Advertisement Banner

ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইউরোপযাত্রায় বাংলাদেশিদের মৃত্যুর হার ১২ শতাংশ

চরচা প্রতিবেদক
চরচা প্রতিবেদক
ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইউরোপযাত্রায় বাংলাদেশিদের মৃত্যুর হার ১২ শতাংশ
প্রতি বছর ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইউরোপ যেতে বিশ্বের সবচেয়ে বেশি মৃতের হার বাংলাদেশিদের। ছবি: রয়টার্স

উত্তাল ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে লিবিয়া থেকে গ্রিসে যাওয়ার পথে ১৮ বাংলাদেশির মৃত্যু হয়েছে। এই ঘটনার পর দেশে জুড়ে শোকের মাতম চলছে। তবে এটি শুধু একক ঘটনা নয়। বরং বিগত কয়েক বছর ধরে বাংলাদেশি নাগরিকরা বিভিন্ন সময় সাগর পথে ইউরোপ যাত্রা করেছেন। এই অবৈধ পথে ইউরোপ যেতে বিশ্বের সবচেয়ে বেশি মৃতের হার বাংলাদেশিদের। এসব মৃত্যু ঠেকাতে আন্তর্জাতিক ভুক্তভোগী দেশগুলোর সমন্বিত চুক্তি ও দেশের অভ্যন্তরে এলাকাভিত্তিক সচেতনতা ক্যাম্পেইন জরুরি বলে জানান বিশেষজ্ঞরা।

জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআর’র দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে অবৈধভাবে ইউরোপে প্রবেশের তালিকায় শীর্ষে আছেন বাংলাদেশের নাগরিকরা। গত বছরের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত ২০ হাজার ২৫৯ জন বাংলাদেশি ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইতালি প্রবেশ করেছেন। এই সময়ে কতজন মারা গেছে সেটির কোনো হিসেব নেই। তবে আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা আইওএম মনে করে, ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিতে গিয়ে যারা মৃত্যুবরণ করেন, তাদের ১২ শতাংশ বাংলাদেশি।

ইউএনএইচসিআরের প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, সাগরপথে ইতালি প্রবেশের ক্ষেত্রে প্রতিবছরই শীর্ষ অবস্থানে আছে বাংলাদেশ। ২০২৪ সালে ১৪ হাজার ২৮৪ জন, ২০২৩ সালে ১২ হাজার ৭৭৪ জন, ২০২২ সালে ১৫ হাজার ২২৮ জন, ২০২১ সালে ৭ হাজার ৮৩৮ জন এবং ২০২০ সালে ৪ হাজার ১৪১ জন বাংলাদেশি ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইতালিতে ঢুকেছেন।

এদিকে গত কয়েক বছরে ইউএনএইচসিআরের ইতালিতে সাগরপথে গমনের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২২–২০২৩ সময়ে সমুদ্রপথে ইতালিতে পৌঁছানো অভিবাসীদের মধ্যে বাংলাদেশিদের অংশ তুলনামূলকভাবে কম ছিল (প্রায় ১৪–১৫ শতাংশের কাছাকাছি) তবে ২০২৪ সালে এই হার উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়ে প্রায় ২০–২৫ শতাংশে পৌঁছে। এরপর ২০২৫ সালে প্রবণতাটি আরও দ্রুত বেড়ে যায়। এই বছরের প্রথমার্ধে বাংলাদেশিরা মোট আগতদের মধ্যে ৩২ দশমিক ৪ শতাংশ ছিল। সর্বশেষ ২০২৬ সালের শুরুতে ইতালিতে সমুদ্রপথে পৌঁছানোদের মধ্যে বাংলাদেশিদের হার ৩৪ দশমিক ১ শতাংশ।

বেশিরভাগই লিবিয়া থেকে যাত্রা শুরু করে, টাকা আদায়ে ‘গেম ঘরে নির্যাতন’

গত কয়েক বছরে গণমাধ্যমের তথ্য অনুসারে, ইউরোপে যাওয়ার জন্য বিভিন্ন দেশের নাগরিকরা ভূমধ্যসাগরের সেন্ট্রাল মেডিটেরানিয়ান রুট দিয়ে যাত্রা শুরু করেন। যার জন্য লিবিয়ার সাগর দালালরা ব্যবহার করেন। গত বছরের ডিসেম্বরে সব দেশের নাগরিকদের মধ্যে সমুদ্র পাড়ি দিয়ে আসা বাংলাদেশি নাগরিক ছিলেন ৩১ শতাংশ। এর পরে আছে মিসর ও সুদান। সেই সময় যেসব নাগরিক লিবিয়া থেকে রওনা হয়েছিল—তার ৩৯ শতাংশই ছিল বাংলাদেশি।

