতে পারে। এটি বর্জ্য থেকে নতুন অর্থনৈতিক মূল্য তৈরি করবে।

আমদানিকৃত কালির এক ব্যয়বহুল বাজার

বাংলাদেশের দ্রুত বর্ধনশীল উৎপাদন ও প্রকাশনা খাত থাকা সত্ত্বেও মুদ্রণ এবং প্যাকেজিং শিল্পগুলো প্রায় সম্পূর্ণরূপেই আমদানিকৃত কালির ওপর নির্ভরশীল। ‘প্রিন্টিং ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ’-এর হিসাব মতে, দেশের বার্ষিক কালির বাজার প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকার (প্রায় ২৪৫ মিলিয়ন ডলার)। বেশিরভাগ কালি এবং এর কাঁচামাল চীন, জাপান, জার্মানি, দক্ষিণ কোরিয়া এবং নেদারল্যান্ডস থেকে আমদানি করা হয়। দেশের প্রায় ১৫ হাজার মুদ্রণ যন্ত্র প্রতি বছর প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকার আমদানিকৃত কালি ব্যবহার করে।

এছাড়া লেজার ও ইঙ্কজেট প্রিন্টারের জন্য আরও প্রায় ৮.৫ হাজার কোটি টাকার কালি আমদানি করা হয়। এই বিশাল চাহিদা থাকা সত্ত্বেও উচ্চ-মানের কার্বন-ভিত্তিক কালির কাঁচামাল উৎপাদনের জন্য বাংলাদেশে নিজস্ব কোনো শিল্প ভিত্তি গড়ে ওঠেনি।

পরিবেশ সম্পর্কিত গণমাধ্যম মঙ্গাবে-তে আজিজ বলেন, “আমরা কম মূল্যের বায়োমাসকে উন্নত শিল্প সামগ্রীতে রূপান্তর করার চেষ্টা করছি। কিন্তু যখন আমরা এটি পাটখড়ি দিয়ে চেষ্টা করলাম, তখন আমরা নিজেরাই অবাক হয়েছিলাম। আমরা পাটখড়ি থেকে আরও উন্নত মানের কালি পেয়েছি এবং এটি আমদানি খরচের তুলনায় খরচ প্রায় ১০ গুণ কমিয়ে দিতে পারে।” 

পাটখড়ি থেকে কালি: প্রস্তুত প্রণালী

গবেষণামূলক পরীক্ষায় গবেষকেরা একটি বিশেষভাবে তৈরি পাইলট চুল্লির (ফার্নেস) মাধ্যমে পাটখড়ি পুড়িয়ে কার্বন তৈরি করেন (পাইরোলাইসিস প্রক্রিয়া)। এই চুল্লিটি প্রক্রিয়াকরণ চলাকালীন উৎপন্ন বিপজ্জনক গ্যাসগুলোকে বায়ুমণ্ডলে ছেড়ে না দিয়ে পুনরায় প্রক্রিয়াজাত করে জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করে, যা ক্ষতিকর নির্গমন হ্রাস করে।

পাটখড়ি পুড়িয়ে কার্বন তৈরি করে তা থেকে তৈরি করা যাবে কালি। ছবি: উইকিমিডিয়া কমন্স
পাটখড়ি পুড়িয়ে কার্বন তৈরি করে তা থেকে তৈরি করা যাবে কালি। ছবি: উইকিমিডিয়া কমন্স

এরপর প্রাপ্ত কার্বন উপাদানকে ‘বল-মিলিং’ প্রযুক্তির মাধ্যমে গুঁড়ো করে গড়ে প্রায় ২৫০ ন্যানোমিটার আকৃতির ‘সাবমাইক্রন’ কণা তৈরি করা হয়। মুদ্রণযোগ্য কালি তৈরির জন্য এই কণাগুলোকে বায়োকম্প্যাটিবল ইথিলিন গ্লাইকল এবং আইসোপ্রোপাইল অ্যালকোহল সমৃদ্ধ জলীয় দ্রবণে মিশ্রিত করা হয়। ‘ক্যানন’ প্রিন্টারে পরীক্ষায় দেখা গেছে, উদ্ভাবিত কালিটি বাজারে প্রচলিত বাণিজ্যিক কালির মতোই কালো রঙ, আলো পরিবাহিতা এবং দীর্ঘস্থায়ী মুদ্রণ সক্ষমতা দেখিয়েছে।