লিবিয়া থেকে বেঁচে ফিরে আসা ভুক্তভোগী সূত্রে জানা যায়, এই রুটে যাত্রার জন্য বিভিন্ন দেশের দালাল চক্র জড়িত রয়েছেন। যারা শুরুতে অর্ধেক টাকা ও পৌছে দেবার পর বাঁকি টাকা নেওয়ার শর্ত দেয়। তবে কেউ টাকা দিতে না চাইলে বা পালানোর চেষ্টা করলে ‘গেম ঘরে’ আটকে রেখে নির্যাতন করা হয় বলেও অভিযোগ পাওয়া যায়।

২৮ মার্চের খবর: ১৮ বাংলাদেশিসহ ২২ অভিবাসনপ্রত্যাশীর মৃত্যু

লিবিয়া থেকে সাগরপথে গ্রিসে যাওয়ার সময়ে খারাপ আবহওয়া ও পথ হারিয়ে নৌকায় ১৮ জন বাংলাদেশিসহ ২২ অভিবাসনপ্রত্যাশীর মৃত্যু হয়েছে। এ পর্যন্ত মারা যাওয়া ১২ জনের পরিচয় নিশ্চিত হওয়া গেছে। যারা সবাই সুনামগঞ্জ জেলার বিভিন্ন উপজেলার বাসিন্দা। দিরাই উপজেলার তারাপাশা গ্রামের আবু সাঈদ সরদারের ছেলে নুরুজ্জামান সরদার ময়না, আব্দুল গণির ছেলে সাজিদুর রহমান, ইসলাম উদ্দিনের ছেলে শাহান মিয়া, রনারচর গ্রামের আব্দুল মালেকের ছেলে মুজিবুর রহমান, বাসুরি গ্রামের মো. সুহানুর রহমান ও মাটিয়াপুর গ্রামের তায়েফ মিয়া, জগন্নাথপুরের চিলাউড়া গ্রামের সোহানুর রহমান, টিয়ারগাঁওয়ের শায়েখ আহমেদ, চিলাউড়া কবিরপুরের মো. নাঈম, পাইলগাঁওয়ের আমিনুর রহমান, ইছগাঁওয়ের মোহাম্মদ আলী। দোয়ারাবাজার উপজেলার কবিরনগর গ্রামের ফয়েজ উদ্দিনের ছেলে ফাহিম আহমেদ মুন্না। বাঁকি মৃতদের এখনো পরিচয় পাওয়া যায়নি।

সুনামগঞ্জের নিহত নাইমের মা আঁখি বেগম বলেন, আমার ছেলে ইউরোপ যাওয়া জন্য দালালকে ১৫ লাখ টাকা দিয়েছিল। কিন্তু তারা ছোট নৌকায় পাঠিয়ে ছেলেকে মেরে ফেলেছে। 

এ বিষয়ে শরণার্থী বিশেষজ্ঞ আসিফ মুনীর বলেন, আসলে দীর্ঘ দিন ধরে দেশের মানুষরা ইউরোপের কয়েকটি দেশে অবৈধভাবে গিয়ে থাকার সুযোগ পেয়েছে। তাই ভালো স্মৃতি হিসেবে অনেকেই এই অবৈধ পথ বেছে নেন। এটি অবশ্য এলাকা ভিত্তিক ভিন্ন ভিন্ন দেশ রয়েছে। কারণ সেখানের পরিচিত কেউ একটি দেশে গিয়ে ভালো সুযোগ–সুবিধা পাওয়ার পর বাঁকিরাও যেতে উৎসাহিত হয়েছেন।

তিনি আরও বলেন, এই অবৈধভাবে ইউরোপ গমন ঠেকানোর জন্য স্থানীয় ভাবে সচেতনতার ক্যাম্পেইন করা। আর যেসব সাব–এজেন্ট মানুষদের প্রলোভন দেখায় তাদের শণাক্ত করে আইনী ব্যবস্থা নেওয়া। আর এইসব রুটে বিভিন্ন মাফিয়া থাকে তাদের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক ভাবে ভুক্তভোগী দেশগুলোর মানবপাচার বিরোধী সমন্বিত চুক্তি করা।  

এর আগে গত রোববার (২৯ মার্চ) পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে এক ব্রিফিংয়ে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম বলেন, ‘‘গ্রিসের ঘটনায় একটি সংঘবদ্ধ আন্তর্জাতিক মানবপাচার চক্র জড়িত। এ চক্রের সদস্যরা বাংলাদেশ ও লিবিয়া  দুই দেশেই সক্রিয়। তারা উন্নত জীবনের প্রলোভন দেখিয়ে সাধারণ মানুষকে বিপজ্জনক পথে পাঠায় বিপুল অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার পর তাদের জীবন ঝুঁকির মুখে ফেলে দেয়।’’

তিনি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে নির্দেশ দিয়েছেন, যাতে দ্রুত এ চক্রকে শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা যায়। প্রয়োজনে আন্তর্জাতিক আইন ও বাংলাদেশের আইন— উভয় ব্যবস্থায় বিচার নিশ্চিত করার কথাও বলেন তিনি।

সম্পর্কিত