প্রচলিত কার্বন ব্ল্যাকের চেয়েও পরিবেশবান্ধব

বাজারে প্রচলিত বাণিজ্যিক কালো প্রিন্টিং কালি মূলত ‘কার্বন ব্ল্যাক’-এর ওপর নির্ভরশীল, যা পেট্রোলিয়াম থেকে অত্যন্ত শক্তি-নিবিড় শিল্প প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তৈরি হয় এবং প্রচুর গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন করে। আজিজের দলের মতে, নবায়নযোগ্য কৃষিজাত বর্জ্য থেকে প্রাপ্ত বায়োমাস-ভিত্তিক কার্বন এর একটি টেকসই বিকল্প। মঙ্গাবেতে আজিজ জানিয়েছেন, প্রচলিত উপায়ে বায়োমাসের ‘পাইরোলাইসিস’ প্রক্রিয়ায় মিথেন ও কার্বন মনোক্সাইডের মতো ক্ষতিকারক গ্যাস নির্গত। কিন্তু তাদের নকশাকৃত পাইলট চুল্লি এই গ্যাসগুলোকে পুড়িয়ে কম ক্ষতিকারক শেষ উপাদানে (কার্বন ডাই অক্সাইড ও পানি) রূপান্তর করে। এই প্রযুক্তি জীবাশ্ম-ভিত্তিক কাঁচামালের পরিবর্তে নবায়নযোগ্য বায়োমাস ব্যবহারের মাধ্যমে সবুজ শিল্প রসায়নের দিকে এগিয়ে যাওয়া একটি আন্দোলনের অংশ। আজিজ আরও জানান, বাংলাদেশে একটি ভালো মানের বল মিলিং মেশিন ক্রয় করে খুব সহজেই এই কালি উৎপাদন করা সম্ভব।

মূল্যবান গ্রাফিনের স্বপ্ন

এই উদ্ভাবনটি একবিংশ শতাব্দীর অন্যতম সম্ভাবনাময় ও মূল্যবান উপাদান ‘গ্রাফিন’ তৈরির ক্ষেত্রেও আশার আলো দেখাচ্ছে। ২০২২ সালের আরেকটি গবেষণায় দেখা যায়, পাটখড়ি উন্নত ও কার্যকরী উপাদানের বড় উৎস হতে পারে। গবেষকেরা গুঁড়ো পাটখড়িকে ‘অ্যাক্টিভেটেড কার্বন ন্যানোশিটে’ রূপান্তরিত করে নিষ্ক্রিয় পরিবেশে প্রায় ২ হাজার ৭০০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় উত্তপ্ত করেন। এর ফলে উচ্চ বিশুদ্ধতা ও শক্তিশালী গাঠনিক স্থায়িত্ব সম্পন্ন একটি ত্রিমাত্রিক আন্তঃসংযুক্ত গ্রাফিন কাঠামো তৈরি হয়।

ব্যাটারি, সেমিকন্ডাক্টর, মহাকাশযান এবং ‘সফট’ ইলেকট্রনিক্সে গ্রাফিনের বৈশ্বিক বাজার ২০৩০ সালের মধ্যে ৯ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে। পাটের এই বিপুল বায়োমাসের কারণে বাংলাদেশের কাছে একটি অপ্রত্যাশিত বাড়তি সুবিধা রয়েছে। বাংলাদেশ সরকার চাইলেই সেই যুগান্তকারী অর্থনৈতিক সুযোগটি কাজে লাগাতে পারে।  

সম্পর্কিত